কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরীর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
নদীর ধারের লোকটা
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। 'কবিস্বর' পত্রিকায় প্রকাশিত। রচনাকাল ১৯৮৭। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
নদীর ধারে দাঁড়িয়ে লোকটা দেখত
কাঠকুটো, তৃণলতা সব কিছু স্রোতোলীন,
বহমান যেন একই নিয়তির দিকে—
লোকটা লক্ষ করত, এই ভেসে চলার মধ্যে
কোনো ছন্দের স্বাতন্ত্র্য নেই,
এই গড্ডলগতিতে নেই কোন বিশিষ্ট তাৎপর্য !
সবাই ঝাঁপ দেয় আর হাবুডুবু খায়—
পারে দাঁড়িয়ে লোকটি কাটিয়ে দেয় সারা সকাল,
তার মনের ভেতর ওঠে নানা কুট প্রশ্নের বুদ্বুদ --
মাথার মধ্যে খেলে বেড়ায় ঐতিহ্য ও ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক হাওয়া।
এভাবেই সে পারে দাঁড়িয়ে নিজের জন্য বিশিষ্ট ভঙ্গিমা তৈরি করে,
ভাবে, সে যদি স্রোতে ঝাঁপ দেয় কখনও,
তবে উজানে যেতে না পারলেও বজায় রাখবে কিঞ্চিৎ তির্যকতা।
এরপর শেষ দুপুরে লোকটা হাতে হলদে সূতো বেঁধে
শেষ পর্যন্ত স্রোতে ঝাঁপ দিল আর সবারই মতো।
জলের মধ্যে এখন প্রচন্ড ঘূর্ণিপাক—
দেখা যাক সে ভেসে ওঠে কোন্ বিশিষ্ট ভঙ্গিমায় –
বহমান গড্ডলতার মধ্যে সৃষ্টি হয় কি না নূতন কোনো বিমূর্ত শিল্প।
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। 'কবিস্বর' পত্রিকায় প্রকাশিত। রচনাকাল ১৯৮৭। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
নদীর ধারে দাঁড়িয়ে লোকটা দেখত
কাঠকুটো, তৃণলতা সব কিছু স্রোতোলীন,
বহমান যেন একই নিয়তির দিকে—
লোকটা লক্ষ করত, এই ভেসে চলার মধ্যে
কোনো ছন্দের স্বাতন্ত্র্য নেই,
এই গড্ডলগতিতে নেই কোন বিশিষ্ট তাৎপর্য !
সবাই ঝাঁপ দেয় আর হাবুডুবু খায়—
পারে দাঁড়িয়ে লোকটি কাটিয়ে দেয় সারা সকাল,
তার মনের ভেতর ওঠে নানা কুট প্রশ্নের বুদ্বুদ --
মাথার মধ্যে খেলে বেড়ায় ঐতিহ্য ও ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক হাওয়া।
এভাবেই সে পারে দাঁড়িয়ে নিজের জন্য বিশিষ্ট ভঙ্গিমা তৈরি করে,
ভাবে, সে যদি স্রোতে ঝাঁপ দেয় কখনও,
তবে উজানে যেতে না পারলেও বজায় রাখবে কিঞ্চিৎ তির্যকতা।
এরপর শেষ দুপুরে লোকটা হাতে হলদে সূতো বেঁধে
শেষ পর্যন্ত স্রোতে ঝাঁপ দিল আর সবারই মতো।
জলের মধ্যে এখন প্রচন্ড ঘূর্ণিপাক—
দেখা যাক সে ভেসে ওঠে কোন্ বিশিষ্ট ভঙ্গিমায় –
বহমান গড্ডলতার মধ্যে সৃষ্টি হয় কি না নূতন কোনো বিমূর্ত শিল্প।
*********************
শরচ্ছবি
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। রচনাকাল ১৯৮৮। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
কখনও দরজা খুলতেই চোখে পড়ে, আমার জন্য যেন অপেক্ষা করে আছে শরৎকাল, তার নিপাট শান্তি, নিকোনো উঠোনের নির্ঝঞ্ঝাট ছবি— যেন আবহমান কাল ধরেই পটে আঁকা ছিল, দরজা খুলেই হঠাৎ চোখে পড়ে গেল আমার!
ইতিহাসের নানাপর্বে আমার পূর্বপুরুষেরা যেন তৈরি করেছিলেন এই শান্তির ছবি, এই শরৎকাল! বইয়ের পাতার মতোই একসাথে নানাযুগের পিতাদের জীবনের প্রাপ্তির, চরিতার্থতার ও প্রাজ্ঞ প্রশান্তির মিলিত যোগফল বলে মনে হয় এই ছবিটাকে। বর্ষণক্ষান্তির পরেপরেই আকাশ-ধোওয়া রোদ বেরিয়ে পড়লেও মনে হয়, এই ছবিটা যেন আগে থেকেই তৈরি হয়েছে নানা যুগে তিলেতিলে, বৈশ্য সমাধি থেকে বিক্রমাদিত্য——— সবারই দান আছে এই দৃশ্যরচনায়। যে রাজা মৃগয়ায় বের হতেন শুভঋতুতে, যে সব শ্রেষ্ঠী সপ্তডিঙা নিয়ে পাল তুলতো সমুদ্রে, যে ব্যাধের দীন আঙিনায় হাজির হতেন ছদ্মবেশী মহাদেবী তার দুঃখের বারোমাস্যা শুনতে, মৈত্রীকরুণার বাণীপ্রচারে বেরোতেন যেসব শ্রমণ, যে ঢাকীর সম্বৎসরের অপেক্ষা শহুরে পূজোকমিটির বাবুদের শারদীয় ডাক পাবার জন্য, তার দাওয়ার নিরালা কোণে খাঁচায় ঝোলানো টিয়াপাখিটি, অথবা নাগরিক উৎসবের হুল্লোড় থেকে ছুটির বোলপুরে স্বেচ্ছানির্বাসিত, শারদজ্যোৎস্নায় একাকী অবগাহনে মাতোয়ারা একেশ্বরবাদী সেই কবি কিংবা হুতোমের নকশার সেই ছুটিতে বাড়ি ফেরা শহুরে বাবুটি, কিংবা নির্জন নদীতীরে উদার আকাশের নীচে কাশবনের পাশে একাকিনী ঘুঁটেকুড়োনি— কংসনারায়ণ থেকে কৃষ্ণচন্দ্ৰ সবারই মিলিত স্বাক্ষরে গড়া এই ছবি যেন এক যৌথ ইশতাহার! মাঝেমধ্যে মেঘের ঘষাকাচের পর্দা সরে গেলে আমি এই ছবি দেখতে পাই, যা প্রবহমান নিস্তরঙ্গ শান্তির মতো, মনে হয়। এখনই হয়তো ভেসে আসবে দূরাগত ঢাকের শব্দ।
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। রচনাকাল ১৯৮৮। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
কখনও দরজা খুলতেই চোখে পড়ে, আমার জন্য যেন অপেক্ষা করে আছে শরৎকাল, তার নিপাট শান্তি, নিকোনো উঠোনের নির্ঝঞ্ঝাট ছবি— যেন আবহমান কাল ধরেই পটে আঁকা ছিল, দরজা খুলেই হঠাৎ চোখে পড়ে গেল আমার!
ইতিহাসের নানাপর্বে আমার পূর্বপুরুষেরা যেন তৈরি করেছিলেন এই শান্তির ছবি, এই শরৎকাল! বইয়ের পাতার মতোই একসাথে নানাযুগের পিতাদের জীবনের প্রাপ্তির, চরিতার্থতার ও প্রাজ্ঞ প্রশান্তির মিলিত যোগফল বলে মনে হয় এই ছবিটাকে। বর্ষণক্ষান্তির পরেপরেই আকাশ-ধোওয়া রোদ বেরিয়ে পড়লেও মনে হয়, এই ছবিটা যেন আগে থেকেই তৈরি হয়েছে নানা যুগে তিলেতিলে, বৈশ্য সমাধি থেকে বিক্রমাদিত্য——— সবারই দান আছে এই দৃশ্যরচনায়। যে রাজা মৃগয়ায় বের হতেন শুভঋতুতে, যে সব শ্রেষ্ঠী সপ্তডিঙা নিয়ে পাল তুলতো সমুদ্রে, যে ব্যাধের দীন আঙিনায় হাজির হতেন ছদ্মবেশী মহাদেবী তার দুঃখের বারোমাস্যা শুনতে, মৈত্রীকরুণার বাণীপ্রচারে বেরোতেন যেসব শ্রমণ, যে ঢাকীর সম্বৎসরের অপেক্ষা শহুরে পূজোকমিটির বাবুদের শারদীয় ডাক পাবার জন্য, তার দাওয়ার নিরালা কোণে খাঁচায় ঝোলানো টিয়াপাখিটি, অথবা নাগরিক উৎসবের হুল্লোড় থেকে ছুটির বোলপুরে স্বেচ্ছানির্বাসিত, শারদজ্যোৎস্নায় একাকী অবগাহনে মাতোয়ারা একেশ্বরবাদী সেই কবি কিংবা হুতোমের নকশার সেই ছুটিতে বাড়ি ফেরা শহুরে বাবুটি, কিংবা নির্জন নদীতীরে উদার আকাশের নীচে কাশবনের পাশে একাকিনী ঘুঁটেকুড়োনি— কংসনারায়ণ থেকে কৃষ্ণচন্দ্ৰ সবারই মিলিত স্বাক্ষরে গড়া এই ছবি যেন এক যৌথ ইশতাহার! মাঝেমধ্যে মেঘের ঘষাকাচের পর্দা সরে গেলে আমি এই ছবি দেখতে পাই, যা প্রবহমান নিস্তরঙ্গ শান্তির মতো, মনে হয়। এখনই হয়তো ভেসে আসবে দূরাগত ঢাকের শব্দ।
*********************
চলে যাওয়া
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। স্মৃতির ছবি। রচনাকাল ১৯৮৮। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
প্রিয়জনেরা বয়ে নিয়ে এসে শুইয়ে দিল তোমাকে
তোমারই বাড়ির সামনে পথের ধারে ...
যে বাড়িতে তুমি ছিলে কর্ত্রী,
আজ যেন সে বাড়ির তুমি কেউ নও--
অব্যবহৃত জিনিসের মতো পথের ধারে বর্জিত!
কিন্তু আমি দেখলাম খড়ের বিছানায় যেন তুমি শিশুর মত ঘুমোচ্ছ,
তোমার খড়গনাসায়, শুভ্ৰ কপোলে বিছিয়ে আছে নিশ্চিন্ত প্রশান্তি
তোমার রঙিন শাড়িতে মোড়া নিস্পন্দ শরীরে খেলা করছে
শেষ বিকেলের পড়ন্ত রোদ!
সেই শরীরটাকে ঘিরে প্রিয়জনেরা দাঁড়িয়ে
নিচু স্বরে প্রার্থনা গান গাইছে....
তোমার স্বামীপুত্রকন্যা, আত্মীয়-স্বজন, বিজাতীয় প্রতিবেশী--
সবাই এসেছে সুদূর যাত্রার পথে তোমাকে বিদায় জানাতে --
যাদের তুমি এতদিন আপ্যায়িত করেছ অমায়িক আত্মীয়তায়!
তাদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমার মনে পড়ল --
একদিন আধোঘুমে টের পেয়েছিলাম আমার কপালে ছুঁইয়েছিলে তোমার করতল....
তাই তোমার সোনার বরণ শরীরের বহ্নিগর্ভ চুল্লীর গহবরে প্রবেশের সময়
মনে হল বাইরের পৃথিবীতে এখনো কত সবুজ...
তার ওঠানামা, লতাগুল্ম ও শিহরণ,
তার ভেতর দিয়েই কত সহজে এই চলে যাওয়া..
মনে হল, সেই পৃথিবীর ধুলোতে, ঘাসে, শিশুদের মাথায়
তুমি রেখে গেছ তোমার হাতের ছোঁয়া...
যখনই ইচ্ছে হবে, তাকে ছুঁয়ে বুঝতে পারব তোমার উপহার।
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। স্মৃতির ছবি। রচনাকাল ১৯৮৮। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
প্রিয়জনেরা বয়ে নিয়ে এসে শুইয়ে দিল তোমাকে
তোমারই বাড়ির সামনে পথের ধারে ...
যে বাড়িতে তুমি ছিলে কর্ত্রী,
আজ যেন সে বাড়ির তুমি কেউ নও--
অব্যবহৃত জিনিসের মতো পথের ধারে বর্জিত!
কিন্তু আমি দেখলাম খড়ের বিছানায় যেন তুমি শিশুর মত ঘুমোচ্ছ,
তোমার খড়গনাসায়, শুভ্ৰ কপোলে বিছিয়ে আছে নিশ্চিন্ত প্রশান্তি
তোমার রঙিন শাড়িতে মোড়া নিস্পন্দ শরীরে খেলা করছে
শেষ বিকেলের পড়ন্ত রোদ!
সেই শরীরটাকে ঘিরে প্রিয়জনেরা দাঁড়িয়ে
নিচু স্বরে প্রার্থনা গান গাইছে....
তোমার স্বামীপুত্রকন্যা, আত্মীয়-স্বজন, বিজাতীয় প্রতিবেশী--
সবাই এসেছে সুদূর যাত্রার পথে তোমাকে বিদায় জানাতে --
যাদের তুমি এতদিন আপ্যায়িত করেছ অমায়িক আত্মীয়তায়!
তাদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমার মনে পড়ল --
একদিন আধোঘুমে টের পেয়েছিলাম আমার কপালে ছুঁইয়েছিলে তোমার করতল....
তাই তোমার সোনার বরণ শরীরের বহ্নিগর্ভ চুল্লীর গহবরে প্রবেশের সময়
মনে হল বাইরের পৃথিবীতে এখনো কত সবুজ...
তার ওঠানামা, লতাগুল্ম ও শিহরণ,
তার ভেতর দিয়েই কত সহজে এই চলে যাওয়া..
মনে হল, সেই পৃথিবীর ধুলোতে, ঘাসে, শিশুদের মাথায়
তুমি রেখে গেছ তোমার হাতের ছোঁয়া...
যখনই ইচ্ছে হবে, তাকে ছুঁয়ে বুঝতে পারব তোমার উপহার।
*********************
ক্রান্তিলগ্নের বিদুর
নিদাঘ পর্ব। মোহিতলাল মজুমদারের জন্মশতবর্ষ স্মরণে। রচনাকাল ১৯৮৯। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
সত্য ও সুন্দর - এই দুটি মাত্র আরাধ্য সংসারে,
হৃদয়রক্ত দিয়ে এ পূজায় চলে না আপোষ --
ভেকধারী ভদ্রতা বা সামাজিকতার দেঁতো হাসির ধার না ধেরে
তাই সে একরোখা গণ্ডার-গোঁ নিয়ে তেড়ে উঠত,
যখনই তার মনে হত সেই পূজার সাত্ত্বিকতায় কোন ব্যাঘাত ঘটেছে!
কীর্তিনাশার কূলে ভাঙা দেউলে বসে
সে শোনাল সোনালী দিনের নবজাগরণের গান,
কিন্তু কারো মরমে পশল না তার সুর!
আদতে সে কিন্তু ছিল আগাপাশতলা প্রেমিক,
রূপের তৃষ্ণা ছিল দুচোখ জুড়ে,
তবু তার ভাগ্যে জুটে গেল চাবুকধারীর ভূমিকা --
অদৃষ্টের এমনই পরিহাস!
বাঙালির জীবনের ক্রান্তিলগ্নে সে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল একাই...
মরণোম্মুখ জাতিকে বাঁচাবার জন্য বিদুরের মতোই অনেকটা --
অবুঝের মত খাড়া রেখেছিল আদর্শের ঝান্ডা,
বোঝেনি যে, বঙ্কিমচন্দ্রের যুগ কবেই হয়েছে গত!
স্বজনসমাজ, বান্ধবমণ্ডলী সকলকে সে দেখেছিল মুখোশ ছাড়িয়ে,
কারণ নিজেকে সে মনে করত সত্যসাধক...
বন্ধুবেশী প্রবঞ্চনার, ভদ্রবেশধারী শঠতার, লৌকিক ভণ্ডামির সেই স্বরূপদর্শন
সে ভুলতে পারল না 'বিস্মরণী'র গান গেয়েও-
অদৃষ্টের এমনই পরিহাস!
নিয়তির এমন ওলটপালট রসিকতা ছিল তার সারা জীবন ভরেই....
সমালোচকের বিশ্লেষণী ছূরিতে সে মানবচরিত্রের ব্যবচ্ছেদ করেছিল,
কিন্তু সে-ছূরিতে তার নিজের হাতও হল রক্তাক্ত!
ভুলতে পারল না বলেই সে উদ্গিরণ করে গেল 'স্মরগরল'...
বাঙালি জাতীয়তার নান্দী উচ্চারণের জন্য
বিশুদ্ধতায় পবিত্রতায় যোগ্যতম ছিল যে-কন্ঠ,
সেই কন্ঠ চিরে গেল বিষাক্ত অভিশাপের তিক্ত উচ্চারণে !
নিজের সংস্কৃতি আর স্বজাতির জন্য যার ছিল স্পর্শকাতর তীব্র গভীর ভালোবাসা,
সমালোচনায় যার ছিল অনুশীলন ও পাণ্ডিত্যের নির্ভুল অভিজ্ঞান,
তারই ছাত্র আজ স্বজাতি-কুৎসার পসরা সাজিয়ে
পরদেশে সস্তা মনীষার বেশ্যাবৃত্তি চালায় --
এটাই বোধ হয় তার অদৃষ্টের সবচেয়ে বড় ঠাট্টা!
*********************
নিদাঘ পর্ব। মোহিতলাল মজুমদারের জন্মশতবর্ষ স্মরণে। রচনাকাল ১৯৮৯। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
সত্য ও সুন্দর - এই দুটি মাত্র আরাধ্য সংসারে,
হৃদয়রক্ত দিয়ে এ পূজায় চলে না আপোষ --
ভেকধারী ভদ্রতা বা সামাজিকতার দেঁতো হাসির ধার না ধেরে
তাই সে একরোখা গণ্ডার-গোঁ নিয়ে তেড়ে উঠত,
যখনই তার মনে হত সেই পূজার সাত্ত্বিকতায় কোন ব্যাঘাত ঘটেছে!
কীর্তিনাশার কূলে ভাঙা দেউলে বসে
সে শোনাল সোনালী দিনের নবজাগরণের গান,
কিন্তু কারো মরমে পশল না তার সুর!
আদতে সে কিন্তু ছিল আগাপাশতলা প্রেমিক,
রূপের তৃষ্ণা ছিল দুচোখ জুড়ে,
তবু তার ভাগ্যে জুটে গেল চাবুকধারীর ভূমিকা --
অদৃষ্টের এমনই পরিহাস!
বাঙালির জীবনের ক্রান্তিলগ্নে সে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল একাই...
মরণোম্মুখ জাতিকে বাঁচাবার জন্য বিদুরের মতোই অনেকটা --
অবুঝের মত খাড়া রেখেছিল আদর্শের ঝান্ডা,
বোঝেনি যে, বঙ্কিমচন্দ্রের যুগ কবেই হয়েছে গত!
স্বজনসমাজ, বান্ধবমণ্ডলী সকলকে সে দেখেছিল মুখোশ ছাড়িয়ে,
কারণ নিজেকে সে মনে করত সত্যসাধক...
বন্ধুবেশী প্রবঞ্চনার, ভদ্রবেশধারী শঠতার, লৌকিক ভণ্ডামির সেই স্বরূপদর্শন
সে ভুলতে পারল না 'বিস্মরণী'র গান গেয়েও-
অদৃষ্টের এমনই পরিহাস!
নিয়তির এমন ওলটপালট রসিকতা ছিল তার সারা জীবন ভরেই....
সমালোচকের বিশ্লেষণী ছূরিতে সে মানবচরিত্রের ব্যবচ্ছেদ করেছিল,
কিন্তু সে-ছূরিতে তার নিজের হাতও হল রক্তাক্ত!
ভুলতে পারল না বলেই সে উদ্গিরণ করে গেল 'স্মরগরল'...
বাঙালি জাতীয়তার নান্দী উচ্চারণের জন্য
বিশুদ্ধতায় পবিত্রতায় যোগ্যতম ছিল যে-কন্ঠ,
সেই কন্ঠ চিরে গেল বিষাক্ত অভিশাপের তিক্ত উচ্চারণে !
নিজের সংস্কৃতি আর স্বজাতির জন্য যার ছিল স্পর্শকাতর তীব্র গভীর ভালোবাসা,
সমালোচনায় যার ছিল অনুশীলন ও পাণ্ডিত্যের নির্ভুল অভিজ্ঞান,
তারই ছাত্র আজ স্বজাতি-কুৎসার পসরা সাজিয়ে
পরদেশে সস্তা মনীষার বেশ্যাবৃত্তি চালায় --
এটাই বোধ হয় তার অদৃষ্টের সবচেয়ে বড় ঠাট্টা!
*********************
মুকুট-কাড়া রানী
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। রচনাকাল ১৯৮৯। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
রক্তে তোমার খেলত যখন দুপুর দিনের জোয়ার,
সেই গুমোরে দেখলে তুমি ধরাকে যেন সরা --
স্ববাসভূমে একতরফা ঘুরিয়ে গেলে ছড়ি,
যারা তোমার স্বজন হত, করলে তাদের প্রজা!
কলজে-ছেঁড়া ধন যেখানে, সেখানে লাগে বুক,
তার বদলে চাবুক হাতে তোমায় দেখেছিলাম!
মনে পড়ে শাসন-শোষণ? ছলচাতুরী? ষড়?
তখন কি আর বুঝেছিলে উল্টে যাবে পাশা!
আজকে তুমি নও কো শুধু মুকুট-কাড়া রানী,
যান্ত্রিকতার শেকল বাঁধা অতীতকালের বালাই;
বুকের থেকে চাবুকটাকেই ভেবেছিলে কাজের,
চিনলে না হায় তাই নিজেরই পায়ের তলার মাটি!
ভেবেছিলে ছেড়ে গিয়ে নিজের আসল বাসা,
এড়িয়ে যাবে ইতিহাসের ক্লাসিক রসিকতা --
তাই কি এলে ভুল ঠিকানায় থাকতে, ষোড়শ লুই
জারের দেশে বেড়াতে এলে যেমন হতো ব্যাপার!
কিন্তু তোমায় উপড়ে নিয়ে কালের কুটিল গতি
ফেলল আবার তাদের কাছেই, ভেবেছ যাদের প্রজা,
যাদের বুকের খোঁজ রাখনি, তাদের হাতেই আজ
ভার পড়েছে তোমার বুকের দোষের চিকিৎসার!
কী হবে আজ অভিশাপে, কপালকে দোষ দিয়ে,
সবার কাছে বিরতিহীন গেয়ে নিজের সাফাই!
সব ট্রাজেডির শুভ্র প্রতীক করুণা টানে বটে,
কিন্তু তাতে মূল বেদনার সুরাহা হয় কিছু?
স্কুল-পলাতক শিশুর মত আঁকড়ে ধরেছিলে
পরবাসের ভুল বিছানা। নিয়তি-রেলগাড়ি
ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমায় -- সাক্ষী আজো আমি
ফেলে গেলে শুধু তোমার শূন্য চোখের চাওয়া!
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। রচনাকাল ১৯৮৯। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
রক্তে তোমার খেলত যখন দুপুর দিনের জোয়ার,
সেই গুমোরে দেখলে তুমি ধরাকে যেন সরা --
স্ববাসভূমে একতরফা ঘুরিয়ে গেলে ছড়ি,
যারা তোমার স্বজন হত, করলে তাদের প্রজা!
কলজে-ছেঁড়া ধন যেখানে, সেখানে লাগে বুক,
তার বদলে চাবুক হাতে তোমায় দেখেছিলাম!
মনে পড়ে শাসন-শোষণ? ছলচাতুরী? ষড়?
তখন কি আর বুঝেছিলে উল্টে যাবে পাশা!
আজকে তুমি নও কো শুধু মুকুট-কাড়া রানী,
যান্ত্রিকতার শেকল বাঁধা অতীতকালের বালাই;
বুকের থেকে চাবুকটাকেই ভেবেছিলে কাজের,
চিনলে না হায় তাই নিজেরই পায়ের তলার মাটি!
ভেবেছিলে ছেড়ে গিয়ে নিজের আসল বাসা,
এড়িয়ে যাবে ইতিহাসের ক্লাসিক রসিকতা --
তাই কি এলে ভুল ঠিকানায় থাকতে, ষোড়শ লুই
জারের দেশে বেড়াতে এলে যেমন হতো ব্যাপার!
কিন্তু তোমায় উপড়ে নিয়ে কালের কুটিল গতি
ফেলল আবার তাদের কাছেই, ভেবেছ যাদের প্রজা,
যাদের বুকের খোঁজ রাখনি, তাদের হাতেই আজ
ভার পড়েছে তোমার বুকের দোষের চিকিৎসার!
কী হবে আজ অভিশাপে, কপালকে দোষ দিয়ে,
সবার কাছে বিরতিহীন গেয়ে নিজের সাফাই!
সব ট্রাজেডির শুভ্র প্রতীক করুণা টানে বটে,
কিন্তু তাতে মূল বেদনার সুরাহা হয় কিছু?
স্কুল-পলাতক শিশুর মত আঁকড়ে ধরেছিলে
পরবাসের ভুল বিছানা। নিয়তি-রেলগাড়ি
ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমায় -- সাক্ষী আজো আমি
ফেলে গেলে শুধু তোমার শূন্য চোখের চাওয়া!
*********************
কবি বিপ্লবীর শতবর্ষে
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। হো চি মিনকে উৎসর্গীকৃত। রচনাকাল ১৯৯১। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
তাবড় তাবড় সব সাম্রাজ্য-গৃধ্নুদের বুটের তলায়
ক্রমান্বয়ে পিষে যাওয়া বিধ্বস্ত একটি জাতিকে
চরিতার্থতার চরম লক্ষ্যে চালনা করতে
তিনি কখনো শীর্ণ দেহে তুলে নিয়েছেন সামরিক উর্দি,
কখনো বা শ্রমিকের জীর্ণ পোশাক;
কিন্তু কারাগারের কঠিন মেঝেতে হোক,
কিংবা শত্রুসংকুল রণভূমে --
তাঁর মনের মধ্যে জেগে থাকত এক কবি,
সব শেকলের ঝনঝনার ওপারে যে-কবি উন্মুখ থাকত
ফুলের সুবাস আর পাখির ডাকের জন্য...
আবার দূর পাহাড়তলিতে গনগনে উনুনের আঁচের সামনে
গম পিষছে যে মেয়েটি,
তার কথাও তাঁর মনে জেগে থাকত,
কারণ সন্তপ্রতিম সেই রাষ্ট্রনায়ক বুঝেছিলেন
জীবন আর মানবতার সঠিক তাৎপর্য!
আমরা বিদ্রোহী কবি অনেক দেখেছি,
নিজের দেশে দেখেছি প্রথম শ্রেণীর রাজবন্দী নায়ককে
জেলখানায় বসে মোটা কেতাব লিখতে
আর কালক্রমে চেপে বসতে অসপত্ন সিংহাসনে....
কিন্তু সেই ক্ষীণতনু দধীচি-হাড়ের মরণপণ সংগ্রামে
প্রথম দেখলাম ইস্পাতের মতো ঝলসে ওঠা কবিতার ছন্দ --
দেখলাম প্রথম কবি-বিপ্লবীকে!
ক্রৌঞ্চমিথুনের বিচ্ছেদ দেখে কাতরহৃদয় বাল্মীকির মতোই
তাঁর প্রাণে জাগত তুচ্ছাতিতুচ্ছ সংবেদনা,
তিনিই বুঝেছিলেন, সহযোদ্ধাদের পথ দেখাতে
কবিরাই তো গাইবে গান!
সেজন্যই তিনি পাহাড় খুঁড়ে সমুদ্র ভরাট করে দেবার
অসম্ভব স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন, অথচ
কবিত্বের চিহ্নস্বরূপ তাঁর বোতামে গোঁজা ছিল না কোনো গোলাপফুল,
তার বদলে ছিল ছাপাখানার তেলকালির বিবর্ণ দাগ!
বস্তুত পিছমোড়া করে বেঁধে আনা এক বন্দীমানুষের ছবি
যখন তিনি কবিতায় এঁকেছিলেন -
সেই জেলখানাতেও যার কানে এসে ঢুকত দোয়েলের সুর,
যার মন ভরে রাখত ফুলের গন্ধ
আর শারদ পূর্ণিমার স্মৃতির সুরভি....
তখন তিনি কিন্তু নিজের কথাই লিখেছিলেন!
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। হো চি মিনকে উৎসর্গীকৃত। রচনাকাল ১৯৯১। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
তাবড় তাবড় সব সাম্রাজ্য-গৃধ্নুদের বুটের তলায়
ক্রমান্বয়ে পিষে যাওয়া বিধ্বস্ত একটি জাতিকে
চরিতার্থতার চরম লক্ষ্যে চালনা করতে
তিনি কখনো শীর্ণ দেহে তুলে নিয়েছেন সামরিক উর্দি,
কখনো বা শ্রমিকের জীর্ণ পোশাক;
কিন্তু কারাগারের কঠিন মেঝেতে হোক,
কিংবা শত্রুসংকুল রণভূমে --
তাঁর মনের মধ্যে জেগে থাকত এক কবি,
সব শেকলের ঝনঝনার ওপারে যে-কবি উন্মুখ থাকত
ফুলের সুবাস আর পাখির ডাকের জন্য...
আবার দূর পাহাড়তলিতে গনগনে উনুনের আঁচের সামনে
গম পিষছে যে মেয়েটি,
তার কথাও তাঁর মনে জেগে থাকত,
কারণ সন্তপ্রতিম সেই রাষ্ট্রনায়ক বুঝেছিলেন
জীবন আর মানবতার সঠিক তাৎপর্য!
আমরা বিদ্রোহী কবি অনেক দেখেছি,
নিজের দেশে দেখেছি প্রথম শ্রেণীর রাজবন্দী নায়ককে
জেলখানায় বসে মোটা কেতাব লিখতে
আর কালক্রমে চেপে বসতে অসপত্ন সিংহাসনে....
কিন্তু সেই ক্ষীণতনু দধীচি-হাড়ের মরণপণ সংগ্রামে
প্রথম দেখলাম ইস্পাতের মতো ঝলসে ওঠা কবিতার ছন্দ --
দেখলাম প্রথম কবি-বিপ্লবীকে!
ক্রৌঞ্চমিথুনের বিচ্ছেদ দেখে কাতরহৃদয় বাল্মীকির মতোই
তাঁর প্রাণে জাগত তুচ্ছাতিতুচ্ছ সংবেদনা,
তিনিই বুঝেছিলেন, সহযোদ্ধাদের পথ দেখাতে
কবিরাই তো গাইবে গান!
সেজন্যই তিনি পাহাড় খুঁড়ে সমুদ্র ভরাট করে দেবার
অসম্ভব স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন, অথচ
কবিত্বের চিহ্নস্বরূপ তাঁর বোতামে গোঁজা ছিল না কোনো গোলাপফুল,
তার বদলে ছিল ছাপাখানার তেলকালির বিবর্ণ দাগ!
বস্তুত পিছমোড়া করে বেঁধে আনা এক বন্দীমানুষের ছবি
যখন তিনি কবিতায় এঁকেছিলেন -
সেই জেলখানাতেও যার কানে এসে ঢুকত দোয়েলের সুর,
যার মন ভরে রাখত ফুলের গন্ধ
আর শারদ পূর্ণিমার স্মৃতির সুরভি....
তখন তিনি কিন্তু নিজের কথাই লিখেছিলেন!
*********************
শিশুস্তোত্র - ১
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। নতুন শিশুর আগমনে। রচনাকাল ১৯৯৫। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
গ্রহান্তরের অদেখা জাদুকর
হঠাৎ এসে অপ্রস্তুত মাটিতে
পুঁতে দিলো বুদ্ধিমত্তা-বীজ
সে গল্প তো শোনাই আছে আগে !
তোর উদয়ও তেমনভাবেই কিনা,
মুগ্ধ মনে ভেবেছি কখনও,
সত্যি বলতে আজও যে জানিনা
এতে আমার হাত ছিল কি কোনও !
স্রষ্টা আমিই ব্যাকরণের মতে ?
হবেও বা! এ-তথ্য তবুও
ঢেউ তোলেনা তেমন আমার মাথায়,
শুধু দেখি তোর এই লীলাখেলা !
স্বয়ম্ভূ তুই, সাধ্য কি রে আমার
গড়ি এমন জটিল রঙ্গশালা,
তুই যা দেখাস, দ্রষ্টা আমি তারই –
তুইই বরং স্রষ্টা এই ভুবনের ।
নিজের খেয়াল, নিজের চমক দিয়ে
অবলীলায় খেলাস আমাদের -
নিজস্ব তোর অভিব্যক্তি আর
নিজস্ব তোর আজব শব্দকোষ !
মগ্ন থাকিস তুরীয় কোন নেশায়,
আমরা সে-মদ জোগাইনি নিশ্চিত,
মায়ার দড়ি বেঁধে যেন তুই
আমাদেরই খেলাস এবং জিত
তোরই, কারণ অবুঝ অবাধ তোর
খেলাগুলোয় যতই এ সমাজের
চেনা পোষাক পরিয়ে দিতে চাই --
খুলে হাসিস উলঙ্গ সম্রাট !
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। নতুন শিশুর আগমনে। রচনাকাল ১৯৯৫। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
গ্রহান্তরের অদেখা জাদুকর
হঠাৎ এসে অপ্রস্তুত মাটিতে
পুঁতে দিলো বুদ্ধিমত্তা-বীজ
সে গল্প তো শোনাই আছে আগে !
তোর উদয়ও তেমনভাবেই কিনা,
মুগ্ধ মনে ভেবেছি কখনও,
সত্যি বলতে আজও যে জানিনা
এতে আমার হাত ছিল কি কোনও !
স্রষ্টা আমিই ব্যাকরণের মতে ?
হবেও বা! এ-তথ্য তবুও
ঢেউ তোলেনা তেমন আমার মাথায়,
শুধু দেখি তোর এই লীলাখেলা !
স্বয়ম্ভূ তুই, সাধ্য কি রে আমার
গড়ি এমন জটিল রঙ্গশালা,
তুই যা দেখাস, দ্রষ্টা আমি তারই –
তুইই বরং স্রষ্টা এই ভুবনের ।
নিজের খেয়াল, নিজের চমক দিয়ে
অবলীলায় খেলাস আমাদের -
নিজস্ব তোর অভিব্যক্তি আর
নিজস্ব তোর আজব শব্দকোষ !
মগ্ন থাকিস তুরীয় কোন নেশায়,
আমরা সে-মদ জোগাইনি নিশ্চিত,
মায়ার দড়ি বেঁধে যেন তুই
আমাদেরই খেলাস এবং জিত
তোরই, কারণ অবুঝ অবাধ তোর
খেলাগুলোয় যতই এ সমাজের
চেনা পোষাক পরিয়ে দিতে চাই --
খুলে হাসিস উলঙ্গ সম্রাট !
*********************
শিশুস্তোত্র- ২
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। সদ্য পিতৃহারা কিশোরকে দেখে। রচনাকাল ২০০৩। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
ঘরের মধ্যে চাপা বিলাপ,
বাইরে প্রবীণগণের আলাপ,
পায়ের নিচে কাঁপছে কি তোর
ভূঁই?
এর মধ্যেই ভীষণ একা
গাছের তলায় দাঁড়িয়ে খোকা,
আধেক অবোধ, আধেক কিশোর
তুই!
আগুন ঢালা আকাশ মাথায়
বাতাস-হারা গাছের পাতায়
দূর হবে কি দাবদাহ তোর
আজ!
জানিস কি তুই অবোধ ওরে,
ঘর উড়েছে দামাল ঝড়ে,
পড়েছে ওই গাছের ওপর
বাজ ?
আমরা সবাই মুখোশধারী
একটা কাজই করতে পারি
সমাজবিধি পালন করা,
তাই
চন্দন আর ধুনো ঢেলে
তোর হাতে আজ বাচ্চা ছেলে
ধরিয়ে দিলাম বালতি ভরা
ছাই।
চিতার রক্ত আভায় কঠোর
লাগছে কি আজ মুখখানা তোর,
বুঝে গেছিস এই কাজে তোর
হক।
পরে যদি লড়াই বাঁধে,
তার দায় তোর পলকা কাঁধে
চাপিয়ে দিয়ে আমরা যে
দর্শক।
ওই চিতাতে পুড়ল অতীত,
নিরাপত্তার স্বপ্নের ভিত,
মুছল রে জীবন থেকে
শৈশব--
নচিকেতার মতন ওরে,
'যম জাঙালের বক্র মোড়ে'
দাঁড়ানো তোর রূপ দেখে
এই স্তব!
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। সদ্য পিতৃহারা কিশোরকে দেখে। রচনাকাল ২০০৩। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
ঘরের মধ্যে চাপা বিলাপ,
বাইরে প্রবীণগণের আলাপ,
পায়ের নিচে কাঁপছে কি তোর
ভূঁই?
এর মধ্যেই ভীষণ একা
গাছের তলায় দাঁড়িয়ে খোকা,
আধেক অবোধ, আধেক কিশোর
তুই!
আগুন ঢালা আকাশ মাথায়
বাতাস-হারা গাছের পাতায়
দূর হবে কি দাবদাহ তোর
আজ!
জানিস কি তুই অবোধ ওরে,
ঘর উড়েছে দামাল ঝড়ে,
পড়েছে ওই গাছের ওপর
বাজ ?
আমরা সবাই মুখোশধারী
একটা কাজই করতে পারি
সমাজবিধি পালন করা,
তাই
চন্দন আর ধুনো ঢেলে
তোর হাতে আজ বাচ্চা ছেলে
ধরিয়ে দিলাম বালতি ভরা
ছাই।
চিতার রক্ত আভায় কঠোর
লাগছে কি আজ মুখখানা তোর,
বুঝে গেছিস এই কাজে তোর
হক।
পরে যদি লড়াই বাঁধে,
তার দায় তোর পলকা কাঁধে
চাপিয়ে দিয়ে আমরা যে
দর্শক।
ওই চিতাতে পুড়ল অতীত,
নিরাপত্তার স্বপ্নের ভিত,
মুছল রে জীবন থেকে
শৈশব--
নচিকেতার মতন ওরে,
'যম জাঙালের বক্র মোড়ে'
দাঁড়ানো তোর রূপ দেখে
এই স্তব!
*********************
বিলটু কাকু
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। চরিত্র চিত্রন। রচনাকাল ২০০৪। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
পূব বাংলার ফেলে আসা কোনো জমিদারির
উত্তরাধিকারী কুলীন বংশের সে ছিল এক সেজ়োকুমার --
শহরে ওকালতিসূত্রে সঞ্চিত বাপের বিত্তের অন্যতম অংশভুক হলেও
সে ছিলনা নেহাত আকাট অপদার্থ!
শিক্ষিত, সুভদ্র, বরঞ্চ অন্যান্য ভাইদের তুলনায় একটু বেশিই ভদ্র --
মার্জিত কথাবার্তায় সংস্কৃতির ছাপ, লেখালেখি, ছবি আঁকায় অনুরাগ !
বাবার মহকুমা আদালতে দারুণ পসার, নিজেও সে করেছিল আইন পাশ,
অনায়াসে একদিন বাপের চেয়ারে বসতে পারত সে...
বাবার সঙ্গে আদালতে যাতায়াতও করেছিল কিছুদিন...
কিংবা সে হতে পারত ভালো একজন কমার্শিয়াল আর্টিস্ট,
কিংবা সে হতে পারত ...
অনেক কিছুই হতে পারত, কিন্তু সে সব কিছুই হল না ।
কী যে হল, শেষ পর্যন্ত তার ঠাঁই হল কিনা রাঁচির গারদে!
প্রতাপী বাপের সহসা প্রয়াণে যখন বৃক্ষছায়া আর রইল না,
সে তখন পড়েছিল বড়ো ভাইয়ের ভাগে ...
শুনেছি তখনই নাকি তার মাথা খারাপের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল,
কিন্তু যতবার কথাবার্তা হয়েছে, একবারও পাইনি কোনো পাগলামির চিহ্ন ...
একবার আমার সেই অসুস্থ জ্ঞাতিকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম,
আমাকে দেখে কোনো লেখা সম্পর্কে কী বৈদগ্ধ্যপূর্ণ আলোচনাই সে করেছিল!
তারপর শুনতাম, মাঝেমাঝেই নাকি পাগলামি বাড়ত...
শেষে বড়ো ভাই তাকে রাঁচিতে ভর্তি করে দিয়ে বাঁচে
এবং সেখানেই সে কবে ইহলীলা সংবরণ করে,
সে খবরও নাকি আত্মীয়েরা সময়মতো পায়নি।
আমার সেই অকালমৃত জ্ঞাতি আজও
আমার স্মৃতিতে ঘুরে ঘুরে হানা দেয়.....
তার স্বভাব, পরিবেশ, মেধা ও পরিণতির চলচ্ছবি দেখে
নিজেকে কেমন যেন অরক্ষিত মনে হয়....
ভাবি, আমাদের মতো একটা জীবন অনায়াসে তারও তো হতে পারত,
তা হলে সে পাগল হত কিনা, এ কথাও মনে হয়।
মনে পড়ে যায়, সে একবার 'এ ম্যাড ম্যান' নামে
এক পুস্তিকা ছাপিয়ে জনে জনে বিতরণ করেছিল...
তাতে সংক্ষিপ্ত ও নির্ভুল ভাষায় লিখেছিল
এমনই এক সমাজকথিত উন্মাদের আরোগ্যকাহিনী ...
তার শেষ লাইনটা আজও মনে আছে - ‘অ্যান্ড হি ম্যারিড'।
আর পাঁচজনের মতো সামাজিক জীবন তো তার হতেই পারত !
আবার তার উল্টোটাও হতে পারত --
আমাদের যে কারও পরিণতি যদি হত
আমার সেই জ্ঞাতি খুল্লতাতের মতো --
এ কথা ভেবেও বারবার শিউরে উঠেছি আমি ...
আজো আমার সেই জ্ঞাতিদের বৈঠকখানায় গিয়ে
তার বড়ো ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার সময় লক্ষ করি
দেয়ালে বাঁধানো আমার সেই মৃত কাকার মৌলিক চিত্রকর্মের নমুনা --
সুদূর বিচারাসনে উপবিষ্ট কোনো সর্বশক্তিমান নিয়ন্তার আবছা অবয়বের সামনে
সারা ছবি জুড়ে উৎকীর্ণ এক আকুল প্রার্থনা -
‘অ্যান্ড লীড আস নট ইনটু টেম্পটেশন,
বাট ডেলিভার আস আনটু লাইট’ !
আমার চোখে সৃষ্টি ও স্রষ্টা এক হয়ে যায় ...
আমাকে যেন ঢেকে ফেলে ঐ আকুল আর্তি কান্নার মতো!
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। চরিত্র চিত্রন। রচনাকাল ২০০৪। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
পূব বাংলার ফেলে আসা কোনো জমিদারির
উত্তরাধিকারী কুলীন বংশের সে ছিল এক সেজ়োকুমার --
শহরে ওকালতিসূত্রে সঞ্চিত বাপের বিত্তের অন্যতম অংশভুক হলেও
সে ছিলনা নেহাত আকাট অপদার্থ!
শিক্ষিত, সুভদ্র, বরঞ্চ অন্যান্য ভাইদের তুলনায় একটু বেশিই ভদ্র --
মার্জিত কথাবার্তায় সংস্কৃতির ছাপ, লেখালেখি, ছবি আঁকায় অনুরাগ !
বাবার মহকুমা আদালতে দারুণ পসার, নিজেও সে করেছিল আইন পাশ,
অনায়াসে একদিন বাপের চেয়ারে বসতে পারত সে...
বাবার সঙ্গে আদালতে যাতায়াতও করেছিল কিছুদিন...
কিংবা সে হতে পারত ভালো একজন কমার্শিয়াল আর্টিস্ট,
কিংবা সে হতে পারত ...
অনেক কিছুই হতে পারত, কিন্তু সে সব কিছুই হল না ।
কী যে হল, শেষ পর্যন্ত তার ঠাঁই হল কিনা রাঁচির গারদে!
প্রতাপী বাপের সহসা প্রয়াণে যখন বৃক্ষছায়া আর রইল না,
সে তখন পড়েছিল বড়ো ভাইয়ের ভাগে ...
শুনেছি তখনই নাকি তার মাথা খারাপের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল,
কিন্তু যতবার কথাবার্তা হয়েছে, একবারও পাইনি কোনো পাগলামির চিহ্ন ...
একবার আমার সেই অসুস্থ জ্ঞাতিকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম,
আমাকে দেখে কোনো লেখা সম্পর্কে কী বৈদগ্ধ্যপূর্ণ আলোচনাই সে করেছিল!
তারপর শুনতাম, মাঝেমাঝেই নাকি পাগলামি বাড়ত...
শেষে বড়ো ভাই তাকে রাঁচিতে ভর্তি করে দিয়ে বাঁচে
এবং সেখানেই সে কবে ইহলীলা সংবরণ করে,
সে খবরও নাকি আত্মীয়েরা সময়মতো পায়নি।
আমার সেই অকালমৃত জ্ঞাতি আজও
আমার স্মৃতিতে ঘুরে ঘুরে হানা দেয়.....
তার স্বভাব, পরিবেশ, মেধা ও পরিণতির চলচ্ছবি দেখে
নিজেকে কেমন যেন অরক্ষিত মনে হয়....
ভাবি, আমাদের মতো একটা জীবন অনায়াসে তারও তো হতে পারত,
তা হলে সে পাগল হত কিনা, এ কথাও মনে হয়।
মনে পড়ে যায়, সে একবার 'এ ম্যাড ম্যান' নামে
এক পুস্তিকা ছাপিয়ে জনে জনে বিতরণ করেছিল...
তাতে সংক্ষিপ্ত ও নির্ভুল ভাষায় লিখেছিল
এমনই এক সমাজকথিত উন্মাদের আরোগ্যকাহিনী ...
তার শেষ লাইনটা আজও মনে আছে - ‘অ্যান্ড হি ম্যারিড'।
আর পাঁচজনের মতো সামাজিক জীবন তো তার হতেই পারত !
আবার তার উল্টোটাও হতে পারত --
আমাদের যে কারও পরিণতি যদি হত
আমার সেই জ্ঞাতি খুল্লতাতের মতো --
এ কথা ভেবেও বারবার শিউরে উঠেছি আমি ...
আজো আমার সেই জ্ঞাতিদের বৈঠকখানায় গিয়ে
তার বড়ো ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার সময় লক্ষ করি
দেয়ালে বাঁধানো আমার সেই মৃত কাকার মৌলিক চিত্রকর্মের নমুনা --
সুদূর বিচারাসনে উপবিষ্ট কোনো সর্বশক্তিমান নিয়ন্তার আবছা অবয়বের সামনে
সারা ছবি জুড়ে উৎকীর্ণ এক আকুল প্রার্থনা -
‘অ্যান্ড লীড আস নট ইনটু টেম্পটেশন,
বাট ডেলিভার আস আনটু লাইট’ !
আমার চোখে সৃষ্টি ও স্রষ্টা এক হয়ে যায় ...
আমাকে যেন ঢেকে ফেলে ঐ আকুল আর্তি কান্নার মতো!
*********************
হারিয়ে যাওয়া গন্ধর্বকে মনে করে
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। প্রয়াত বন্ধু দীপঙ্কর বসু স্মরণে। রচনাকাল ২০২১। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
আকাশে ভাসলে তুলো শরতের,
হাওয়া হলে সুরভিমদির
মনে পড়ে যায় তাকে পথে যেতে যেতে...
মনে হয়, পাশ থেকে এই বুঝি সে
হাঁক দিয়ে উঠবে, 'থামাও থামাও গাড়ি' বলে -
নেমে যাবে চটপট ক্যামেরার শিকার সন্ধানে.....
পথে যেতে যেতে যেই চোখ পড়ে কাশের জঙ্গলে,
আনমনা হয়ে যাই, তার কথা ভেবে,
মনে হয় এই বুঝি মাথা ঝাঁকানো কাশের পেছন থেকে সে বেরিয়ে আসবে,
সপ্রতিভ বেল্টে গোঁজা ফিটফাট জামা....
আদুরে বাচ্চার মতো কাঁধে ঝুলে আছে তার শখের ক্যামেরা -
তার মাথার চুল মিশে গেছে কাশের শুভ্রতায়...
কাশ থেকে আকাশ পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে বিশাল ক্যানভাস
সেই রূপদক্ষের লেন্সে ধরা দিয়ে ধন্য হবে বলে!
আশ্বিনের সোনা-রোদ মুখ দেখালেও তাকেই মনে পড়ে যায়,
মনে হয় পাশে বসে এই বুঝি গেয়ে উঠবে সেই গন্ধর্ব --
'অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া'...
মনে পড়ে, আকাশের সব আলো পান করে নিয়ে
প্রতিদানে সেও গানে গানে ভরে দিয়েছিল আকাশকে...
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ফুটে থাকলে মায়াবী পলাশ,
তখনও সেই জাদুকর চোখে ভেসে ওঠে,
দেখতে পাই দেহের বয়স ভুলে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে মাঠেঘাটে...
ছিন্নবাধা পলাতক বালকের মতো
অবুঝ নেশার ঘোর চোখে নিয়ে,
আশ্চর্য গন্ধর্ব সেই কোথায় হারিয়ে গেল শেষে!
জানি ঠিক, ওই দূর মাঠে কোনো পলাশ, পুটুস কিংবা মহুয়ার প্রেমে
মগ্ন সেই গন্ধর্বকে ঠিক পাওয়া যাবে --
কোমরে সপ্রতিভ বেল্ট, তাতে গোঁজা নাছোড় ক্যামেরা....
পলাশের রংয়ে মিশে গেছে তার আগুন রঙা জামা --
চোখে তার বেপরোয়া বেহিসেবী রোখ --
একাই সে শূন্য করে দিয়ে যাবে জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার!
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। প্রয়াত বন্ধু দীপঙ্কর বসু স্মরণে। রচনাকাল ২০২১। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
আকাশে ভাসলে তুলো শরতের,
হাওয়া হলে সুরভিমদির
মনে পড়ে যায় তাকে পথে যেতে যেতে...
মনে হয়, পাশ থেকে এই বুঝি সে
হাঁক দিয়ে উঠবে, 'থামাও থামাও গাড়ি' বলে -
নেমে যাবে চটপট ক্যামেরার শিকার সন্ধানে.....
পথে যেতে যেতে যেই চোখ পড়ে কাশের জঙ্গলে,
আনমনা হয়ে যাই, তার কথা ভেবে,
মনে হয় এই বুঝি মাথা ঝাঁকানো কাশের পেছন থেকে সে বেরিয়ে আসবে,
সপ্রতিভ বেল্টে গোঁজা ফিটফাট জামা....
আদুরে বাচ্চার মতো কাঁধে ঝুলে আছে তার শখের ক্যামেরা -
তার মাথার চুল মিশে গেছে কাশের শুভ্রতায়...
কাশ থেকে আকাশ পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে বিশাল ক্যানভাস
সেই রূপদক্ষের লেন্সে ধরা দিয়ে ধন্য হবে বলে!
আশ্বিনের সোনা-রোদ মুখ দেখালেও তাকেই মনে পড়ে যায়,
মনে হয় পাশে বসে এই বুঝি গেয়ে উঠবে সেই গন্ধর্ব --
'অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া'...
মনে পড়ে, আকাশের সব আলো পান করে নিয়ে
প্রতিদানে সেও গানে গানে ভরে দিয়েছিল আকাশকে...
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ফুটে থাকলে মায়াবী পলাশ,
তখনও সেই জাদুকর চোখে ভেসে ওঠে,
দেখতে পাই দেহের বয়স ভুলে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে মাঠেঘাটে...
ছিন্নবাধা পলাতক বালকের মতো
অবুঝ নেশার ঘোর চোখে নিয়ে,
আশ্চর্য গন্ধর্ব সেই কোথায় হারিয়ে গেল শেষে!
জানি ঠিক, ওই দূর মাঠে কোনো পলাশ, পুটুস কিংবা মহুয়ার প্রেমে
মগ্ন সেই গন্ধর্বকে ঠিক পাওয়া যাবে --
কোমরে সপ্রতিভ বেল্ট, তাতে গোঁজা নাছোড় ক্যামেরা....
পলাশের রংয়ে মিশে গেছে তার আগুন রঙা জামা --
চোখে তার বেপরোয়া বেহিসেবী রোখ --
একাই সে শূন্য করে দিয়ে যাবে জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার!
*********************
