বন্ধুর মৃত্যু কবি সুব্রত চক্রবর্তী ১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
দুঃখহীন, সুখহীন---অগ্নিপরিমণ্ডলের কাছে যেন সে কোথাও আছে ; মনে হয়, যেন সে আবার কাঁধে হাত রেখে বলবে : কি খবর, কেমন আছেন? অনেক ফুলের নিচে ঠাণ্ডা, শাদা ঐ দু'টি হাত এখন রয়েছে ছুঁয়ে স্বপ্নহীন কম্পাসের কাঁটা... জীবন্ত শঙ্খের শুঁড় বুক থেকে শুষে নিলো শ্বাস।
স্মৃতি-বিস্মৃতির কাছে শুকনো, খর পাতার মর্মর--- নিঃশব্দ জলের টানে ভেসে গেলে নষ্ট, ম্লান ফুল আগুনের পরপারে, অন্ধকারে, মানুষের মুখ জলস্রোতে ভেসে যায়...ষেন এক স্থিরদৃশ্য এই ভেসে-যাওয়া! সেও ছেড়ে যায় সব---পিছুটান ছিল, টানা ও পোড়েন ছিল, স্মৃতি ছিল, দুঃখসুখসাধ, মানুষেরই মতো। আজ, সব নিয়ে, চলে যায় সে আগুনের স্তব্ধতায়। ভোর হলো স্তব্ধতার কাছে॥ . **************** . সূচীতে . . .
প্রেম কবি সুব্রত চক্রবর্তী ১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
শিবানীর প্রেম এসে ছুঁয়েছিলো শিবানীর মাকে একদিন। শিবানীর মা কি জানে এই কথা, শিবানী কি জানে। উজ্জ্বল শাড়ির পাড়ে লেগে আছে অভ্রকণা---শিবানীর মা একা-একা হেঁটে যান নিচু চোখে ; আর দূরে, ধবল শাম্পানে
শিবানী ভ্রমণ করে। দীর্ঘ, খর, চেরা জিভে চেটে খায় . কুয়াশার জল... এই তা'র ভালবাসা, এই তা'র তৃষ্ণা-নিবারণ। শিবানীর মা কি জানে অতশত! ...চিবুকের নিচে, শিথিল খোঁপায় তা'র কুয়াশা নিবিড় হয়, . উজ্জ্বল শাড়ির পাড়ে ঝ'লে অভ্রকণা। . **************** . সূচীতে . . .
কবির শরীর কবি সুব্রত চক্রবর্তী ১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
শাদা কুসুমের ম্লান ঠাণ্ডা অন্তরালে মানুষের ছায়া পড়ে, স্পর্শ করে কবির শরীর ; শব্দের শৃঙ্খল ছিঁড়ে বড় দীর্ঘ পথে তিনি চলে যান--- . উপমাবিহীন ঐ যাত্রা একা-একা, ঐ যাত্রা দীপ্তির আঁধারে।
ফুলের খর্খর শব্দে চেয়ে দেখি অপরূপ শান্ত দু'টি হাত জলের প্রবাহে আজ ভাসিয়েছে জলের প্রবাহ, ধাতুর গৌরবে আজ রেখে যায় ধাতুর গৌরব, শব্দের অনিন্দ্য পায়ে পরিয়েছে নিঃশব্দ নুপুর !
কে তাঁকে ডেকেছে আজ! প্রতিধ্বনি! হলুদ জড়তা! না কি কোনো রত্নচ্ছায়া! নীলিমার পুরোনো পাথর! ঠাণ্ডা শাদা কসুমের@ অন্ধকারে কান্তিমান কবির শরীরে মানুষের ছায়া পড়ে---কবির শরীর ঘিরে . শব্দহীন ছায়ার সঞ্চার।
@ কসুমের - শব্দটি আমরা কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থে এ ভাবেই পেয়েছি। সম্ভবত “কুসুম” হবে। . **************** . সূচীতে . . .
মানুষ কবি সুব্রত চক্রবর্তী ১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
১.
মানুষ কি ভাবে যাবে! শৈশবের অর্ধস্ফুট বীজ আজো তা'র করতলে ; আজো তা'র পরিকীর্ণ চুল ফুলে ওঠে দিগ্বিদিকে : আঙুলের স্পর্শকাতরতা, আশরীর জেগে থাকে! নীলাভ জড়ূল জঙ্ঘাদেশে ভাসমান, বজ্রচিহ্নে। মানুষ কি ভাবে তবে যাবে! বুকে তা'র ঝুলে আছে কবেকার তৃপ্ত মুথাঘাস... স্বপ্নময় দু’টি চোখে শৈশবের নির্জন প্রচ্ছায়া ব্যাপ্ত হ’য়ে পড়ে আছে।
মানুষের সারা গায়ে লেগে আছে মানুষের দুর্নিরীক্ষ্য আঁশ॥
২.
আমাকে দিয়েছো শান্তি, অবিকল মানুষের মতো।
উজ্জ্বল অস্ত্রের নিচে মানুষের মৃত্যু হয়, তবু অস্ত্র উজ্জ্বল স্পর্শে মানুষ রয়েছে আজো বেঁচে ; মানুষের বাঁচা-মরা, মানুষেরই বাঁচা-মরা শুধু ... আমাকে দিয়েছো শাস্তি, অবিকল মানুষের মতো।
পশু বা পাখির কথা আমিও শুনেছি কিছু---মেটে বা কাগজে পুতুলের মতো নয়, কম-বেশি মানুষেরই মতো পশু-পাখি বেঁচে থাকে, পশুপাখি মরে যায়। যেন, জন্মের পাঁশুটে জাল ঘিরে থাকে ওদেরও সাম্বিৎ মানুষের মতো---ছার মানুষের মতো নয় তবু... আজীবন বেঁচে থাকে, আজীবন মরে থাকা মানুষেরই শুধু॥ . **************** . সূচীতে . . .
মানুষের পাশের চেয়ার কবি সুব্রত চক্রবর্তী ১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মানুষের পাশের চেয়ারগুলি কি রকম, আমি আজো তেমন জানি না। . দূর থেকে লক্ষ ক’রে কোঠো বলে মনে হয়, . নিরুত্তাপ বলে মনে হয়। ঐ সব চেয়ারে আমি কোনো দিন বসিনি, কেবল . মনে হয়, একদিন বসা যাবে---হয়তো বসা যাবে। হয়তো একদিন আমি সবুজ রেকসিনে ঠেক্ নিতে পার ; . কালচে-ধরা মসৃণ হাতলে হাত রেখে, গল্পসল্প ক'রে গেলে টের পেতে পারি . ঐ সব চেয়ারের আখুটে গহ্বর . বসবাসযোগ্য কি না, বনে কি না, . কি রকম নিভরযোগ্যতা... ঐ সব চেয়ারের মিশরী-ধাঁধাঁর মতো সরল মায়ায় . মানুষ কি ভাবে থাকে এ রকম বশীভূত হ’য়ে।
আজো শুধু দূর থেকে এ সব চেয়ারের ইন্দ্রিয়স্পন্দন, . ঐ সব চেয়ারের টানা ও পোড়েন বুঝে নিতে চেষ্টা করি ; মনে হয়, দূরত্বের শব্দহীনতায় শীতের হলুদ পাতা ঝরে যায়। ও সহসা, করাত টানার খস্-খস্ শব্দ শুনে, মনে হয় একদিন, জ্যোৎস্নালোকে, পরীরমণীরা ভূতুড়ে গাছের নীচে খেলেছিলো স্বপ্নকূট সর্বনেশে খেলা। . **************** . সূচীতে . . .
যেতে হবে ১ কবি সুব্রত চক্রবর্তী ১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। কবির এই গ্রন্থে “যেতে হবে” নামের দুটি কবিতা রয়েছে। আমরা নামের সাথে কেবল ১ ও ২ সংখ্যা যোগ করে দিয়েছি যাতে পাঠকের, কবিতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সুবিধা হয়।
যেতে হবে ছি'ড়ে-ভেঙে, সরাসরি না হলে আবার একই পথে ফিরে আসা, বারংবার। মানুষের হাত রেখেছে পিছনে টেনে, অপরাধে, শুশ্রূষায়, প্রেমে... যেতে হ'লে, ছি'ড়ে-ভেঙে যেতে হ'বে। খিন্ন পিছুটান আন্তরিক চেরা-কণ্ঠে বলেছে ‘এখানে থাকো, ঘুমে কিংবা আধো-জাগরণে---স্পর্শকামী ধাতুর খাঁচায়।'
ছোঁয়াচ কাড়ার মধ্যে বেড়েছে যে, সে-ও জানে ছোঁচা মানুষের প্রকৃতি কি! মানুষের নুন্নুড়ির রস কোনদিকে বহে যায়...ভেজা নুর, অভিলাষ তা'র--- মানুষের---কতখানি ছোঁয়ালেপা, কতটা পলিত।
এই স্রাব, প্রতিবেশ---এইসব ফাঁস ছিঁড়ে ফেলে, যেতে হ'লে, সরাসরি যেতে হ'বে। মানুষের হাত রেখেছে পিছনে টেনে, অপরাধে, শুশ্রূষা ও প্রেমে... দামড়া পিছুটান ভেঙে যেতে হ'বে, যদি যেতে হয়। . **************** . সূচীতে . . .