বিষবৃক্ষ ভালোবাসা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১.৯.৭৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
তোমার না-থাকা ভালোবেসে কিছু ভুলকে বেঁধেছি বক্ষে, কিছু বলো নাই---ভুল বৃক্ষকে অবাধে দিয়েছো বাড়তে।
তুমি কি জানতে ওই তরু নয় স্বস্থ্যোপযোগি, ওতো সেই বিষবৃক্ষ। তুমি কি জানতে ওই ভুল বোধ কতোখানি ক্ষতি নষ্ট! তাহলে আমার ভুল নির্মান করোনি তা কেন ধংশ?
এটুকু জীবনে এই অপচয়, ভুল পথে এই যাত্রা--- মিছে কষ্টকে ভালোবেসে এই আত্মহনন যজ্ঞে কেন জল ঢেলে নেভাওনি এর হোমানল-বিষ-অগ্নি?
না পাওয়াকে যদি পেয়ে যাই তবে না-পাওয়াই হয় সত্য. গুটিকয় হাতে পাওয়ার নীড়টি থাকে ক্রীতদাস-বন্দী--- আমার পাপ্য এই ধোয়া জালে চিরদিন হলো ভ্রষ্ট।
তুমি বলো নাই এই ত্যাগ হবে কারো স্বার্থের টেক্কা সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে একজন রবে ব্যর্থ, তুমি বলো নাই---তুমি বলো নাই অমোঘ নিয়তি মিথ্যে।
ধাবমান ট্রেনের গল্প কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৫.৯.৭৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
তখন সন্ধার পর আমাদের সব কথা বলা হয়ে গেছে। মুখোমুখি বোসে থাকা কথাহীন ক্লান্ত চোখ, নোখ খুঁটে খুটে
যে যার স্মৃতির কাছে ফিরে এসে হয়েছি নিরব কোলাহল--- সব কথা বলা হয়ে গেছে।
তখন স্তব্ধতা জুড়ে শুধু মেঘ--- শুধু ঘাম--- শুধু যন্ত্রের চিৎকার স্মৃতি আর আকাংখার সব গল্প বলা হয়ে গেছে। জীবনের কথাগুলো এরকম মুহূর্তে ফুরায় স্পর্শ করার আগেই ভালোবাসা গৃহ ছেড়ে এভাবে পালায় দূরে।
ধাবমান ট্রেন তার ছুটে চলা ধাতব জীবন, আমাদের সবুজ কম্পার্মেন্ট তবু শব্দহীনতা--- মৃত্যুর মতো--- যেন ফসল উঠে যাওয়া নিস্ব ক্ষেত---ভেঙেচুরে প’ড়ে আছে তার মাঝে শীতের বিষন্ন রোদ, নিরুত্তাপ--- অসুখে মোড়ানো।
আমাদের সব গল্প, সব কথা, সব স্মৃতি বলা হয়ে গেছে, টের পেয়ে আকাশের দেহ থেকে ঝ'রে পড়ে সন্ধ্যার তমসা আমাদের নিশব্দের প’রে, আমাদের জীবনের পরে।
আমরা কি কোনোদিন আর কোনো কথা বলবো না? এরকম পরস্পর মুখোমুখি বোসে থেকে থেকে ছুটে চলা সময়ের ট্রেনে কোনোদিন আবার হবো না মুখরিত? কোনো কথা বলবো না!
আমরা কি কিছুই কবো না আর? আকাশের দেহ থেকে ঝ’রে পড়ে সন্ধ্যার আঁধার--- এসো কথা বোলে উঠি, আমরা ভালোবাসার কথা বলি. এই দিশব্দের দেয়াল ভেঙে এসো আজ স্বপ্নের কথা বলি।
আমাদের প্রিয় কথাগুলো, গল্পগুলো, প্রিয় স্বপ্নগুলো সেই শৈশবের মতো কতোদিন প্রান খুলে বলিনি কোথাও! আহা, কতোদিন আমরা আমাদের ভালোবাসার কথা বলিনি!
বিশ্বাসী বৃক্ষের ছায়া কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১১.৯.৭৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
অনিদ্রার শোকচিহ্ন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৯.৮.৭৬ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
বুকের ভেতরে এই ঝড় তুমি জানবে না, নিরুপায় ধংশের মাঝে কেন এই স্বেচ্ছাদহনে অনায়াসে স্বপ্নের সরল সংসারখানা ভেঙে ফেলি। তুমি জানবে না, একখণ্ড মেঘের জন্যে কি বিশাল মরুভূমি অভ্যন্তরে তুমুল সাইমুমে বিশটি চৈত্রের নিচে পুড়ে যায় অক্ষম ক্ষোভে।
এই চোখ দেখে তুমি বুঝবে না, কতোটা ভাঙনের চিহ্ন জীবনের কতোটা পরাজয় ছুঁয়ে তার বেড়েছে বয়সের মেধা।
অভিমানে কষ্ট বুজে আসে, নিরপরাধ বাসনার চোখে স্বচ্ছ কাঁচের মতো জ'মে থাকে জল, টলমল---তবু ঝরে না কখনো . . .
শরীরে ঘামের ঘ্রানে শুধু কেটে যায় বেলা, ক্লান্তিগুলো খুলে-খুলে আগামীকে বলি : জননীর অপেক্ষা নিয়ে কতোটুকু রেখেছো আমার পৌষে নবান্নের মতো কতোটুকু সুস্থির নিশ্চয়তা?
ফাঁসির মঞ্চ থেকে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১০.৭.৭৭ নীলক্ষেত ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
ফাঁসির মঞ্চ থেকে আমাদের যাত্রার শুরু।
এক একটি জন্মের সমান মেধাবী মৃত্যু এক একটি প্রতিজ্ঞা-পুষ্ট মৃত্যুর সোপান দুর্যোগ-অন্ধকারে তুলে রাখে সূর্যময় হাত--- তুমুল তিমিরে তবু শুরু হয় আমাদের সঠিক সংগ্রাম।
মৃত্যুর মঞ্চ থেকে মৃত্যুর ভূমি থেকে আমাদের প্রথম উত্থান। যাকে তুমি মৃত্যু বলো, যাকে তুমি বলো শেষ, সমূল পতন আমি তার গভীরে লুকোনো বিশ্বাসী বারুদের চোখ দেখে বলি এইসব মৃত্যু কোনো শেষ নয়, কোনো বিনাশ. পতন নয় . . .
এই সব মৃত্যু থেকে শুরু হয় আমাদের সূর্যময় পথ, এই ফাঁসির মঞ্চ থেকেই আমাদের যাত্রার শুরু। . **************** . সূচীতে . . .
হে আমার বিষন্ন সুন্দর কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২.২.৭৮ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
হে আমার বিষন্ন সুন্দর হৃদয়ের কূল ভেঙে কেন আজ এতো জল ছড়ালো শরীরে কেন আজ বাতাসে বসন্ত দিন ফিরে এলো কুয়াশার শীতে!
কে সেই বংশীবাদক স্বপ্নের শিয়রে বোসে বাজাতেন বাঁশি বেদনার ধ্বনি তুলে রাত্রি দিন, সে আজ হারালো কোথায়?
বেদনার রঙ দিয়ে আমি যারে আঁকি হৃদয়ের রক্ত দিয়ে আমি যারে আঁকি আমার কষ্ট দিয়ে, আমার স্বপ্ন দিয়ে যে আমার নিভৃত নির্মান সেই তুমি---হে আমার বিষন্ন সুন্দর
মর্মমূল ছিঁড়ে এসে ঠাঁই নিলে কেন এই মাংশের বুকে! কেন ওই বৃক্ষতলে, কেন ওই নদীর নিকটে এসে বোলে গেলে তোমার ঠিকানা!
আমি তো প্রার্থনাগুলো শস্যের বীজের মতো দিয়েছি ছড়িয়ে জল তাকে পুষ্টি দেবে, মাটি তাকে ভূমি দেবে, তুমি তার গভীর ফসল--- বাতাসে তুলোর মতো তুমি তবে উড়ে এলে কেন!
কেন আজ পোড়া তুষের গন্ধে শুধু জন্মের কথা মনে পড়ে! শৈশব কৈশোর এসে মিশে থাকে ফাল্গুনের তুমুল হাওয়ায় একটি রাত্রি কেন হয়ে ওঠে এতো দীর্ঘ দীর্ঘ রাত?
হে আমার বিষন্ন সুন্দর দুচোখে ভাঙন নিয়ে কেন এই রুক্ষ দুঃসময়ে এলে কেন সমস্ত আরতির শেষে আজ এলে শূন্য দুখানি হাত! কেন এলে, বিষন্ন সুন্দর, তুমি কেন এলে? . **************** . সূচীতে . . .
নক্ষত্রের ধুলো কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৫.৭.৭৬ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
মারী ও মড়ক নাচে পাণ্ডুর মানুষের বুকের প্রদেশে। ধূসর-পালক-রাতে পলাতক সব পাখি---পাখিদের গান--- যেন এই মাঠে আর উৎসব হবে না কোনোদিন---কোনো শীতে ছোঁবে না কখনো আর।
প্রৌঢ় পৃথিবীর নগ্ন খুলিতে পা রেখে এক অঘ্রানী যুবক, করতলে মাটি ছুঁয়ে রক্তে মাংশে পেতে চায় শানিত আগুন, বন্ধ্যা অন্ধকার তবু মৃত মানুষের মতো ব’য়ে আনে শীত ব’য়ে আনে কবরের হলুদ কাফনে বাঁধা একরাশ স্মৃতি।
ক্ষুধার শয্যা পেতে এক মন্বন্তরের ক্ষুধিত শকুন মননের হাড় থেকে ছিঁড়ে খায় বোধি প্রেম, সুস্থতার মাংশ. মানুষ জানে না তবু কতো হাড় করোটির ধুলো জ'মে জ'মে একটি নক্ষত্রের বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে সেইরাতে---
সেইরাতে সমুদ্রের সফেদ ফেনার মতো একখানা হাত মৃত্যুর গভীর থেকে তুলে এনেছিলো এক শস্যার্দ্র জন্ম, সেইরাতে, সেইরাতে-সূর্যহীন জোস্নাহীন সেই অন্ধকারে আমাদের প্রতিজ্ঞারা মেঘের মুখোশ ছিঁড়ে নক্ষত্রের দিকে উঠে গিয়েছিলো এক ফেনিল প্রত্যাশায়।
কৃষ্ণপক্ষে ফেরা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৩.৩.৭৬ রামপাল মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
দুর্বিনীত জলের সাহস কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১১.১২.৭৭ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
হত্যা আর সন্ত্রাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ব্যথিত জীবন, আজ বড় দুঃসময়---ইঁটের দেয়ালে বন্দি ফুলের চিৎকার ওই শোনো কাতর কান্নার ধ্বনি ভেসে আসে নিষিদ্ধ বাতাসে।
কথা বলো, কথা বলো অমিতাভ। শানিত শোনিতে জ্বেলে প্রতিবাদী আগুনের লাভা একবার বোলে ওঠো : দুঃশাসন আমি মানি না তোমাকে, একবার বোলে ওঠো : ভুল মানুষের কাছে নতজানু নই।
পৃথিবীতে তিনভাগ জল ওদের জানিয়ে দাও প্লাবনে পাহাড় ধসে, ধ'সে যায় মাটি শিলার বিপুল মাংশ খসে পড়ে দুর্বিনীত জলের আঘাতে।
অমীমাংসিত ক্ষোভ যার মিশে আছে অস্থি শোনিতে রক্তাক্ত হয়েছে বুক--- নতজানু সে মানুষ হয়নি কখনো॥ . **************** . সূচীতে . . .
অবেলায় শংখধ্বনি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৯.৭.৭৬ নীলক্ষেত ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
সাহস আমাকে প্ররোচনা দেয় জীবন কিছুটা যাতনা শেখায় ক্ষুধা ও খবর এই অবেলায় অতোটা ফুলের প্রয়োজন নেই।
বুকে ঘৃনা নিয়ে নীলিমার কথা অনাহারে ভোগা মানুষের ব্যথা প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই--- করুনা কাতর বিনীত বাহুরা ফিরে যাও ঘরে।
নষ্ট যুবক ভ্রষ্ট আঁধারে কাঁদো কিছুদিন কিছুদিন বিষে দহনে দ্বিধায় নিজেকে পোড়াও না হলে মাটির মমতা তোমাতে হবে না সুঠাম, না হলে আঁধার আরো কিছুদিন ভাসাবে তোমাকে।