| কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকারের কবিতা |
| আগমনি কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙালীর গান”, কাব্য সংকলন থেকে নেয়া। (মহড়া) গিরিরাজ হে জামায়ে আনিও মেয়ের সঙ্গে। মেয়ের যেরূপ মন, মায়ে বোঝে যেমন, পুরুষ পাষাণ তুমি, বুঝ না তেমন, তাই শিবের নাম করি, আমার নাম ধরি উপহাস করিতেছ রঙ্গে॥ (চিতেন) আমি ভুলি নাই আরবারের কথা, মায়ের মনে আমি মা হয়ে দিয়েছি ব্যথা, উমা এল বাহির দুয়ারে, কোলে করি ত্বরা করে জিজ্ঞাসি উমারে, “আমার শিব তো আছেন ভালো”। উমা বলে “আছেন ভালো” চোখে দেয় অঞ্চল, বলে 'চোখে কী হলো, আমার চোখে কী হলো'। আমি বুঝিনু সকল, কেন চোখে দেয় অঞ্চল, হিয়ের জল ঝিয়ের চখে উথলিল। (অন্তরা) আমি ভুলি নাই আর বারের কথা, সরমে মরমের কথা, হিয়েয় আছে গাঁথা, কার্তিকে রাখিয়া বুকে, নাচায় গৌরী থেকে থেকে, সোনার কার্তিক তোমায় দেখে, উঠে চমকে। বলে তোমায় দেখিয়ে, “মা ওমা ওকে দাঁড়ায়ে," উমা বলে 'তোমার দাদা ওই, বাবা, আমার বাবা অই।' বাপ সোহাগে বাপের ছেলে, জড়িয়ে মায়ের ধরে গলে, বলে “মা আমার বাবা কই”, বলে “কেন এলো না, ওমা বলো না” বলে, কেশে ধরে টানে, উমা চাহি আমার পান বলে, “কেন এলো না, তোমার দিদি জানে, আমি সেই অবধি, সরমে, মরমে আছি মনোভঙ্গে” . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| ভগবতী ভারতী কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙালীর গান”, কাব্য সংকলন থেকে নেয়া। ॥ ভৈররী - ত্রিতালী॥ পুরাকালের কথা পুরাতন অতি. স্মরিতে সকলে, করি হে মিনতি। হিমালয় পাশে, নিরালয় বাসে, একান্ত রাখি মন, পতি প্রতি। নারায়ণ রাগে, আপন সোহাগে, গাহিল ভারতী ভগবতী॥ হেলায়ে পড়েছে দেহ, এলায়ে পড়েছে কেশ, সাদরে পদযুগ রাখে সতী। পতিপদে দৃষ্টি, রাখি করে সৃষ্টি, কত তাল লয় সঙ্গতি॥ কাল ব্যাপিয়ে, তান আলাপিয়ে, বাজাল ত্রিতন্ত্রী দেবী ভারতী। হৃদয়ে রহিল, ত্রিতন্ত্রী ধারা, জাহ্নবী যমুনা সরস্বতী॥ ওংকার নাদে, গম্ভীর খাদে, ধরম করম কহে ভাগীরথী। মধ্যম গ্রামে, প্রেমরস নামে, যমুনা করিল ধীরগতি॥ শাস্ত্রতত্ত্ব জ্ঞানে, উচ্চ মধুর তানে, বহিল বাণী বেগবতী॥ ত্রিধারা বহিয়ে, প্রয়াগে মিশিয়ে, মিলাল জ্ঞান ধরম ভকতি॥ দৃষদ্বতী পারে, সরস্বতী ধারে, ব্রহ্মর্ষি সবে ব্রহ্মমতি। পরম ব্রহ্ম গানে, চরম ধর্ম জ্ঞানে, জগতে দেখাল পরম মুকতি॥ (সত্য কালের কথা) জাহ্নবী-ধারে গোমুখী হরিদ্বারে, কঙ্খল, কনোজ, হস্তিনা বসতি। ধর্ম কর্ম যাগে, শঙ্গ ঘণ্টারবে, পতিত পাবনী ভাগীরথী॥ (ত্রেতা যুগের কথা) যমুনা জীবনে, মথুরা বৃন্দাবনে, পূর্ণব্রহ্ম সনে হলাদিনী শকতি। বেণু বংশী গানে, প্রেম ভকতি তানে যমুনা করিল উজান গতি॥ (দ্বাপর যুগের কথা) আহা কী বিভ্রাটে, ভারত ললাটে, চক্র ঘুরাইল নিয়তি। কুরুক্ষেত্র যোগে, রক্ত বালু মাঝে বিলুপ্ত হইল সরস্বতী॥ শস্ত্র শাস্ত্র জ্ঞান, হইলা অন্তর্ধান, বাজিল মূর্খতা ভীরুতা সংহতি। জ্ঞান বিনা ধরম, জ্ঞান বিনা প্রেম, নীরস কর্কশ অধোগতি॥ সরস্বতী ধার, বহে না হৃদয়ে আর, ত্রিবেণি দ্বিবেণি পরিণতি। ছিন্ন তন্ত্রী লয়ে, অশ্রু বিসর্জিয়ে, ওই শুনো কাঁদে মাতা ভাবতী॥ পুরাতন যন্ত্রে, ছিন্ন জ্ঞান তত্রে, আর কি হয় রে স্বর-সঙ্গতি॥ ধরিতে ধর্মগান, ভুলে রে ভকতি তান, জ্ঞান পঞ্চম বিনে দুর্গতি॥ বক্ষে বহে দ্বিধারা, চক্ষে বহে দ্বিধারা, সর্বাঙ্গে বহে রে স্রোতস্বতী। আপন বিরাগে, করুণার রাগে, ঝরনার মতো ঝুরে ভারতী॥ থাকো রে সুসন্তান, কাখোরে মায়ের মান প্রেম ধর্ম করো জ্ঞানের যুকতি। সারি দেহযন্ত্র, জুড়ি দেহতন্ত্র, হৃদয়ে বহাও পুন সরস্বতী॥ আবার একান্তে, পতি পদপ্রান্তে, বসিয়া মাতা স্থিরমতি। নারায়ণ রাগে, পূর্বের সোহাগে, গাহুক ভগবতী ভারতী॥ . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| শুকশারি-সংবাদ কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙালীর গান”, কাব্য সংকলন থেকে নেয়া। শুক বলে, আমার কৃষ্ণ রোজগারি ছেলে, শারি বলে, আমার রাধায় গয়না দিবে বলে, রোজগার কীসের লাগি। শুক বলে, আমার কৃষ্ণের চশমা শোভে নাকে, শাহি বলে, আমার রাধায় খুঁটিয়ে দেখবার পাকে, নইলে পরবে কেন? শুক বলে, আমার কৃষ্ণের দাড়ি দোলায়িত, শারি বলে, আমার রাধার চিরুনি-চালিত, নইলে জটা হত। শুক বলে, আমার কৃষ্ণের চেন ঝলমল, শারি বলে, আমার রাধার গোটেরই নকল, কেবল এ পিট ও পিট। শুক বলে, আমার কৃষ্ণের আলবার্ট টেড়ি, শারি বলে, আমার রাধার সিঁথির অনুকারী, টেড়ি পেলে কোথা। শুক বলে আমার কৃষ্ণ কভু হ্যাটকোটধারী, শারি বলে, রাধার তখন ঘেরাল ঘাঘরি, সে যে রাই নাগরী। শুক বলে, আমার কৃষ্ণ সাম্যগীতি গায়, শারি বলে, আমার রাধায় ভুলাবারে চায়, নইলে বিষম দায়। শুক বলে, কৃষ্ণ আকুল স্বাধীনতা-তরে, শারি বলে, তাইতে রাধার কোটালি সে করে, এই দিনদুপরে। শুক বলে, কৃষ্ণ করেন নারীর উদ্ধার, শারি বলে, নইলে মন পেতো কি রাধার। হত পায়ে ধরা সার। শুক বলে, আমার কৃষ্ণ কোম্ ত তন্ত্র পড়ে, শারি বলে, আমার রাধার পূজা করবে বলে, কোম্ ত রাধাতন্ত্র। শুক বলে, আমার কৃষ্ণ হবে বলন্টিয়ার, শারি বলে, আমার রাধা তাতেও আগুসার, যমুনার ঢেউ দেখেছ। শুক বলে, আমার কৃষ্ণ যোগ শিখিতে চায়, শারি বলে, আমার রাধা মন্ত্রদাতা তায়, সে যে মন্ত্রগুরু। শুক বলে, আমার কৃষ্ণ লেখে নবেল নাটক, শারি বলে, তাতে রাধার গুণেরই চটক, তাই পড়ে পাঠক। শুক বলে, আমার কৃষ্ণ সংকীর্তন গায়, শারি বলে, বিনোদিনী মহাপ্রভু তায়, নইলে ভজবে কেন। কবি বলে, শুকশারির বিবাদ সে অনন্ত যমুনা, গোটা দুই কথা মাত্র দিলাম নমুনা। বলি, লাগলো কেমন? . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| বাউলের গান কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙালীর গান”, কাব্য সংকলন থেকে নেয়া। তপ, জপ, যাগ, যজ্ঞ, কার তরে মন উপবাস। কার তরে তেরো পার্বণ, করিস রে তুই বারো মাস॥ রুক্ষু চুলে গাঁট্টা মাথে, লম্বা নখে ঊর্ধ্ব হাতে, ধুনি জ্বেলে বৃষ কাঠে, গাছতলাতে করিস বাস। কেন ধুনি জ্বেলে বৃষ কাঠে, গাছ তলাতে করিস বাস। ছাই মুখে, চিমটে কাঁধে, গাঁজা টেনে নেকড়া পিঁধে, এমন শ্রী-ছন্ন ছাঁদে পাবি কি তুই শ্রীনিবাস, ভেবেছিস এমন শ্রী-ছন্ন ছাঁদে, পাবি কিরে তুই শ্রীনিবাস। তুমি মানুষের ছেলে, সে মানুষ ভুলে গেলে, মানুষ কি মাটিতে মেলে রঙ্গ দিয়ে কল্লে তরাস। ভোলা মন মানুষ কি কাঠে মেলে, রঙ্গ দিয়ে করলে তরাস। তুই নিজে পয়গম্বর, তোর মাঝে বিশ্বম্ভর, তবে কেন দিগম্বর হয়ে, করিস হা হুতাশ। খ্যাপা মন হয়ে কেন দিগন্বর, করিস রে তুই হা হুতাশ। যে আছে অন্তরে অরে ভাবিস অন্তরে, অন্তরের ধন অন্তর করে করিস রে তল্লাস। বোকা মন অন্তরের ধন অন্তর করিস করিস রে তল্লাস। দেখ যত তপ জপ, কেবল কটভজপ ছেড়ে দে রে লপঝপ, স্থির মনেতে কর বিশ্বাস ; বাচাল মন ছেড়ে দে রে লপঝপ, স্থির মনেতে রাখো বিশ্বাস॥ . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| নববাণিজ্য-গান কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙালীর গান”, কাব্য সংকলন থেকে নেয়া। এ নব বাণিজ্যে ভাই, জীবন খোয়াই। হিসাব করিয়া দেখি, কী দিয়া কী পাই॥ কাঞ্চন বদলে কাচ পাইনু, পৈঁছার বদলে চুড়ি। মুকুতা বদলে শুকতি পেলাম, হীরার বদলে নুড়ি॥ পট্টবাস বদলে পাটের ছালটি, রুমাল বদলে রেপার। কাশ্মীরি বদলে কাশ্মীরা মিলেছে, ঘুনসির বদলে কার॥ কাঁচা দুধ বদলে চা-দুধ চলেছে, মিষ্টান্ন বলে কেক। চাপাটি বদলে পাঁউরুটি বাসি, বাঁটুলা বদলে ডেক্॥ মৃগের বদলে মুরগি চলেছে, দধির বদলে চাটনি। পলান্ন বদলে মাংস-ঘি-ভাত, গল্পের অভাবে খুট্ নি॥ দয়া ধর্ম বদলে দেহ ধর্ম আছে, দান দিয়া নাম করা। সৌজন্য বদলে সামান্যে ঘৃণা, গৌরাঙ্গের পা ধরা॥ সাহস বদলে সাপট পাইনু হর্ষের বদলে হাসি। কর্তৃত্ব বদলে, বক্তৃত্ব পেয়েছি, কাজে লঘু, মুখে বহুভাষী॥ পাণ্ডিত্য বদলে ভাণ্ডিত্য পেয়েছি, শিক্ষার বদলে শিখা। বেদাঙ্গ বদলে, বিড়ম্বনা আছে, মূলের বদলে টীকা॥ গাম্ভীর্য বদলে, দাম্ভিক্য পেয়েছি, জ্ঞান বদলে গর্ব। সারল্য বদলে তারল্য মিলেছে, দীর্ঘের বদলে খর্ব॥ আগমতন্ত্র দিয়া আগস্ট কন্তু পানু, কিন্তু নাম মাত্র। বিদ্যার বদলে বাদ হতেছে সমান শিক্ষক ছাত্র॥ যজন বদলে যাজন হতেছে, দক্ষিণা বদলে ভিক্ষা। ইষ্ট গুরু বদলে ইষ্টুপিট জুটেছে, উপদেশ বদলে দীক্ষা॥ স্বাস্থ্যের বদলে রাস্তা পেয়েছি, জোরের বদলে জ্বর। তস্কর বদলে টেক্সের দারোগা, সঙ্গে আসেসর॥ বিষয় বদলে বিচার মিলেছে, বৈভব বদলে টাইটেল। মান বদলে নাম গেজেটে, কিংবা মামলা লাইবেল॥ গৃহস্থলি বদলে পাকস্থলী বুঝেছি, স্বজন পরিজন ভূলি। ভিক্ষা না দিয়া শিক্ষা দিয়া থাকি, খেটে খাও দূর হও বুলি॥ গৃহিণী বদলে গহনা ভিখারি, ভায়ের বদলে শালা। কুটুন্ব বদলে কুপোষ্য জুটেছে, ব্যভারে ঝালাপালা॥ সংগীত বদলে সংগত আছে, তানলয় বদলে তাল। আমোদ বদলে মদেরই বোতল, জ্ঞান খোয়ায়ে গাল॥ নমস্কার বদলে আবিষ্কার হয়েছে, মাথা নাড়ানাড়ি। আলিঙ্গন বদলে হস্তকম্পন, পঞ্জা নড়ানাড়ি॥ ক্ষমতা বদলে সমতা হয়েছে, সমান মিছরি মুড়ি। রক্ষক বদলে ভক্ষক জুটেছে, (দেয়) পণের বদলে বুড়ি॥ পঞ্চায়ত বদলে লাঞ্ছনা হয়েছে, জজের গোলাম জুরি। শাসন বদলে, শোষণ চলেছে, দেহি দেহি ভূরি॥ রাজত্ব বদলে বাণিজ্য হয়েছে, কোটির বদলে লক্ষ। অযুত বদলে নিযুত লইয়া ভান্ডার ভরিছে যক্ষ॥ সর্বস্ব বদলে সভ্যতা পেয়েছি, চক্ষু থাকিতে অন্ধ। কঙ্কণ বদলে অক্ষয় গাইছে, কাব্যের বদলে ছন্দ॥ . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |