স্বপ্ন-জাগানিয়া কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৮ মাঘ ’৮৬ বাজুয়া খুলনা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
হারানো আঙুল কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২১ ফাল্গুন ’৮৪ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান। ব্রিটিশ আমলে ঢাকার মসলিন তাঁতিদের বুড়ো আঙুল কেটে দিয়ে সেই অমূল্য শিল্পের নিষ্ঠুর ইতি টেনে দেওয়া নিয়ে তাঁর কবিতা “হারানো আঙুল”।
নেই। কেউ নেই--- ইতিহাস জেগে আছে শুধু একা অতন্দ্র দুচোখ। যেন এক মৃত মানুষের পাঁজরের জীর্ন হাড় বিগত জন্মের স্মৃতিকথা বুকে নিয়ে নীরবে রয়েছে প’ড়ে ধুলো-জমা লতা গুল্ম তৃনের ভেতর!
নেই। সেই সব তাঁতের হৃদয় থেকে বেজে-ওঠা শ্রমের সঙ্গিত নেই। স্বপ্নের সেই সব শিল্পীর হাত থেমে গেছে অনেক অতীতে, এখন ক্লান্তির মতো জীবনের স্মৃতিচিহ্ন প’ড়ে আছে ব্যথিত পাঁজর।
কোনো গান শূনবো বোলে কি এই পথে আসা?
হারানো উত্তাপ আমি খুঁজতে খুঁজতে কেন ওই জীবনের হাড় লতা গুল্ম, ভাঙা ইঁট, কেন ওই দেয়ালের পাথর সরাই! কেন শুধু মসলিন মসলিন বোলে কেঁদে উঠি বুকের ভেতরে?
ভাঙা-ইঁট, ওই হাড়---ও-তো শুধু বেদনার ব্যর্থ অবশেষ আমি তবু সেই ধুলো খুঁড়ে খুঁড়ে শুঁকে দেখি ভেতরের মাটি। কেন দেখি? কেন সেই শিল্পীর কাটা-আঙুল খুঁজে পেতে চাই? পেতে চাই তাঁতের হৃদয় থেকে বেজে-ওঠা শ্রমের সঙ্গিত ঘরে ঘরে রেশমের গান্ধমাখা আশ্বাসের মসৃন বাতাস।
হারানো শিল্পের ভাষা হারানো শ্রমের পেশী হারানো উত্তাপ আমি খুঁজতে খুঁজতে কেন ওই বুড়ো অশথের নিচে বাঁধানো দিঘির ঘাট ওই ভাষা দেয়ালের কাছে এসে থমকে দাঁড়াই!
কেন শুধু জীবনের হাড় থেকে ধুলো, বালি, রাত, ঘাম, ব্যর্থতা সরাই?
এখানে জীবন ঘিরে যে-বাতাস বুকে নিতো তাঁতের শীৎকার ঘামের গন্ধ আর বধূদের স্বপ্নময় বুকের উত্তাপ আজ আর সে-বাতাস নেই . . .
যে-আকাশ দেখেছিলো রেশমের তন্তু-মুগ্ধ শিল্পীর আঙুল আজ আর সে আকাশ নেই . . .
যে-চাঁদ, নীলিমা, রাত্রি শুনেছিলে ঘুঙুরের গল্প-লেখা-গান সে-চাঁদ, নীলিমা, রাত ধুলোর অনেক নিচে গিয়েছে হারায়ে।
রেশমের তনু-মুগ্ধ এক নোতুন আঙুল বিশ্বাসের তাঁতে আজ আবার বুনতে চাই জীবনের দগ্ধ মসলিন।
এই ধুলো, ক্লান্তি, ভুল, ব্যর্থ রক্তগুলো খুঁড়ে খুঁড়ে গভীর মাটিতে এই ইঁট, ঘুনপোকা, জীর্ন দুঃখগুলো খুলে খুলে গভীর হৃদয়ে ফিরে যাবো---যে রকম গৃহে ফেরে নীড়ভ্রষ্ট নিরুদ্দেশ পাখি, যে রকম কূলে ফেরে কালোজলে দিশেহারা নিখোঁজ নাবিক।
হারানো শিল্পের কাছে হারানো প্রানের কাছে প্রয়োজনে নতজানু হবো, হারানো শিল্পীর কাছে পুনরায় নতজানু হবো।
এই ধুলো, ক্লান্তি, ভুল. জীর্ন দুঃখগুলো ছিঁড়ে খুঁড়ে ফিরে যাবো স্বর্নগ্রামে॥ . **************** . সূচীতে . . .
ইশতেহার কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১০.০৩.৮৩ মুহম্মদপুর ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
পৃথিবীতে মানুষ তখনো ব্যক্তি স্বার্থে ভাগ হয়ে যায়নি। ভূমির কোনো মালিকানা হযনি তখনো। তখনো মানুষ শুধু পৃথিবীর সন্তান।
অরন্য আর মরুভূমির সমুদ্র আর পাহাড়ের ভাষা তখন আমরা জানি। আমরা ভূমিকে কর্ষন কোরে শস্য জন্মাতে শিখেছি। আমবা বিশল্যকরনীর চিকিৎসা জানি আমরা শীত আর উত্তাপে সহনশীল ত্বক তৈরি করেছি আমাদের শরীরে। আমরা তখন সোমরস, নৃত্য আর শরীরের পবিত্র উৎসব শিখেছি।
আমাদের নারীরা জমিনে শস্য ফলায় আর আমাদের পুরুষেরা শিকার করে ঘাই হরিন। আমরা সবাই মিলে খাই আর পান করি। জ্বলন্ত আগুনকে ঘিরে সবাই আমরা নাচি আর প্রসংসা করি পৃথিবীর। আমাদের বিস্ময় আর সুন্দরগুলোকে বন্দনা করি।
পৃথিবীর পূর্নিমা রাতের ঝলোমলো জোস্নায় পৃথিবীর নারী আর পুরুষেরা পাহাড়ের সবুজ অরন্যে এসে শরীরের উৎসব করে।
তখন কী আনন্দরঞ্জিত আমাদের বিশ্বাস। তখন কী শ্রমমুখর আমাদের দিনমান। তখন কী গৌরবময় আমাদের মৃত্যু।
তারপর--- কৌম জীবন ভেঙে আমরা গড়লাম সামন্ত সমাজ। বন্য প্রানীর বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য অস্ত্রগুলো আমরা ব্যবহার করলাম আমাদের নিজের বিরুদ্ধে।
আমাদের কেউ কেউ শ্রমহীনতায় প্রশান্তি খুঁজে পেতে চাইলো। দুর্বল মানুষেরা হয়ে উঠলো আমাদের সেবার সামগ্রী। আমাদের কারো কারো তর্জনী জীবন ও মৃত্যুর নির্ধারক হলো।
ভারি জিনিশ টানার জন্যে আমবা যে চাকা তৈরি করেছিলাম তকে ব্যবহার করলাম আমাদের পায়ের পেশীর আরামের জন্য। আমাদের বন্য অস্ত্র সভ্যতার নামে গ্রাস কোরে চল্লো মানুষের জীবন ও জনপদ।
আমরা আমাদের চোখকে সুদূরপ্রসারি করার জন্যে দূরবীন আব সূক্ষ নিরীক্ষনের জন্যে অনুবীক্ষন তৈরি করলাম। আমাদের বাহুর বিকল্প হলো ভারি যন্ত্র আর কারখানা। আমাদের পায়ের গতি বর্ধন করলো উড়ন্ত বিমান!
আমাদের কণ্ঠস্বর বর্ধিত হলো, আমাদের ভাষা ও বক্তব্য গ্রন্থিত হলো, আমরা রচনা করলাম আমাদের অগ্রযাত্রার ইতিহাস। আমাদের মস্তিষ্ককে আরো নিখুঁত ও ব্যাপক করার জন্যে আমরা তৈরি করলাম কম্পিউটর।
আমাদের নির্মিত যন্ত্র শৃংখলিত করলো আমাদের আমাদের নির্মিত নগর আবদ্ধ করলো আমাদের আমাদের পুঁজি ও ক্ষমতা অবরুদ্ধ করলো আমাদের আমাদের নভোযাদ উৎকেন্দ্রিক করলো আমাদের।
অস্তিত্ব রক্ষার নামে আমরা তৈরি করলাম মারনাস্ত্র। জীবন রক্ষার নামে আমরা তৈরি করলাম জীবনবিনশী হাতিয়ার। আমরা তৈরি করলাম পৃথিবী নির্মূলদসক্ষম পারমানবিক বোমা।
একটার পর একটা খাঁচা নির্মান করেছি আমরা। আবার সে-খাঁচা ভেঙে নোতুন খাঁচা বানিয়েছি--- খাঁচার পর খাঁচায় আটকা পড়তে পড়তে খাঁচার আঘাতে ভাঙতে ভাঙতে, টুকরো টুকরো হয়ে আজ আমরা একা হয়ে গেছি। প্রতোকে একা হয়ে গেছি।
কী ভয়ংকর এই একাকিত! কী নির্মম এই বান্ধবহীনতা! কী বেদনাময় এই বিশ্বাসহীনতা!
এই সৌরমণ্ডলের এই পৃথিবীর এক কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে যে-সিসুর জন্ম। দিগন্তবিস্তৃত মাঠে ছুটে বেড়ানোর অদম্য স্বপ্ন যে-কিশোরের। জোস্না যাকে প্রাবিত করে। বনভূমি যাকে দুর্বিনীত করে। নদীর জোয়ার যাকে ডাকে নেশার ডাকের মতো। অথচ যার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে উপনিবেশিক জোয়াল গোলাম বানানোর শিক্ষাযন্ত্র।
অথচ যার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এক হৃদয়হীন ধর্মের আচার। অথচ যাকে শৃংখলিত করা হয়েছে স্বপ্নহীন সংস্কারে।
যে-তরুন উনসত্তুরের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। যে-তরুন অস্ত্র হাতে স্বাধীনতাযুদ্ধে গিয়েছে। যে-তরুনের বিশ্বাস, স্বপ্ন, সাধ, স্বাধীনতা-উতরকালে ভেঙে খান খান হয়েছে। অন্তরে রক্তাক্ত যে তরুন নিকপায় দেখেছে নৈরাজ্য, প্রতারনা আর নির্মমতাকে।
দুর্ভিক্ষ আর দুঃশাসন যার নিভৃত বাসনাগুলো দুমড়ে মুচড়ে তছনছ করেছে।
যে-যুবক দেখেছে এক অদৃশ্য হাতের খেলা। দেখেছ অদৃশ্য এক কালোহাত।
যে-যুবক ভয়ানক অনিশ্চয়তা আর বাজির মুখে চুঁড়ে দিয়েছে নিজেকে।
যে-পুরুষ এক শ্যামল নারীর সাথে জীবন বিনিময় করেছে। যে-পুরুষ ক্ষুধা, মৃত্যু আর বেদনার সাথে লড়ছে এখনো, লড়ছে বৈষম্য আর শ্রেনীর বিরুদ্ধে--- সে আমি।
আমি একা। এই ব্রহ্মাণ্ডের ভেতর একটি বিন্দুর মতো আমি একা। আমার অন্তর রক্তাক্ত। আমার মস্তিষ্ক জর্জরিত। আমার স্বপ্ন নিয়ন্ত্রিত। আমার শরীর লাবন্যহীন। আমার জিভ কাটা!
তবু এক নোতুন পৃথিবীর স্বপ্ন আমাকে কাতর করে আমাকে তাড়ায় . . .
আমাদের কৃষকেরা শূন্য পাকস্থলি আর বুকে ক্ষয়কাশ নিয়ে মাঠে যায় আমাদের নারীরা ক্ষুধায় পীড়িত হাড্ডিসার। আমাদের শ্রমিকেরা স্বাস্থ্যহীন। আমাদের শিশুরা অপুষ্ট, বীভৎস-করুন। আমাদের অধিকাংশ মানুষ ক্ষুধা, অকালমৃত্যু আর দীর্ঘশ্বাসের সমুদ্রে ডুবে আছে।
পৃথিবীর যুদ্ধবাজ লোকদের জটিল পরিচালনায় ষড়যন্ত্রে আর নির্মমতায়, আমরা এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তা আর চরম অসহায়ত্বের আবর্তে আটকা পড়েছি।
কী রেদনাময় এই অনিশ্চয়তা! কী বীভৎস এই ভালোবাসাহীনতা! কী নির্মম এই স্বপ্নহীনতা!
আজ আমরা আবার সেই বিশ্বাস আর আনন্দকে ফিরে পেতে চাই। আজ আমরা আবার সেই সাহস আর সরলতাকে ফিরে পেতে চাই। আজ আমরা আবার সেই শ্রম আর উৎসবকে ফিরে পেতে চাই। আজ আমরা আবার সেই ভালোবাসা আর প্রশান্তিকে ফিরে পেতে চাই। আজ আমরা আবার সেই স্বাস্থ্য আর শরীরের লাবন্যকে ফিরে পেতে চাই। আজ আমরা আবার সেই কান্নাহীন আর দীর্ঘশ্বাসহীন জীবনের কাছে যেতে চাই। আজ আমরা শোষন আর শঠতা অকালমৃত্যু আর ক্ষুধার যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পেতে চাই।
আমাদের সমৃদ্ধ এই বিজ্ঞান নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতাময় এই শিল্পসম্ভার নিয়ে আমাদের দূরলক্ষ্য আর সূক্ষ বীক্ষন নিয়ে আমাদের দ্বন্দ্বময় বেগবান দর্শন দিয়ে আমরা ফিরে যাবো আমাদের বিশ্বাসের পৃথিবীতে। আমাদের শ্রম, উৎসব, আনন্দ আর প্রশান্তির পৃথিবীতে। পরমানুর সঠিক ব্যবহার আমাদের শস্যের উত্পাদন প্রয়োজনতুল্য কোরে তুলবে। আমাদের কারখানাগুলো কখনোই হত্যার অস্ত্র তৈরি করবে না। আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞান নিরোগ করবে পৃথিবীকে। আমাদের মর্যাদার ভিত্তি হবে মেধা, সাহস আর শ্রম।
আমাদের পুরুষেরা সুলতানের ছবির পুরুষদের মতো স্বাস্থ্যবান, কর্মঠ আব প্রচণ্ড পৌরুষদীপ্ত হবে। আমাদের নারীরা হবে শ্রমবতী, লক্ষীমন্ত আর লাবন্যময়ী। আমাদের শিশুরা হবে পৃথিবীর সুন্দরতম সম্পদ।
আমরা শস্য আর স্বাস্থের, সুন্দর আর গৌরবের কবিতা লিখবো।
আমরা গান গাইবো আমাদের বসন্ত আর বৃষ্টির বন্দনা কোরে। আমবা উৎসব করবো শস্যের। আমরা উৎসব করবো পূর্নিমার। আমরা উৎসব করবো আমাদের গৌরবময় মৃত্যু আর বেগবান জীবনের।
কিন্তু এই স্বপ্নের জীবনে যাবার পথ আটকে আছে সামান্য কিছু মানুষ। অস্ত্র আর সেনা-ছাউনীগুলো তাদের দখলে। সমাজ পরিচালনার নামে তারা এক ভয়ংকর কারাগার তৈরি করেছে আমাদের চারপাশে।
তারা ক্ষুধা দিয়ে আমাদের বন্দি করেছে। তারা বস্ত্রহীনতা দিয়ে আমাদের বন্দি করেছে। তারা গৃহহীনতা দিয়ে আমাদের বন্দি করেছে। তারা জুলুম দিয়ে আমাদের বন্দি করেছে। বুলেট দিয়ে বন্দি করেছে।
তারা সবচে’ কম শ্রম দেয় আর সবচে’ বেশি সম্পদ ভোগ করে। তারা সবচে’ ভালো খাদ্যগুলো খায় আর সবচে' দামি পোষাকগুলো পরে। তাদের পুরুষদের শরীর মেদে আবৃত, কদাকার। তাদের মেয়েদের মুখের ত্বক দ্যাখা যায় না, প্রসাধনে ঢাকা। তারা আলস্য আর কর্মহীনতায় কাতর, কুৎসিত।
তাদের ঈর্ষা কুটিলতাময়। তাদের হিংসা পর্বতপ্রমান। তাদের নির্মমতা ক্ষমাহীন। তাদের জুলুম অশ্রতপূর্ব।
তারা আমাদের জিভ ফেটে নিতে চায়। তারা আমাদের চোখ উপড়ে ফেলতে চায়।
তারা আমাদের মেধা বিকৃত করতে চায়। তারা আমাদের শ্রবন বধির কোরে দিতে চায়। তারা আমাদের পেশীগুলো অকেজো কোরে দিতে চায়। আমাদের সন্তানদেরও তারা চায় গোলাম বানাতে।
একদা অরন্যে যেভাবে অতিকায় বন্যপ্রানী হত্যা কোরে আমরা অরন্যজীবনে শান্তি ফিরিয়ে এনেছি, আজ এইসব অতিকায় কদাকার বন্যমানুষগুলো নির্মূল কোরে আমরা আবার সমতার পৃথিবী বানাবো। সম্পদ আর আনন্দের পৃথিবী বানাবো। শ্রম আর প্রশান্তির পৃথিবী বানাবো॥ . **************** . সূচীতে . . .
ছিনতাই কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ০৬.০৬.৮০ মিঠেখালি বাগেরহাট। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
দ্বিধাগ্রস্ত দাঁড়িয়ে আছি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৪.০২.৮৪ কবি জসীমউদ্দীন হল ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
সেই যে আমি দাঁডিয়েছিলাম, মনে পড়ছে? সেই যে আমি উস্কো-খুস্কো আউল বাউল একমাথা চুল, সেই যে আমি রক্তচক্ষু, দুই চোখে দুই রক্তজবা মনে পড়ছে?
সেই যে আমি দাঁড়িয়েছিলাম, তোমার স্মৃতিবন্ধের উপর দাঁডিয়েছিলাম, মনে পড়ছে? সকাল তোমার মনে পড়ছে?
সেই যে আমি মিছিল জুড়ে মত্ত আওয়াজ মারমুখো এক রুক্ষ যুবক রক্তপাতের স্বপ্ন মাথায় সেই যে আমি ক্লান্ত একলা মানুষ সেই যে আনি স্বপ্নে জীবন রক্ত দেখি, টকটকে লাল রক্ত দেখি সেই যে আমি রাত্রে চোখে ঘুম আসে না চোখ বুজলেই মিছিল দেখি, বুলেটবিদ্ধ মানুষ দেখি সেই যে আমি একটুখানি স্নেহের কাঙাল, মনে পড়ছে?
সেই যে আনি দাঁড়িয়ে ছিলাম, দ্বিধাগ্রস্ত দাঁড়িয়ে ছিলাম, মনে পড়ছে? সকাল, তোমার মনে পড়ছে?
তখন আমার মুঠোয় তাজা আগ্নেয়াস্ত্র সমতার এক মন্ত্র আমার বুকের ভেতর কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম, দ্বিধাগ্রস্ত দাঁড়িয়ে ছিলাম। কারন আমি পথ চিনি না, হত্যাযোগ্য লোক চিনি না, কেন আমি ভুল মানুষের খুনে আমার হাত রাঙাবো!
মনে পড়ছে সেই যে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম একটি ভাঙা ব্রীজের উপর দাড়িয়ে ছিলাম দ্বিধাগ্রস্ত . . .
সেই যে আমি একটি শাদা ফুলের খোঁজে বেরিয়েছিলাম সেই যে আমি একটা নোতুন বাড়ির খোঁজে বেরিয়েছিলাম সেই যে আমি পরান-জোড়া ভালোবাসার স্বপ্ন নিয়ে বেরিয়েছিলাম মনে পড়ছে সকাল, তোমার মনে পড়ছে?
আমার সহ্যাত্রীরা কেউ শিকারে খুব নায করেছে কেউবা অন্ধকারের খাতায় লিখেছে তার মূল ঠিকানা। সেই যে আমি আলোর খোঁজে বেরিয়েছিলাম, আমার চতুর্পার্শ্বে আলো, আমি ভীষন অন্ধকারে।
আমার চুতর্পার্শ্বে আলো, ভিন্ন আলো--- আলো জ্বলছে, অন্ধকারে ফুল ফুটছে। আলো জ্বলছে, ব্যক্তিগত বাড়ি উঠছে আলো জ্বলছে, ভিন্ন আলো। কিন্তু আমি দাঁডিড়ে ছিলাম, দ্বিধাগ্রস্ত দাঁড়িয়ে ছিলাম দাঁড়িয়ে আছি।
আমার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র হত্যাযোগ্য লোক চিনি না। আমার বুকে অগ্নিমন্ত্র শিকারে এই হাত ওঠে না।
সেই যে ভাঙা ব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে ছিলাম দ্বিধাগ্রস্ত দাঁড়িয়ে আছি দাঁড়িয়ে আছি দাঁড়িয়ে আছি . . .
আমরা কেন জিজ্ঞাসা করছি না : ভোরে নাস্তা করেছেন? এই যে, সকালে খেয়েছেন?
পরস্পর দ্যাখা হলে আমরা এখনো কেন জিজ্ঞাসা করছি : কেমন আছেন? আমরা কেন জিজ্ঞাসা করছি না : লাঞ্চ খেয়েছেন? ভাত? গত রাতে? আগের দুপুরে?
পরস্পর দ্যাখা হলে আমরা এখনো কেন জিজ্ঞাসা করছি : কেমন আছেন? আমরা কেন জিজ্ঞাসা করছি না : লাশটা কোথায় গেলো? রাজপথে গুলি হচ্ছে কেন?
পরস্পর দ্যাখা হলে আমরা কেন জিজ্ঞাসা করছি : কেমন আছেন? আমরা কেন জিজ্ঞাসা করছি না : আন্দোলন কতোদূর? হরতালে 'নিখিল' ফাটবে? আমরা কেন জিজ্ঞাসা করছি না : সামরিক না জনতা? কোন পক্ষ? ধনী না মানুষ? . **************** . সূচীতে . . .
প্রতিবাদ পত্র : ১৪ই ফেব্রুয়ারী ’৮৩ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৭.০২.৮৩ লালবাগ ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আমি তোমাকে আর মিথ্যুক বলতে চাই না, তোমাকে বলতে চাই স্বৈর-সরকারী প্রেসনোট।
আমি তোমাকে মীরজাফর বলতে চাই না, তোমাকে বলতে চাই মধাবিত্ত রাজনীতিবিদ।
কোনো প্রতিশ্রুতি তুমি কখনো রাখোনি বোলে আজ আর কোনো কষ্ট, কোনো ক্ষোভ কাতর করে না, আমি ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাহীন বুর্জোয়া খল নেতৃত্বের সকল প্রতিশ্রুতির কথা ভাবি, আন্দোলনের তাজা রক্তে পা ভিজিয়েও যারা সব মসনদে মেতে আছে লোভাতুর কুকুরের মতো।
তোমাকে এখন প্রতারক বলতে চাই না, তোমাকে বলতে চাই ক্লেদ, সাপ্রদায়িক শকুন--- যারা মুখে ধর্ম আর মহান শান্তির কথা বলে অথচ সমস্ত কাজ করে তারা ধর্মের বিরুদ্ধে।
এখন তোমাকে আর ঘৃনা করতে চাই না আমি থুতু দিতে চাই জলপাই বাহিনীর মুখে--- যারা শিশু একাডেমী, নীলক্ষেত রক্তে ভিজিয়েছে, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছে গুলিবিদ্ধ লাশ, বুটের তলায় পিষে যারা খুন করেছে মানুষ,
আজ সেই জলপাই বাহিনীর রক্ত নিতে চাই॥ . **************** . সূচীতে . . .
লাশগুলো আবার দাঁড়াক কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৮.১০.৮৩ কবি জসীমউদ্দীন হল ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
বৃষ্টি হলে মাটি কাঁপে, লাশগুলো আবার দাঁড়াতে চায়। হাত বাঁধা, চক্ষু বাঁধা, বেয়নেটে ছিন্নভিন্ন দেহ--- লাশগুলো আবার দাঁড়াতে চায়।
আপন খুলির দিকে চেয়ে থাকে অন্ধকার চোখ, আপন হাড়ের দিকে চেয়ে থাকে বিষন্ন সকেট। বৃষ্টি হলে মাটি কাঁপে, বৃষ্টির সুগন্থ পেয়ে জেগে ওঠে লাশের কাঠামো।
পরিচিত শেয়ালেরা সাবারাত হল্লা কোরে ফেরে, উপরে শকুন ডাকে, শকুনের এখনো সুদিন। মাংশের ঢেকুর তুলে নেড়িকুত্তা বেঘোরে ঘুমায়--- মাটি কাঁপে, লাশগুলো আবার দাঁড়াতে চায়।
মুখোমুখি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৮.০২.৮৪ লালবাগ ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আমরা কথা বলতে চাই আমরা আমাদের ক্ষুধার কথা বলতে এসেছি, আমরা কথা বলবো।
আমরা আমাদের বস্ত্রহীনতার কথা বলতে এসেছি, আমরা কথা বলবো!
লাঠিচার্জ আমাদের ফেরাতে পারেনি কাঁদানে গ্যাস আমাদের ফেরাতে পারেনি রাইফেল আমাদের ফেরাতে পারেনি মেশিনগান আমাদের ফেরাতে পারেনি---
আমরা এসেছি আমরা আমাদের গৃহহীনতার কথা বলবো।
কৃষক তোমাদের পক্ষে যাবে না শ্রমিক তোমাদের পক্ষে যাবে না ছাত্র তোমাদের পক্ষে যাবে না সুন্দর তোমাদের পক্ষে যাবে না স্বপ্ন তোমাদের পক্ষে যাবে না---
তারা সকলেই কষ্টে আছে তারা সকলেই অনটনে আছে তারা সকলেই বিক্ষোভের হাত তুলেছে।
তোমাদের পক্ষে যাবে কুকুর তোমাদের পক্ষে যাবে সুবিধাভোগী তোমাদের পক্ষে যাবে বিত্তবান নেকড়েরা।
বৃক্ষ তোমাদের অভিশাপ দিচ্ছে শস্য তোমাদের অভিশাপ দিচ্ছে রক্ত তোমাদের অভিশাপ দিচ্ছে তোমাদের অভিশাপ দিচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত শিশুরা।
লক্ষ মৃত্যু আমাদের ফেরাতে পারেনি, আমরা এসেছি। আমরা আমাদের শিক্ষাহীনতার কথা বলবো। আমরা আমাদের চিকিৎসাহীনতার কথা বলবো। আমরা আমাদের গৃহহীনতার কথা বলবো। আমরা আমাদের বস্ত্রহীনতার কথা বলবো। আমরা আমাদের ক্ষুধা ও মৃত্যুর কথা বলবো।
আমরা তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা থেকে এসেছি আমরা সিপাহী আন্দোলনের দুর্গ থেকে এসেছি আমরা তেভাগার কৃষক, নাচোলের যোদ্ধা আমরা চটকলের শ্রমিক, আমরা সূর্যসেনের ভাই আমরা একাত্তুরের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে এসেছি,
কাঁধে স্টেন, কোমরে কার্তুজ, হাতে উন্মত্ত গ্রেনেড--- আমরা এসেছি॥ . **************** . সূচীতে . . .
পাকস্থলি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৮.০২.৮৪ মুহম্মদপুর ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আমার ঘরে আগামিকাল চাল ফুরোবে আমার ঘরে আগামিকাল ডাল ফুরোবে--- আমার এখন ভাতের দাবি। সব মিছিলেই এখন আমার ক্ষুধার দাবি সব মিছিলেই এখন পাকস্থলির দাবি।
লক্ষ টাকায় শোভন হচ্ছে বিত্তবানের বিলাস-কক্ষ, সর্বহারার মলিন বক্ষ লক্ষ্য করছে লক্ষ টাকায় পোষা সৈন্য, শান্তিরক্ষী, প্রতিরক্ষার অস্ত্র বুলেট। লক্ষ টাকার খাবার উড়ছে মার্সিডিজের নীলাভ ধোঁয়ায়---
আমার এখন ভাতের দাবি আমার পাকস্থলির দাবি, আমি দক্ষিন-বাম বুঝি না, বুঝি না, নির্বাচনের চার্ম বিঝি না--- আমার এখন ভাতের দাবি।
অনেক তর্ক টেবিল জুড়ে চল্লো তো ভাই, অনেক হলো মেরুকরন, গনতন্ত্র পুনরুদ্ধার অনেক হলো।
অনেক অস্ত্রবাজির খেলা, অনেক চমক. অনেক প্রতিবাদের সভা, বারোই, তেরোই দিবস, অনেক স্মৃতিচারন মেলা, স্বৈরতন্ত্র হলো তো ভাই, অনেক হলো বুট-রাইফেল ঘষা-মাজা। চোপ হালারা . . .
আমার এখন ভাতের দাবি, আমার পাকস্থলির দাবি॥ . **************** . সূচীতে . . .
কনসেক্ট্রেশন ক্যাম্প কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৩.০২.৮৪ কবি জসীমউদ্দিন হল ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
তার চোখ বাঁধা হলো। বুটের প্রথম লাথি রক্তাক্ত করলো তার মুখ। খ্যাতলানো ঠোঁটিজোড়া লালা রক্তে একাকার হলো, জিভ নাড়তেই দুটো ভাঙা দাঁত ঝ'রে পড়লো কংক্রিটে। মা . . . মাগো . . . চেঁচিয়ে উঠলো সে।
পাঁচশো পঞ্চান্ন মার্কা আধ-খাওয়া একটা সিগারেট প্রথমে স্পর্শ করলো তার বুক। পোড়া মাংশের উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো ঘরের বাতাসে। জ্বলন্ত সিগারেটের স্পর্শ তার দেহে টসটসে আঙুরের মতো ফোস্কা তুলতে লাগলো।
দ্বিতীয় লাথিতে ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে গেলো দেহ, এবার সে চিৎকার করতে পারলো না।
তাকে চিৎ করা হলো। পেটের উপর উঠে এলো দুইজোড়া বুট, কালো ও কর্কশ। কারন সে তার পাকস্থলির কষ্টের কথা বলেছিলো। বলেছিলো অনাহার ও ক্ষুধার কথা।
সে তার দেহের স্বাধীনতার কথা বলেছিলো। বুঝি সে-কারণে ফর ফর কোরে টেনে ছিঁড়ে নেয়া হলো তার সার্ট। প্যান্ট খোলা হলো। সে এখন বিবস্ত্র, বীভৎস।
তার দুটো হাত--- মুষ্টিবদ্ধ যে হাত মিছিলে পতাকার মতো উড়েছে সক্রোধে, যে-হাতে সে পোস্টার সেঁটেছে, বিলিয়েছে লিফলেট, লোহার হাতুড়ি দিয়ে সেই হাত ভাঙা হলো। সেই জীবন্ত হাত, জীবন্ত মানুষের হাত।
তার দশটি আঙুল--- যে আঙুলে ছুঁয়েছে সে মার মুখ্ ভায়ের শরীর, প্রেয়সীর চিবুকের তিল।
যে-আঙুলে ছুঁয়েছে সে সাম্যমন্ত্রে দীক্ষিত সাথির হাত, স্বপ্নবান হাতিয়ার, বাটখারা দিয়ে সে-আঙুল পেষা হলো। সেই জীবন্ত আঙুল, মানুষের জীবন্ত উপমা।
লোহার সাঁড়াশি দিয়ে, একটি একটি কোরে উপড়ে নেয়া হলো তার নির্দোষ নোখগুলো। কী চমৎকার লাল রক্তের রঙ।
সে এখন মৃত। তার শরীর ঘিরে থোকা থোকা কৃষ্ণচূড়ার মতো ছড়িয়ে রয়েছে রক্ত, তাজা লাল রক্ত।
তার থ্যাতলানো একখানা হাত প’ড়ে আছে এদেশের মানচিত্রের উপর, আর সেই হাত থেকে ঝ'রে পড়ছে রক্তের দুর্বিনীত লাভা--- . **************** . সূচীতে . . .