কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
পরিচয়
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৯ ভাদ্র ’৮৬ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

এতো যে ভাঙন, ধংশ, রক্ত---
মনে আমার বয়স হয় না!

এতো যে হাওয়ায় ওড়ায় স্মৃতি
এতো যে নদী ভাঙছে দুকূল
মনে আমার বয়স হয় না।

বাইরে এবং বুকের মধ্যে
হিয়ার ভেতর---হিয়ার মধ্যে
হারানো এক হুল্দে পাখি উড়ছে বসাছে
দুলছে, যেন শৈশবে সেই দোলনা খেলা---
হায়রে আমার বয়স হয় না!

বন্ধুরা সব বিত্তে বাড়ে চিত্তে বাড়ে
বাড়ে শনৈঃ গৃহাস্থালি,
আমার তবু বয়স হয না, বুদ্ধি হয় না।

একটি নোতুন ভাষার খোঁজে
একটি ভালোবাসার খোঁজে
যায় কেটে দিন . . .  
  
নোখে এবং দাঁতে সবাই শান্‌ দিয়ে নেয়,
আমি আমার নিরীহ নোখ ছাঁটছি কেবল
সবুজ মাজন কিনছি আমাব দাঁতের জন্যে।

হায়রে আমার বয়স হয় না, সংসারী-মন পোক্ত হয় না---

অন্ধকারে শরীর ঢেকে সাবধানে সব হাঁটছে যখন
আমি তখন ভেতর বাহির খোলা রেখেছি,
আলোর সামনে খুলে রেখেছি।

আজো আমার বোধ হলো না।
ভেতরে নীল ক্রোধ হলো না
পরান-গলা রোধ হলো না---

পাথর এবং পাখির মাঝের ফারাক বুঝতে সময় লাগে,
বক্ষ এবং লতার মানে আজো আমি সবুজ বুঝি।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ও মন, আমি আর পারি না
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৬ ভাদ্র ’৮৬ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

পরান দুলে উঠলো হাওয়ায়-
বনে কি মৌশুম এসেছে?
এই কি উদাস হবার সময়?
ও মন-মঝি . . .

পালে কি তোর বাও লাগে না
টের পাস না জলের উজান?
মন-মাঝি রে---আমি কি তোর বৈঠা নেবো!

ঝুলন্ত এই সাঁকোর ’পরে
আর পারি না।
জন্মও নেই, মৃত্যুও নেই
ধংশও নেই, সৃষ্টিও নেই
কেবল জোড়াতালির ’পরে, কেবল করতালির ’পরে
আর পারি না।

ও মন, আমি আর পারি না . . .
বাঘের থাবায় হরিন ঘায়েল,
হায়রে আমি হাত-পা বাঁধা
ঠিক সাঁকোটির মধ্যিখানে

দুইদিকে দাঁত, দুইদিকে নোখ,
দুইদিকে দুই বন্য শুয়োর এবং ঘৃনা
শুধুই ঘৃনা---

ও মন, শুধু ঘৃনায় কি আর শস্য ফলে?

মাটির জন্যে মমতা কৈ?
ভালোবাসার জন্যে সে-লাল আগুন কোথায়?
ওই যে নুলো, আঁতুর, ভীরু আধমরাটা

আরও তো চাই সামান্য রোদ
সে.রোদ কোথায়?

হাতটি তারে ছোঁয়ালেই কি যন্ত্র বাজে!

বেলা যে যায় ও মন-মাঝি---
নিস্ফলা এই মাটির ভার কি সারা জনম বইতে হবে
কইতে হবে নিজের কাছে নিজের ভালোবাসার কথা?
ও মন, আমি আর পারি না . . .

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
একজোড়া অন্ধ আঁখি
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৫ বৈশাখ ৮৫ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

কতোটুকু পরিচয় হলো আজো মানুষে মানুষে!
আমি তো নিজের দিকে চেয়ে চেয়ে চিরকাল থমকে থেকেছি
গহন অরন্য-পথে যেন এক হারানো পথিক
চিনতে পারিনি।

চিনতে পারি না---
তাকালেই দেখি যারে সে যে এক কুয়াশা-মানুষ
বিদেশ বিভুঁই সে যে চিরকাল দূরের আকাশ।
আঁখির ভেতর থেকে যে-দ্যাখে তাকিয়ে
কথার ভেতরে থাকে যার কথাগুলো,
প্রানের ভেতরে যার প্রানখানি বাজে নিশিদিন
তাকে তো দেখি না---
যে-চোখ তাকিয়ে দ্যাখে, তারে আমি কোন চোখে দেখি?

কতোটুকু চেনা-জানা হলো আজো মানুষে মানুষে!
আমি তো শত্রুর মুখে আজো দেখি স্বজনের রেখা,
আজো দেখি ভালোবাসা ফিরে যায় ঘৃনার ছোবলে
রক্তাক্ত অধরে তার মানুষের ভ্রান্তিগুলো কাঁদে।

ঘৃনা কি বেদনা তুমি হাসিতে লুকাও,
'আমি তারে প্রেম ভাবি, ভাব মুগ্ধ প্রানের গ্রকাশ---
নিয়তির চোখ হাসে, হাসে সত্য সুচতুর দুজনার মাঝে।

বেলা যায়---দিন তবু দিনে-দিনে বাড়ে
মানুষের ঘর বাড়ে ঘরের ভেতর,
হয়তো বা বৃক্ষ ভেবে বুকে রাখি চিরকাল সাপের শরীর
বুঝাতে পারি না---
মানুষের বেঁচে-থাকা এইভাবে বেঁচে থাকে ঘোর কুয়াশায়॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পরাজিত প্রেম
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৩০ ফাল্গুন ’৮৪ খুলনা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  
প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

পরাজিত প্রেম তোমাকে দেবো না স্বাতি।
এই উন্মূল জীবনের বোনা স্বপ্নের ছেঁড়া তাঁত
তোমাকে দেবো না, তোমাকে দেবো না স্বাতি,
পরাজিত প্রেম তোমাকে দেবো না প্রিয়।

শিথানে আমার ধূপে-চন্দনে পাপ,
রক্তে আমার কালো সময়ের ক্লেদ
নষ্ট চাঁদের পুন্নিমাহীন নিস্ফলা প্রান্তর---
নষ্ট জীবন তোমাকে দেবো না প্রিয়,
বন্ধা বাসনা দেবো না তোমারে স্বাতি।

জন্ম যেমন জননীর দেহ জানে
সন্তান শুধু জানে জীবনের শুভ্র সম্ভাষন,
আমিও তেম্নি যন্ত্রনা পাপ পুষে রাখি অন্তরে---
আমার যে-প্রেম কখনো সে তার জানে না জন্ম স্মৃতি।

পরাজিত প্রেম তোমাকে দেবো না প্রিয়,
কষ্ট আমাতে বাড়ক নদীর ভাঙনের মতো শোকে
অসুখি বাতাস অন্ধ করুক হৃদয়ের খোলা আঁখি,
ধংশ আমার মজ্জায় এসে জ্বলুক শ্মশানে চিতা---
তবু এই প্রেম, পরাজিত প্রেম তোমাকে দেবো না স্বাতি,
রুগ্ন সকাল তোমাকে দেবো না প্রিয়।

ভাঙনের ক্ষত বুকে রেখে দেবো আমি,
আমার উত্তরাধিকারী যেন দ্বীপখানি পায় ফিরে!
ব্যথার শ্মশানে প’ড়ে থাক প্রিয় মন

চিতার আগুনে পড়ুক আমার নষ্ট বুকের হেম,
পড়ুক ব্যর্থ তিমিরে আমার হৃদয়ের নীল ব্যথা---

আমি এই প্রেম, পরাজিত প্রেম তোমাকে দেবো না প্রিয়॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দুটি চোখ মনে আছে
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৩০ আশ্বিন ’৮৬ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

১.
দুটি চোখ মনে আছে, আর কিছু নেই . . .

হুইসেল বাজিয়ে যায় মাঝবাতে সুদূরের ট্রেন,
ভেতরে কোথায় যেন খাঁ খাঁ করে শূন্য এক নদী
জলহীন। আমি শুধু এক জোড়া চোখের ভেতর
ক্লান্তিহীন চেয়ে থেকে জীবনের ভাঙাগড়া দেখি,
যেন বা সে ইতিহাস, সভ্যতার ক্রমবিকাশের---

চোখের ভেতরে চোখ, চেয়ে থাকি স্মৃতির ভাষায়
তবু যেন স্মৃতি নয়, স্বপ্ন নয়---
বোধের অতীত কিছু
দৃষ্টিরও অতীত কিছু
আমি তারে কোনো নামে, কোনো চিহ্নে বোঝাতে পারি না।

২.
দুটি চোখ মনে'আছে, আর কিছু নেই . . .

লিলুয়া বাতাসে ঝরে এলোমেলো হলুদিয়া-পাতা,
আমি যে আউলা-হিয়া বেদনার নিজ্ঝুম বায়ে
ঝ’রে পড়ি। আমারে কি সেই চোখ রেখেছে গো মনে?
সেই দুটি চোখ যেন অঘনের সোনালিমা ক্ষেত
আমারে গড়ায় ভাঙে সারাবেলা স্বপ্নের সংশয়ে।

চোখের ভেতরে চোখ, চেয়ে থাকি পরানের চোখে,
তবু যে মেটে না সাধ, পোড়া মন
পুড়ে সে পোড়ায় হিয়া,
লো নিঠুর দরদিয়া

হয়েছো গোপন ঘুন, শাঁস কাটো লুকায়ে ভেতরে---
পুড়ে মরি কেমনে গো আমি তারে বাইরে দ্যাখাবো!

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ও পরবাসীয়া
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৪ জ্যৈষ্ঠ ’৮৬ চানখার পুল ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

চিবুকের চুম্বন চিহ্ন আমি ফিরে যাচ্ছি,
চোখে টলোমলো নদী আমি ফিরে যাচ্ছি।
ফিরে যাচ্ছি সন্ধা, ফিরে যাচ্ছি মাধবীলতার ফুল,
খুব বেদনায় নূয়ে থাকা একজোড়া চোখ
ফিরে যাচ্ছি।

ফিরে যাচ্ছি, ললাটে চুম্বন চিহ্ন আমি ফিরে যাচ্ছি---
ফিরে যাচ্ছি হিয়া, ফিরে যাচ্ছি আঁখি, ফিরে যাচ্ছি প্রেম,
কণ্ঠলগ্ন দিন, বক্ষলগ্ন দিন, প্রিয়দিন ফিরে যাচ্ছি।

বুকের ভেতরে গাঢ় পরবাস নিয়ে
হাড়ের ভেতরে এক অন্ধকার নিয়ে
চোখের সকেটে শান্ত সমুদ্রকে নিয়ে
ফিরে যাচ্ছি অমল বিরহ।

ফিরে যাচ্ছি
ফিরে যাচ্ছি
ফিরে যাচ্ছি
পেছনে কাঁদছে হিয়া, দেবদারু, সন্ধার আকাশ,
ভাসায়ে বিরহ-নাও ভালোবাসা পরবাসে যায়
হৃদয়ে চুন্বন রেখে ভালোবাসা পরবাসে যায় . . .
  
পরবাসে যাই
হৃদয়ে রক্তে চিহ্ন, গাঢ় লাল, পরবাসে যাই,
স্বপ্নের আঁধার পার হয়ে যাই আলোর উঠোনো॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বৃষ্টির জন্যে প্রার্থনা
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৫ বৈশাখ ’৮৫ ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  
প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

একবার বৃষ্টি হোক অবিরাম বৃষ্টি হোক
উষর জমিনে,
নিরীহ রক্তের দাগ মুছে নিক জলের প্লাবন,
মুছে নিক পরাজিত ব্যর্থ বাসনার গান, গ্লানি পৃথিবী।

তুমি যদি বনস্পতি তবে প্ররোচনা দাও, বৃষ্টি হোক---
বনভূমি, বৃক্ষময় হাত তবে প্রসারিত করো,
মেঘের জরাযু ছিঁড়ে নামুক জলের শিশু
জন্মের চিৎকারে ভ'রে দিক অজন্মা ভুবন!

বরষা-মঙ্গল গান আজ আর কে গাবে এখানে!
ধংশেরও তবু কিছু অবশেষ থাকে, চিহ্ন থাকে
আমাদের তা-ও নেই---স্মৃতি নেই, চিহ্ন নেই, শূন্য গৃহাঙ্গন।
কতিপয় রক্তপায়ী জীব
কতিপয় জন্মভুক প্রানী
রক্তের উৎসব খ্যালে আমাদের প্রানের উঠোনে।

বৃষ্টি হোক, একবার বৃষ্টি হোক,
দ্বিধার আকাশ ছিঁড়ে ঝরুক প্রেরনা-আর্দ্র জল।

প্রানের মন্দিরা আজ বাজাতে বাজাতে যাবো মাটির নিকটে,
যে-মাটি উদোম গায়ে শুয়ে আছে অজন্মা-আধাঁর,
যে-মাটি তামাটে তনু, ইতিহাস লেখে তার বুকের কাগজে,
একাকি উড়ায় ধুলো, বিশাল বিক্ষোভে জ্বালে বেদনার শিখা---

ভালোবেসে প্রিয় সেই মাটির সিঁথানে যদি রেখেছি হৃদয়
তবে আজ বৃষ্টি হোক, অবিরল বৃষ্টি হোক উষর জীবনে,
ধুয়ে যাক জমাট রক্তের দাগ, পরাজয়, গ্লানির পৃথিবী॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নিখিলের অনন্ত অঙ্গন
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৭ বৈশাখ '৮৫ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

১.
হারানো অতীত ছাড়া, ক্রমাগত ভবিষ্যত ছাড়া
মোর কোনো বর্তমান নেই,
মোর কোনো মধ্যভাগ নেই।

প্রতিটি মুহূর্ত এসে ভেঙে পড়ে অতীতের জলে,
প্রতিটি আগামী এসে ধ’সে পড়ে অতীতের খাদে।
ওগো নদী---অতীতের খাদ, ওগো জল, গভীর গহ্বর
আমার জন্মের ধ্বনি, আমার মৃত্যুর বাঁশি, যদি তুমি মনে রাখো
যদি তুমি নিবিড় স্মৃতির মতো বুকে রাখো তারে---
বুকে তুমি রাখবেই জানি,
আমি তবে আরো এক ভবিষ্যৎ গ’ড়ে তুলি বুকের জমিনে।

আগামী, অতীত ছাড়া মোর কোনো বর্তমান নেই,
শিকড়, প্রশাখা ছাড়া মোর কোনো মধ্যভাগ নেই---

একটি মুহূর্ত তুলে নিতে গেলে সময়ের বৃক্ষ থেকে ছিঁড়ে
দ্বিতীয় মুহূর্ত এসে হাতে ঠ্যাকে, প্রথমা হারায়ে যায়
অতীতের জলে।

কিছুই থাকে না হাতে, ছুঁয়ে থাকা যায় না কিছুই,
আকাংখায় ডেকে এনে শুধু তারে অতীতে হারানো---
যেইখানে শুরু তার, শেষ তার সেখানেই শুরু।

২.
আমি এই বর্মানহীন মুহূর্তের সাঁকো বেয়ে
ভবিষ্যৎ ছোঁবো বোলে ছুটে যাই সমগ্র জীবন,
অতীত মুঠোয় আসে শুধু
ভবিষ্যৎ থাকে তার অ-ধরা অ-ছোঁয়া দূর ভবিষ্যতে।

৩.
মুহূর্তের চূর্ন পরমানু ডেকে বলে : ওই দ্যাখ, রে অবোধ
ওই তোর হারানো অতীত, ওই তোর পরানের ভূমি
কিছু তুই চাষাবাদ শেখ, শিখে রাখ জমিনের ভাষা,
গর্ভিনী রমনী তোর এই ক্ষেতে বুনেছিলো ফসলের বীজ
এই ক্ষেতে রমনীর তামাটে শরীর আর সকল্যান বাহু
একদিন শস্যের সুগন্ধ মেখে ফিরে গেছে অঙনের নীড়ে।

ওইনদী, ধলাজল, আঁকাবাঁকা বিশাল উদোম
রোদ্দুরে শুকায় তনু বর্ষায় ফেনায়ে ওঠে উতলানো দুধ---
একদিন বেহুলার দুরন্ত বিশ্বাস ভেসেছিলো ওই জল,
ওই নগী, ওই মত্ত ডাকাত তুফানে।

আন্ধার-দরিয়া তোর ঘিরে আছে জীবনের এপার ওপার,
তোর সে-বিশ্বাস কই, বেহুলার মতো তোর বেদনার ভেলা
কেন আজো ভাসে নাই তুফান-তিমিরে?
কেন আজো শংখ, খোল, করতালে বাজে নাই হৃদয়ের বানী!

অবোধ যে সেই খোঁজে অপরের দূরতম সুখের ঠিকানা।

চামড়ার পরতে পরতে তোর জ'মে আছে লবনের স্বাদ
পলির সুগন্ধ ঘন জীবনের উর্বরতা---
তুই তবু কিছু তার চিনলি না, কিছু তার নিলি না জীবনে,
জোস্নাকে রোদ্দুর ভেবে হারালি চাঁদের স্বাদ দিনের সুষমা।

৪.
সময় গড়ায়ে পড়ে---অতীতের শান্ত জলে উথালি পাথাল
গরজে উঠতে চায় ব্যর্থ বাসনা সকল, ব্যর্থ রক্তপাত
মুখোশেব জটিল লেবাস দুহাতে ছিঁড়তে চায়
পারে না সে।
ছিঁড়তে পারে না, ফিরতে পারে না, শুধু শোচনায় ফুরায় প্রহর
আক্ষেপে হারায় কাল বয়সের বিভা।
 
মুহূর্তের 'পরে বোসে
বোধিবৃক্ষ কথা কয়, কথা কয়
স্মিতির ভেতর থেকে কেউ যেন কথা ক’য়ে ওঠে,
কেউ যেন চিৎকারে মাতায় দেশ, ব্রহ্মাণ্ড, পৃথিবী
সাগর, অরন্যভূমি, জনপদ জুড়ে তার কণ্ঠস্বর বাজে।
আমার না-বলা কথা, ব্যর্থ বাসনার গান
তার কণ্ঠে বেজে ওঠে আমার স্বপ্নের ভাষা।

৫.
জন্মের গন্ধের কথা মনে রেখো হে মাটি, মৃত্তিকা, ধুলো,
হে প্রাণ অচিন পাখি
এই ঘর ঘাটির মন্দির ছেড়ে যতোদুরে যাও
সাড়ে তিন হাত ঘরে তোর রয়ে যাবে প্রানের পৃথিবী।

আমাদের বিগত গৌরবগুলো, প্রশান্তিগুলো
ওইখানে ঢাকা প’ড়ে আছে সব ধুলো আর কাঁকরের প্রচুর নিচেয়,
অতীতের মাটি খুঁড়ে কে আজ খুঁজবে সেই প্রেরনার পরম ফসিল?

৬.
অনন্ত নিখিল শুধু সব কথা জেনেছে আমার
উদোম অরন্য বীথি শুধু তারা জেনেছে আমায়।
আমার স্বপ্নের কথা মানুষেরও চে' বেশি নক্ষত্র জেনেছে,
আমার বেদনাগুলো আমার চে' বেশি জেনেছে পাখিরা---

৭.
সত্যের লাঙলে চিরে এই পোড়া বুকের জমিন
আমিও ফসল হবো, হবো আমি শস্য ভরা ক্ষেত,
সোনালি অঘনে তুমি আঁটি আঁটি ধান তুলে নিও।

আবার নবান্ন কোরো, অতিথিবে নারায়ন জেনে
শাকান্ন, শিঙির ঝোল, আমসতু, খেজুর-পাটালি
কাঁসার থালায় এনে খেতে দিও শীতল পাটিতে।

জলের আর্শিতে মুখ দেখে আবার সিঁদুর এঁকো সুতনু-সিঁথায়,
কবিগান শুনে-ফেরা রাত জাগা ক্লান্ত চোখে
আদোরের বকুনি বুলিয়ে তুমি ডেকে নিও বুকের আড়ালে,
দিবসের ক্লান্তিগুলি খুলে খুলে রেখো তুমি রাতের শয্যায়।

৮.
আমার সন্তান এসে সেই গান শোনাবে তোমায়
আমার রক্ত, ঘাম, বেদনা দিয়ে
আমি আজ সেই গান লিখে যাবো মাটির কাগজে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মনে করো তাম্রলিপ্তি
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৬ আশাঢ় মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

আকাশ মেঘলা নয়---
মনে করো তুমি আর . . . না, তুমি একাই যাচ্ছো।
ঘ্রান নিচ্ছো সবুজের, হাতে নিচ্ছো তুচ্ছ ঘাস,
কোনো তাড়া নেই যেন, যেন, কোনো ব্যস্ততা নেই তোমার।

তোমার দক্ষিনে সাগর, উত্তরে পাহাড় আর . . . না, আর কিছু নয়,
তোমার পেছনে ইতিহাস---তোমার সামনে?

মনে করো তুমি যাচ্ছো, তুমি একা---
তোমার হাতে আঙুলের মতো শিকড়, যেন তা আঙুল
তোমার হাড়ে সঙ্গিতের মতো ধ্বনি, যেন তা মজ্জা
তোমার ত্বকে অনার্যের শোভা মসৃন আর তামাটে---
তুমি যাচ্ছো, মনে করো তুমি দুই হাজার বছোর ধ'রে হেঁটে যাচ্ছো।

তোমার পিতার হত্যাকারী একজন আর্য
তোমার ভাইকে হত্যা করেছে একজন মোঘল
একজন ইংরেজ তোমার সর্বস্ব লুট করেছে---
তুমি যাচ্ছো, তুমি একা, তুমি দুই হাজার বছোর ধরে হেঁটে যাচ্ছো।

তোমার দক্ষিনে শবযাত্রা, তোমার উত্তরে মৃত্যু-চিহ,
তোমার পেছনে পরাজয় আর গ্লানি--- তোমার সামনে?

তুমি যাচ্ছো, না-না তুমি একা নও, তুমি আর ইতিহাস---
মনে করো তাম্রলিপ্তি থেকে নৌ-বহর ছাড়ছে তোমার,
মনে করো ঘরে ঘরে তাঁতকল আর তার নির্মানের শব্দ
শুনতে শুনতে তুমি যাচ্ছো ভাটির এলাকা, মহুয়ার দেশে,
মনে করো পালাগানের আসর, মনে করো সেই শ্যামল রমনী
তোমার বুকের কাছে নত চোখ, থরো থরো রক্তিম অধর---
তুমি যাচ্ছো, দুই হাজার বছোর ধরে হেঁটে যাচ্ছো তুমি . . .

তোমার ডাইনে রক্ত, তোমার বাঁদিকে রক্ত
তোমার পেছনে রক্ত, রক্ত আর পরাজয়---তোমার সামনে?

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পক্ষপাত
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৭ মাঘ ’৮৩ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

তোমার হাতে আনন্দ ফুল, আমার হাতে গ্রেনেড।
ভাঙবো বোলে থমকে এখন দাঁড়িয়ে আছি রুক্ষ পথে,
ভাঙবো বোলে ভাঙছি প্রথম নিজের সীমা-গণ্ডি,
তোমার চোখে শ্যামল সোহাগ, আমার চোখে অগ্নি।

প্রয়োজনে আজ গুঁড়িয়ে দিলাম একান্ত সব স্বপ্নগুলো,
প্রয়োজনে আজ বুকে নিলাম পথের যতো কষ্ট।
তোমরা বলো ভুল করেছি, আমার সবি নষ্ট---

বাজায় ঘারা বাজাক বীনা, করুক যারা করছে ঘূনা---
আমি আমার পথ চিনেছি আমার পথে চলবো।
নাইবা র'লো সুস্বাগতম এসব কথাই বলবো :

মানুষ তুমি ভুল কোরো না,
সাহস তোমার জ্বালাও শিখা বুকের মাঝে সত্য---
তোমার র'লো সুখী মানুষ, আমার ব'লো আর্ত॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর