তিনজন মুনিয়া ছিল। মরে গেছে। আজ ভাঙাচোরা খাঁচা ঐ পড়ে আছে উঠোনের কোণে ; পরিত্যক্ত খাঁচা ঐ নষ্ট হয় জলে ও রোদ্দুরে . . . .
তিনজন মুনিয়া ছিল, মরে গেছে। ওদের উসখুশ ওড়াউড়ি মনে পড়ে ; মনে পড়ে ওদের রঙিন স্বাধীনতাকামী দুঃখ, স্বাধীনতা কামী পরাজয় !
উঠোনের কোণে ঐ পড়ে থাকা তারের খাঁচায় রোদ পড়ে জল পড়ে। কাল রাতে, জ্যোত্স্না ও ছায়ায় তিনটি মুনিয়া এসে খুঁজেছিল ঝ’রে-যাওয়া ওদের পালক . . . . চৈত্রের দুপুরে শুকনো বাঁশপাতা উড়ে যায়। ছিল তিনজন মুনিয়া পাখি --- গত শীতে মরে গেছে। বোবা ছেলোটির হাতে ফাঁকা খাঁচাটিকে দেখে বড় ভয় করে, অবসাদ হয়। . **************** . সূচীতে . . .
নতুন নারীর পাশে কবি সুব্রত চক্রবর্তী ১৯৮২ সালে প্রকাশিত, উত্তম দাশ, মৃত্যুঞ্জয় সেন, পরেশ মণ্ডল সম্পাদিত “কবিতা : ষাট সত্তর” কাব্য সংকলনের কবিতা।
সূর্য অতিক্রম করে চলে যায় নৌকাগুলি। নতুন নারীর পাশাপাশি বসে আছি। দুটি সাদা হাত ছুঁয়ে বারবার ঢেউ ফিরে যায়, ফিরে আসে বারবার ; বালি ও ঝিনুকে বল্লমের দীর্ঘ ছায়া আড়াআড়ি পড়ে আছে। জলের সমাধি ফুলে উঠে ভেঙে যায়---ধবল প্রপাত ফুঁড়ে উড়ে যায় তিনটি সি-গল্।
আমি তার চোখ থেকে খুঁটে নিতে চাই স্বপ্ন, সাধ ও অন্ধতা, আম তার ঠোঁট থেকে শুষে নিতে চাই প্রাণ, শান্তি ও আশ্রয়, আমি তার শরীরজলের গন্ধে মাথা নিচু ক’রে টের . পেতে চাই জন্মান্ধবিশ্বাস।
নীল নাইলনের জাল খস্ খস্ শব্দ করে ; হা-হা শব্দে ঢেউ বারবার ফিরে আসে --- আর কোন শব্দ নেই। বালির গহ্বরে, ছায়াময়তার দেশে। দাউ দাউ জ্বলে উঠলো পাঁতার আগুন...
সন্তপ্ত দুহাত থেকে ঝরে যায় সবকিছু ; থাকে শুধু অটুট পিপাসা। . **************** . সূচীতে . . .
কবির ঘর-গেরস্থালি কবি সুব্রত চক্রবর্তী ১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত, সাগরময় ঘোষ সম্পাদিত “দেশ পত্রিকার সুবর্ণজয়ন্তী কবিতা-সংকলন” এর কবিতা। কবিতাটি দেশ পত্রিকার ১৩ শ্রাবণ ১৩৭৯ (২৯ জুলাই ১৯৭২) সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।
অ-ই দ্যাখো কবির বাড়ি, ---কবি তো সন্ন্যাসী নয়, ওর ঘর-গেরস্থালি আছে। আছে ন্যুব্জ বাবা তার ; বারান্দার সামান্য রোদ্দুরে অ-ই দ্যাখো উনি বসে চোখে ঘুম হাত-থেকে-খসে-পড়া গুড়গুড়ির নলে--- লাল-পিঁপড়ে ঘুরে যায়, বারান্দায় অই তো রোন্দুরে শালিক-পাখিরা আসে ; তাই দেখে তালি দেয়, হাসে কবির প্রথম মেয়ে, কাল রাত্রে পরী দেখেছিল।
কবি-পত্নী রোগা, তবে ঘন-চোখ, সারা মুখে সরের মতন মমতা ছড়িয়ে আছে ; কবি তাকে ভালোবাসে খুব--- কবি তাকে এনে দেয় বেল-ফুল, এনে দেয় চুড়ি সাঁওতালী মেলা থেকে ; তাকে নিয়ে বাড়ির উঠানে বেল-চারা পুঁতে দেয়। স্ত্রীর ইচ্ছে, আগামী বর্ষায় ফুলে-ফুলে ছেয়ে যাক বাড়ি।
কবি তো সন্ন্যাসী নয়, ঘর-গেরস্থালি করে--- টাটকা-মাছ কেনে প্রতিদিন--- আর লক্ষ পচা-শব্দ ক্ষুদে লাল-পিঁপড়ের মতন কবির মগজ খুঁড়ে চলে যায় অন্ধকারে, বেলা-অবেলায়। . **************** . সূচীতে . . .
দুই জীবন কবি সুব্রত চক্রবর্তী ১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত, সাগরময় ঘোষ সম্পাদিত “দেশ পত্রিকার সুবর্ণজয়ন্তী কবিতা-সংকলন” এর কবিতা। কবিতাটি দেশ পত্রিকার ১২ বৈশাখ ১৩৮২ (২৬ এপ্রিল ১৯৭৫) সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।
একটা জীবন ভাঙতে-ভাঙতে অন্য জীবন গড়তে থাকি এক জীবনের শূন্যতাকে অন্য জীবন ভরিয়ে তোলে, একটা জীবন জবুথবু, অন্য জীবন হাওয়ায় দোলে--- একটা জীবন যেমন-তেমন, আরেক জীবন সাজিয়ে রাখি।
ফুলের শরীর ছিঁড়তে-ছিঁড়তে পেয়ে গেলাম ফুলের জমক ফুলের কঠিন বন্দিশালায় রোদ পড়েছে, পড়ছে ছায়া--- ওই যে রোদে, ওই যে ছায়ায় দুইটি ফড়িং উড়ছে মায়ায় ; একটা ফড়িং ফুলের কান্তি, অন্য ফড়িং ফুলেরই শোক।
নদীর জলে হাত রেখেছি, নদী আমায় ক্ষমা করে ; নারীর দেহে হাত রেখেছি, নারী আমায় ক্ষমা করে--- জলের স্পর্শে, নারীর স্পর্শে দুইটি জীবন পুণ্যে ভরা, একটা জীবন নিদ্রাহারা, অন্য জীবন ঘুমের ঘোরে।
একটা জীবন এলোমেলো, অন্য জীবন গুছিয়ে রাখি ; ওই যে জীবন বহির্মুখী, এই জীবনে ঘরের টান--- ফুলের শান্ত বন্দিশালায় সারা জীবন ভ্রাম্যমাণ, একটা জীবন ভাঙতে-ভাঙতে আরেক জীবন গড়ছি না কি ! . **************** . সূচীতে . . .
খেলার পোশাক কবি সুব্রত চক্রবর্তী ১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। ২০০৪ সালে প্রকাশিত, শ্যামলকান্তি দাশ ও বিমল গুহ সম্পাদিত “হাজার কবির হাজার কবিতা” কাব্য- সংকলনের কবিতা।
ছিলো যারা কাছাকাছি নব্বুই মিনিটব্যাপী জয়ে পরাজয়ে উজ্জ্বল আলোর বৃত্তে ওরা সব কোলাহল নিয়ে চলে গেছে। বেজেছিলো বিদায়ী হুইশ্ ল, দীর্ঘ, টানা...শুয়ে আছি, মনে পড়ে মূঢ় করতালি।
নিঃশব্দে শিশির ঝ'রে, খোলা বুক ভিজেছে শিশিরে। সেই কাঁটা নড়ে চড়ে...অকস্মাৎ, আঞ্চলিক মাঠে বৃষ্টি নামে : শুয়ে থাকি, একা-একা, ঠাণ্ডা ভেজা নখে খুঁটি ব্রণ---প্রবল বৃষ্টিতে ঐ ভিজে যাচ্ছে পরিত্যক্ত খেলার পোশাক।
রাতের পোশাক থেকে ঝরে জল---রাত্রে হলো বৃষ্টিপাত খুব ; সারারাত, তোমার গম্ভীর মুখ ভিজেছিলো বৃষ্টিজলে! ...চোর মধারাতে এসেছিলো---নিয়ে গেছে আলোকিত কাঠের জাহাজ। শকলের ঠাণ্ডা দাগ, সারা গায়ে লেগে আছে! . করতলে ভোর . লেবুর নির্জন গন্ধে ভরে যায়। বিদেশী মানুষ একা---রাখে হাত, শান্ত, লেবু ফুলে।
যেতে চাই কবি সুব্রত চক্রবর্তী ১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বৃষ্টির ভেতরে ঐ জবাগাছ, আমি তার ক্ষমা ও সারল্যে যেতে চাই। ...এই ঘর, ভূতে-পাওয়া সারাদিন, বিছানা ও কাঠের টেবিল, নষ্ট মোম, আধখোলা কলমের নিস্তব্ধতা ছেড়ে চলে যাবো। বৃষ্টির ভেতরে এ জবাগাছ আমাকে ডেকেছে সুখী ফুলে, পাতার আনন্দে। ম্লান এই ঘর, এই ষে জীবন, থেঁতো দিন, ভূতগ্রস্ত শব্দগুলি, চাদর ও নিঃসঙ্গ টেবিল, ক্ষয়া মোম, ঠাণ্ডা, মৃত খরথরে কাগজ... সব ছেড়ে, বৃষ্টির ভেতরে ঐ জবাগাছ, আমি তা'র সহজ সরল ব্যর্থতায় চলে যেতে চাই। . **************** . সূচীতে . . .
কবির মত্যু কবি সুব্রত চক্রবর্তী ১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অদ্ভুত শুন্যতা এসে আমাদের ভারি জব্দ করে ; যেন সে শূন্যতা নয়, যেন তা'র টানা ও পোড়েনে কবেকার অভিলাষ, পদচ্ছাপ, দণ্ডিত কাপাস স্তূপাকার হ’য়ে আছে। মাঝে-মাঝে গোপন দর্পণে জেগে ওঠে বনাঞ্চল, নদীতীর, খেয়াপারাপার...
নিস্পৃহ কাচের স্পর্শে আমাদের খর্বুটে আঙুলে বিপুল কামনা এসে জড়ো হয়। বিদায়কালীন সঘন চোখের কথা মনে পড়ে। সহসা শূন্যতা... আগুনের অন্ধকারে চলে যান পিছুটানহীন, তৃপ্তি ও অতৃপ্তিহীন, সঙ্গিহারা ; শুধু পড়ে থাকে উজ্জ্বল তিমির, ঢেউ, পদচিহ্ন, রক্তাক্ত মর্মর--- অদ্ভুত শূন্যতা তাঁর আমাদের ভারি জব্দ করে, যেন সে ভরাট কিছু, আছে যার টানা ও পোড়েন। . **************** . সূচীতে . . .
বালক জানে না কবি সুব্রত চক্রবর্তী ১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
আকাশ যে নীল নয়---পাখি জানে, ঘুড়ি কিছু জানে দু’হাতে লাটাই ধরে যে বালক সারাবেলা মাঠে-মাঠে ঘোরে যে জানে আকাশ নীল, তা'র দু'টি দীর্ঘ চোখে ভেসে থাকে ম্লান জলকণা।
জলের ভিতরে ঐ, আমাদের বালক-বয়স... ঘুরন্ত লাটাই হাতে, একা-একা. সারাবেলা আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। আকাশ যে নীল নয়, ঘুড়ি জানে, পাখি জানে---বালক জানে না। . **************** . সূচীতে . . .