গোচারণের মাঠ কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার ১২৮৭ বঙ্গাব্দে (১৮৮০ খৃষ্টাব্দ) চুঁচুড়া থেকে সাধরণী প্রেসে মুদ্রিত ও প্রকাশিত, “গোচারণের মাঠ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। এই গ্রন্থের অনুশীর্ষগুলি (sub-heading) কবিতার মধ্যে না দিয়ে বেজোড় সংখ্যার পৃষ্ঠাগুলির উপরে মাঝখানে দেওয়া রয়েছে। প্রতিটি জোড় সংখ্যার পৃষ্ঠার উপরে গ্রন্থের নাম “গোচারণের মাঠ” দেয়া রয়েছে। আমরাও এখানে তা কবিতার মাঝে মাঝে না দিয়ে পাশে পাশে দিয়েছি, গ্রন্থের পৃষ্ঠাসংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।
অমল শামল তৃণ ঢাকা ধরাতল, বহু দূর ভরপুর সবুজ কেবল ; অতিদূরে সমুখেতে রহিয়াছে কত, থাক্ থাক্ , কাল কাল, ধোঁয়া ধোঁয়া মত, ছোট ছোট শৈল-মালা আকাশের গায়, নিবিড় মেঘের মত বেশ দেখা যায়। বামেতে আকাশ আসি পরশিছে মাটী, হরিতে মিলেছে নীল অতি পরিপাটী ; উপরে আকাশ-পট কেমন সুনীল, সাঁই সাঁই পাখা ছাড়ি ভেসে যায় চীল। পিছনে বসতি ঘর, বাগান, সরাই, পোঁতা উচা চালা ঘর, পালুই, মরাই। সুগভীর সরোবরে ঢাকিয়াছে জল, কমলের পাতা আর কলমীর দল ;
মাথায় বটের চূড়া সেকেলে দেউল, ॥ গোচারণের মাঠ॥ আশে পাশে অনাদরে, পুরাণ তেঁতুল ; বেউড় বাঁশের ঝাড় মাথা নোয়াইয়া, কট্ কট্ রব করে থাকিয়া থাকিয়া। নিকটে বিটপী বট নিবিড়, অসাড়, গট হয়ে বসে যেন গাছের পাহাড়। অতিশয় উঁচু পাড়ে তিন সারি তাল, আধ ভাঙা বাঁধা ঘাট, চৌচীর চাতাল। ডাহিনে গহন বন---নীরব, বিশাল, এক পদে যোগ সাধে কত শত শাল ; পাছে কেহ গোল করে, এই ভয়ে তারা, সারি সারি তাল-তরু রেখেছে পাহারা। যোগ সাধনের কাল রাতি পোহাইল, সোণার দুয়ার খুলি ঊষা দেখা দিল ; পবন বলিল মৃদু সবাকার কাছে, ঊষা দেখা দিল আর, ঘুমাতে কি আছে? যোগীদের পাহারায় তাল আছে খাড়া, দেহ ঝাড়ি, মাথা নাড়ি, দিল তারা সাড়া ; তালপাতা অসি তুলি ঝনাৎ করিল, সই রবে শাখীদের সমাধি ভাঙিল।
“ওরে আকাশের পাখী --- কেন চাস্ জল? আশে পাশে জলধর (তোর) করে ঢলঢল ; শুনিয়াছি তুই নব- ঘন বারি বিনা, আর কোন বারি তুই পান করিবি না ; তবে কেন বার বার চাস্ তুই জল? হিয়াতে বাজে রে, হই পরাণে বিকল ; মরা মানুষের কথা মনে পড়ে পাখী, বিঁধ না হৃদয়ে আর বার বার ডাকি ; তোর কি জলের দুখ ও ফটীক জল ! আশে পাশে জলধর (তোর) করে ঢল ঢল।”
পাহাড়ির ঢালু গায়ে চরে গাভী পাল ; ভাগাভাগি দুই দল হুইল রাখাল। একদল কাছে থাকি, দেখিবে গোধন, পাহাড়ে বেড়াতে চলে আর কয় জন। হাতেতে মারিয়া তালি দৌড়িল উধাও, আঁকা বাঁকা পথ ধরি করিছে চড়াও ;'
ছোট ছোট ঝোপ গুলি ডিঙি ডিঙি যায়, ॥ গোচারণের মাঠ॥ চোখ বুজি শশ-শিশু ঝোপেতে লুকায় ; দৌড়িতে দৌড়িতে পদ অবশ হুইল, সমুখের গোপ যুবা হঠাৎ থামিল ; একে একে সবে আসি দাঁড়ায় তখন, ফিরিয়া দেখিল হোথা চরিছে গোধন ; ছাতিম ছায়ায় আছে কয় জন বসি, ঝরণার ধারে আছে--- “হলা”, “রাকা” “শশী” ; “হলারে” বলিয়া ডাক ছাড়িল যুগল, চাহিয়া দেখিল হেথা রাখালের দল। সমুখে পাষাণ-বর, মাথায় টোপর, বিশাল কঠিন দেহ---ভূধর শিখর ; যুগ যুগ শত আছে, সমভাবে খাড়া, নাহি নাড়ে শির, নাহি দেয় দেহ ঝাড়া ; অকাতরে জানু পাতি বলি আছে বীর, দেবতার দিকে মুখ অভয় শরীর ; বরষার কালে কত নব-জলধরে, আশে পাশে ঘুরে বুলে অনুরাগ-ভরে ; চুপি চুপি ঝোপে ঝাপে লুকাইয়া রয়, অভিলাস --- পাহাড়ের সনে কথা কয় ;