কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকারের কবিতা
*
আগমনি
কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার।
১৯০৫ সালে প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙালীর গান”, কাব্য সংকলন থেকে নেয়া।

(মহড়া)
গিরিরাজ হে জামায়ে আনিও মেয়ের সঙ্গে।
মেয়ের যেরূপ মন, মায়ে বোঝে যেমন,
পুরুষ পাষাণ তুমি, বুঝ না তেমন,
তাই শিবের নাম করি, আমার নাম ধরি
উপহাস করিতেছ রঙ্গে॥

(চিতেন)
আমি ভুলি নাই আরবারের কথা,
মায়ের মনে আমি মা হয়ে দিয়েছি ব্যথা,
উমা এল বাহির দুয়ারে,
কোলে করি ত্বরা করে জিজ্ঞাসি উমারে,
“আমার শিব তো আছেন ভালো”।
উমা বলে “আছেন ভালো” চোখে দেয় অঞ্চল,
বলে 'চোখে কী হলো, আমার চোখে কী হলো'।
আমি বুঝিনু সকল, কেন চোখে দেয় অঞ্চল,
হিয়ের জল ঝিয়ের চখে উথলিল।

(অন্তরা)
আমি ভুলি নাই আর বারের কথা,
সরমে মরমের কথা, হিয়েয় আছে গাঁথা,
কার্তিকে রাখিয়া বুকে, নাচায় গৌরী থেকে থেকে,
সোনার কার্তিক তোমায় দেখে, উঠে চমকে।
বলে তোমায় দেখিয়ে, “মা ওমা ওকে দাঁড়ায়ে,"
উমা বলে 'তোমার দাদা ওই,
বাবা, আমার বাবা অই।'
বাপ সোহাগে বাপের ছেলে,
জড়িয়ে মায়ের ধরে গলে,
বলে “মা আমার বাবা কই”,
বলে “কেন এলো না, ওমা বলো না”
বলে, কেশে ধরে টানে, উমা চাহি আমার পান
বলে, “কেন এলো না, তোমার দিদি জানে,
আমি সেই অবধি, সরমে, মরমে আছি মনোভঙ্গে”

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভগবতী ভারতী
কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার।
১৯০৫ সালে প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙালীর গান”, কাব্য সংকলন থেকে নেয়া।

॥ ভৈররী - ত্রিতালী॥

পুরাকালের কথা পুরাতন অতি.
স্মরিতে সকলে,                           করি হে মিনতি।
হিমালয় পাশে,                               নিরালয় বাসে,
একান্ত রাখি মন, পতি প্রতি।
নারায়ণ রাগে,                              আপন সোহাগে,
গাহিল ভারতী ভগবতী॥
হেলায়ে পড়েছে দেহ,                 এলায়ে পড়েছে কেশ,
সাদরে পদযুগ রাখে সতী।
পতিপদে দৃষ্টি,                              রাখি করে সৃষ্টি,
কত তাল লয় সঙ্গতি॥
কাল ব্যাপিয়ে,                             তান আলাপিয়ে,
বাজাল ত্রিতন্ত্রী দেবী ভারতী।
হৃদয়ে রহিল,                                  ত্রিতন্ত্রী ধারা,
জাহ্নবী যমুনা সরস্বতী॥
ওংকার নাদে,                                 গম্ভীর খাদে,
ধরম করম কহে ভাগীরথী।
মধ্যম গ্রামে,                                 প্রেমরস নামে,
যমুনা করিল ধীরগতি॥
শাস্ত্রতত্ত্ব জ্ঞানে,                           উচ্চ মধুর তানে,
বহিল বাণী বেগবতী॥
ত্রিধারা বহিয়ে,                             প্রয়াগে মিশিয়ে,
মিলাল জ্ঞান ধরম ভকতি॥
দৃষদ্বতী পারে,                                সরস্বতী ধারে,
ব্রহ্মর্ষি সবে ব্রহ্মমতি।
পরম ব্রহ্ম গানে,                            চরম ধর্ম জ্ঞানে,
জগতে দেখাল পরম মুকতি॥

