ফসলের কাফন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৩.৯.৭৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
ভরা ফসলের মাঠে যদি মৃত্যু হয় ভরা জোয়ারের জলে যদি মৃত্যু হয় আমার স্বপ্নের দায়ভার আমি তবে তোমাকেই দেবো।
মুছবো না দেহ থেকে মাছের ঘ্রানের মতো ভেজা ঘাম, বসন্ত আসার আগে এই মৃত্যু, তবু তাকে বলবো না অসময় যদি দেখি আমাদের অমিত সন্তান তারা লাঙল নিয়েছে হাতে চাষাবাদে নেমে গেছে অনাবাদি বেদনার কঠিন মাটিতে সব।
ভরা ফসলের মাঠে যদি মৃত্যু হয় তবু দঃখ নেই--- সুর্য ওঠার আগেই হদি মৃত্যু হয় তবু কোনো দুঃখ নেই, জেনে যাবো. ভোর হবে---আমাদের সন্তানেরা পাবে মুগ্ধ আলো, শীতার্ত আঁধারে আর পুষ্টিহীন শিশুদের কান্নার বিষাদ কোনেদিন শুনবে না কেউ।
জেনে যাবো ঋনমুক্ত, আমাদের কাংখিত পৃথিবী এলো।
ভরা শস্যের প্রান্তরে যদি মৃত্যু হয় তবে আর দুঃখ কিসে! জেনে যাবো শেষ হলো বেদনার দিন---ফসল ফলেছে মাঠে, আমাদের রক্তে শ্রমে পুষ্ট হয়েছে ওই শস্যের গুতিটি সবুজ কনা। . **************** . সূচীতে . . .
প্রথম পথিক কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২০.০৭.৭৬ নীলক্ষেত ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
বলো এই হাত কতোটুকু হিংস্র-সুঠাম হবে! এই মাধবীলতার মতো নমনীয় আঙুলগুলো এই চোখ, এ-চিবুক কতোখানি সর্বগ্রাসী হবে ৰলো আমি কতোটুকু মানুষ হবো কতটুকু পশু!
হাড়ের ভেতরে আছে এক লুকোনো অনাহার আছে ঋন---আছে গত মানুষের অসহায় পচন। জীবিত খুলির মধ্যে বিক্ষোভে ন’ড়ে ওঠে এক লাখ তীব্র করতল একলাখ পুষ্টিহীন শিশুর ক্ষয়মান দেহ। কালো ফুল, কালো হৃদপিণ্ডের শেষতম খেয়া বলো, বলো আমি কতোখানি বিক্ষোভ হবো, কতোখানি রক্ত হবো?
নিসর্গে নতজানু মন তবু তো তরুতল দেখে শৈশবে শীতের ঝরাপাতাদের লাশ কুড়োনোর দিনে ফিরে ফিরে খুলে দেয় বুকের দরোজাখানা, হিরন্ময় রুটি-ভাত--বিক্ষোভ-বিশ্বাস বলো আমি কতোজন শ্রমিক হবো, কতোজন দুর্বিনীত ঘাতক।
বিপরীত বাসনারা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৪.৫.৭৪ লালবাগ ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
একদিন নারী-প্রেম ডেকেছে আমাকে, আমি খুব সাড়াহীন নিশব্দে ছিলাম আমি যাইনি।
নিসঙ্গ বসন্তে আমার বন্ধ দরোজায় করাঘাত করেছিলে তুমি প্রেম আমি দোর খুলিনি--- আমি যাইনি।
উন্মূল বাসনা-বিদ্ধ রক্তাক্ত যৌবন আমাকেও ডেকেছিলো অভিসারে আমি যাইনি।
নদীদের রোমন্থনে ভাষা আছে, ঢেউয়ের মুকুটে জীবনের প্রতিবিম্ব এ-কথাও বলেছিলে একদিন--- তবু আমি যাইনি নদীর কাছে, সাগর আমাকে ডেকেছিলো আমি যাইনি।
সৌন্দর্য আমাকে ডেকেছিলো প্রাচুর্য আমাকে ডেকেছিলো আমি যাইনি---
তুমি আমাকে ডাকোনি কখনো আমি শুধু তোমারই কাছে যাবো। . **************** . সূচীতে . . .
অবরোধ চারিদিকে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১১.২.৭৫ লালবাগ ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
প্রত্যাশার প্রতিশ্রুতি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৫.২.৭৫ লালবাগ ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
হাত ধরো আমি হিংসার পৃথিবীতে এনে দেবো সুগভীর প্রেম কবিতার অহিংস-স্বভাব। হাত ধরো, হাত ধরো---আমি তোমাদের আরাধ্য ভুবনে এনে দেবো ব্যতিক্রম অভিধান, তোমাদের তমসা-সকালে আমি পৌঁছে দেবো সমস্যাহীন এক সূর্যময় রোদ্দুর।
গভীর নিকটে বোসে আমি উষ্ণ করতলে অনর্গল ছড়াচ্ছি আগুনের পুষ্টিকর ওষুধ।
রাতের দরোজা খুলে রাস্তায় বেরোলেই সে-রোগনাশক এসে ধুয়ে দেবে জটিল স্বভাব!
হাত ধরো, আমি একটি সঠিক নিশ্চয়তা এনে দেবো সন্ত্রাসের দৈনন্দিন উঠোনে।
হাত ধরো---আমি সমস্ত হতাশাকে মন্ত্রবলে নিমেশে মুছে দেবো এক সৌম্য যাদুকর, ভরাট অঘ্রান এসে চেতনায়, গৃহস্থালিতে ছড়াবে আশংকাহীন স্বপ্নের ঘ্রান---
দিঘল রাত্রি কারো শরীরে দেবে না মৃত্যুর ছোঁয়া চোখের সকেটে কারো স্বপ্নভুক মাছি ফেলবে না শ্বাস। হাত ধরো, আমি বেদনার দীর্ঘ রজনী থেকে অনিদ্রা তুলে নিয়ে এনে দেবো নিশ্চিন্ত ঘুম।
হাত ধরো, হাত ধরো--- আমি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিবর্তে এনে দেবো তৃতীয় পৃথিবীর শ্রেনীহীন কবিতার ভুবন। . **************** . সূচীতে . . .
সভ্যতার সরঞ্জাম কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৭.৯.৭৬ সাহেবের মাঠ মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
রক্তে আগুন তোর, তুই এতো নমনীয় হোলি চন্দনে সিক্ত কপাল হোলি তুই বিনম্র মাধবী! প্রাচীন পিঁচুটি চেখে তোর এতো দীর্ঘ হালো ঘুম তুই কোনো রাত্রি দেখলি না, কোনো সকালের সূর্য দেখলি না।
রক্তে তোর হত্যার উৎসব তবু তুই পৃথিবীর যে কোনো রক্তপাতে এতোবেশি কাতর হোলি প্রমানিত কয়েদী-র মতো হোলি এতো অসহায়, এতো নতমুখী তরু! ভেতরে এতো বিক্ষোভ, তবু তুই বিক্ষুব্ধ হোলি কৈ!
রৌদ্রে ফাটা মাটি তোকে ঢেকে নিলো গভীর তুষার, সুঠাম ইঁটের মতো দহনের ক্ষতচিহ দেহে নিয়ে তোর মাটি সভ্যতার সরঞ্জাম হলো---
দাহ তোকে টেনে নিলো অপরূপ মধ্যরাতে ছিঁড়ে পড়া আকাশের সেই সব তারা সেই সব বৃন্তচ্যুত তরুন নক্ষত্রের ব্যথা তোকে কি ভীষন টেনে নিলো বুকে।
তুই কতো শিশু ছিলি এতোকাল অবাধ্য বালক আদিম পিতার চে'ও তুই ছিলি বেশি নগ্নতনু ছিলি খুব অনাবৃত অপরূপ স্বভাবে বিশ্বাসে, তবু তুই আবরিত হোলি শেষে ঘোলাটে তুষারে, হোলি তুই বাধ্য বিনয়ী বকুল!
জানালায় জেগে আছি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৯.৩.৭৬ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
চোখের কার্নিশে জমেছে অযত্ন অবহেলা, উদাসী ঊর্ননাভ কখন বুনে গেছে সংসার নিজের চতুর্পাশে জানি না, আসাতে বিভোর ছিলাম তার চ'লে যাওয়া মনে নেই . . .
এতোটা বিভোরতা ছিলো, এতোটা পাওয়ার পুলক এতোখানি বসবাস ছিলো তার আমার গভীরে!
কোনো কথাহীন নিশব্দে এসে করতলপটে লিখেছিলো একখানি কথা---আমি।
একথানি কথার ভেতরে এতো কথা ছিলো, এতো মোহ ছিলো একখানি বাঁকা চাঁদে ছিলো এতোটা স্নিগ্ধ পূর্নিমা!
জেগে আছি, জেগে আছি--- যতোদূরে যাও জেনো রাত্রির ঘরে আমারো একখানা জানালা আছে, চৈত্রের সব পাখি--- সব ফুল--- সব প্রতীক্ষারা এই নিশব্দ জানালার কাছে নত হয়ে আসে অঙ্গের সুষমা খুলে যায় সৌরভরাশি।
এতোটা নিশব্দে জেগে থাকা যায় না, তবু জেগে আছি . . . আরো কতো শব্দহীন হাঁটবে তুমি, আরো কতো নিভৃত চরনে আমি কি কিছুই শুনবো না--- আমি কি কিছুই জানবো না! . **************** . সূচীতে . . .
অশোভন তনু কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৭.৪.৭৬ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
তবে কি শরীরে কোনো অন্যায় ছিলো অন্তসত্তার লজ্জার মতো ফুটে ওঠা স্ফীত উদোর জন্মের পুর্বাভাসে বেড়ে ওঠা সেই অশোভন সত্য কোখাও কি মাখা ছিলো অবয়বে, দেহে।
তবে কি শরীরে ছিলো কোনো উদ্ধত অশোভন কোনো অপঘাত, প্রত্যাখ্যানে পুষ্ট কোনো মৃত্যুর স্মৃতি তাজা কিছু ধংশের ক্ষতচিহ্ন কোনো প্রসাধন যাকে আগলে রাখতে পারেনি! অন্তরাল ছিন্ন কোরে জেগে ওঠা সেই ভয়ানক ক্ষতি কোথাও কি পষ্ট হয়ে উঠেছিলো ললাটে, মুখে?
গৃহ ডাকে না--- মানুষ গুটিছে নেয় তার সবগুলো ডাকার হাত। শিকড় বিশ্বাসী মানুষ এতোটা তরু-ঘাতক হতে পারে এতোটা হিংশ্র হাত ছিঁড়ে নিতে পারে মমতার সকল লতা!
মানুষ কি পাখি, পাখায় লেখা এক যাযাবর পথ?
সংসাব রচনায় তবে ফুলের এতো উপেক্ষা কেন এ-বুকে আগুন দেখে মানুষের এতো ভয় কেন! তবে কি তনুতে আমার কোনো ধংশের ক্ষতচিহ ছিলো? তবে কি চোখে মুখে আমার ভিন্ন কোনো পূর্বাভাস ছিলো? . **************** . সূচীতে . . .
অপরূপ ধংশ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ০৪.০১.৭৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
একটি পাতার পতনেই যদি শুভ সুষমায় শুভ্র একটি ফুলের ফুটে ওঠা হয় সুস্থ, আমি তবে পাতা ঝরলাম ঝরা বাসনায়।
একটি রাতের মৃত্যুতে যদি আঁধারের এই রাজ্যে ফিরে আসে রোদ, বিশ্বাস. শুভ-সূর্য, আমি তবে সেই শেষ রাত্রির বরাভয়।
প্রাপ্য না হয় হবে না কিছুই রবে না বিজয় মাল্য গহন দহন জড়িয়ে থাকবে মর্মে. আমি তবু এই চির-না-পাওয়ায় উজ্জ্বল।
একটি আমার ধংশেও যদি অমলিন অনবদ্য একটি তোমার বেঁচে থাকা হয় সত্য আমি তবে হবো সেই ধংশেই অপরূপ। . **************** . সূচীতে . . .
গোপন ইঁদুর কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৩১.১.৭৭ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
এক ইঁদুর আসে রাতে আমার ঘরে, চিকোন দাঁতে কাটে দেয়াল মেঝে, কাটে সকল প্রয়োজনীয় জিনিশপাতি কাটে এক ইঁদুর আসে ঘরে।
তার ছয়টি দাঁতে কাটে মাথার স্নায়ু, বুকে আমার নোখের কটু ঘায়ে ছেঁড়ে রূপোল স্বর্ন শুভ স্মৃতির বসবাস তার বিষের নোখে দাঁতে।
এক সুশ্রী তনু ইঁদুর আসে দেহে, টের পাই না কোনো কিছুই তার, দেহে আমার সিঁদ কেটে যায় গোপনে সেই চোর তার টের পাই না কিছু।
এই ইঁদুর-কাটা দেহের বাড়িঘর, বাইরে থেকে যায় না বোঝা কিছু ভেতরে সেই ইঁদুর বোসে ছয়টি দাঁতে কাটে হায়, বোধি আমার মেধা।
সেই সুশ্রী তনু ইঁদুর এসে দেহে কাটে জীবন-স্বপ্ন-শুভতরু, বাইরে থেকে যায় না বোঝা, মৃত্যু বাড়ে ঘরে হায়, টের পাই না কিছু! . **************** . সূচীতে . . .