উত্তম দাশ, মৃত্যুঞ্জয় সেন ও পরেশ মণ্ডল সম্পাদিত “কবিতা : ষাট সত্তর” (১৯৮২) কাব্য সংকলনে আমরা
কবির সম্বন্ধে যা কিছু তথ্য পাবার পেয়েছি। সেখানে তাঁর কবি-পরিচিতিতে রয়েছে . . .
“কবি তার কবি-চরিত্র সম্বন্ধে মৃত্যুর পূর্বে আমাদের লিখে জানিয়ে ছিলেন যে তিনি তাঁর কবি চরিত্র সম্বন্ধে
এখনো কিছু ভাবেন নি।” এই কাব্য-সংকলনের কাজ চলা কালীন ১৯৮০-তে কবি মারা যান।
কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “বিবিজান ও অন্যান্য কবিতা” , “বালক জানে না” (১৯৭৯)। কবি
অরণি বসুর তত্ত্বাবধানে ২০১৫ সালে পরম্পরা প্রকাশনী থেকে কবি “সুব্রত চক্রবর্তীর কবিতা সংগ্রহ”
প্রকাশিত হয়েছে।
এ ছাড়া কবির জীবন সম্বন্ধে আমাদের কাছে আর কোনো তথ্য নেই। কেউ যদি তা আমাদের পাঠান তাহলে
আমরা তা কৃতজ্ঞতার সাথে এখানে উল্লেখ করবো।
আমরা কৃতজ্ঞ কবি দীপন মিত্রর কাছে কারণ কবি সুব্রত চক্রবর্তীর এই ছবিটি এবং তাঁর ফেসবুকের
দেওয়ালে লেখা "আমার প্রিয় কবি সুব্রত চক্রবর্তীকে নিয়ে দু-চার কথা" আলেখ্যটি এখানে প্রকাশিত করার
অনুমতি দিয়েছেন। কবি দীপন মিত্রর ফেসবুকে যেতে . . .।
১৬ই জুন ২০২২ তারিখে কবি সম্পাদক দীপন মিত্র তাঁর ফেসবুকে কবি সুব্রত চক্রবর্তীর কবিতা নিয়ে
একটি আলেখ্য প্রকাশ করেন। তাঁর অনুমতি নিয়ে আমরা সেই লেখাটি এখানে তুলে দিলাম . . .
আমার প্রিয় কবি সুব্রত চক্রবর্তীকে নিয়ে দু-চার কথা
দীপন মিত্রর ফেসবুক থেকে নেওয়া তাঁর অনুমতি
(জন্ম ১০ অক্টোবর, ১৯৪১ – প্রয়াণ ১০ জানুয়ারি ১৯৮০)
হলদেটে হয়ে যাওয়া একটি পত্রিকার পাতায় প্রথম সুব্রত চক্রবর্তীর খান দশেক কবিতা পড়ি। একটি গভীর
নির্জন কণ্ঠ যেন কোনো কুয়োর মতোই অতল সত্তার অন্তঃপুর থেকে নিঃসৃত। তাঁর ভাষায় নিবিড়তা,
আর্দ্রতা যেমন আছে, তেমনই আধুনিক বাচনভঙ্গিজনিত টেনশন অনুভব করা যায় তাঁর পংক্তিতে। কবি
নিঃসঙ্গ, বিষণ্ণ কিন্তু অনমনীয়। কখনো তীব্র, খর।
“সকলে ভ্রমণ শেষে ঘরে ফেরে- একজন কখনো ফেরে না।
অনন্ত প্রবাস তার নদীতীরে, সমাধিভূমির ভাঙা মর্মর ছায়ায় ...
অনন্ত প্রবাস তার অবিশ্বাসে, দুঃখে-সুখে , যুদ্ধহীন জয়ে-পরাজয়ে ...
সকলে ভ্রমণ শেষে ঘরে ফেরে- একজন কখনো ফেরে না”।
এই শাশ্বত লাইনগুলি সুব্রত চক্রবর্তীর ‘সামান্য মানুষের গল্প’ নামের একট কবিতা থেকে উদ্ধৃত। অব্যর্থভাবে
আমার বিশ্বখ্যাত জার্মান ভাষার কবি রাইনে মারিয়া রিলকের কবিতা ‘শরতের দিন’ মনে পড়ে যায়।
রিলকে লিখেছেনঃ
যে আজ গৃহহীন, তৈরি করবে না কোনো আশ্রয়ের স্থল
যে থাকে একা, সেভাবেই থাকবে অনিশ্চিতকালব্যাপী
জেগে উঠবে নেহাত অল্প কিছু পড়বে বলে, অথবা লিখবে দীর্ঘ চিঠি
আর শ্লথ ভাবে, এলোমেলো হাঁটবে শহরের এই বীথি সেই বীথি
বুনো পাতারা যখন আলগা হয়ে এসেছে ঝরবে বলে
কবিতা দুটির মধ্যে সেভাবে আপাত সাদৃশ্য নেই, কিন্তু দুটির মধ্যেই এমন আন্তরিকতা, এমন নির্জনতা, এমন
অন্তর্মুখী অন্বেষণ রয়েছে যা তাঁদের জাত চিনিয়ে দেয়। কারো মনে হতেই পারে যে আমি রিলকের সঙ্গে
তুলনা টেনে বড্ড বাড়াবাড়ি করছি, কিন্তু আমার পাঠ অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে, সৎ কবিতার
গুণগত পরিচয় একক এবং অদ্বিতীয়। আরেকটি দিকের ওপর জোর দিতে চাই, সেটা হলো সুব্রত চক্রবর্তী
একজন অত্যন্ত উঁচু দরের কবি ছিলেন। আজ যদি বাংলা কবিতা তাঁকে ভুলে গিয়ে থাকে, তা কিন্তু
আজকের দারিদ্রকেই তুলে ধরে।
আবার আসি সুব্রত চক্রবর্তীর আরেকটি কবিতা ‘ যেতে চাই’-এর এই অমোঘ কিছু পংক্তির কাছেঃ
“বৃষ্টির ভেতর ঐ জবাগাছ, আমি তার ক্ষমা ও সারল্যে
যেতে চাই- এই ঘর, ভূতে-পাওয়া সারাদিন, বিছানা ও কাঠের টেবিল,
নষ্ট মোম,আধখোলা কলমের নিস্তব্ধতা ছেড়ে
চলে যাবো। বৃষ্টির ভেতরে ঐ জবাগাছ আমাকে ডেকেছে
সুখী ফুলে, পাতার আনন্দে”।
অনন্য এই পংক্তিটি কী সহজে লিখেছেন, “বৃষ্টির ভেতর ঐ জবাগাছ, আমি তার ক্ষমা ও সারল্যে যেতে
চাই-“। জবাগাছের ক্ষমা ও সারল্য! এর থেকে সুন্দরতর আর কী বা বলা যেতে পারত? ক্ষমা ও সারল্যের
এই যৌগ সম্মিলন বাংলা ভাষার এক নমনীয় মৌলিকতাকে তুলে ধরে। জবা গাছের গোটা অস্তিত্বটা
যেন উঠে আসে। মন শান্ত ও সুধীর হয়।
সুব্রত চক্রবর্তীর কবিতা দাবি করে পাঠকের একান্ত মগ্নতা। তাঁর কবিতার অন্তরে প্রবেশ করতে চাই গভীর
মনোনিবেশ। তাঁর পংক্তিগুলি অনুভব করতে চাইলে পাঠের সময় থামতে হবে, অপূর্ব ভাষাভঙ্গির নেশা
ধরিয়ে দেওয়ার মতো জায়গাগুলোতে কখনো কখনো থামতে হবে – কেন না শ্রবণে মোহিত
করলেও শব্দের যাত্রায় এই কবির মনন জগত অত্যন্ত তীব্র। পাঠককে থেমে বুঝতে হবে, অনুভব করতে
হবে। ‘কবির মৃত্যু’ কবিতাটি থেকে প্রথম স্তবকটি এই রকমঃ
অদ্ভুত শূণ্যতা এসে আমাদের ভারি জব্দ করে;
যেন সে শূন্যতা নয়, যেন তার টানা ও পোড়েনে
কবেকার অভিলাষ, পদচ্ছাপ, দন্ডিত কাপাস
স্তুপাকার হয়ে আছে। মাঝে-মাঝে গোপণ দর্পণে
জেগে ওঠে বনাঞ্চল, নদীতীর,খেয়াপারাপার ...
কবির মৃত্যুর থেকে যে শূন্যতাবোধ জন্ম নেয়, সে তো অন্য আরেক কবির কাছে, নিজের সাফল্য বা ব্যর্থতা
নিয়ে দুর্বিষহ টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে। কবি চলে গেছেন কিন্তু “কবেকার অভিলাষ, পদচ্ছাপ, দন্ডিত
কাপাস / স্তুপাকার হয়ে আছে”। মৃত কবির কতো অভিলাষ, কতো নিজের ভিতরে ও বাইরে যাত্রার
পিপাসার্ত পদচ্ছাপ পড়ে থাকে। কীভাবে পড়ে থাকে? তুলোকে যেভাবে আঘাতে আঘাতে সরল করা হয়ঃ
“দণ্ডিত কাপাস / স্তুপাকার হয়ে আছে”।
পত্রিকায় তাঁর কয়েকটি কবিতা পড়ার পর হন্যে হয়ে খুঁজেছি তাঁর বই। কোথাও পাইনি তাঁর বই। মাত্র
উনচল্লিশে মৃত্যু নিয়েছে তাকে সেই ১৯৮০ সালে। রুপোলি পোকায় খেয়েছে তাঁকে। হারিয়ে গেছেন সুব্রত
বাংলা কবিতার জগত থেকে। এর তার থেকে নাম শুনেছি কখনও কদাচিৎ ‘বালক জানে না’। বিস্মিত
হয়েছি এমন একজন সৎ, সংবেদনশীল কবি হারিয়ে যেতে পারে?
ফেসবুকে আমার অন্যতম প্রিয় কবিকে নিয়ে এই লেখাটি নেহাত আমার শ্রদ্ধা নিবেদন। এর আকার আর
বাড়াতে চাই না। একটি সুসংবাদ দিয়ে লেখাটি শেষ করি যে, কবি অরণি বসু’র তত্ত্বাবধানে ২০১৫ সালে
পরম্পরা প্রকাশনী থেকে সুব্রত চক্রবর্তীর কবিতা সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে।
ঃঃঃঃঃঃ
আমরা মিলনসাগরে কবি সুব্রত চক্রবর্তীর কবিতা তুলে আনন্দিত।
উত্স -
কবি সুব্রত চক্রবর্তীর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।
আমাদের ই-মেল - srimilansengupta@yahoo.co.in
এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১৮.৬.২০২২
কবির "নীল অপেরা" কাব্যগ্রন্থের ৩টি কবিতার সংযোজন - ২১.৬.২০২২ ^^ উপরে ফেরত
...
কবি সুব্রত চক্রবর্তী - জন্মগ্রহণ করেন আসামের
তেজপুরে।
কবি, পদার্থবিদ্যায় এম.এস.সি. পাশ করে বর্ধমান রাজ কলেজে,
তাঁর মৃত্যুর আগে পর্য্যন্ত অধ্যাপনা করেন।