পৃথিবীর প্রৌঢ় স্তন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৫.১.৭৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
স্ত্রীর অবাধ দুধ পান কোরে একদিন আমিও চেয়েছি হতে শৈশব--- শিশুকাল আমিও চেয়েছি হতে শিশু।
মাথার খুলির প'রে, মগজের তলদেশে সারারাত সারাদিন সাড়ে তিনশত কোটি কাক ঠোকরায় বিরতিবিহীন। অভাব---অভাব আসে ঝাঁক-ঝাঁক বুনো শুয়োরের মতো।
কি করুন কাটে রাত---ঘুম নেই চিন্তার চোখে, সরল শিশুর মতো খুলে ফেলি শরীরের যাবতীয় সভ্যতাগুলো,
নত হোই--- স্ত্রীর স্তন্যে রাখি ঠোঁট আদিম মানুষ আমি এই বিংশ শতকে
একটি মানুষ পারে কতোটুকু সরাতে অভাব! সে আরো অভাব খুঁড়ে টেনে তোলে অনন্ত শূন্যতা, অনন্ত হাহাকার আরো বেড়ে ওঠে তার বাইরে ভেতরে।
ঘুম নেই জীবনের চোখে--- শতশত উলঙ্গ মানুষ ছুটে এসে শিশুর মতো মাঝরাতে কামড়ায় পৃথিবীর প্রৌঢ় স্তন নিরুপায় ব্যর্থ ক্রোধে।
ক্লান্ত ইতিহাস কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৪.১১.৭৭ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
যে-পথে ফিরেছে সব, সেই পথে আমার হবে না ফেরা, ভাঙনের রুগ্ন গান শুনতে শুনতে বৃষ্টিতে আমুণ্ডু ভিজে বেহুলার ভাঙা ভেলা ফিরে যাবে জন্মের বিশ্বাসে।
সাথে আমি কি কি নেবো? বিলাসী নগর থেকে তীক্ষ্ণ রমনীর প্রেম মদ, মাংশ, কৃত্রিম হাসির ঠোঁট, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভালোবাসা? আমি কি কি নেবো! ইটের নিসর্গ থেকে জংধরা মানুষের শব, কালো টাকা জালিয়াতি, আলুর গুদাম আর এই ন-পুংশক রাজনীতি?
সেল্ফে বন্দি রবীন্দ্রনাথ, ড্রয়িংরুমে ঝুলে থাকা ধানশীষ আহা বাংলাদেশ তুমি ঝুলে আছো---আমার সোনার বাংলা . . . কতিপয় হিজড়া-পণ্ডিত আর মূর্খ নেতাদের ডিনার টেবিলে মুখ খুবড়ে প'ড়ে আছে বিষন্ন বাংলাদেশ উচ্ছিষ্ট হাড়ের মতো।
আমি জানি এই ঋন আমাকেই শোধ দিতে হবে, এই ধংশস্তূপ কাঁধে নিয়ে আমাকেই যেতে হবে সহস্র মাইল।
ফিরে যাবো। যে-পথে সবাই ফেরে, হাসি খুশি মুখে গান, প্রিয়জন সাথে সেই পথে আমার হবে না ফেরা, সেই পথ আমার হবে না--- রক্ত, ঘাম আর ধংশস্তূপ কাঁধে নিয়ে আমাকে ফিরতে হবে।
ট্রেনের জানালা দিয়ে ধানক্ষেত দেখতে দেখতে আমার ফেরা হবে না চেঞ্জারে ভাটিয়ালি লালন শুনতে শুনতে আমার ফেরা হবে না, বুক তরা ভালোবাসা মৌন মুগ্ধ গান আমার হবে না ফেরা---
আমাকে ফিরতে হবে ঘাম, রক্ত আর সময়ের ধংশস্তূপ কাঁধে শেষতম সৈনিকের মতো একা একা ক্লান্ত ইতিহাস।
বিশ্বাসের হাতিয়ার কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৬.১.৭৭ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
নষ্ট সময়---নষ্ট প্রহর নষ্ট শশা-র পচনের মতো গলিত জীবন। মাজরা পোকায় খেয়ে যাওয়া ধান তরুন শস্য নমস্য কিছু প্রবীন পথিক
আঞ্জো বোসে আছে পচা পুরাতন বটের শিকড়ে।
মৌশুম যায়---অনাবাদি জমি প’ড়ে থাকে চাষহীন, লাঙল আসে না. আসে নর্তকী খেমটা নাচনে ধেয়ে। ধেনোমদ চায় বিদেশী বনিক, ধান চায় স্বদেশীরা---
শিরা উপশিরা ধমনী-রক্তে কারা বুনে যায় রোগ কারা লালনের বাউল কণ্ঠে সোনালি শিকল বাঁধে? কারা সেই প্রতারক! কারা এ মাটির পুষ্পকে বলে পাপ?
কোটি কোটি বুক এক বুকে মিশে আছে, জয়ন্তিয়ায়---খাশিয়া পাহাডে---পদ্মার ভাঙা পাড়ে হাজার বছর যে-মানুষ শুধু লড়েছে কঠিন প্রানে
যে-মানুষ হাড়ে লবনের ঘ্রান, বুকে সমুদ্র-ঝড় রোদ্দুরে পোড়া চামড়ায় যারা মেখেছে পলির কাদা, আজ তারা আসে গর্জনে ঘন বর্ষনে, কাঁপে মাটি!
নিশব্দ থামাও কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৩.৯.৭৭ মিঠেখালি, মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
থামাও, থামাও এই মর্মঘাতী করুন বিনাশ, এই ঘোর অপচয় রোধ করো হত্যার প্লাবন।
লোকালয়ে ভোর আসে তবু সব পাখিরা নিখোঁজ--- শস্যের প্রান্তর খুলে ডাকি আয়, আয় প্রিয় পাখি,
একবার ডেকে ওঠ মুখরতা, মৃত্যুর সকালে বাজুক উচ্ছ্বল গান---জনপদ নিসর্গ জানুক এখনো পাখিরা আছে, গান আছে জীবনের ভোরে।
থামাও মৃত্যুর এই অপচয়, অসহ্য প্রহর। স্বস্তির অস্থিতে জ্বলে মহামারী বিষন্ন অসুখ, থামাও, থামাও এই জংধরা হৃদয়ের ক্ষতি।
ইঁটের দেয়াল ভেঙে যে-ভাষার সদর্প উত্থান যে-ভাষার নিত্য জন্ম মানুষের জ্বলস্ত শিখায়, আজ কেন সে-ভাষার কলরব শুনি না জীবনে?
কারা তবে সুখী হয়, নীলিমায় ওডায় ফানুস! কারা এই দুঃসময়ে চ'ড়ে ফেরে অলীক জাহাজ?
ঘড়ভরা মৃত্যুহিম, লোকালয় ভয়ার্ত শ্মশান। গান নেই, পাখি নেই, শব্দ নেই---নিশব্দ থামাও এ ভীষন বেদনার রক্তচোখ, ডাকাত নৈশব্দ . . .
মৃত্যুকে থামাও, বলে আয় পাখি, আয় মুখরতা একবার ডেকে ওঠ এই কালো নির্মম সকালে। লোকালয় গান হোক---জনপদ, নিসর্গ জানুক এখনো পাখিরা আছে, গান আছে জীবনের ভোরে।
বেলা যায় বোধিদ্রুমে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৬.৯.৭৫ লালবাগ ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
এখনো কি হয়নি সময়, বোধিদ্রুম এখনো কি আসেনি প্রত্যর্পনের রাত!
বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে রাজনীতিকের ধমনী শিরায় সুবিধাবাদের পাপ বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে বুদ্ধিজীবীর রক্তে স্নায়ুতে সচেতন অপরাধ বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে জাতির তরুন রক্তে পুষেছে নির্বীর্যের সাপ---
উদোম জীবন উল্টে রয়েছে মাঠে কাছিমের মতো।
২. কোনো কথা নেই---কেউ বলে না, কোনো কথা নেই---কেউ চলে না, কোনো কথা নেই---কেউ টলে না, কোনো কথা নেই---কেউ জ্বলে না--- কেউ বলে না, কেউ চলে না, কেউ টলে না, কেউ জ্বলে না।
যেন অন্ধ, চোখ বন্ধ, যেন খঞ্জ, হাত বান্ধা, ভালোবাসাহীন, বুক ঘৃনাহীন, ভয়াবহ ঋন ঘাড়ে চাপানো---শুধু হাঁপানো, শুধু ফাঁপানো কথা কপচায়--- জলে হাতড়ায়, শোকে কাতরায় অতিমাত্রায় তবু জ্বলে না। লোহু ঝরাবে, সব হারাবে--- জাল ছিঁড়বে না ষড়যন্ত্রের? বুক ফাটাবে, ক্ষত টাটাবে--- জাল ছিঁড়বে না ষড়যন্ত্রের?
মনে পড়ে বট? রাজপথ পিচ? মনে পড়ে ইতিহাস? যেন সাগরের উতলানো জল নেমেছে পিচের পথে মানুষের ঢেউ আছড়ে পড়েছে ভাঙা জীবনের কুলে? মনে কি পড়ে না, মনে কি পড়ে না. মনে কি পড়ে না কারো? কী বিশাল সেই তাজা তরুনের মুষ্টিবদ্ধ হাত যেন ছিঁড়ে নেবে গ্লোব থেকে তার নিজস্ব ভূমিটুকু!
মনে কি পড়ে না ঘন বটমূল, রমনার উদ্যান একটি কণ্ঠে বেজে উঠেছিলো জাতির কণ্ঠস্বর? শত বছোরের কারাগার থেকে শত পরাধীন ভাষা একটি প্রতীক কণ্ঠে সেদিন বেজেছিলো স্বাধীনতা।
হাতিয়ারহীন, প্রস্তুতি নেই, এলো যুদ্ধের ডাক, এলো মৃত্যুর এলো ধংশের রক্ত মাখানো চিঠি। গ্রাম থেকে গ্রামে, মাঠ থেকে মাঠে, গঞ্জের সুবাতাসে সে-চিঠি ছড়ায়, রক্ত খবর, সে-চিঠি ঝরায় খুন, স্বজনের হাড়ে করোটিতে জ্বলে সে-চিঠির সে-আগুন।
৫. মনে কি পড়ে না, মনে কি পড়ে না, মনে কি পড়ে না তবু? গেরামের সেই শান্ত ছেলেটি কি-রোষে পড়েছে ফেটে বন্ধুর লাশ কাঁধে নিয়ে ফেরা সেই বিভীষিকা রাত সেই ধর্ষিতা বোনের দেহটি শকুনে খেয়েছে ছিঁড়ে---
মনে কি পড়ে না হাতে গ্রেনেডের লুকোনো বিস্ফোরন? তারও চেয়ে বেশি বিস্ফোরনের জ্বালা জ্বলন্ত বুকে গর্জে উঠেছে শত গ্রেনেডের শত শব্দের মতো।
গেরামের পর গেরাম উজাড় উঠোনে উঠেছে ঘাস। হাইত্নের 'পরে ম'রে 'পড়ে আছে পালিত বিডাল ছানা, কেউ নেই, শুধু তেমাথায় একা ব্যথিত কুকুর কাঁদে।
আর রাত্রির কালো মাটি খুঁড়ে আলোর গেরিলা আসে---
৬. ঝোপে জঙ্গলে আসে দঙ্গলে আসে গেরিলার দল, হাতিয়ার হাতে চম্কায়। হাতে ঝলসায় রোষ প্রতিশোধ। শোধ রক্তের নেবে তখতের নেবে অধিকার। নামে ঝনঝায় যদি জান্ যায় যাক, ক্ষতি নেই ; ওঠে গর্জন, করে অর্জন মহা ক্ষমতার, দিন আসবেই, দিন আসবেই, দিন সমতার।,
৭. দিন তো এল না! পূথিবীর মানচিত্রের থেকে ছিঁড়ে-নেয়া সেই ভূমি দুর্ভিক্ষের খরায় সেখানে মন্বন্তর এলো। হত্যায় আর সন্ত্রাসে আর দুঃশাসনের ঝড়ে উবে গেল সাধ বেওয়ারিশ লাশে, শাদা কাফনের ভিড়ে, তীরের তরীকে ডুবালো নাবিক অচেতন ইচ্ছায়।
৮. আবার নামলো ঢল মানুষের আবার ডাকলো বান মানুষের আবার উঠলো ঝড় মানুষের
৯. গ্রাম থেকে উঠে এলো ক্ষেতের মানুষ খরায় চামড়া-পোড়া মাটির নাহান, গতরে ক্ষুধার চিন্ মলিন বেবাক, শিকড়শুদ্ধু গ্রাম উঠে এলো পথে
অভাবের ঝড়ে ভাঙা মানুষের গাছ আছড়ে পড়লো এসে পিচের শহরে।
তাদের অচেনা লাশ চিনলো না কেউ ঝাঁক ঝাঁক মাছি শুধু জানালো খবর।
বেওয়ারিশ কাকে বলো, কার পরিচয়? বাংলার আকাশ চেনে, চেনে ওই জল আমার সাকিন জানে নিশুতির তারা, চরের পাখিরা জানে পাড় ভাঙা নদী আমি এই খুনমাখা মাটির ওয়ারিশ।
১০. স্বপ্ন-হারানো মানুষের ঢল রাজপথে আসে নেমে স্বজন হারানো মানুষের ঢল রাজপথে আসে নেমে ক্ষুধায় কাতর মানুষের ঢল রাজপথে আসে নেমে পোড়ায় নগরী, ভাঙে ইমারত, মুখোশের মুখ ছেঁড়ে ছিঁড়ে নিতে চায় পরাধীন আলো প্রচণ্ড আক্রোশে।
১১. আমি কি চেয়েছি এতো রক্তের দামে এতো কষ্টের, এতো মৃত্যুর, এতো জখমের দামে নিভ্রান্তির অপচয়ে ভরা এই ভাঙা ঘরখানি? আমি কি চেয়েছি কুমির তাড়ায়ে বাঘের কবলে যেতে?
আর কতো চাস? আর কতো দেবো কতো রক্তের বলী?
প্রতিটি ইঞ্চি মাটিতে কি তোর লাগেনি লোহুর তাপ? এখনো কি তোর পরান ভেজেনি লোনা রক্তের জলে?
ঝড়ে বন্যায় অনাহার আর ক্ষুধা মন্বন্তরে পুষ্টিহীনতা, জুলুমে জখমে দিয়েছি তো কোটি গ্রান--- তবুও আসে না সমতার দিন, সমতা আসে না আজো।
১২. হাজার সিরাজ মরে হাজার মুজিব মরে হাজার তাহের মরে বেঁচে থাকে চাটুকার, পা-চাটা কুকুর, বেঁচে থাকে ঘুনপোকা, বেঁচে থাকে সাপ।
১৩. খুনের দোহাই লাগে, দোহাই ধানের দোহাই মেঘের আর বৃষ্টি জলের দোহাই, গর্ভবতী নারীর দোহাই, এ-মাটিতে মৃত্যুর অপচয় থামা।
আসুক সরল আলো, আসুক জীবন চারিদিকে শত ফুল ফুটুক এবার।
১৪. জাতির রক্তে ফের অনাবিল মমতা আসুক জাতির রক্তে ফের সুকঠোর সমতা আসুক আসুক জাতির প্রানে সমতার সঠিক বাসনা॥
পৌরানিক চাষা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৪ বেশাখ ৮৫, সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
পতিত জমিনে যদি কোনোদিন দ্যাখা হয় ওলো নারী, তখন বলিস ডেকে : আটকুড়ে শিথিল মরদ--- আমি সব মাথা পেতে নেবো।
চাষের চৌষট্টি কলা শিখেছে শরীর। আমি সেই পৌরানিক কিষান-আদম গন্ধমের আছে অভিজ্ঞতা, আছে জানা খরা, জল, অনাবৃষ্টি, মেঘের গতিক--- ভয় নেই ওলো নারী, চাষাবাদ আমিও শিখেছি।
আমিও শিখেছি নারী লাঙলের জটিল নিয়ম, মানুষের কতোটুকু মাটি আর কতোটা জলীয়
কতোটুকু পশু থাকে একজন রমরীর দেহে বৈশাখের রাতে কেন সোমত্ত শরীর জুড়ে শ্রাবনের বেনোজল ডাকে।
ওলো নারী, সহজে খুলি না তনু, খুলি না জবান।
দিশিখে নিশির ডাক শুনে যদি শিখিল হয়েছে শাড়ি তবে আর দ্বিধা কেন? কাঁকরের রাঙামাটি অপরূপ শয্যা হবে চন্দনের ঘ্রান হবে শরীরের উষ্ণতম ঘাম---
ওলো নারী ভয় নেই, চাষের চৌষটি কলা আমিও শিখেছি, আমিও শিখেছি নারী আবাদের মাতৃভাষা, সঠিক শৃঙ্গার॥
কাচের গেলাশে উপচানো মদ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২০ ফাল্গুন ৮৪ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
বদলে যাচ্ছে এই গ্রামখানি, নদীটির তীর কপালের নিচে সবল চক্ষু বদলে যাচ্ছে।
কিশোরীর ঝাঁক দল বেঁধে আর খেলতে আসে না। হাতের ভেতরে মমতার হাত, স্মৃতির পৃথিবী বদলে যাচ্ছে বদলে যাচ্ছে---বদলে যাচ্ছে।
ঘড়িতে তখন মধ্যরাত্রি স্নায়ুতে আমার না-পাওয়া সুখের ব্যথিত অনল স্নায়ুতে এখন তোমাকে না-পাওয়া রাগী সাইমুম @। তুমিও ক্রমশ বদলে যাচ্ছো---বদলে যাচ্ছো।
আমার দুপাশে ভাঙছে পৃথিবী পদ্মার চর, রাজনীতি আর রম্য গনিকা। সব বনভূমি হচ্ছে এখানে সভ্য নগৰী গ্রাম থেকে আসা মানুষের ঢেউ ভাঙছে মড়কে।
বদলে যাচ্ছে, পৃথিবী আমার বদলে যাচ্ছে, বধির একটা বুনো মহিষের ক্ষুধার মতোন আমার ভেতরে নিসঙ্গতাই বেড়ে ওঠে শুধু
সুস্থতা চাও, সুস্থতা চাও আমি তো পারি না, কাচের গেলাশে উপচানো মদ আমার রক্ত পান কোরে আমি ধুয়ে দিতে চাই রুগ্নতাগুলো, ব্যর্থ পৃথিবী মুছে দিতে চাই আমি তো পারি না।
কষ্ট আমার স্নায়ুর ভেতরে, চোখের সকেটে, কষ্ট আমার হাড়ের ভেতরে জ্বলে চন্দন, নিভূতি চাও, নিভৃতি চাও আমি তো পারি না।
কাচের গেলাশে উপচানো মদ তোমাদের প্রেম পান কোরে আমি ধুয়ে দিতে চাই কষ্ট আমার।
আমার দুদিক, চতুপার্শ্ব বদলে যাচ্ছে সোনার হরিন আমি তো খুঁজি না শ্রীমতী জীবন আমি তো ডাকি না ব্যাকুল দুহাতে খ্যাতির শিখর।
শুধু আমি এই কষ্ট আমার মুছে নিতে চাই, নগরের রুখো গ্রাস থেকে সেই গ্রামখানি মোর দুধভাত, মিঠে রূপশালি ধান, সেই গ্রামখানি কেড়ে নিতে চাই কেড়ে নিতে চাই কেড়ে নিতে চাই। কাচের গেলাশে উপচানো মদ হারানো সে-প্রেম পান কোরে আমি ধুয়ে দিতে চাই কষ্ট আমার।
আমার গ্রামের নদীটির মতো তোমার দুচোখে কেন বালুচর জেগে ওঠে স্বাতি, কেন শূন্যতা? সুস্থতা চাও---কোথায় স্বস্তি, কোথায় সলিল? এইটুকু মদ গরল পানীয় পাবে কি ভেজাতে পৃথিবীর চেয়ে আরো বড়ো এক পোড়া মরুভূমি?
বদলে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে--- রূপশালি ধান গ্রামটিরে আমি বাঁচাতে পারি না, আঙুলের ফাঁক গ’লে নেমে যায় বাসনার জল রাখতে পারি না করপুটে প্রিয় স্বপ্ন আমার।
কষ্ট আমার বুকের পাঁজরে, রোমকূপে, নোখে কষ্ট আমার নিদ্রাবিহীন চোখের তারায়।
ব্যর্থতা আমি মুছে দিতে চাই, মুছে দিতে চাই, কাচের গেলাশে উপচানো মদ ব্যথিত জীবন পান কোরে আমি ধুয়ে দিতে চাই কষ্ট আমার॥
. ***************
@ সাইমুম - একটি শক্তিশালী, শুষ্ক, ধূলোচ্ছাদিত ঝড়ো হাওয়া। এই শব্দটি দ্বারা সাধারণত আরব উপদ্বীপের মরুভূমিসমূহ, সিরিয়া, ইরাক, জর্ডান, ফিলিস্তিন, ইজরায়েল ও সাহারা অঞ্চলের উপর বয়ে যাওয়া স্থানীয় ঝড়কে বুঝানো হয়ে থাকে।
হারাই হরিনপুর কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৪ জ্যৈষ্ঠ ৮৬ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
যে পায় সে পেয়ে যায়---সকলে পায় না।
কাকে বলো? অভিমান, কার সাথে তবে? অমনই হবে, হয়, ভেঙে তছনছ পুড়ে পুড়ে খাক হও বিষন্ন অঙ্গার কিছুই পাবে না তবু--- যে পায় সে পেয়ে যায়--- বাকিরা হারায়।
কে যায় হরিনপুর? কতোজন? কারা? একজন হাসে শুধু দখিনার হাসি, ভালোবাসি---বোলে তারে যেখানে জড়াই সেতো শুধু মাংশ, হাড়, হিয়ার উপমা--- তাকে কি, হৃদয় বলে? বক্ষস্থিত প্রান? কে তারে পেয়েছে কবে? কতোজন. কারা?
যে পায় সে পেয়ে যাবে---আমার হবে না, রবে না জলের চিহ্ন রোদের কপালে। আমি শুধু চাষ হবো হবো না ফসল? বনভূমি কেটে শুধু নগর বানাবো?
কে গেল হরিনপুর, কতোটা বয়স কতোটা অঘ্রান তার হৃদয়ের আয়ু হয় নাই জানা---
দেখি তার দেহখানা বেড়ে ওঠে রোদে, আঁধার কেটেছে যারা শীতার্ত অঘনে তারা থাকে স্বপ্নহীন অমার খাঁচায়।
অকর্ষিত হিয়া কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৬ শ্রাবণ ৮৫ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
প্রস্তুত ছিলো প্রেম. তুমি শুধু হাত তুলে ডেকেছো তারে--- যজ্ঞের জোগাড় শেষে তুমি শুভ্র এলে পুরোহিত, চুম্বন সাজানো ছিলো, তুমি এসে ছোঁয়ালে অধর অধরের 'পরে।
সমস্ত পরান জুড়ে যে-অম্লান ফলভারে নত তুমি তার ঘ্রান পেয়ে এলে যেন শ্যামল, কিষান, এলে মাটির মরমে রেখে মনেরম মৌন ক্ষত।
তৃষ্ণার তিমিরে জেগে ভালোবাসা বুনেছি একাকি, আজ তার ভাঙা-ম্লান দিনগুলো মুছে যায় দ্রুত নীড়ের নিবিড় কোলে ফিরে আসে স্বপ্নময় পাখি।
লাবন্য-লতার মতো চোখে নামে সবুজাভ স্নেহ, কিসের আড়ালে ছিলো এতোদিন এই ব্যথা-সুখ এই মুগ্ধ মৌন বোধ, ভালোবাসা অনাবাদী দেহ?
কিসের আড়ালে ছিলো, কিসের আড়ালে ছিলো এই তনু, অকর্ষিত হিয়া!