(সত্য কালের কথা)
জাহ্নবী-ধারে                             গোমুখী হরিদ্বারে,
কঙ্খল, কনোজ, হস্তিনা বসতি।
ধর্ম কর্ম যাগে,                               শঙ্গ ঘণ্টারবে,
পতিত পাবনী ভাগীরথী॥

(ত্রেতা যুগের কথা)
যমুনা জীবনে,                              মথুরা বৃন্দাবনে,
পূর্ণব্রহ্ম সনে হলাদিনী শকতি।
বেণু বংশী গানে,                        প্রেম ভকতি তানে
যমুনা করিল উজান গতি॥
(দ্বাপর যুগের কথা)
আহা কী বিভ্রাটে,                           ভারত ললাটে,
চক্র ঘুরাইল নিয়তি।
কুরুক্ষেত্র যোগে,                            রক্ত বালু মাঝে
বিলুপ্ত হইল সরস্বতী॥
শস্ত্র শাস্ত্র জ্ঞান,                             হইলা অন্তর্ধান,
বাজিল মূর্খতা ভীরুতা সংহতি।
জ্ঞান বিনা ধরম,                           জ্ঞান বিনা প্রেম,
নীরস কর্কশ অধোগতি॥
সরস্বতী ধার,                          বহে না হৃদয়ে আর,
ত্রিবেণি দ্বিবেণি পরিণতি।
ছিন্ন তন্ত্রী লয়ে,                             অশ্রু বিসর্জিয়ে,
ওই শুনো কাঁদে মাতা ভাবতী॥
পুরাতন যন্ত্রে,                               ছিন্ন জ্ঞান তত্রে,
আর কি হয় রে স্বর-সঙ্গতি॥
ধরিতে ধর্মগান,                      ভুলে রে ভকতি তান,
জ্ঞান পঞ্চম বিনে দুর্গতি॥
বক্ষে বহে দ্বিধারা,                       চক্ষে বহে দ্বিধারা,
সর্বাঙ্গে বহে রে স্রোতস্বতী।
আপন বিরাগে,                               করুণার রাগে,
ঝরনার মতো ঝুরে ভারতী॥
থাকো রে সুসন্তান,                   কাখোরে মায়ের মান
প্রেম ধর্ম করো জ্ঞানের যুকতি।
সারি দেহযন্ত্র,                                জুড়ি দেহতন্ত্র,
হৃদয়ে বহাও পুন সরস্বতী॥
আবার একান্তে,                            পতি পদপ্রান্তে,
বসিয়া মাতা স্থিরমতি।
নারায়ণ রাগে,                            পূর্বের সোহাগে,
গাহুক ভগবতী ভারতী॥

.               ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শুকশারি-সংবাদ
কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার।
১৯০৫ সালে প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙালীর গান”, কাব্য সংকলন থেকে নেয়া।

শুক বলে, আমার কৃষ্ণ রোজগারি ছেলে,
শারি বলে, আমার রাধায় গয়না দিবে বলে,
রোজগার কীসের লাগি।
শুক বলে, আমার কৃষ্ণের চশমা শোভে নাকে,
শাহি বলে, আমার রাধায় খুঁটিয়ে দেখবার পাকে,
নইলে পরবে কেন?
শুক বলে, আমার কৃষ্ণের দাড়ি দোলায়িত,
শারি বলে, আমার রাধার চিরুনি-চালিত,
নইলে জটা হত।
শুক বলে, আমার কৃষ্ণের চেন ঝলমল,
শারি বলে, আমার রাধার গোটেরই নকল,
কেবল এ পিট ও পিট।
শুক বলে, আমার কৃষ্ণের আলবার্ট টেড়ি,
শারি বলে, আমার রাধার সিঁথির অনুকারী,
টেড়ি পেলে কোথা।
শুক বলে আমার কৃষ্ণ কভু হ্যাটকোটধারী,
শারি বলে, রাধার তখন ঘেরাল ঘাঘরি,
সে যে রাই নাগরী।
শুক বলে, আমার কৃষ্ণ সাম্যগীতি গায়,
শারি বলে, আমার রাধায় ভুলাবারে চায়,
নইলে বিষম দায়।
শুক বলে, কৃষ্ণ আকুল স্বাধীনতা-তরে,
শারি বলে, তাইতে রাধার কোটালি সে করে,
এই দিনদুপরে।
শুক বলে, কৃষ্ণ করেন নারীর উদ্ধার,
শারি বলে, নইলে মন পেতো কি রাধার।
হত পায়ে ধরা সার।
শুক বলে, আমার কৃষ্ণ কোম্ ত তন্ত্র পড়ে,
শারি বলে, আমার রাধার পূজা করবে বলে,
কোম্ ত রাধাতন্ত্র।
শুক বলে, আমার কৃষ্ণ হবে বলন্টিয়ার,
শারি বলে, আমার রাধা তাতেও আগুসার,
যমুনার ঢেউ দেখেছ।
শুক বলে, আমার কৃষ্ণ যোগ শিখিতে চায়,
শারি বলে, আমার রাধা মন্ত্রদাতা তায়,
সে যে মন্ত্রগুরু।
শুক বলে, আমার কৃষ্ণ লেখে নবেল নাটক,
শারি বলে, তাতে রাধার গুণেরই চটক,
তাই পড়ে পাঠক।
শুক বলে, আমার কৃষ্ণ সংকীর্তন গায়,
শারি বলে, বিনোদিনী মহাপ্রভু তায়,
নইলে ভজবে কেন।
কবি বলে, শুকশারির বিবাদ সে অনন্ত যমুনা,
গোটা দুই কথা মাত্র দিলাম নমুনা।
বলি, লাগলো কেমন?

.               ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কত নিদ্রা যাবে মা গো রাজরাজেশ্বরী
কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার।
১৯০৫ সালে প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙালীর গান”, কাব্য সংকলন থেকে
নেয়া।

॥ ললিত - ঠেকা॥

কত নিদ্রা যাবে মা গো রাজরাজেশ্বরী!
ভোগচক্ষু মেলো মা গো রোগ পরিহরি॥
চৌদিকে সন্তানগণ, স্তন্য বিনা ক্ষুণ্ণমন,
শ্রীমুখ নেহারে সবে যুগ যুগ ধরি ;
উঠো উঠো জগন্মাতঃ করো গো কটাক্ষপাত,
রক্ষো রক্ষো রক্ষাকর্ত্রি ভারত-ঈশ্বরি॥

.               ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আকাশের কোলে ওই নব জলধর
কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার।
১৯০৫ সালে প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙালীর গান”, কাব্য সংকলন থেকে
নেয়া।

আকাশের কোলে ওই নব জলধর,
কেমন নয়নভরা রূপ মনোহর
তোরা যাবি ওর কাছে, যাবি যদি আয়,
আঁকাবাঁকা দেহখানি ওই দেখা যায়।
কাছে গেলে জলধর দিবে জলধার,
তৃষিত তাপিত হিয়া জুড়াবে সবার।
কত রামধনু সবে দিবে হাতে হাতে,
তোরা যাবি যদি আয়, আমাদের সাথে।
আকাশের কোলে ওই নব জলধর,
কেমন নয়ন-ভরা রূপ মনোহর॥

.               ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ওরে আকাশের পাখি, কেন চাস জল
কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার।
১৯০৫ সালে প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙালীর গান”, কাব্য সংকলন থেকে
নেয়া। কবির ১৮৮০ সালে প্রকাশিত “গোচারণের মাঠ” কাব্যগ্রন্থের গান।


ওরে আকাশের পাখি, কেন চাস জল,
আশেপাশে জলধর (তোর) করে ঢলঢল,
শুনিয়াছি তুই নবঘনবারি বিনা,
আর কোনো বারি তুই পান করিবি না।
তবে কেন বার বার চাস তুই জল,
হিয়াতে বাজে রে, হই পরান বিকল।
মরা মানুষের কথা মনে পড়ে, পাখি,
বিঁধো না হৃদয়ে আর বার বার ডাকি।
তোর কি জলের দুখ ও ফটিক জল,
আশে পাশে জলধর (তোর) করে ঢলঢল॥

.               ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
“যে যাবার সে যাউক", পুরবিতে বলে
কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার।
১৯০৫ সালে প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙালীর গান”, কাব্য সংকলন থেকে
নেয়া। কবির ১৮৮০ সালে প্রকাশিত “গোচারণের মাঠ” কাব্যগ্রন্থের গান।

“যে যাবার সে যাউক", পুরবিতে বলে,
আমি তো যাব না কভু যমুনারই জলে।
যমুনার জলে আমি ছায়া দেখিয়াছি,
সে অবধি যমুনার কূল ছাড়িয়াছি ;
ছায়ার মায়ার বলে হই আনমনা,
যে যাবে সে যাক জলে, আমি তো যাব না॥

.               ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বাউলের গান
কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার।
১৯০৫ সালে প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙালীর গান”, কাব্য সংকলন থেকে নেয়া।

তপ, জপ, যাগ, যজ্ঞ, কার তরে মন উপবাস।
কার তরে তেরো পার্বণ, করিস রে তুই বারো মাস॥
রুক্ষু চুলে গাঁট্টা মাথে, লম্বা নখে ঊর্ধ্ব হাতে,
ধুনি জ্বেলে বৃষ কাঠে, গাছতলাতে করিস বাস।
কেন ধুনি জ্বেলে বৃষ কাঠে,
গাছ তলাতে করিস বাস।
ছাই মুখে, চিমটে কাঁধে,
গাঁজা টেনে নেকড়া পিঁধে,
এমন শ্রী-ছন্ন ছাঁদে পাবি কি তুই শ্রীনিবাস,
ভেবেছিস এমন শ্রী-ছন্ন ছাঁদে,
পাবি কিরে তুই শ্রীনিবাস।
তুমি মানুষের ছেলে, সে মানুষ ভুলে গেলে,
মানুষ কি মাটিতে মেলে রঙ্গ দিয়ে কল্লে তরাস।
ভোলা মন মানুষ কি কাঠে মেলে,
রঙ্গ দিয়ে করলে তরাস।
তুই নিজে পয়গম্বর, তোর মাঝে বিশ্বম্ভর,
তবে কেন দিগম্বর হয়ে, করিস হা হুতাশ।
খ্যাপা মন হয়ে কেন দিগন্বর,
করিস রে তুই হা হুতাশ।
যে আছে অন্তরে অরে ভাবিস অন্তরে,
অন্তরের ধন অন্তর করে করিস রে তল্লাস।
বোকা মন অন্তরের ধন অন্তর করিস
করিস রে তল্লাস।
দেখ যত তপ জপ, কেবল কটভজপ
ছেড়ে দে রে লপঝপ, স্থির মনেতে কর বিশ্বাস ;
বাচাল মন ছেড়ে দে রে লপঝপ,
স্থির মনেতে রাখো বিশ্বাস॥

.               ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নববাণিজ্য-গান
কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার।
১৯০৫ সালে প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙালীর গান”, কাব্য সংকলন থেকে নেয়া।

এ নব বাণিজ্যে ভাই,                 জীবন খোয়াই।
হিসাব করিয়া দেখি, কী দিয়া কী পাই॥
কাঞ্চন বদলে                             কাচ পাইনু,
পৈঁছার বদলে চুড়ি।
মুকুতা বদলে                          শুকতি পেলাম,
হীরার বদলে নুড়ি॥
পট্টবাস বদলে                         পাটের ছালটি,
রুমাল বদলে রেপার।
কাশ্মীরি বদলে                     কাশ্মীরা মিলেছে,
ঘুনসির বদলে কার॥
কাঁচা দুধ বদলে                       চা-দুধ চলেছে,
মিষ্টান্ন বলে কেক।
চাপাটি বদলে                        পাঁউরুটি বাসি,
বাঁটুলা বদলে ডেক্‌॥
মৃগের বদলে                            মুরগি চলেছে,
দধির বদলে চাটনি।
পলান্ন বদলে                           মাংস-ঘি-ভাত,
গল্পের অভাবে খুট্ নি॥
দয়া ধর্ম বদলে                        দেহ ধর্ম আছে,
দান দিয়া নাম করা।
সৌজন্য বদলে                           সামান্যে ঘৃণা,
গৌরাঙ্গের পা ধরা॥
সাহস বদলে                              সাপট পাইনু
হর্ষের বদলে হাসি।
কর্তৃত্ব বদলে,                          বক্তৃত্ব পেয়েছি,
কাজে লঘু, মুখে বহুভাষী॥
পাণ্ডিত্য বদলে                      ভাণ্ডিত্য পেয়েছি,
শিক্ষার বদলে শিখা।
বেদাঙ্গ বদলে,                          বিড়ম্বনা আছে,
মূলের বদলে টীকা॥
গাম্ভীর্য বদলে,                        দাম্ভিক্য পেয়েছি,
জ্ঞান বদলে গর্ব।
সারল্য বদলে                          তারল্য মিলেছে,
দীর্ঘের বদলে খর্ব॥
আগমতন্ত্র দিয়া                     আগস্ট কন্তু পানু,
কিন্তু নাম মাত্র।
বিদ্যার বদলে                              বাদ হতেছে
সমান শিক্ষক ছাত্র॥
যজন বদলে                             যাজন হতেছে,
দক্ষিণা বদলে ভিক্ষা।
ইষ্ট গুরু বদলে                         ইষ্টুপিট জুটেছে,
উপদেশ বদলে দীক্ষা॥
স্বাস্থ্যের বদলে                          রাস্তা পেয়েছি,
জোরের বদলে জ্বর।
তস্কর বদলে                          টেক্সের দারোগা,
সঙ্গে আসেসর॥
বিষয় বদলে                           বিচার মিলেছে,
বৈভব বদলে টাইটেল।
মান বদলে                               নাম গেজেটে,
কিংবা মামলা লাইবেল॥
গৃহস্থলি বদলে                        পাকস্থলী বুঝেছি,
স্বজন পরিজন ভূলি।
ভিক্ষা না দিয়া                       শিক্ষা দিয়া থাকি,
খেটে খাও দূর হও বুলি॥
গৃহিণী বদলে                             গহনা ভিখারি,
ভায়ের বদলে শালা।
কুটুন্ব বদলে                            কুপোষ্য জুটেছে,
ব্যভারে ঝালাপালা॥
সংগীত বদলে                            সংগত আছে,
তানলয় বদলে তাল।
আমোদ বদলে                         মদেরই বোতল,
জ্ঞান খোয়ায়ে গাল॥
নমস্কার বদলে                      আবিষ্কার হয়েছে,
মাথা নাড়ানাড়ি।
আলিঙ্গন বদলে                              হস্তকম্পন,
পঞ্জা নড়ানাড়ি॥
ক্ষমতা বদলে                           সমতা হয়েছে,
সমান মিছরি মুড়ি।
রক্ষক বদলে                            ভক্ষক জুটেছে,
(দেয়) পণের বদলে বুড়ি॥
পঞ্চায়ত বদলে                          লাঞ্ছনা হয়েছে,
জজের গোলাম জুরি।
শাসন বদলে,                           শোষণ চলেছে,
দেহি দেহি ভূরি॥
রাজত্ব বদলে                           বাণিজ্য হয়েছে,
কোটির বদলে লক্ষ।
অযুত বদলে                              নিযুত লইয়া
ভান্ডার ভরিছে যক্ষ॥
সর্বস্ব বদলে                          সভ্যতা পেয়েছি,
চক্ষু থাকিতে অন্ধ।
কঙ্কণ বদলে                             অক্ষয় গাইছে,
কাব্যের বদলে ছন্দ॥

.               ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পূর্ণিমায় বংশীরব
কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার।
১৯০৫ সালে প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙালীর গান”, কাব্য সংকলন থেকে
নেয়া।

॥ রাসের গানের সুর॥

সুধাপানে সুধাকর, আজি অকাতর,
বিমানে বহিল বন্যা, তরতরতর।
চঞ্চল তারকায় করে টলমল,
ঝিমিকি ঝিমিকি ডুবে, উঠে ঝলমল,
মজিল জগৎ বুঝি সুধার বন্যায়---
বাহুতে বল্লরি ধরি তরু শিহরায়।
চল্লিয়া সুধার বন্যা যমুনার জলে,
শতধা গরবি চাঁদ নাচি নাচি চলে।
কাঁপে জল, কাঁপে বন, কাঁপে সমীরণ,
বুঝিরে বুঝিরে কাঁপে অই বৃন্দাবন।
না না --- অই গরজ গতীর সব স্থির স্থির স্থির
বাঁশি বায় শ্যাম রায় ধীরি ধীরি ধীর,
সারি গামা পাধা নিসা ফুকে ফুকে বাঁশি,
পূরিণিমা রাধে নিশা শরতের আজি,
আজি কাত্যায়নী ব্রত হবে উযাপন
ব্রত ভুলি ঘুমে ঢুলি আছো কী কারণ।
সারি গামা পাধা নিশা গামা সারি পাধা
শারদিম ব্রত নিশা কাঁহা তুহু রাধা।
বাঁশি বায় শ্যাম রায় ধীরি ধীরি ধীর,
অই গরজে গভীর সব স্থির স্থির স্থির।
তিষ্ঠো তিষ্ঠো নষ্ট চন্দ্র আকাশে ওইখানে,
ডুবেছে সুধার বন্যা বংশীরব তানে।
কালামুখী কালিন্দী তু ছাড় রঙ্গ ভঙ্গ।
নিচল নিথর গুণ সুতান তরঙ্গ
না কাঁপো, না কাঁপো লতা, না শিহর তরু,
অভয় দিতেছে বংশী ভয় কী রে অরু।
(তখন হল) স্থির বন, সমীরণ যমুনার জল,
না নড়ে গাছের পাতা লতিকা নিচল।
চাঁদোয়ার গায়ে আঁকা চন্দ্রমা যেমন,
নীল গগনে স্থির চন্দ্র রহিল তেমন।
টিপিটিপি হাসি হাসি নক্ষত্রনিচয়,
আঁখিকোণে কহে কথা সভয়ে অভয়।
(তখন) বংশীতে পুরিল ঘর পুন শ্যামরায়
নিধুবন কানন রে আয় আয় আয়।
তখন বংশীকণা ব্রজাঙ্গনা চলে বৃন্দাবনে,
শ্যামপাগলিনি সবে শ্যামদরশনে।
জড় পাপী নাহি পারে ত্যজিতে শয়ন,
নয়ন মুদিয়া ভাবি সে বংশী-বয়ন॥

.               ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভারতীর রোদন
কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার।
১৯০৫ সালে প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙালীর গান”, কাব্য সংকলন থেকে
নেয়া।

॥ ভৈরবী - একতালা॥

অবোধ সন্তান তুই করিস রে আবদার '
না বুঝিলি নিজ দশা দুর্দশা আমার।
ব্রহ্মার তনয়া আমি, নারায়ণ মম স্বামী,
মহাকাল কোপে এবে পাই রে সংহার॥
ব্রহ্মার মানস-সরে, শ্বেতপদ্ম থরে থরে
পদ্মবনে হংস সনে করেছি বিহার।
এখন এ কালিদহে, কালি অঙ্গে রক্ত বহে,
চারি দিকে কালসর্প, গর্জে অনিবার॥
নারায়ণ পদ সেবি, ধরায় আছিনু দেবী,
আদরের আদরিণী ছিলাম সবার।
কী পাপে পাপিনী আমি, শ্রীপদে ঠেলিল স্বামী,
নাহি জানি ভালো মন্দ কপাল আমার॥
শিরে বসি মহাজন, লয় যত রত্ন ধন,
শূন্য সব ধান্য গোলা, ত্রিশূন্য ভান্ডার।
তবু তো রে ক্ষান্ত নহে, অঙ্গের শোণিত চাহে,
নিজস্ব সর্বস্ব দিয়ে নাহিরে নিস্তার॥
বসন ভূষণ নাই, অঙ্গে ধুলা মাটি ছাই,
রুক্ষ কেশে হয়েছে রে শিরে জটা ভার।
উৎসবের ছড়াছড়ি এখন তোমার॥
থরেথরে ফুলমাল উড়াও নিশান লাল,
বাদ্যভাণ্ড গণ্ডগোল কর অনিবার।
করিস উৎসব মেলা, খেলিস যে কীবা খেলা,
এই কী সময় বাছা তোর খেলিবার?
শত্রু মুখে দিয়ে ছাই, তোর মুখ পানে চাই,
বয়সের চিহ্ন সব দেখিয়ে তোমার।
এমন কপাল মোর, না হইল জ্ঞান তোর,
না বুঝিলি দুঃখদশা এ দুঃখিনী মার॥

.               ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর