কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
পুড়িয়ে দেবো নীল কারুকাজ
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৯ বৈশাখ ’৮২ লালবাগ ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

বুকের ভেতর লুকিয়ে আছে তীব্র আগুন
পুড়িয়ে দেবো, পুড়িয়ে দেবো, সতর্ক হও।

রূপেল পালক গুটাও এখন
কৃত্রিমতার নীল কারুকাজ
জঠর জ্বালায় পুড়িয়ে দেবো, সতর্ক হও।

স্বপ্ন-বিলাস ছড়িয়ে আছো চতুর্দিকে,
ফসল ক্ষেতে খেলছে তোমার সোনার মৃগ,
অবক্ষয়ের ধূসর পোষাক অঙ্গে আমার
অন্ধকারের বিরাট পাখায় আড়াল-করা গেরস্থালি,
উঠোন জুড়ে উজান হাওয়ার দীর্ঘনিশাস।

সাপের ফনায় হাত রেখেছো
হাত রেখেছো বাঘের গায়ে---
ঘরে তোমার লালিত সুখ, আজন্ম সাধ
পুড়িয়ে দেবো, পুড়িয়ে দেবো, সতর্ক হও।

মাটির প্রতি অনূর্বরা আঙুল রেখে
মেঘের অর্থ অনাবৃষ্টি বুঝালে হায়।

শীতার্ত বুক, শীতল শোনিত,
রোদ্দুরকে বল্লে তোমরা জটিল আঁধার।
মাটিতে এক মাতাল যুবক আগুন হাতে
ভীষন খেলায় মত্ত এখন খামখেয়ালি
উল্টো হাতে ঘোরাচ্ছে তার তীব্র লাটিম---

সুখের বাগান, যুক্তিবিহীন খেলনা পুতুল
রেশমি আদোল, মেদাবৃত নিতম্বদ্বয়
হলুদ রাতে ন্যাংটা উরুর খেমটাপনা,
পুড়িয়ে দেবো, পুড়িয়ে দেবো, সতর্ক হও।

বুক পকেটে আতপ চালের সোঁদা গন্ধ
কোথায় যাবে---নহলি ধান টানছে তোমায়।

কাকের পালক, গঙ্গাফড়িং, বাউল বাতাস
হরগাজাবন গেরস্থালি
চোখের ভেতর নোনা সাগর, খয়রি শালিক
মাছরাঙ্গার বিচিত্র রঙ--- কোথায় যাবে?
আঙ্গিনাতে লাউয়ের জাংলা টানছে তোমায়।

রূপেল পালক গুটাও এখন
গুটাও কৃত্রিমতার ফানুস, নীল কারুকাজ
পুড়িয়ে দেবো, পুড়িয়ে দেবো, সতর্ক হও॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মুখোমুখি দাঁড়াবার দিন
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৩০ পৌষ ’৮৩ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

মুখোমুখি দাঁড়াবার এইতো সময়,
শত্রু কে চিনে গেছে অমিত মানুষ,
হৃদয় জেনেছে ঠিক কতোটা পচন---
মুখোমুখি দাঁড়াবার এইতো সময়।

বুঝেছে জীবন তার কোথায় খলন
কোন সেই ভুল ছিলো বিশ্বাসে, বোধে,

কোন সেই প্রতারক ছিলো তার প্রভু---
মুখোমুখি দাঁড়াবার এইতো সময়।

ফুলের ঘাতক খোঁজে ফুলের পোষাক
মাংশাসী পাখি তার লুকোয় নখর,
লাঙল জেনেছে তার শ্রমে কার লাভ
রাজপথ জেনে গেছে কারা কাঁদে রাতে---
পোড়া ভিতে পোড়ে কোন নিস্ব জীবন।

পিষ্ট পৃথিবী তোলে পাথরের ভার,
কর্কশ হাত টানে সময়ের রশি।
কালো-ম্লান মানুষেরা জাগে দরোজায়
মুখোমুখি দাঁড়াবার এইতো সময়॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হাউসের তালা
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৫ জ্যৈষ্ঠ '৮৭ মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

এক জনমের এই রূপোলিয়া-তালা
কোন চাবি দিয়ে তারে খুলি ?

বিহান গডায়ে যায়, দুপুর গড়ায়ে যায়, নামে নিশি, বিষের রাত্তির,
জীবন গড়ায়ে যায়, জীবনের ফুল-পাতা, না-ফোটা মুকুল।

গোনের নৌকোর মাঝি, ভাটিয়ালি গেয়ে যাও---জানো তুমি?
তুমি জানো, যব-ডুমুরের গাছে আউলা-বাউলা-মন মাছরাঙা পাখি?
তুমি জানো? ও মেঘ, ও অঘনের পোয়াতি প্রান্তর, জানো তুমি?
সুখ দিয়ে খোলে না সে, খোলে না সে বেদনায়ও,
আমার সাধের তালা কোন চাবি দিয়ে তাবে খুলি?

বৈশাখের ডাকাতিয়া ঝড়, তুমি জানো? গায়ের হালোট তুমি জানো?
ও লাঙল, ও মাটি, ও কিশোরির প্রথম প্রণয়, তুমি জানো?
জ্বলন্ত উনুনে ভাত, দারুচিনি আর কাঁচা বিহানের রোদ
দুধের থালের পাশে ভন্ ভন্‌ নীল মাছি, তুমি জানো? বৃষ্টি তুমি জানো?
তুমি জানো, দিগন্তে আঁচল মেলে, শুয়ে-থাকা নিধুয়া-পাথার?

আলো দিয়ে খোলে না সে, খোলে না সে আঁধারেও,
আমার সাধের তালা, কোন চাবি দিয়ে তারে খুলি!
ঘৃনাতেও খোলে না সে, ভালোবাসা, তুমি পারো?

.              ****************

@ হাউস - শখ, ইচ্ছা, আশা, আরবী - হবশ্ ।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
গহিন গাঙের জল
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৬ বৈশাখ ’৮৫ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

গহিন গাঙের ঘোলা নোনাজল উথালি পাথালি নাচে
ফনা তুলে আসে তুফানের সাপ কাফনের মতো শাদা
পরানের 'পরে পড়ে আছড়ায়ে বিশাল জলের ক্রোধ---
যেন উপকূল ভিটে মাটি ঘর টেনে নিয়ে যাবে ছিঁড়ে।

বাঘের পায়ের চিহ্নের মাঝে জ’মে আছে রূপো-জল
মরা হরিনের চোখের মতোন ঘোর নিরজন রাতে
নায়ের গলুয়ে তামাটে কিশোর
বাঁশিতে বাজায় কথা,
বিজন রাত্রি ভেঙে পড়ে সেই ব্যাকুল বাঁশির টানে
ফুলে ফুলে ওঠে সোমত্ত জলে জোস্নার যৌবন।

রোদ্দুরে পোড়া জোস্নায় ভেজা প্লাবনে ভাসানো মাটি
চারিপাশে তার রুক্ষ হা-মুখো হাভাতে হাঙর জল।
উজানি মাঝির পাঞ্জায় তবু বিদ্যুৎ জ্বলে ওঠে
জ্ব’লে ওঠে তাজা বারুদ-বহ্নি দরিয়ার সম্ভোগ---
উপদ্রুত এ-উপকূলে তবু জীবনের বাঁশি বাজে।

তেজি কব্জায় জমি চ'ষে আমি ঘরে তুলে নিই ব্যথা,
ঘরে তুলে নিই হাহাকারে ভরা অনাহারী দিনমান।
যে-ফসল ক্ষেতে করেছি লালন কষ্টে, রক্তে, ঘামে
আমার অঙনে সে-ধান ওঠে না
ওঠে শস্যের ঋন।
বুকের রক্ত, কষ্টের দামে আমি কিনে নিই শোক
আমি কিনে নিই ক্ষুধার্ত দেশ নিরন্ন লোকালয়।

বুকের মধ্যে থেমে আসে গান, চিৎকার জ'মে ওঠে,
ভেঙে ফেলি বাঁশি, ফুলের বাগান, তছনছ করি নারী,
গহন রক্তে জেগে ওঠে জল গহিন গাঙের ফনা---
বুনো শুয়োরের বন্যতা নাচে মগজে, পেশীতে দেহে,
গজরায় যেন অজগর-রোষে পাঁজরের তাজা হাড়।

এ-ধান আমার।
আমার অস্থি মজ্জায় তার গন্ধ রয়েছে মিশে।
আমার লাঙল যে-নাবীকে চ’ষে জঠরে বুনেছে বীজ
ভাতার না-হোই আমি তবু তার শিশুর জনক হবো!

গহিন গাঙের নোনাজল ফোটে টগবগ কোরে বুকে
ভেঙে পড়ে পাড় বিশাল বৃক্ষ প্রপিতামহের ভিটে---
'আসে জল, আসে বারুদ-প্লাবন দরিয়ার বিক্ষোভ।

বিজন রাত্রি তছনছ ছোটে, ভীত হরিনের কাক
খুরের শব্দে কাঁপে মর্মর বুনো বৃক্ষের তনু,
চরের মাটিতে স্বজনের হাড়ে
দূরের বাতাস কাঁদে
জনপদে জ্বলে শোকের মলিন চিতা।

সারা রাত্রির নিঘুম শকুনেরা
সকালের লাল সূর্যকে ছেড়ে বেদনার বাঁকা ঠোঁটে।

অধিকারহীন পরাধীন ভোর উঠোনে ঝিমোয় প’ড়ে,
দরিয়ার জল তবুও ধোয়ায় দুঃস্বপ্নের ক্ষত।
তবুও কিশোর, তামাটে কিশোর বাঁশিতে বাজায় কথা
জনপদ জুড়ে সেই সুর লেখে বেদনার নীরবতা।
বক্ষের প’রে রাখো ওই দুটি মেহেদি খচিত হাত,
নকশি কাঁথাটি বুকের উপরে আলতো জড়ায়ে রাখো।
বুকের মধ্যে দামাল দরিয়া নেচে ওঠে আজ
কি জানি কিসের টানে---
ফেটে পড়ে পাকা পেয়ারার মতো চাঁদের হলুদ কনা।

ডাকে চর আয়
আয়---আয়---আয় ডাকে দরিয়ার উতলানো নোনা জল।
মৃত হরিনের চোখের মতোন ঘোর নিরজন রাত,
কে জানি বজায় বাঁশিটি আজকে ভিন্ন আরেক সুরে---
ডাকে জল আয়, ডাকে বাঁশি আয় প্লাবনের প্রান্তরে॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
চাষারা ঘুমায়ে আছে
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৭ ভাদ্র ’৮৫ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

কেমন সুরত সই, ওলো সই কেমন সে-তনু
পরান উথলে ওঠে বলা তারে যায় না ভাষায়
কি কোরে বুঝাই তোরে ওলো সই কোন উপমায়!

সমুদ্র দিয়েছে নুন তার হাড়ে নোনা ভালোবাসা,
সেগুনের মতো দেহ অপরূপ গভীর শ্যামল---
সবুজ আঙুল আহা তার দুধের সরের মতো নোখ
মাঝ রাতে খুঁড়ে তোলে পরানের গোপন খোয়ার।

শুটকির গন্ধে রাত ভ'রে ওঠে কানায় কানায়,
লো সই বুঝাই তারে শুয়ে থাক সময় আসেনি,
এখনো গাঙের জলে আসে নাই চূড়ান্ত জোয়ার।
চাষারা ঘুমায়ে আছে সারাদিন বেদনাকে চ'ষে
ঘরের মাগির মাই মুঠে পুরে রয়েছে বেঘোর।

শুধু এক তন্দ্রাহীন তামাটে কিশোর
স্বপ্নের শিথানে বোসে বাজায় গোপন এক আগামীর বাঁশি . . .
আমি বলি : জেগে থাক, কিছুক্ষন জেগে থাক, আসেনি সময়।

জেগে সে আকাশ দ্যাখে, পাঁজরের বেদনাকে দ্যাখে,
সঙ্গমে ক্লান্ত চাষার অসহায় মুখ আর বাহুখানা দ্যাখে---
সহসা চিৎকার কোরে ওঠে : কতোদিন, আর . . . কতো . . . দিন?

এখনো গাঙের জলে আসে নাই চূড়ান্ত জোয়ার
চাষারা ঘুমায়ে আছে সারাদিন অন্ধকার চষে॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তামাটে রাখাল
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৬ আশ্বিন ’৮৫ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

বার বার বাঁশি তো বাজে না, বাঁশি শুধু একবারই বাজে।

তামাটে কিশোর তুই সারারাত বাজালি নিশিথ,
বাজালি ব্যথার হাড়, প্রিয় বুক, হিমেল-খোয়াব।
রজনী পোহায়ে এলো, ঢ'লে পড়ে নিঘুম-শিশির
আলোর করাত কাটে ফালি ফালি তিমিরের তনু
তবু তোর বাঁশি তো বাজে না!

হাড়ের পাঁজর বাজে
বাজে হিয়া, রক্ত-মাংশ, চরাচর, নিখিলের নীড়,
হৃদয়েব স্বপ্ন বাজে---তবু কেন বাঁশিটি বাজে না?

তামাটে রাখাল তুই.সারাদিন বাজালি বাতাস
বিরান বিলের বুকে নিসঙ্গতা বাজালি রে তোর।

কবে কোন উদাসিন বাউলের একতারাখানি
যেইভাবে বেজেছিলো---যেইভাবে বাজে প্রান, বাজে দেহ,
সেই সুর হারালি কোথায় তুই তামাটে রাখাল?
বাঁশি তো বাজে না তোর!

তামাটে রাখাল তোর বাঁশিটি বাজে না কেন?
বাজে তোর নিসঙ্গতা, বাজে তনু. ব্যথিত খোয়াব,
গহন সুরের যতো বাজে তোর দিবস রজনী---
তবু কেন বাঁশিটি বাজে না?

একবার বেজেছিলো বাঁশি---বাঁশি শুধু একবারই বাজে?

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
খামার
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৬ বৈশাখ ’৮৬ মিঠেখলি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

আজ আর বৃষ্টি নেই---রোদের রঙিন চিল
ডানার পালক তার মেলে দিছে আকাশের তলে।
উদ্ভিদের দেহ দ্যাখো কি-শ্যামল চেকনাই
আহা কি মাটির ঘ্রান, সোঁদা ঘ্রান---মাটিও কি ফুল?

ব্রহ্মাণ্ডের শূন্য-ডালে ফুটে থাকা এই রুক্ষ তামাটে কুসুম
সূর্যহীন, জোস্নাহীন করে কোন অন্ধকারে ফুটে উঠেছিলো
কবে কোন কিষানেরা অন্ধকার চ'ষে
এই মাঠে বুনছিলো প্রেম
মনে নেই---

মনে নেই কবে এই অনন্ত বৃষ্টি মেঘ
পৃথিবীর তিনভাগ রোদনের মতো ঝ'রে পড়েছিলো।

আজ আর বৃষ্টি নেই
খামারে এসেছে নেমে সভ্যতার নহলি কিষান,
পুরোনো পায়ের চিহ্ন খুঁজে খুঁজে বরষার জলে
তাকে ফের যেতে হবে, পুনর্বার ফিরে যেতে হবে
জন্মের আন্ধার ঘরে পুনর্বার . . .

একদা প্রস্তর-দিন তারপর তামা ও লোহায়
সভ্যতা বেড়েছে তার অন্তরের গাঢ় প্রয়োজনে।
করোটির ঘাম আর পাঁজবের বাঁকা ঋদ্ধ হাড়ে।
মানুষের চর্ম, অস্থি, ঘর্মময় শ্রমের ভাষায়
জীবন লিখেছে নাম নিখিলের অমর কাগজে।

আজ আর বৃষ্টি নেই---আজ শুধু জ'মে আছে মেঘ
জীবন বিরোধী মেঘ,
অরন্য-জীবন সেই আজ আছে জীবনে, অরন্য---
পশুরা গিয়েছে বনে সে-ভূমিকা নিয়েছে মানুষ॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বৈশাখি ছেনাল রোদ
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৬ জ্যৈষ্ঠ ’৮৫ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

বৈশাখি ছেনাল রোদ, ঘরখানা পোড়ালি আমার!

আমার সবুজ মাঠ, নধর ফসল
আমার অঙ্গন, ভিটে, তরমুজ, রাই,
আমার দুধেল গাই, অন্নদানা, গাভিন ঘরনি
বৈশাখি ছেনাল রোদ, সর্বনাশা, পোড়ালি সকল।

গগনে গভীর মেঘ জলের জরুল
বনভূমি বৃক্ষময় শ্যামলিম ছায়া
তবু তারা ফিরে গেল, খরদাহ নেভালো না কেউ,
জেগে র'লো সারাবুকে ক্ষত চিহ্ন, রোদের আঘাত।

কারে আমি ডেকে বলি সুহৃদ স্বজন
কার ছায়া তবে সত্য, বাসযোগ্য ভূমি!
কার হাতে হাত রেখে চিতাভস্মে জীবন সাজাবো
এন দেবো কার বুকে স্বপ্ন-ধোয়া প্রেরনার সাধ!

বৈশাখি ছেনাল খরা হিয়াখানি পোড়ালি আমার---

আমারে বানালি বিধি বিষাদের খেয়া,
তবু যদি সত্যি হয় এই জন্ম নেয়া
তাহলে জীবন ঘ’ষে পুনর্বার জ্বালাবো আগুন,
পুনর্বার প্রেম ছোঁবো, ছোঁবো স্বপ্ন মাটির পাঁজর॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সাত পুরুষের ভাঙা নৌকা
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২২ জ্যৈষ্ঠ ’৮৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

এই তো রে সেই জীবন-তরী
বাইতে বাইতে জনম গেল           টের পেলি না।

এইতো রে সেই জীবন-তরু
চাষ আবাদে ফুরোলো দিন          ফল পেলি না,
বাইতে বাইতে জনম গেলো         টের পেলি না।
 
এই হলো সেই সময়-নদী, এই তো সে-কূল, এই কিনারা
এইখানে তোর পাল ছিঁড়েছে, ভাঙা নায়ে জল নিয়েছে।
এইখানে বাঁক নেবার কথা
ছিলো, কিন্তু পথ হারালি,
হারালি তোর দিক-নিশানা---
বাইত বাইতে জনম গেল             টের পেলি না।

আহারে আন্ধারের মাঝি
উজানে তোর নাও চলে না,
সাত পুরুষের ভাঙা নৌকো
আজো সে নাও বাঁক নিলো,          কুল নিলো না।

সামনে কারা মেঘ দ্যাখালো
দুঃখ দিয়ে গাঙ সাজালো,
কারা তোর এই ভাঙা নায়ে
চাপিয়ে দিলো হাজার বোঝা         খোঁজ গেলি না।

সাতপুরুষের ভাঙা নৌকা
বাইতে বাইতে জনম গেল            টের পেলি না॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রাস্তার কবিতা
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৬ ফাল্গুন ’৮৩ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

বন্দনা করি
বন্দনা করি এদেশেরই অনার্য পিতার
শ্যাম চামড়ার শ্যামল মানুষ মাটি শ্যামলার,

খাঁটি মানুষ যারা ২ রক্ত ধারা দিয়েছে মিশায়ে
এদেশেরই মাটি জলে নওল নোনা বায়ে,

যারা মাটির ছেলে ২ কৃষক জেলে শ্রমিক সর্বহারা
এই জাতির রক্তে দিছে শক্ত শ্রমের ধারা,

যারা গাঁয়ে থাকে ২ গায়ে মাখে বৃষ্টি রোদের প্রেম
আষাঢ় মাসের কাদায় বোনে শস্য সুখের হেম,

বোনে দুঃখ-জরা ২ রক্তঝরা জীবন যুদ্ধের গান,
যাদের হাড়ে মাংশে ফোটে আন্দোলনের ধান।

বাজান করতালি, ২ সবকে বলি, পদ্য আমার শুরু
প্রনতি জানাতাম যদি থাকতো কোনো গুরু

কিন্তু হতভাগ্য, ২ দুরারোগ্য ব্যারাম সারাদেশে
কোনো তথ্যে কোনো পথ্য সারে না সে ব্যাধি।

দ্যাখো চতুর্দিকে, ২ নিচ্ছে শিখে, ছেলে, বুড়ো, নারী,
তেল মালিশের না-না কৌশল না-না ছল-চাতুরী।

এবার সুদিন এলো, ২ পাওয়া গেল পানির নিচে গ্যাস,
সাগরে ভাই পাওয়া যাবে আরো তেলের রাশ।

বলো মারহাবা, ২ তেল পাইবা, পাইবা তেলের পা,
দরকার মতো সেই পায়েতে তেল লাগাইয়া যা।

কোনো চিন্তা নেই, ২ ধেই ধেই নাচো দিয়ে কাছা
মামা ভাগ্নে নাইবা রলো আছে আইনের চাচা।

আমবা হাঁদা-হাবা, ২ মার বাবা বেঁধে হাত ও পা,
চিরকালই খাবো আমরা ফরেন লাঠির ঘা।

বড়ো কষ্ট মন, ২ এ অবন্যে বাঁচা ভীষন দায়
রাজার হাতি ছাইড়া দিছে সকল কিছু খায়,

কোনো বিচার হয় না, ২ আছে নানা আইনের সব ফাঁক,
আইন তৈরি করেন যারা তাদের সবি মাফ।

আহা বঙ্গদেশ, ২ রঙ্গ বেশ, কতো রঙ্গের খেলা,
তন্ত্রে মন্ত্রে যুদ্ধ চলছে, চলছে শিল্প-মেলা।

আমরা চুনোপুঁটি, ২ গুটি সুটি থাকি ঘরের কোনে,
রুই বোয়ালের বড়ো বুদ্ধি বড়ো যে তার মানে।

তবু যেটুক বুঝি. ২ তাই পুঁজি, তা-ও হয় যে মিস্‌,
গাছ পালা কাইটা ঢাকার বানাইছে প্যারিস।

বড়ো ভালো চিন্তা, ২ নাচো ধিন্ তা, ধিন্ তা ধিনা ধিনা
বাংলাদেশে প্যারিস পেলে মজার নেই তো সীমা।

“ওরা নষ্ট লোক, ২ করে শোক গেরাম গেরাম বোলে,
বাংলাদেশকে ঢোকাবো ভাই রাজধানীর খোলে---”

বলেন চিস্তাবিদ। ২ দিকবিদিক জ্ঞানের মধ্যে পোকা,
নামের শেষে না-না হরফ মানুষকে দ্যায় ধোকা।

করে বুদ্ধি বন্টন, ২ হাতে লণ্ঠন, দিবালোকের চোর
ডলার রুবেল দিনার পেয়ে কাটে না আর ঘোর।

আমরা সবি জানি, ২ কতোখানি কারা কোথায় আছে,
কে কতোটা জলে তলে কে কতোটা গাছে।

কারা ছদ্মবেশী, ২ বাইরে দেশি, বিদেশি ভেতরে
সময় মতো মুখোশ খোলে, সময় মতো পরে।

এরাই মূল শক্র, ২ পাপের গুরু সমাজের জীবানু,
মনের মধ্য ক্ষত এদের বাইরে সুশ্রী তনু।

ভাইরে বিশ্বেস করো, ২ বুকে বড়ো ব্যথার আগুন জ্বলে,
আর্ত মানুষ পিষে ওরা সুখের দালান তোলে।  

দেশে নান শ্রেণী, ২ বাড়ায় গ্লানি, হিংসা ও বিদ্বেষ
সব কথার গোড়ার কথা বলছি আমি শেষ

মানুষ সচেতন হও, ২ মুখোশ হটাও, ভাঙো শ্রেণীভেদ
দেশের মাংশে পচন তা যে করতে হবে ছেদ।

ফেরো নিজের ঘরে, ২ নিজ সংসারে স্বজনের উঠোনে,
সমান ভাবে ভাগ কোরে নাও বেঁচে থাকার মানে।

মানুষ কষ্টে আছে, ২ কষ্টে বাঁচে হাজার গ্রামের লোক,
স্বপ্নবিহীন জীবন তাদের হৃদয় ভরা শোক।

তাদের বন্দনা গাই, ২ বুকে সাজাই সময়ের ইতিহাস
এই জাতির আনন্দ, সুখ, দুঃখ, দীর্ঘশ্বাস

পরাজয় গ্লানি। ২ টানছি ঘানি আজো জানি তার,
আলোর ঘায়ে খুললো না কেউ অন্ধকারের দ্বার।

ছিলো শক্ত পেশী, ২ যে বিশ্বাসী সমুন্নত হাত
ছিঁড়লো না সে, রক্তচোষা অবিচারের রাত।

ছিলো নিজস্ব গান, ২ নিজের পরান, নিজের বাড়ি ঘর
মাল মশলা নিজের ছিলো নিজের কারিগর,

ছিলো নদীর ভাষা, ২ ভালোবাসা বেহুলার সাম্পান
তবু লখিন্দরের আজো পেলো না পরান।

যতো বিজ্ঞজনে, ২ আয়োজনে ব্যস্ত যে শহরে
নিজের সুখের ঘর গড়তে দুখী মাইন্সের হাড়ে।

তাদের বলি শোনো, ২ ষদি কোনো না-করো উপায়
হাজার মানুষ ভাঙবে ও-সুখ হাজার হাতের ঘায়,

কোনো নিষ্কৃতি নাই, ২ আমি জানাই শোনো স্বার্থপর---
আর্ত মানুষ কেড়ে নেবে তাদের অধিকার।

তারা জেগে উঠেছে, ২ ছুটে আসছে বুকে সত্য আলো,
তাদের আগমনের বার্তা রুদ্র বইলা গেল।

আমার পদ্য শেষ, ২ চি, এই দেশ, এ মাটির বাঙ্গালি,
আমার ভালোবাসার অস্ত্রে সাহস ওঠে জ্বলি।

ওঠে রনবাদ্য, ২ যা আরাধ্য, প্রার্থনা যা মনে
সমস্ত আরতি আমার বিশ্বাসের চরনে---
তুমি শক্তি দিও॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর