কবি সুব্রত চক্রবর্তীর কবিতা
*
যেতে হবে ২
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। কবির এই
গ্রন্থে “যেতে হবে” নামের দুটি কবিতা রয়েছে। আমরা কেবল ১ ও ২ সংখ্যা যোগ করে
দিয়েছি যাতে পাঠকের, কবিতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সুবিধা হয়।

যেতে হ'বে, সব কিছু ছেড়েছুড়ে, হেমন্ত যে ভাবে
ফাঁকা মাঠ ছেড়ে যায় আরো এক নিঃস্বতার কাছে,
কাবিতা যেমন যায় প্রতীকের উপাসনা ভেঙে,
সেভাবেই যেতে হ'বে। যেন এক কম্পাসবিহীন
জাহাজের ডেক থেকে দেখা যায় দিক্চক্রবাল
ধূসর, ধূসরতর যেন এক কম্পমান আলো,
দূর থেকে আরো দূরে চলে যায় ; কী এক ইশারা,
কী এক জন্মান্ধ টান---আড়াআড়ি---জীবনযাপনে!

ঘর-গেরস্থালি ছেড়ে যেতে হ'বে---সহসা কখন
চড়ুই যেমন যায় খড়কুটো, তাজা ডিম ছেড়ে,
সেভাবেই যেতে হ'বে ; একাদিন ভিখারী যেমন
এটা-সেটা ফেলে রেখে চলে যায় নির্লিপ্ত ভিক্ষায়...
সেভাবেই চলে যাবো, দুঃখ থেকে অন্তহীন শোকে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দয়াময়ী বিবিজান
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

একটুখানি দয়া তোমার পেলাম বলে উঠলো ভেসে
মৃত-মাছের ডুবন্ত আঁশ, মৃত-মাছের চক্ষু দু'টি
শরীরনয়! দয়া তোমার পেলাম, তাইতো এই অবেলা
পড়লো ভেঙে। চতুর্দিকে, দুঃখী মানুষ উঠলো হেসে।

ঘুম থেকে যে ঘুমের দিকে সমস্তদিন আমার চলা...
বুকে আমার শুকিয়ে আছে ছেলেবেলার কৃতজ্ঞতা!
যৎসামান্য দয়া তোমার পেলাম বলে ঘুম ভেঙেছে---
দূর-বয়সের সহচরী, আজ জ্বলন্ত রজস্বলা।

ছড়িয়ে যায় রূপোলি আঁশ, ফুঁসে উঠলো হলুদ পাতা,
তোমার দিকে ঝুঁকেছিলাম, যখন ছিলে অন্য মনে---
আর সহসা চোখে তোমার দেখেছিলাম নির্বাসন!
জীবনব্যাপী দয়া তোমার---যাবজ্জীবন দণ্ডদাতা॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মধ্যবয়সের রাত্রি
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

রাত কত! চারিদিকে কম্পমান পাতার মর্মরে
গাছের গভীর দুঃখ সাড়া দেয়।...মৃত্যুহীন, জন্মান্তরহীন
.        একটি ধূসর মথ্‌ বসে থাকে নিঃসঙ্গ টেবিলে।
স্বপ্নের নিষ্পন্ন শিশু ঘুমিয়ে রয়েছে পাশে ;
.                ওর বুকে হাত রাখি,
.        টের পাই আরতি ও রক্ত চলাচল...
আর দূরে, আলোকিত মাঠ থেকে মৃত শিশু ডাকে, তা'র
.                দু'টি চোখে পাথরের টান।

রাতের নিসর্গ থেকে ঝরে যায় নষ্টবীজ,
.                ঝ'রে যায় শাম কূট পাখির পালক।
.        স্বপ্ন থেকে, পরিত্রাণ থেকে
শৈশবের চিরবৃষ্টি সারারাত ঝ'রে যায় ক্ষয়া-মোমে,
.                মলিন টেবিলে।

নিস্পন্দ মথের কাছে আড়াআড়ি দুটি হাত :
.                রাত কত!
.        চারিদিকে পাতার মর্মরে
গাছের গভীর শান্তি সাড়া দেয় : দূরে
.        স্মৃতিফলকের কাছে উদাসীন শঙ্খ বাজে,
.                উড়ে যায় ঠান্ডা, শাদা চাঁদ।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
খেলা
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

উজ্জল হলুদ আলো---চারিদিকে লম্বা, টানা কাঠের গ্যালারি
ফাঁপা, গোল পায়ের আওয়াজে জাগে ; এই মাঠে---অনন্ত প্রান্তরে
খেলা শুরু হয়ে যায় ; হাড়ে তৈরী ঢ্যাঙা গোলপোস্ট
রাতের বাতাসে নড়ে---খট্‌ খট্‌ শব্দ হয় : মানুষ-রেফারি
চাকাওলা জুতো প'রে এদিকে-ওদিকে যায়, বাজায় হুইশ্‌ল্।
কাঠের গ্যালারি থেকে হো-হো, হা-হা শব্দ আসে, ঠাণ্ডা কোলাহল।

হলুদ আলোয় আজ এই মাঠ ভরে গেছে, নেমে এলো নক্ষত্র ও চাঁদ ;
গ্যালারির পেট থেকে উঠে আসে রোমহীন ইঁদুরের মাথা...
পরস্পর দেখা হলে মানুষ যেমন করে, আবিকল তারই সমর্থনে
দু'টি ইঁদুরের মাথা ঠোকাঠুকি করে নেয়---ঢুকে যায় গ্যালারির পেটে।
অসংখ্য খেলুড়ে আর অসংখ্য ফুটবল আজ, ভরে আছে অনন্ত প্রান্তর---
মানষ-রেফারি, বেঁটে, লম্বা, রণপায়ে, দ্রুত, ছুটে যায়, দোলায় নির্দেশ।

লৌকিক নির্দেশ এই মানুষের---আজ, এই চূড়ান্ত খেলায়
ভাসমান শাদা দাঁত তর্জনীর নখে খুঁটে বলেছিলো, ‘লাস্ট ওয়ার্নিং’ ;
কর্কশ পাথর ছুঁড়ে হো-হো, হি-হি হাস্য করে কাঠের গ্যালারি---
ও হাড়ের গোলপোস্ট, ঐ রাতের বাতাসে, নড়ে, গিলে খায় চ্যাপ্টা ফুটবল।

টানা বাঁশি, উঠে চলে যায় চাঁদ, নক্ষত্রও চলে যায় : নিস্তব্ধ গ্যালারি
ছুঁয়ে পড়ে আছে রোদ---নিভে গেছে সমস্ত হলুদ
আলো, আর শব্দহীন এই মাঠ ভরে গেছে সকালের রোদে...
শক্ত, খাড়া গোলপোস্টে ফড়িং বসেছে ঐ---শাদা দাগ,
.                        সুনিশ্চিত বসেছিলো কাক।
কোথাও মানুষ নেই, নির্দেশ-সংকেত নেই---শুধু পড়ে ছিলো
তার বাঁকা তর্জনীর শান্ত নখ এইখানে, এইমাত্র ইঁদুরে খেয়েছে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বই
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
১৯৬০ সালে প্রকশিত কবির “বালক জানে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

দুঃখের দিনের সাথী, শাদা বই, তুমি স্তব্ধ কাঠের টেবিলে
আরো গাঢ় স্তব্ধতায় মিশে আছো। পাশে, ঐ জানালায়, নিশীথকালীন
তীব্র জবা ফুটে থাকে ; আর শান্ত পাতার মর্মরে,
যা'রা চলে গেছে দূরে, ঐ সব মানুষের ঠাণ্ডা অভিলাষ
ভেসে আসে।...এ সব জানো না তুমি, শাদা বই, চিরজায়মান
কাঠের টেবিল থেকে সারারাত বেড়ে ওঠো চারিদিকে।
.                                                মরমানুষের
ঘুমন্ত শরীর থেকে শুষে নাও স্বপ্ন, প্রেম, স্বাধীনতা।...নিঃশব্দ সকালে
কালো মলাটের নিচে মানুষ পায়নি খুঁজে
.                        অস্ত্রের আঘাতচিহ্ন, রক্তমাখা চুল।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রোগশয্যায়
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
কবির “নীল অপেরা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। কবিতাটি আমাদের চয়ন করে পাঠিয়েছেন
কবি দীপন মিত্র। মিলনসাগরে প্রকাশ ২১.৬.২০২২।

ঘরে ঢোকার ঠিক আগে, সহসা মনে হয়েছে, এমন ভঙ্গিতে
পর্দার আড়ালে তুমি সরে গেলে ;
সামান্য আনতমুখে দ্রুতহাতে মুছে নিলে ঠোঁট।
বাজে ঝরনা, চীনাংশুক ওড়ে।

চৈত্রের জ্বলন্ত রাত্রি একা বাড়ে, একা পুড়ে যায়।
ঘুমন্ত চোখের পাশে জাগে স্বপ্ন, প্রহরিণী, দেখো মধ্যযাম!
নিভস্ত চুল্লির বুকে ধিকিধিকি আমার হৃদয়
দহন সহিছে একা, চৈত্রের জলন্ত রাত একা পোড়ে।

ঘরে ঢোকার ঠিক আগে তোমার নিবিড় ছায়া
পর্দার আড়ালে ডুবে যায়---
দ্রুত হাতে মুছে নিলে ঠোঁট
.        হঠাৎ মনে হয়েছে এমনই ভঙ্গিতে
ঈষৎ রাতুল মুখে। সে কি স্বপ্ন!

সদাভ্রাম্যমাণ
চৈত্রের বাঘিনী রাত, অন্ধকারে কোন ঝরনা বাজে!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিদেশভূমি, বিস্মৃতি
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
কবির “নীল অপেরা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। কবিতাটি আমাদের চয়ন করে পাঠিয়েছেন
কবি দীপন মিত্র। মিলনসাগরে প্রকাশ ২১.৬.২০২২।

প্রচ্ছন্ন বিদেশভূমি বক্ষোদেশে অবিরত সজ্জিত রেখেছি।
যে-কোনো বিদেশে যাই, ঘরবাড়ি বসবাসযোগ্য মনে হয়।
নতুবা নিশ্চিত ঘুম, হে আলস্য, ঘুমের ভিতরে
পেয়েছি আপন ঘর--- অনায়াসলভ্য বিবিজান।
.        বুকের ভিতরে ঘুম, ঘুমের ভিতরে
.        মেঠোপথ, আভার্লাঁস, রাখালের বাঁশি---
হে শীত, তুমি তো জানো, বাগানের কুয়াশা মাড়িয়ে
নিরিবিলি হেঁটে গেছি প্রতিদিন
.        দেশ বন্ধু ঘর ছেড়ে যে-কোনো বিদেশে---
যেখানে মসৃণ মুখে সুআলাপী মহিলারা আপন ডালায়
রেখেছে বিষণ্ণ ফুল, মহান আঁধার--- দূরে, মহিমামণ্ডিত
স্মৃতি তার আপনার শরীরেই মশালের সম্ভাবনা নিয়ে
.        দাঁড়িয়ে রয়েছে স্থির--- বুকে তারও ধূসর বারুদ!
বিদেশে স্মৃতি কি থাকে! যদি থাকে, বিদেশি পথিক
.        তুমি তার হাত ধরে কত দূর যেতে পারো
.                                        কত দূরে যাবে?

বিস্মৃতি ধবল হাত পেতে দিলে, যদি পেতে দেয়---
.        হে হৃদয়, নেবে নাকি সঙ্গোপনে পরম উদ্ধার!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সামান্য মানুষের গল্প
কবি সুব্রত চক্রবর্তী
কবির “নীল অপেরা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। কবিতাটি আমাদের চয়ন করে পাঠিয়েছেন
কবি দীপন মিত্র। মিলনসাগরে প্রকাশ ২১.৬.২০২২।

কবিতা এক

সকলে ভ্রমণ শেষে ঘরে ফেরে--- একজন কখনো ফেরে না।
অনন্ত প্রবাস তার নদীতীরে, সমাধিভূমির ভাঙা মর্মরছায়ায়...
অনন্ত প্রবাস তার অবিশ্বাসে, দুঃখে-সুখে, যুদ্ধহীন জয়ে-পরাজয়ে...
সকলে ভ্রমণ শেষে ঘরে ফেরে--- একজন কখনো ফেরে না।

আজন্ম-বিদেশি ওই মানুষের পুরোনো রুমালে
কোনো করস্পর্শ নেই, স্মৃতি নেই, নেই কোনো রঙিন অক্ষর।

মানুষ ছুটির শেষে ঘরে ফেরে নিয়ে কত মজার পুতুল,
ভ্রমণকাহিনি, ফোটো, মোহময় গন্ধে ভরা উলের মাফলার---

একজন সামান্য লোক ঘরে থাকে, একা-একা, নিজের মতন ;
অনন্ত প্রবাস তার এই ঘর---
এই ঘরে ঝরনাশব্দ ভেসে আসে, ছায়া দেয় দীর্ঘ শাল, ওঁরাও যুবতী
গান গায় খিন্নস্বরে। এই ঘরে সে কি বন্দি! পর্যটক নয়!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর