কবি স্বাতী রহমানের কবিতা
*
থামুন
কবি স্বাতী রহমান
রচনা ২৩শে জুলাই ২০২১।

এবার থামুন
মৃতের সংখ্যা
সনাক্তের সংখ্যা গোনা বন্ধ করুন
যুদ্ব
মহামারী
রক্তপাত
ক্ষেপণাস্ত্র
তেজস্ত্রিয়তা
দেখেছি আমরা
ভোগের লালসা এবার কমিয়ে ফেলুন
লকলকে জিহবা আর বের করবেন না
লোলুপ দৃষ্টিতে সম্পদের দিকে তাকাবেন না
বাজার দখলের পাশা খেলা এবার থামান
ভোগের নেশার কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে আকাশ
হিরোশিমা নাগাসাকির ধ্বংসযজ্ঞ
কালো মানুষের লাল রক্ত
আমরা দেখেছি
এবার থামুন
মৃত্যু দেখে আতঙ্কিত হয়েছিলেন সিদ্ধার্থ
গৃহত্যাগ করেছিলেন
মৃত্যুর ভয়াবহতা দেখে
বিস্মিত হয়েছিলেন রাজা অশোক
প্রতিদিন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে
মৃত্যুবরণ করছে যারা
হে মহান জাতিসংঘ
সেই মৃত্যুর সংখ্যা আর গুনবেন না।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নারী
কবি স্বাতী রহমান
কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২৯শে মার্চ ১৯৯৩ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার
মহিলা অঙ্গন-এ।

বহুদিন নিজেকে রেখেছি অবহেলায়,
অপ্রয়োজনীয় অব্যবহৃত দ্রব্যের মতো
মেধাকে রেখেছি ফেলে ভাঁড়ারের ঘরে।
বহুদিন নিজেকে রেখেছি লুকিয়ে,
গোপনীয় বেদনার মতো দুঃখকে গোপন করে।
বহুদিন কাজলহীন দুচোখ রেখেছি শূন্য।
অভিমানী শিল্পীর মতো নিজেকে রেখেছি
আলোর বাইরে।
কোন এক অধ্যাত অজানা মফস্বলের মতো
নিজেকে রেখেছি দরিদ্র করে।
বহুদিন ড্রয়ারে বন্দী করে রেখেছি
প্রয়োজনীয় কাগজ।
নির্বিঘ্নে যেখানে বেঁধেছে বাসা তেলাপোকা
নিজের সাধের পান্ডুলিপিটা অবহেলায়
পড়ে পড়ে ভিজেছে রাতের ঘাতক বৃষ্টিতে।
অস্পষ্ট ছিন্নভিন্ন হয়েছে সমস্ত ভাবনার
সাজানো শব্দাবলী।
স্যাঁতসেঁতে কাগজগুলো দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে
ঘিঞ্জি বর্তির মতো!
কখনো বলেনি কেউ,
ওগুলো বাতাসে দাও,
এগুলো রৌদ্র দাও।
এভাবেই বহুদিন আফ্রিকার গহীন অরণ্যের মতো
আমি ও আমার আমিত্ব রয়েছে সূর্যালোকহীন।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রবহমান
কবি স্বাতী রহমান
রচনা ৪ঠা জুলাই ২০২১।

আমি তো আছিই
তোমার ধমনির রক্তে বহমান
আমি তো আছিই
তোমার হৃদপিন্ডের স্পন্দনে
আমি তো আছিই
তোমার বিষাদে
আমি তো আছিই
তোমার বিষন্ন প্রহরে
আমি তো আছিই
প্রবল বর্ষায়
আমি তো আছিই
শীতের ঝরাপাতায়
আমি তো আছিই
তোমার বিরহে
আমি তো
ক্ষণস্থায়ী বুদবুদ নই
নিমিষে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবো
আমি তো আছিই......

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
খোঁজ
কবি স্বাতী রহমান
রচনা ১৮ই জুন ২০২১।

তুমি যখন আমাকে খুঁজেছিলে অনলাইনে
আমি তখন মেঘের আড়ালে ছিলাম
বিদ্যুংরেখা হয়ে তোমাকে চমকে দিয়েছিলাম
তুমি যখন আমাকে খুঁজেছিলে
উদ্যানে উদ্যানে
তখন আমি ফুলের পাপড়ি হয়েছিলাম
তুমি স্পর্শ করেছিলে আমি ঝরে পড়েছিলাম
তুমি যখন আমাকে খুঁজেছিলে
ফেনিল সাগরে
তখন আমি ঝিনুকের মাঝে মুক্তো হয়েছিলাম
তুমি যখন আমাকে খুঁজেছিলে
হোয়াটস অ্যাপে
ফেসবুকে
ম্যাসেন্জারে
তখন আমি সুর হয়ে
তোমার অন্তরে বেজেছিলাম।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দাহ
কবি স্বাতী রহমান
রচনা ৯ জুলাই ২০২১।

এই মেয়ে শোন
তুমি তোমার স্মৃতিগুলো
শুকনো পাতার মতো পুড়িয়ে ফেলো
আর তা থেকে উত্তাপ নাও
এই মেয়ে শোন
তুমি তোমার স্পর্শের অনুভূতি
প্রবল বৃষ্টিতে ধুয়ে ফেলো
বৃষ্টির স্পর্শ থেকে শীতলতা নাও
এই মেয়ে শোন
তুমি তোমার প্রেমকে
অগ্নি যজ্ঞে দাহ করে দাও।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সিজোফ্রেনিয়াক
কবি স্বাতী রহমান
রচনা ২ জুন ২০২১।

নাট্যমঞ্চে নাটক শুরুর আগে
অকস্মাৎ সাজঘরে ঢুকে পড়েছিল ইডিয়ট
অভিনেতা অভিনেত্রীদের তখনও মেক-আপ
করা হয়নি
কুৎসিত কদাকার চেহারাগুলো
সে দেখে ফেলেছিল।
যখন হত্যাকান্ড চলছিল
তখনও ভুলক্রমে ইডিয়ট
সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল
রক্তমাখা শাণিত চাকু
সে দেখে ফেলেছিল।
পরচুলা, মুখোশ
যখন হ্যালোউইন পাটির
আলো আঁধারিতে খসে
পড়েছিল তখন সে
খুনিকে চিনে ফেলেছিল।
কাশিমবাজার কুঠির
ষড়যন্ত্রের সময়
সে সেখানে উপস্থিত হয়েছিল
পর্দার আড়ালের সবকিছু
ইডিয়ট একদিন জেনে ফেলেছিল।
তখন সবাই তাকে সিজোফ্রেনিয়াক বলেছিল।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তখন
কবি স্বাতী রহমান
রচনা ১০ই মে ২০২১।

ধৈর্য ধরতে ধরতে
এক সময় আমরা গাছ
হয়ে যাবো
পা দুটো শিকড় হয়ে
চলে যাবে মাটির গভীরে
সহ্য করতে করতে
এক সময় আমরা
মোমবাতির মতে নিঃশেষ
হয়ে যাবো
প্রতিবাদের অগ্নিশিখা
জ্বলে উঠবে না আর
ধৈর্য ধরতে ধরতে
এক সময় অনুভূতিহীন
হয়ে যাবো আমরা
কোন কবিতার জন্ম
হবেনা আর
সহ্য করতে করতে
এক সময় পৃথিবী
অক্সিজেনহীন হয়ে যাবে
আমরা শ্বাস নিতে
পারবোনা আর
তখন........................

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
১৯৭১
কবি স্বাতী রহমান
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মহান ত্যাগকে স্মরণ করে। রচনা ৬ জানুয়ারি ২০২১।

জলপাই রঙের জীপ আসে সাগর চিড়ে
জলপাই রঙের জীপ আসে পাহাড় চিড়ে
জলপাই রঙের জীপ আসে রাজপথে
খট খট শব্দ তোলে বুট জুতো
সপাং সপাং শব্দ ভাসে বেত্রাঘাতের
বুক চিরে কান্না আসে বেয়োনেটের
রক্তস্ত্রোত মিশে যায় অশ্রুজলে।
আর্তনাদের শব্দ ভাসে বজ্রনাদে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
চিল
কবি স্বাতী রহমান
রচনা ১ এপ্রিল ২০২১।

চিল উড়ে এসে
মা পাখির ডানার আড়াল থেকে
ছোঁ মেরে কেড়ে নেয় পাখির ছানা
ক্ষুধার্ত চিলের ক্ষুধা মেটে না
নিঃস্ব মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নেয় সে
নদীর ভাঙনের মতো গ্রাস করে নেয় বসতভিটা
দানার জন্য হাত পাততে হয় নিঃস্ব মানুষকে
ক্ষুধার্ত চিলের সব চাই
ক্ষমতা
অর্থ
প্রতিপত্তি
যার যেটুকু আছে সবটুকু নিয়ে নেয় চিল
সব হারানো মানুষ
ক্ষতবিক্ষত হয়
রক্তাক্ত হয়
চিল উড়ে বেড়ায়
খুঁজে বেড়ায় পাখির ছানা।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
স্বর্ণলতার হেমলক
কবি স্বাতী রহমান
প্রথম প্রকাশ সাপ্তাহিক বিচিত্রা, স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ সংখ্যা, ২৫শে মার্চ ১৯৯৪।

ইভের ভেতরে ছিল ভূবন ভোলানো স্বর্ণলতা,
তাই আদম নিয়েছিল স্বাদ নিষিদ্ধ ফলের।
আমার স্বর্ণলতা তোমাকে জড়াতে চেয়েছিল।
বিষাদাক্রান্ত সেই প্রাচীন স্বর্ণলতা,
তোমার বিষাদ আকন্ঠ পান করতে চেয়েছিল।
জীবন প্রেমী সেই স্বর্ণলতা,
মৃত জীবন থেকে জীবন গড়তে চেয়েছিল।
গৃহী সেই স্বর্ণলতা তাই,
আজন্ম বাউলের কাছে ঘরের কথা বলেছিল!
নির্বোধ সেই স্বর্ণলতা,
বোহেমিয়ান বাঁশীওয়ালার কাছে
উত্তরাধিকার চেয়েছিল।
অপরূপ সেই স্বর্ণলতা,
তৃষ্ণার্তের মতো পান করতে চেয়েছিল,
ভালোবাসার হেমলক।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর