কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকারের কবিতা
*
ভারতবর্ষ
কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার
১২৮১ বঙ্গাব্দে (১৮৭৪ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “শিক্ষানবিশের পদ্য” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

.     শ্মশানে শায়িত দেখ সদ্যঃ মরা দেহ,
প্রাণপাখী পলায়েছে, আছে শূন্য গেহ,
বিপদ বিরাম যাতে যাতনার শেষ,
সেইকাল কলেবরে করেছে প্রবেশ,
করাল কবল কিস্ত পারেনি এখন
সুন্দর শরীর শোভা করিতে হরণ ;
দেখিয়াছ---দেহে কিবা দিব্য শোভা সাজে,
---শান্তির উজ্জ্বল কান্তি মুখচন্দ্র মাঝে ;
---শক্তশির, রক্তহীন, তাহাতে বিকল,
তথাপি কপোল ভাব কেমন কোমল ;
দেখিলে এরূপ রূপ মনে এই লয়,
জীবিত মানব ইহা শব দেহ লয় ;
ক্ষণে ক্ষণে বলে উঠে হৃদয় কাতর
.     নৃশংস শমন তোর বৃথা আড়ম্বর।
মিছা মায়ামোহ হায়! কতকক্ষণ রয়
মুদিত নয়ন দেয় শোক পরিচয়,
আলোকপলকহীন এবে দে লোচন,
কোণেতে কটাক্ষ নাই, না! করে ক্রন্দন,
ভুরূভঙ্গি ভাঙ্গিয়াছে ভীষণ শমন,
নিভায়েছে নয়নাগ্নি,---শীতল এখন,
নিষ্ঠুর নয়ন ভাব ভাবিয়া কেবল
দুঃখিত দর্শক হয় হৃদয়ে বিহ্বল,
দেখিবারে যেই দশা মন নাহি চায়,
নিস্তেজঃ নয়ন তাই মনেতে জাগায়।
মরণে মানব দেহ দৃশ্য চমত্কার
সুন্দর, কোমল, কিবা শাস্তির আধার,
সেই ভাব ভারতের এবে বিদ্যমান,
ভারত বিখ্যাত বলি, বটে অহঙ্কার,
জীবন্ত ভারত মাতা নহে কিন্তু আর !!

------------------------

.     শীতল সুন্দর শোভা ভরা মিষ্টরস,
মরণেও রমণীয় ভারত বরষ ;
দরশনে শোকসহ উথলে অন্তর,
প্রাণবায়ু নাই তার কিসের সুন্দর?
নিশ্বাসে গিয়াছে প্রাণ আভা যায় নাই,
শব দেহ শোভা সব হেরিতে না চাই ;
ফুল্ল ফুল তুল্য শোভা অথচ ভীষণ,
শ্মশান সাজন্ত, কিন্তু নাহি চায় মন ;
অস্তমিত প্রাণসূর্য্য, তাহার কিরণে
দেহ ঘন সুরঞ্জিত লোহিত বরণে,
স্বর্ণছটা চারিদিকে নাচিয়া বেড়ায়,
দেহ পাশে মন যেন মাগিছে বিদায় ;
স্বর্গীয় সৌন্দর্য্য এই আলোক আধার,
অমল অনল আভা অদ্যাপি ইহার
উজলিয়া রাখে বটে এই রম্য স্থান,
না পারে জাগাতে কিন্তু করি তেজোদান।

------------------------       

.     সিন্ধুহতে ব্রহ্মপুত্র হিন্দুস্থান ভূমি !
অবিস্মৃত অগণিত বীর প্রসূ তুমি !
স্বাধীনতাবেদী ছিলে সুখপীঠ স্থান,
গৌরব কবর এবে, অসুখ আধান ;
আর্য লোক বাস বলি আর্য্যাবর্ত্তনাম,
তব গরিমার বুঝি এই পরিণাম !
.    ওহে স্বাধীনতা পুত্র, এবে পরাধীন !
( দেহেতে দুর্ব্বল অতি মানস মলিন, )
পথশ্রান্ত ওহে পান্থ, সুধাই তোমায়,
শিখরী শেখরে অই, কিবা দেখা যায়?
রাজপুত রাজধানী চিতোর নগর?
পদ্মিনী সতীত্ব পদ্ম প্রকাশের সর?
অই কি উদয়পুর রাণা রাজধানী?
যোধপুর যোধপুর বেষ্টিত বনানি?
জয়সিংহ জয়চিহ্ন জয়পুর অই?
সফলিত সমভাবে, স্বাধীনতা কই?

-------------------------

.     সুবিখ্যাত রাজবারা মানবমণ্ডল,
ভারত হৃদয় ক্ষেত্র---রণ রঙ্গ স্থল,
উঠ উঠ রাজপুত্র ! নিশা অবসান,
মাতার কোলেতে বসি কর স্তন পান,
পিতৃগণ চিতা হতে ক্ষার লহ গিয়া,
দুর্ব্বলতা দূর কর দেহেতে মাখিয়া,
সেই ভস্ম ঢাকা আছে পূত ধনঞ্জয়,
তাপে পাবে তেজোবল জাগিবে হৃদয়।
রুষিয়া রুষিয়া আসে আসিয়ার মাঝে,
লুণ খেয়ে গুণ মান রাখহ ইংরাজে ;
বিষম আক্রম হতে করিবারে ত্রাণ,
সাধিবারে স্বাধীনতা যদি যায় প্রাণ,
ছুটিবে চৌদিকে তব যশঃ পরিমল ;
প্রাচীন ক্ষত্রিয় নাম হইবে উজ্জ্বল ;
বাড়িবে তোমার গুণে পিতৃ পুণ্যবল ;
কম্পিবে তোমার নামে দুর্দ্দান্ত সকল ;
সন্তান পাইবে নাম অমুল্য রতন,
যশো আশা করি তাহা করিবে স্মরণ ;
শমন সদন যাত্রা করিবে স্বীকার,
কলঙ্ক নাদিবে তবু সে নামে তোমার ;
আহবে আহত পিতা তাহার বচন
পারে কি সন্তান কভু করিতে লঙ্ঘন?
স্বাধীনতা সাধনক সংগ্রাম সাগর,
সত্য বটে সেতু নাই, নিস্তরি দুস্তর,
বার বার হাতে পারে তাহাতে মগন,
সাহসে করিয়া ভর কর সন্তরণ,
পর পারে পাবে পুরী অতি সুখকর,
সুন্দর বন্দর নাম “বিজয় নগর”।
.     ভারত তোমার কীর্ত্তি হয় নাহি লয়,
অনাদি অনন্ত-কাল দেয় পরিচয় ;
অঙ্গার বরণ অঙ্গ মিসর ভূপতি
(কেবা জানে নাম তার? কোথায় বসতি?)
করেছে নির্ম্মাণ কীর্ত্তি করিতে অক্ষয়
পরবত পরিমিত পিরামিড চয় ;
ভারতভূমির কীর্ত্তি সর্ব্বভুক কাল
করিয়াছে গ্রাস মিলি কবল করাল ;
তবু আছে বীরগণ বিক্রমের স্থল,
প্রকৃতির পিরামিড পর্ব্বত সকল ;
দেখায়ে দুর্গম দুর্গ বিদেশী বান্ধবে
ভারতে ভারতী বলে শোক পূর্ণ রবে,---
“চমকে চাহিছ বাছা। চারি দিকে হের
মরণ স্মরণ চিহ্ন অমর নরের।”

-----------------------

স্বাধীনতা স্বর্ণকণ্ঠী কাড়িয়া যখন
যবন পরালে পায়ে নিগড় বন্ধন,
দূরে গেল খ্যাতি মান পড়িল প্রমাদ ;
লিখিতে লেখনী রোয়, বর্ণিতে বিষাদ।
না পারে মানস বল নাশিতে যবন,
আপন করম ফলে হারালে সে ধন ;
নিজ নীচাশয় দোষে হইল পতন,
শোষক শাসক তাই করিছে দলন।

---------------------  

হে ভারত! পান্থ করি বক্ষে বিচরণ
কি পায় দেখিতে বল গৌরব লক্ষণ?
পুরাণ কাহিনী মত সুন্দর আখ্যান,
কোন কবি পারে বল করিতে ব্যাখ্যান?
বাল্মীকির বীণা, আর বালকের স্বর,
না মোহে, না দহে, আর শ্রীরাম অন্তর !
রামরাজ্যে রামচন্দ্র না দেখিতে পাই !
তপোবনে সে বাল্মীকি আর এবে নাই !
সে বীণা নীরব এবে না করে হুঙ্কার !
অযোধ্যায় যোদ্ধা নাই, বীরের হুঙ্কার !
ভাস্কর আচার্য্য নাই, নাহি সে শঙ্কর,
শঙ্করকিঙ্কর সবে ভারত ভিতর !
নাহি করে চন্দ্রগুপ্ত ভারত উদ্ধার,
নাহি লেখে মাতৃগুপ্ত “শকুন্তলা” আর ;
ভোজ, পুরু, শিলাদিত্য-শ্রীহর্ষবর্দ্ধন,
শূন্য করি চলিগেছে রাজ সিংহাসন ;
শূন্য বন, সিংহাসন, পুড়েছে কপাল,
শূন্য কোষ ঝুলিতেছে, নাহি করবাল ;
ভুলোকে আলোক নাই, ঘোর অন্ধকার,
ভারতে ভারত নাই, কিছু নাই আর !!

দেশ উপযোগী ছিল সন্তান সকল,
এবে সেই সন্তানের কিবা আছে বল?
আছিল ব্রাহ্মণ জাতি তেজঃ পুঞ্জ দেহ,
ফলাহার, জলপান, গিরি গুহা গেহ ;
হৃদে ধরি ব্রহ্মতেজ, করে ধরি অসি,
করিয়াছে ক্ষত্র কূল কীর্ত্তি মহীয়সী ;
(এবে) হ্রাস পেয়ে দাস ভাবে কাটে বারমাস,
দাস ত মাথার মণি দাস-অনুদাস !
সূতিকা ত্যজিয়া ক্রমে শ্মশানে চিতায়
কৃমি মত চিরদিন কিলি বিলি যায় ;
হিতাহিত বোধ শূন্য বিবেক বিহীন,
পাপেতে বিশেষ পটু মনেতে মলিন ;
মানব গৌরব লোপী, মোহ মূর্ত্তিমান,
রিপু বশীভূত হিন্দু পশুর সমান ;
বন্য বন মানুষের গুণ হৃদে নাই,
স্বাধীন, সাহসী নর দেখিতে না পাই ;
পৃথিবীর জাতি মাঝে সুমহত খ্যাতি,
শোর্য্য বীর্য্য বলহীন অতি ভীরু জাতি ;
চাতুরি মাধুরি দেখ সর্ব্বত্র প্রচার,
সুচতুর হিন্দু জাতি সুনাম ইহার !

------------------------   
   
স্বাধীনতা দেবতার গম্ভীর বচন
পারেনা নিদ্রিত চিত জাগাতে এখন ;
ভাঙ্গিয়াছে ঘাড় বোঝা বয়ে অবিরত,
কেবা আর পারে বল করিতে উন্নত?
বিষ হীন আশীবিষ এবে যে এখন,
ফণা তুলে পুনঃ আর করে কি গর্জ্জন?
বৃথায় বিলাপ মোর অরণ্যে রোদন,
শোকের সাগর আর কি কাজ মন্থন?
পাঠক পুঞ্জের-প্রতি শেষ নিবেদন,
প্রলাপ বচন বলি না কর হেলন,
শুনিলে এসব কথা শোক যদি হয়,
লিখিতে কেঁদেছে কিনা লেখক হৃদয়?

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সাগর
কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার
১২৮১ বঙ্গাব্দে (১৮৭৪ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “শিক্ষানবিশের পদ্য” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

.     সুনীল গভীর সিন্ধো কল্লোলিয়া চল,
লক্ষ পোত বক্ষে তব বৃথা ভাসি যায় !
ধরাধাম ধ্বংশ করে মানবের বল,
নর গরিমার সীমা সাগর বেলায় ;
না থাকে আঁচড় কভু তব নীল কায় ;
তব কীর্ত্তি তব অঙ্গে ; মানব যখন
সহসা সাগর গর্ভে বৃষ্টি বিন্দু প্রায়
হাবু ডুবু খেয়ে ডোবে, কেবল তখন
সে দেহ বহন করে? কে করে দহন?
কে বা হরিবোল বলে? কে করে ক্রন্দন?

----------------------        

না চলে চরণ তার তব পথোপরি,
তব জল তল বল কে করে হরণ?
ধরাধ্বংশী নরবলে উপহাস করি,
তুলিয়া তরঙ্গ তুঙ্গ করি আস্ফালন,
ঊর্দ্ধ করি তুলি তারে গগন প্রাঙ্গণ,
দূর করে দেহ তারে করিয়া আঘাত,
ডাকিতে, কাঁপিতে থাকে, করয়ে রোদন,
তবু আশা নাহি ছাড়ে, তুলি দুই হাত
ঈশ্বর নিকট যাচে আশ্রয় নির্ব্বাত,
পুনঃ উত্থা, পুনঃ ধাক্কা,---পপাত---নিপাত॥

----------------------     

.     যেই যুদ্ধ তরিব্রজ বজ্রসম দম্ভে
প্রস্তর গঠিত পুরী পাড়ে কাঁপাইয়া,
সিংহাসনে রাজা টলে, প্রজাপুঞ্জ কম্পে,
কাটিয়া বিশাল শাল জাহাজ গঠিয়া,
গর্ব্বে নাম ধরে নর তাহাতে চড়িয়া,
“সংগ্রাম শাসক” কিন্বা “সাগর ঈশ্বর,”
তুমি লীলা খেলা কর সে সব পাইয়া ;
বিন্ব মত নাশ করে তরঙ্গ নিকর ;
---যেই তরঙ্গের ভঙ্গে নগর, প্রান্তর,
আম, গোষ্ঠ, গিরি, গুহা, যায় যম ঘর।---

---------------------------              

.     ইরাণ, তুরাণ, রোম, ভারত, আরব,
তব তীরে কত রাজ্য, কোথায় এখন?
স্বাধীন আছিল যবে মহা রাজ্য সব,
তখনো যেমন ছিলে এখনো তেমন ;
বনবাসী, কি বিদেশী, কিম্বা ক্রীত জন,
এবে দেখ তব তটে সবে নরপাল,
রাজার ভবন এবে বিজন কানন ;
তোমার বিকার শুদ্ধ তরঙ্গ বিশাল ;
বলিত না করে কাল তব নীল ভাল,
আদ্যাবধি এক ভাবে চল চির কাল ।

----------------------------             

আকুলিত বক্ষঃ যবে প্রবল পবনে,
প্রশান্ত হৃদয় কিম্বা মন্দ বায়ু বলে,
ঈশ্বর প্রতিমা শোভে প্রজ্বল দর্পণে ;
তুষার মণ্ডিত মেরু, কিম্বা উষ্ণ স্থলে,
অদৃশ্যের সিংহাসন তব নীল জলে ;
অসীম, অনম্ত, তুমি ! বিশীল হৃদয় ;
তোমারি পল্লব হাত গঠিত সকলে
তিমি, তিমিঙ্গিল আদি জল জন্তু চয় ;
সর্ব্বস্থানে সর্ব্বকালে তব জয় জয় !!
একাকী, অতল স্পর্শ, বিভরিত-ভয়।

------------------------              

.     ভালবাসি ওহে সিন্ধো ! তোমার তরঙ্গে,
তব ক্রোড়ে বাল্য খেলা করিয়াছি কত !
উত্তুঙ্গ তরঙ্গভঙ্গে নাচিতাম রঙ্গে,
ভাসিতাম তব জলে জল বিম্ব মত,
আজীবন সন্তরণ মম মনোগত ;
তোমার তরঙ্গ তুঙ্গ আনন্দ আধান ;
ভয়াবহ তবাবহ হইলে আহত,
ভাসিত আনন্দে মাত্র তোমার সন্তান ;
বিনা ভয়ে দূরে গিয়ে পাইয়াছি ত্রাণ,
ধরিলাম জটা তব---সঁপিলাম প্রাণ।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নারী
কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার
১২৮১ বঙ্গাব্দে (১৮৭৪ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “শিক্ষানবিশের পদ্য” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

প্রণয় পবিত্র পাশ,                 তাহে পরিণয় ফাঁশ,
দম্পতির বাড়ে অনুরাগ ;
সতত সানন্দ মনে,                   যেন গৃহ পূর্ণ ধনে,
এক যোগে করে জপঃযাগ।
গুণে মনে অনুপমা                  বিশ্বাসী বান্ধব সমা
পুরুষের অর্দ্ধ অঙ্গ নারী ;
ধন, ধর্ম্ম, ভোগ সুখ,                 সব হেরে সেই মুখ,
স্বর সুখ সহবাস তারি।
নারী নর-সধর্ম্মিণী,                   পুত্র কন্যা প্রদায়িনী,
গৃহকর্ম্মে নিপুণা গৃহিণী ;
প্রাণ হতে আনুরক্তি,             প্রভু ভাবি করে ভক্তি,
হৃষ্ট মনে আজ্ঞানুপালিনী ;
অমিয় কোমল কথা               হরে হিয়েমনো ব্যথা,
জননীর সমা স্নেহবতী ;
ধর্ম্ম কর্ম্ম-সুসাধনে,                 কিন্বা দেব আরাধনে,
পিতা সম শিক্ষা দেয় সতী।
জীবন কণ্টক বন,                    কষ্ট তাহে পর্য্যটন,
পরম আনন্দ কিন্তু তায়,
শোক শান্তি প্রদায়িণী,                  সুসহায় সুসঙ্গিনী,
নারী রূপে ধরা দেবী যদি বামে যায়।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
একদিন
কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার
১২৮১ বঙ্গাব্দে (১৮৭৪ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “শিক্ষানবিশের পদ্য” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

.     দুখেতে ভরিল বুক, শোকেতে অন্তর,
নয়নে দেখিনু কত দৃশ্য মনোহর ;
শীতমূর্ত্তি শীত কাল, আবৃত নীহার জাল,
যেন কালান্তক কাল, আসিল আপনি,---
কালে দেখি শত অন্ত, ভ্রমিছে নব বসম্ত,
মিলিয়া কুসুমদন্ত, হাসিছে ধরণী,
শীত গ্রীষ্ম গেছে মম অনর্থ চিন্তায়,
এখন কাঁদিয়া আর কিবা ফল হায় !!

------------------------      

.     স্বপন সমান সব---কখন কি ঘটে !
পুনরায় দেখা দিল কল্পনার পটে,
নিশানাথ নিশাসনে, হাসিতেছে হৃষ্ট মনে,
খেলিছে যেন গগনে, সুধার লহরী,
ক্ষণে দেখি জলধর, ঢাকিয়াছে শশধর,
অন্ধকারে চরাচর, ডুবিয়াছে মরি !
দুখেতে ভরিল বুক, শোকেতে অন্তর,
নয়নে দেখিনু পুন দৃশ্য মনোহর,

--------------------------                   

অনন্ত সংসার মাঝে জীবন কানন,
কষ্টের কণ্টক তাহে, সুখের সুমন,
আজি ধনবাদ্যময়, বেষ্টিত বান্ধবচয়,
সুখময় সমুদয়, প্রফুল্ল অন্তর,
কালি আর কিছু নাই, বন্ধু জন ঠাই ঠাই,
মাগিলে না ভিক্ষা পাই, ক্ষুধায় কাতর ;
অনুতাপে পরিপূর্ণ হল মম মন,
মিছা কাজে করিয়াছি সময় যাপন।

---------------------------          

এত কাল পরে আর ভাবিলে কি হয়?
আলস্যো গিয়াছে মম সোণার সময় ;
কালের কৌশলে হয়, সৃজন পালন লয়,
কাল ত অলস নয়, আমিই অলস,
প্রথমে অঙ্কুর হল, গাছেতে পল্লব দল,
ক্রমেতে ধরিল ফল, কালেতে সুরস ;
এই কাল করিয়াছি শুদ্ধ ছেলে খেলা ;
না বুঝিয়া নিজ কাজ করিয়াছি হেলা !

--------------------------            

অনুতাপ করি আর কিবা প্রয়োজন?
পাইব পরম ধন করিলে যতন ;
ঋতু পিছে ঋতু ধায়, দিন আছে রাত যায়,
এইরূপ সমুদায় ঘুরে অবিরাম,
চিরদিন এক ভাবে, @@ @@ নাহি যাবে,
কিছুদিন পরে পাবে সুখময় ধাম ;
এতকাল কাটায়েছি বিষয় চিন্তায়,
জীবন যাপন এবে ধর্ম্মের সেবার।

@@ @@ - অপাঠ্য শব্দ।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হাসি কান্না
কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার
১২৮১ বঙ্গাব্দে (১৮৭৪ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “শিক্ষানবিশের পদ্য” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

(বর্ষায়)
মলিন ভুবন কেন বিসাদে বিকল?
ধরাধর বরষিছে কেন আঁখি জল?
কাছে গঙ্গা ভরাজলে, কিনারায় টলটলে,
প্রবল পবন বলে কেন করে কল কল?
কূলেতে কদম্ব গাছে বিহঙ্গ বসিয়া আছে,
নাহি গায় নাহি নাচে, কেন ভয়েতে বিহ্বল?
পর পারে দৃষ্টি হয়, সব অন্ধকার ময়,
সহে বৃষ্টি তরুচয়, নীরবে নিচল !
এই যে চাহিল রবি, ধরাধরে নব ছবি,
পুলকে বলিছে কবি বলিহারি কল !
কাঁদে বিশ্ব কাঁদি আমি, হাসিনু হাসালে তুমি,
হানিকান্না পূর্ণভূমি, তোমারি কৌশল!

-------------------------          

(শীত ঋতু রাতি শেষে )
মনোহর রাতি কাল শরদের অন্তে,
নীরব ভুবন পূর্ণ অপূর্ব হেমন্তে ;
নির্ম্মল অম্বরে নাই কুয়াসার ছটা,
কলঙ্ক কালিমা নাই, নাহি ঘন ঘটা ;
পূর্ণিমা গরিমা গর্ব্বে পূর্ন শশধর
সুনীল অন্বরগর্ভে চলে গর গর ;
সর্ব্বংসহা দেবী দেখি মত্ত নিশানাথে,
ধীরভাবে করপাত সহিতেছে মাথে,
স্পন্দহীনা বসুন্ধরা, না করে হুতাশ,
নাহি নাড়ে অঙ্গ, দেবী না ছাড়ে নিশ্বাস,
অভিমানে ধরণীর আঁখি ছল ছল,
নীরবে বিরল বিন্দু ঝরে আঁখি জল ;
হিন্তাল, তমাল, তাল, বনরাজিগণ,
মাতার কোলেতে-বসি করিছে রোদন ;
কাছেতে কোলের কন্যা গঙ্গা ভয় পায়,
কল কল নাহি করে কোলে কোলে যায় ;
উপরে তারকাগণ নীরবে বিচারে,
মলিন মহীর দুখে বলিতে না পারে,
সকলি বিমর্ষ যেন অথচ সুছন্দ,
শীতঋতু রাতিশেষে বিষাদে আনন্দ।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর