কবি সুব্রত চক্রবর্তীর কবিতা
*
প্রতীক্ষা
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

১.

গ্রীষ্মের বিকেল দীর্ঘ, পাথরের নিচে
রেখেছি তোমার চটি ; স্মৃতির ভেতরে দোখি তুমি, প্রিয়, শীতের বাগানে
উজ্জ্বল চপ্পল রেখে চলে গেছ! ...ফিরে আসতে পার,
এই ভেবে যায় ঋতু। আজ দীর্ঘ গ্রীষ্মের বিকেলে, প্রিয়, পাথরের নিচে
তোমার নিস্তব্ধ চটি পুড়ে যায়---
.                পাথরের পরপারে ওঠে ফাঁপা চাঁদ।

২.

যাকে ডাকো, সাড়া দেয়! আধ-পোড়া দহন-বেলায়
নিঃশব্দচরণে সে কি চলে গেছে! চৈত্রের বাতাসে
শুকনো-পাতা ঝরে যায়। সারারাত, পাতার মর্মরে
জেগে থাকো ; সারারাত চেয়ে দেখো কঠিন আকাশে
ওড়ে ছাই---জ্বলন্ত পাথর খাড়া দ্রুত নেমে আসে।
.                                                শশস্বরে
তোমাকেও কেউ ডাকে! ডাকে নাকি! ...দহন বেলায়
কেউ নেই ; সে কি তবে আগুনের অন্ধকারে চলে গেছে!
.                                                পাতার মর্মরে
জেগে ওঠো---নিঃশব্দচরণে তুমি একা হাঁটো টানা বারান্দায়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বন্ধুর মৃত্যু
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

দুঃখহীন, সুখহীন---অগ্নিপরিমণ্ডলের কাছে
যেন সে কোথাও আছে ; মনে হয়, যেন সে আবার
কাঁধে হাত রেখে বলবে : কি খবর, কেমন আছেন?
অনেক ফুলের নিচে ঠাণ্ডা, শাদা ঐ দু'টি হাত
এখন রয়েছে ছুঁয়ে স্বপ্নহীন কম্পাসের কাঁটা...
জীবন্ত শঙ্খের শুঁড় বুক থেকে শুষে নিলো শ্বাস।

স্মৃতি-বিস্মৃতির কাছে শুকনো, খর পাতার মর্মর---
নিঃশব্দ জলের টানে ভেসে গেলে নষ্ট, ম্লান ফুল
আগুনের পরপারে, অন্ধকারে, মানুষের মুখ
জলস্রোতে ভেসে যায়...ষেন এক স্থিরদৃশ্য এই
ভেসে-যাওয়া! সেও ছেড়ে যায় সব---পিছুটান ছিল,
টানা ও পোড়েন ছিল, স্মৃতি ছিল, দুঃখসুখসাধ,
মানুষেরই মতো। আজ, সব নিয়ে, চলে যায় সে
আগুনের স্তব্ধতায়। ভোর হলো স্তব্ধতার কাছে॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রেম
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

শিবানীর প্রেম এসে ছুঁয়েছিলো শিবানীর মাকে
একদিন। শিবানীর মা কি জানে এই কথা, শিবানী কি জানে।
উজ্জ্বল শাড়ির পাড়ে লেগে আছে অভ্রকণা---শিবানীর মা
একা-একা হেঁটে যান নিচু চোখে ; আর দূরে, ধবল শাম্‌পানে

শিবানী ভ্রমণ করে। দীর্ঘ, খর, চেরা জিভে চেটে খায়
.                                                কুয়াশার জল...
এই তা'র ভালবাসা, এই তা'র তৃষ্ণা-নিবারণ।
শিবানীর মা কি জানে অতশত! ...চিবুকের নিচে,
শিথিল খোঁপায় তা'র কুয়াশা নিবিড় হয়,
.                উজ্জ্বল শাড়ির পাড়ে ঝ'লে অভ্রকণা।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কবির শরীর
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

শাদা কুসুমের ম্লান ঠাণ্ডা অন্তরালে
মানুষের ছায়া পড়ে, স্পর্শ করে কবির শরীর ;
শব্দের শৃঙ্খল ছিঁড়ে বড় দীর্ঘ পথে তিনি চলে যান---
.                                        উপমাবিহীন
ঐ যাত্রা একা-একা, ঐ যাত্রা দীপ্তির আঁধারে।

ফুলের খর্খর শব্দে চেয়ে দেখি অপরূপ শান্ত দু'টি হাত
জলের প্রবাহে আজ ভাসিয়েছে জলের প্রবাহ,
ধাতুর গৌরবে আজ রেখে যায় ধাতুর গৌরব,
শব্দের অনিন্দ্য পায়ে পরিয়েছে নিঃশব্দ নুপুর !

কে তাঁকে ডেকেছে আজ! প্রতিধ্বনি! হলুদ জড়তা!
না কি কোনো রত্নচ্ছায়া! নীলিমার পুরোনো পাথর!
ঠাণ্ডা শাদা কসুমের@ অন্ধকারে কান্তিমান কবির শরীরে
মানুষের ছায়া পড়ে---কবির শরীর ঘিরে
.                                শব্দহীন ছায়ার সঞ্চার।

@ কসুমের - শব্দটি আমরা কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থে এ ভাবেই পেয়েছি।
সম্ভবত “কুসুম” হবে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শিকড়ে ছেয়েছে দেহ
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

বরস বেড়েছে নাকি! লতা-গুল্ম ছেয়েছে শরীর।
রক্তের ফেনায় পাই টের
শিকড়ের নড়াচড়া, শিকড়ের আড়াআড়ি টান ...
অতল ঘূর্ণির দিকে ছুটে যায় রক্তস্রোত, করজোড়ে যায়।

খসে ত্বক, উড়ে যায় সাবলীল ; বাতাসের নুনে
ধাতুর মূর্তিতে জং ধরে আজ। ধাতুর নিষ্পাপ
শিশুটি ভেঙেছে ঐ! ওকে ডাকো, টেনে নাও বুকে---
আহারে, তোমার দিকে নূলো হাত তুলে ধরে ও যে!

শিকড়ে ছেয়েছে দেহ---ফাটে হাড়, নুয়েছে কাঁকাল ...
বয়স হয়েছে নাকি! বহমান রক্তে পাই টের
লতা-গুল্মে করতালি, লতা-গুল্মে আড়াআড়ি টান---
শীতল ঘূর্ণির দিকে ভেসে যায় উজ্জ্বলতা, সফলতা যায়॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষ
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

১.

মানুষ কি ভাবে যাবে! শৈশবের অর্ধস্ফুট বীজ
আজো তা'র করতলে ; আজো তা'র পরিকীর্ণ চুল
ফুলে ওঠে দিগ্বিদিকে : আঙুলের স্পর্শকাতরতা,
আশরীর জেগে থাকে! নীলাভ জড়ূল
জঙ্ঘাদেশে ভাসমান, বজ্রচিহ্নে। মানুষ কি ভাবে
তবে যাবে! বুকে তা'র ঝুলে আছে কবেকার তৃপ্ত মুথাঘাস...
স্বপ্নময় দু’টি চোখে শৈশবের নির্জন প্রচ্ছায়া
ব্যাপ্ত হ’য়ে পড়ে আছে।

মানুষের সারা গায়ে লেগে আছে মানুষের দুর্নিরীক্ষ্য আঁশ॥

২.

আমাকে দিয়েছো শান্তি, অবিকল মানুষের মতো।

উজ্জ্বল অস্ত্রের নিচে মানুষের মৃত্যু হয়, তবু
অস্ত্র উজ্জ্বল স্পর্শে মানুষ রয়েছে আজো বেঁচে ;
মানুষের বাঁচা-মরা, মানুষেরই বাঁচা-মরা শুধু ...
আমাকে দিয়েছো শাস্তি, অবিকল মানুষের মতো।

পশু বা পাখির কথা আমিও শুনেছি কিছু---মেটে বা কাগজে
পুতুলের মতো নয়, কম-বেশি মানুষেরই মতো
পশু-পাখি বেঁচে থাকে, পশুপাখি মরে যায়। যেন,
জন্মের পাঁশুটে জাল ঘিরে থাকে ওদেরও সাম্বিৎ
মানুষের মতো---ছার মানুষের মতো নয় তবু...
আজীবন বেঁচে থাকে, আজীবন মরে থাকা মানুষেরই শুধু॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিদেশী মানুষ
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

রাতের পোষাক থেকে ঝরে জল---রাত্রে হলো বৃষ্টিপাত খুব ;
সারারাত, তোমার গম্ভীর মুখ ভিজেছিলো বৃষ্টিজলে! ...চোর
মধ্যরাতে এসেছিলো---নিয়ে গেছে আলোকিত কাঠের জাহাজ।
শেকলের ঠাণ্ডা দাগ সারা গায়ে লেগে আছে!
.                                                করতলে ভোর
.                লেবুর নির্জন গন্ধে ভরে যায়।
বিদেশী মানুষ---একা---রাখে হাত শান্ত লেবুফুলে।

‘সারারাত বৃষ্টি হলো’---ওকে বলি---ভিজেছিলো রাতের পোষাক।
তোমার গম্ভীর মুখ ভেজা, ঝরে পড়ে জল।
.                                        জাহাজের বাঁশি
মধ্যরাতে বেজেছিলো---লম্বা, টানা...
.                ভেসে গেছে রত্নময় কাঠের জাহাজ ;

বিদেশী মানুষ---একা---তুলে নিলো লেবুফুল,
.        মুখে তা'র শেকলের আড়াআড়ি দাগ।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের পাশের চেয়ার
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

মানুষের পাশের চেয়ারগুলি কি রকম, আমি আজো তেমন জানি না।
.        দূর থেকে লক্ষ ক’রে কোঠো বলে মনে হয়,
.                নিরুত্তাপ বলে মনে হয়।
ঐ সব চেয়ারে আমি কোনো দিন বসিনি, কেবল
.        মনে হয়, একদিন বসা যাবে---হয়তো বসা যাবে।
হয়তো একদিন আমি সবুজ রেকসিনে ঠেক্‌ নিতে পার ;
.                        কালচে-ধরা মসৃণ হাতলে
হাত রেখে, গল্পসল্প ক'রে গেলে টের পেতে পারি
.                ঐ সব চেয়ারের আখুটে গহ্বর
.        বসবাসযোগ্য কি না, বনে কি না,
.                        কি রকম নিভরযোগ্যতা...
ঐ সব চেয়ারের মিশরী-ধাঁধাঁর মতো সরল মায়ায়
.        মানুষ কি ভাবে থাকে এ রকম বশীভূত হ’য়ে।

আজো শুধু দূর থেকে এ সব চেয়ারের ইন্দ্রিয়স্পন্দন,
.        ঐ সব চেয়ারের টানা ও পোড়েন
বুঝে নিতে চেষ্টা করি ; মনে হয়, দূরত্বের শব্দহীনতায়
শীতের হলুদ পাতা ঝরে যায়। ও সহসা, করাত টানার
খস্‌-খস্ শব্দ শুনে, মনে হয় একদিন, জ্যোৎস্নালোকে, পরীরমণীরা
ভূতুড়ে গাছের নীচে খেলেছিলো স্বপ্নকূট সর্বনেশে খেলা।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
টিঁকে থাকা
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

গতবছরে রোপণ-করা গোলাপ গাছে আসছে কুঁড়ি...
আমায় তুমি আরো একটু সময় দিলে গুছোবো ঠিক
জীবনটাকে। শক্ত কাজ---এটাও চাই, ওটাও চাই
তা'র মানে তো সাংসারিক সুখ-সুবিধে, পদ্য লেখা!

উড়ছে বালু, ভাঙলো টিলা...মরুভূমির কাছেই শেখা,
সারাটা দিন বালুর নিচে নিশ্চেতন সরীসৃপ!
তা'র মানে তো টিঁকে থাকাই জবর কাজ---ঘরজামাই
সাংসারিক সুখ-সুবিধে, পদ্য যেন নষ্ট ছুঁড়ি!

আমায় তুমি আরো একটু সময় দিলে শিখতে পারি
দুই-দু’গুণে দুয়ের মজা---এটাও হয়, ওটাও হয়...
সারাটা দিন বালুর নিচে, অন্ধকারে, নিশ্চেতন ---
তা'র মানে তো টিঁকে থাকাই--- অন্যনাম আত্মক্ষয়॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
যেতে হবে ১
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। কবির এই গ্রন্থে
“যেতে হবে” নামের দুটি কবিতা রয়েছে। আমরা নামের সাথে কেবল ১ ও ২ সংখ্যা যোগ
করে দিয়েছি যাতে পাঠকের, কবিতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সুবিধা হয়।

যেতে হবে ছি'ড়ে-ভেঙে, সরাসরি না হলে আবার
একই পথে ফিরে আসা, বারংবার। মানুষের হাত
রেখেছে পিছনে টেনে, অপরাধে, শুশ্রূষায়, প্রেমে...
যেতে হ'লে, ছি'ড়ে-ভেঙে যেতে হ'বে। খিন্ন পিছুটান
আন্তরিক চেরা-কণ্ঠে বলেছে ‘এখানে থাকো, ঘুমে
কিংবা আধো-জাগরণে---স্পর্শকামী ধাতুর খাঁচায়।'

ছোঁয়াচ কাড়ার মধ্যে বেড়েছে যে, সে-ও জানে ছোঁচা
মানুষের প্রকৃতি কি! মানুষের নুন্নুড়ির রস
কোনদিকে বহে যায়...ভেজা নুর, অভিলাষ তা'র---
মানুষের---কতখানি ছোঁয়ালেপা, কতটা পলিত।

এই স্রাব, প্রতিবেশ---এইসব ফাঁস ছিঁড়ে ফেলে,
যেতে হ'লে, সরাসরি যেতে হ'বে। মানুষের হাত
রেখেছে পিছনে টেনে, অপরাধে, শুশ্রূষা ও প্রেমে...
দামড়া পিছুটান ভেঙে যেতে হ'বে, যদি যেতে হয়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর