কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরীর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
নিরঞ্জন
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। স্মৃতির ছবি। রচনাকাল ২০২১। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
আমাদের ছেলেবেলায় 'বিজয়া'একটা ক্রিয়াপদও ছিল,
প্রতিমা নিরঞ্জন হয়ে যাবার পর সবাই একে অন্যের বাড়ি গিয়ে যখন দেখা করত,
অভ্যাগতদের করা হত মিষ্টি খাইয়ে আপ্যায়ন,
সেই ব্যাপারটাকে বলা হত 'বিজয়া করা'....
সেই একটা আশ্চর্য সময় ছিল ,
যখন সব কিছুরই একটা আগাম সংকেত মিলত....
সেই যে লোকটি প্রতি বছর রোদ সোনালি হয়ে ঢাক বেজে ওঠার পর এক দিন
সামনের রাস্তায় মাথায় হাঁড়ি চাপিয়ে এসে হাঁক দিত--
"মিহিদানা, চন্দ্রপুলি, সীতাভোগ, ক্ষীরের সন্দে -এ - শ" বলে...
আমরা সংকেত পেতাম, বিজয়া এসে গেছে!
শুনেছি অনেক বনেদি বাড়ির পুজোয় গৌরীকে বিদায়ী বরণ করার আগে
উড়িয়ে দেওয়া হত নীলকন্ঠ পাখি --
উড়ে গিয়ে কৈলাসে দুর্গার ফিরে যাবার খবর দেবে বলে ....
সেও তো একরকম সংকেত বিজয়া-বেলার!
মনে আছে, ছেলেবেলায় দশমীর বিকালবেলায়
কখন 'বিজয়া করতে' অতিথিদের আসা শুরু হবে ,
তার প্রতীক্ষা চলত.....
প্রতিবছর সবার আগে উপস্থিত হত এক বিহারী সাদাসিধে প্রৌঢ় মানুষ,
কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে এসে আমার দাদুকে নমস্কার জানাত...
তারপর হত কোলাকুলি বিনিময় ও মিষ্টিমুখ...
শুনেছিলাম তার নাম নাকি উধু --
একদা কবে সে দাদুর কাছে নাকি কাজ করত,
অবসর নেবার পর বছরে এই একদিনই
সে দেখা করতে আসত তার প্রাক্তন বড়বাবুর সঙ্গে!
সেটাও ছিল একটা সংকেত....
উধু আসলেই আমরা বুঝতাম, বিজয়া শুরু হয়ে গেল!
বহুদিন হয়ে গেল, উধুরা আর আসেনা বিজয়া করতে ....
তেমনভাবে প্রায় কেউই আর আসে না,
বিজয়া এখন আর ক্রিয়াপদ নয়, শুধুই একটি বিশেষ্য বা বিশেষণ....
বহু দশমীর মধ্যে একটা বিশেষ দশমীর নাম বিজয়া !
বিজয়ার প্রণাম, শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ জানিয়ে চিঠি লেখা হত একসময়,
এখন আর হয়না, কারণ চিঠি জিনিসটাই উঠে গেছে ...
আজকাল হয়তো টেলিফোনে শুভেচ্ছা বিনিময় করে কেউ কেউ, কিন্তু --
প্রতি বছর বিজয়ার প্রথম আশীর্বাদী ফোন আসত যাঁর কাছ থেকে,
আমার সেই কাকু এবছর আর দশমী পর্যন্ত অপেক্ষা না করে
দেবীপক্ষের সূচনাতেই ওপারে ভাসালেন ভেলা ...
সেই যে কবে সেই মিহিদানা আর ক্ষীরের সন্দেশওয়ালা আসত,
তার সন্দেশের স্বাদের মতো তার মুখও আমার আজও পরিষ্কার মনে আছে ...
কিন্তু তার সেই হাঁক আজ আর শোনা যায়না!
শুনেছি, বাড়ির পুজোয়ও গৌরীবরণের পর
এখন আর নীলকন্ঠ পাখী ওড়ানো হয়না --
নীলকন্ঠ এখন শুধুই এক প্রতীক...
কিন্তু আজও আছে গৌরীবরণ আর নিরঞ্জন...
আজও আছে শুভ্র কাশ, নীল আকাশ, আর অন্য সব অমোঘ সংকেত --
হয়ত সেসব সংকেত আজ আর পড়তে পারিনা ঠিকমতো...
তবু আজও হেঁটে যাই যন্ত্রবৎ সুবর্ণরেখার তীর ধরে -
যেমন হেঁটেছি আমি প্রথমবার দাদুর হাত ধরে,
তারপর কতবার হেঁটে গেছি এই পথ বেয়ে,
কখনো বা সঙ্গে ছিল শিশুপুত্র, বন্ধুরা কখনো ...
এখনও এ পথ দিয়ে যেতে যেতে দেখতে পাই আগের মতোই
কারা যেন ম্লান সাঁঝে ভাসায় ওই গাঙুরের জলে
জীবনের মন্ডপ খালি করে সোনার প্রতিমা...
পেছনে ফিরলে দেখি, শুধু পড়ে আছে নদীতীরে
কত ছারখার জাহাজ আর মাস্তুলের ধ্বস্ত অবশেষ...
সুবর্ণরেখার জলে আলো কাঁপে থির থির বিজয়ার সাঁঝে,
দলমা পাহাড় থেকে ঠান্ডা হাওয়া ভেসে এসে ধাক্কা দেয় গায়ে.....
জানি না সেও কোনো সংকেত বয়ে আনে কিনা,
আলতো স্পর্শ করে বলছে কি সে কানে কানে,"বন্দরের কাল হল শেষ"!
কাটালে তো বহু কাল এই জীর্ণ ঘাটের কিনারে,
এবার নোঙর তোল, উড়িয়ে দাও বার্তাবহ নীলকন্ঠ পাখি....
উড়ে যাক সেই পাখি দলমা পেরিয়ে আরও উত্তরের দিকে!"
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
নিদাঘ পর্ব। স্মৃতির ছবি। রচনাকাল ২০২১। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
আমাদের ছেলেবেলায় 'বিজয়া'একটা ক্রিয়াপদও ছিল,
প্রতিমা নিরঞ্জন হয়ে যাবার পর সবাই একে অন্যের বাড়ি গিয়ে যখন দেখা করত,
অভ্যাগতদের করা হত মিষ্টি খাইয়ে আপ্যায়ন,
সেই ব্যাপারটাকে বলা হত 'বিজয়া করা'....
সেই একটা আশ্চর্য সময় ছিল ,
যখন সব কিছুরই একটা আগাম সংকেত মিলত....
সেই যে লোকটি প্রতি বছর রোদ সোনালি হয়ে ঢাক বেজে ওঠার পর এক দিন
সামনের রাস্তায় মাথায় হাঁড়ি চাপিয়ে এসে হাঁক দিত--
"মিহিদানা, চন্দ্রপুলি, সীতাভোগ, ক্ষীরের সন্দে -এ - শ" বলে...
আমরা সংকেত পেতাম, বিজয়া এসে গেছে!
শুনেছি অনেক বনেদি বাড়ির পুজোয় গৌরীকে বিদায়ী বরণ করার আগে
উড়িয়ে দেওয়া হত নীলকন্ঠ পাখি --
উড়ে গিয়ে কৈলাসে দুর্গার ফিরে যাবার খবর দেবে বলে ....
সেও তো একরকম সংকেত বিজয়া-বেলার!
মনে আছে, ছেলেবেলায় দশমীর বিকালবেলায়
কখন 'বিজয়া করতে' অতিথিদের আসা শুরু হবে ,
তার প্রতীক্ষা চলত.....
প্রতিবছর সবার আগে উপস্থিত হত এক বিহারী সাদাসিধে প্রৌঢ় মানুষ,
কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে এসে আমার দাদুকে নমস্কার জানাত...
তারপর হত কোলাকুলি বিনিময় ও মিষ্টিমুখ...
শুনেছিলাম তার নাম নাকি উধু --
একদা কবে সে দাদুর কাছে নাকি কাজ করত,
অবসর নেবার পর বছরে এই একদিনই
সে দেখা করতে আসত তার প্রাক্তন বড়বাবুর সঙ্গে!
সেটাও ছিল একটা সংকেত....
উধু আসলেই আমরা বুঝতাম, বিজয়া শুরু হয়ে গেল!
বহুদিন হয়ে গেল, উধুরা আর আসেনা বিজয়া করতে ....
তেমনভাবে প্রায় কেউই আর আসে না,
বিজয়া এখন আর ক্রিয়াপদ নয়, শুধুই একটি বিশেষ্য বা বিশেষণ....
বহু দশমীর মধ্যে একটা বিশেষ দশমীর নাম বিজয়া !
বিজয়ার প্রণাম, শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ জানিয়ে চিঠি লেখা হত একসময়,
এখন আর হয়না, কারণ চিঠি জিনিসটাই উঠে গেছে ...
আজকাল হয়তো টেলিফোনে শুভেচ্ছা বিনিময় করে কেউ কেউ, কিন্তু --
প্রতি বছর বিজয়ার প্রথম আশীর্বাদী ফোন আসত যাঁর কাছ থেকে,
আমার সেই কাকু এবছর আর দশমী পর্যন্ত অপেক্ষা না করে
দেবীপক্ষের সূচনাতেই ওপারে ভাসালেন ভেলা ...
সেই যে কবে সেই মিহিদানা আর ক্ষীরের সন্দেশওয়ালা আসত,
তার সন্দেশের স্বাদের মতো তার মুখও আমার আজও পরিষ্কার মনে আছে ...
কিন্তু তার সেই হাঁক আজ আর শোনা যায়না!
শুনেছি, বাড়ির পুজোয়ও গৌরীবরণের পর
এখন আর নীলকন্ঠ পাখী ওড়ানো হয়না --
নীলকন্ঠ এখন শুধুই এক প্রতীক...
কিন্তু আজও আছে গৌরীবরণ আর নিরঞ্জন...
আজও আছে শুভ্র কাশ, নীল আকাশ, আর অন্য সব অমোঘ সংকেত --
হয়ত সেসব সংকেত আজ আর পড়তে পারিনা ঠিকমতো...
তবু আজও হেঁটে যাই যন্ত্রবৎ সুবর্ণরেখার তীর ধরে -
যেমন হেঁটেছি আমি প্রথমবার দাদুর হাত ধরে,
তারপর কতবার হেঁটে গেছি এই পথ বেয়ে,
কখনো বা সঙ্গে ছিল শিশুপুত্র, বন্ধুরা কখনো ...
এখনও এ পথ দিয়ে যেতে যেতে দেখতে পাই আগের মতোই
কারা যেন ম্লান সাঁঝে ভাসায় ওই গাঙুরের জলে
জীবনের মন্ডপ খালি করে সোনার প্রতিমা...
পেছনে ফিরলে দেখি, শুধু পড়ে আছে নদীতীরে
কত ছারখার জাহাজ আর মাস্তুলের ধ্বস্ত অবশেষ...
সুবর্ণরেখার জলে আলো কাঁপে থির থির বিজয়ার সাঁঝে,
দলমা পাহাড় থেকে ঠান্ডা হাওয়া ভেসে এসে ধাক্কা দেয় গায়ে.....
জানি না সেও কোনো সংকেত বয়ে আনে কিনা,
আলতো স্পর্শ করে বলছে কি সে কানে কানে,"বন্দরের কাল হল শেষ"!
কাটালে তো বহু কাল এই জীর্ণ ঘাটের কিনারে,
এবার নোঙর তোল, উড়িয়ে দাও বার্তাবহ নীলকন্ঠ পাখি....
উড়ে যাক সেই পাখি দলমা পেরিয়ে আরও উত্তরের দিকে!"
*********************
রসের কণা
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
অচেনা কুসুম। মধ্যযুগের কৃষ্ণভক্ত মুসলিম কবি সৈয়দ ইব্রাহিম খান (১৫৪৮- ১৬২৮) ওরফে রসখানের হিন্দি কবিতার অনুবাদ। রচনাকাল ১৯৬৬। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
★ রসখান বলে, মানবজনম পাই যদি আরবার,
গোকুলের গোপ ও গাভীদের মাঝে বাস হয় যেন আমার॥
পশুর জন্ম যদি হয়, তাতে দুঃখ কেন বা করি,
যদি নন্দরাজের ধেনু সাথে প্রতিদিন আমি চরতে পারি॥
পাথরজন্ম যদি পাই, তবে হই যেন ওই গিরি,
ব্রজের ওপরে ছাতার মতন ধরলেন যাকে হরি॥
পাখি যদি হই তবে যেন সেইখানে বাঁধি আমি নীড় --
যেখানে রয়েছে কদমের গাছ, যমুনা নদীর তীর!
★ অপ্সরা, গন্ধর্ব, নারদ, বাসুকী সকলে করেন যাঁর গুণগান,
যাঁর অনন্ত নাম জপে শিব, ব্রহ্মা, গণেশ কিনারা না পান,
যাঁর ধ্যানে সব সিদ্ধপুরুষ সমাধিমগ্ন সদাই থাকে--
শুধু এক বাটি ননীর জন্য, গোপীরা কতই নাচাল তাঁকে!
মহেশ, গণেশ, দিনেশ, সুরেশ, অনন্ত যাঁর মহিমা গান,
নারদ ও ব্যাস থেকে শুকদেব ধ্যানেতেও যাঁর কুল না পান,
অনাদি অনন্ত, অখন্ড অছেদ্য, অভেদ্য যাঁকে বেদ বলে --
শুধু এক বাটি ননীর জন্য তাঁকেও নাচাল গোপীদলে!
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
অচেনা কুসুম। মধ্যযুগের কৃষ্ণভক্ত মুসলিম কবি সৈয়দ ইব্রাহিম খান (১৫৪৮- ১৬২৮) ওরফে রসখানের হিন্দি কবিতার অনুবাদ। রচনাকাল ১৯৬৬। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
★ রসখান বলে, মানবজনম পাই যদি আরবার,
গোকুলের গোপ ও গাভীদের মাঝে বাস হয় যেন আমার॥
পশুর জন্ম যদি হয়, তাতে দুঃখ কেন বা করি,
যদি নন্দরাজের ধেনু সাথে প্রতিদিন আমি চরতে পারি॥
পাথরজন্ম যদি পাই, তবে হই যেন ওই গিরি,
ব্রজের ওপরে ছাতার মতন ধরলেন যাকে হরি॥
পাখি যদি হই তবে যেন সেইখানে বাঁধি আমি নীড় --
যেখানে রয়েছে কদমের গাছ, যমুনা নদীর তীর!
★ অপ্সরা, গন্ধর্ব, নারদ, বাসুকী সকলে করেন যাঁর গুণগান,
যাঁর অনন্ত নাম জপে শিব, ব্রহ্মা, গণেশ কিনারা না পান,
যাঁর ধ্যানে সব সিদ্ধপুরুষ সমাধিমগ্ন সদাই থাকে--
শুধু এক বাটি ননীর জন্য, গোপীরা কতই নাচাল তাঁকে!
মহেশ, গণেশ, দিনেশ, সুরেশ, অনন্ত যাঁর মহিমা গান,
নারদ ও ব্যাস থেকে শুকদেব ধ্যানেতেও যাঁর কুল না পান,
অনাদি অনন্ত, অখন্ড অছেদ্য, অভেদ্য যাঁকে বেদ বলে --
শুধু এক বাটি ননীর জন্য তাঁকেও নাচাল গোপীদলে!
*********************
হে অধিনায়ক, হে নেতা আমার!
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
অচেনা কুসুম। ওয়াল্টার হুইটম্যান (১৮১৯-৯২) রচিত ইংরেজি কবিতা 'Captain, Oh My Captain' কবিতার অনুবাদ। রচনাকাল ১৯৬৮। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
হে অধিনায়ক! হে নেতা আমার! হল আমাদের ভয়সঙ্কুল যাত্রার অবসান,
যুঝেছে যে আমাদের তরী সব দুর্বিপাক আর পেয়েছি আমরা কাঙ্ক্ষিত বরদান।
বন্দর ওই অদূরে, শুনছি ঘণ্টাধ্বনি, সমবেত জনগণ করে কলরোল,
ভয় ভেঙে দিয়ে ফিরছে জাহাজ, দেখে সাহসীর উন্নত চূড়া আনন্দ-হিল্লোল!
কিন্তু হৃদয়! হৃদয় আমার! ওই যে ওখানে ওই ফোঁটাগুলো গাঢ় লাল, উজ্জ্বল,
যেখানে তরীর পাটাতনে ওই নায়ক আমার রয়েছেন শুয়ে মৃত এবং শীতল!
হে অধিনায়ক! হে নেতা আমার! জেগে ওঠ তুমি, শোন একবার ওই ধ্বনি ঘন্টার -
জেগে ওঠ ওগো, তোমারই জন্য ওড়ে যে পতাকা, তোমারই জন্য ভেরী ওই সোচ্চার !
তোমারই জন্য পুষ্পস্তবক, রঙিন ওই মালা, বেলাভূমি উত্তাল যে তোমারই টানে,
সেখানে জনতা তোমাকেই ডাকে, আগ্রহে চেয়ে আছে আজ তারা তোমারই মুখের পানে!
কিন্তু এখানে! হে অধিনায়ক! হে পিতা আমার! বাহুটিকে করে মাথার আশ্রয়স্থল,
এটা কি স্বপ্ন! জাহাজের পাটাতনে আজ তুমি রয়েছ যে পড়ে মৃত এবং শীতল!
নায়ক আমার দেন না যে সাড়া, ঠোঁট দুটি তাঁর বিবর্ণ আর নীরব, বয় না শ্বাস,
জনক আমার হাতের স্পর্শ পারেন না আর বুঝতে, নেই যে প্রাণ, নেই অভিলাষ,
নিরাপদে তরী ভিড়েছে যে তীরে, ফেলেছে নোঙর, অভিযান তার সুসম্পূর্ণ, শেষও,
ভীতিসঙ্কুল যাত্রার থেকে জয়ী এ তরণী ফিরছে, তার আজ সুসফল উদ্দেশ্য;
উদ্বেল হও ওরে বেলাভূমি, বাজো রে ঘন্টা, কিন্তু আমার চোখে যে অশ্রুজল,
বিষণ্ণ পায়ে হাঁটব মেঝেতে, যেখানে আমার নায়ক আজ শুয়ে মৃত এবং শীতল!
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
অচেনা কুসুম। ওয়াল্টার হুইটম্যান (১৮১৯-৯২) রচিত ইংরেজি কবিতা 'Captain, Oh My Captain' কবিতার অনুবাদ। রচনাকাল ১৯৬৮। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
হে অধিনায়ক! হে নেতা আমার! হল আমাদের ভয়সঙ্কুল যাত্রার অবসান,
যুঝেছে যে আমাদের তরী সব দুর্বিপাক আর পেয়েছি আমরা কাঙ্ক্ষিত বরদান।
বন্দর ওই অদূরে, শুনছি ঘণ্টাধ্বনি, সমবেত জনগণ করে কলরোল,
ভয় ভেঙে দিয়ে ফিরছে জাহাজ, দেখে সাহসীর উন্নত চূড়া আনন্দ-হিল্লোল!
কিন্তু হৃদয়! হৃদয় আমার! ওই যে ওখানে ওই ফোঁটাগুলো গাঢ় লাল, উজ্জ্বল,
যেখানে তরীর পাটাতনে ওই নায়ক আমার রয়েছেন শুয়ে মৃত এবং শীতল!
হে অধিনায়ক! হে নেতা আমার! জেগে ওঠ তুমি, শোন একবার ওই ধ্বনি ঘন্টার -
জেগে ওঠ ওগো, তোমারই জন্য ওড়ে যে পতাকা, তোমারই জন্য ভেরী ওই সোচ্চার !
তোমারই জন্য পুষ্পস্তবক, রঙিন ওই মালা, বেলাভূমি উত্তাল যে তোমারই টানে,
সেখানে জনতা তোমাকেই ডাকে, আগ্রহে চেয়ে আছে আজ তারা তোমারই মুখের পানে!
কিন্তু এখানে! হে অধিনায়ক! হে পিতা আমার! বাহুটিকে করে মাথার আশ্রয়স্থল,
এটা কি স্বপ্ন! জাহাজের পাটাতনে আজ তুমি রয়েছ যে পড়ে মৃত এবং শীতল!
নায়ক আমার দেন না যে সাড়া, ঠোঁট দুটি তাঁর বিবর্ণ আর নীরব, বয় না শ্বাস,
জনক আমার হাতের স্পর্শ পারেন না আর বুঝতে, নেই যে প্রাণ, নেই অভিলাষ,
নিরাপদে তরী ভিড়েছে যে তীরে, ফেলেছে নোঙর, অভিযান তার সুসম্পূর্ণ, শেষও,
ভীতিসঙ্কুল যাত্রার থেকে জয়ী এ তরণী ফিরছে, তার আজ সুসফল উদ্দেশ্য;
উদ্বেল হও ওরে বেলাভূমি, বাজো রে ঘন্টা, কিন্তু আমার চোখে যে অশ্রুজল,
বিষণ্ণ পায়ে হাঁটব মেঝেতে, যেখানে আমার নায়ক আজ শুয়ে মৃত এবং শীতল!
*********************
চাতক পাখিকে
অচেনা কুসুম। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ (১৭৭০- ১৮৫০) রচিত 'To the Skylark' অবলম্বনে। রচনাকাল ২০২১। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
চারণ তুই ঊর্ধ্ববিহারী! তীর্থযাত্রী আকাশপথের!
তুচ্ছ করিস বুঝি মায়া-ভরা ধরার ধূলায়?
না কি, যবে ডানা তোর অভিসারী ঊর্ধ্বলোকের,
আঁখি-মন পড়ে আছে শিশিরেতে ভেজা এ কুলায়ে?
সে কুলায়, যেখানে তুই নামতে পারিস ইচ্ছেমতো
বন্ধ করে কূজনের গান, কম্প্রপক্ষকে করে সংহত!
নির্ভয় গায়ক তুই! উঠিস ঊর্ধ্বে দৃষ্টিসীমা ছেড়ে,
ঢেলে দিস প্রেমগীতিধারা তোর সন্তানের ওপরে,
রয়েছে কুলায়ে যারা, অব্যর্থ বাঁধন এক সে রে,
ধরণীও কম উৎফুল্ল হয় না সে আনন্দ-শিহরে!
তবু তোর গর্ব এই, গান গাস নিজের গরিমায় --
গাস না তো নবপত্রে ভরা বসন্তের প্রেরণায়!
ছেড়ে দে না বুলবুলিকে তার ছায়াচ্ছন্ন বনদেশ,
তোর জন্য রয়েছে তো আলোকের গরিম নির্জন-
যেখান থেকে ঢেলে দিস আরও স্বর্গীয় সুরাবেশ,
পৃথিবীর ওপরে সে যেন এক বন্যার প্লাবন!
তুই যেন সেই প্রজ্ঞা, যা ঊর্ধ্বে ওঠে, করে না ভ্রমণ -
বিশ্বাস করেছিস তুই স্বর্গে মর্ত্যে প্রেমের বন্ধন!
*********************
অচেনা কুসুম। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ (১৭৭০- ১৮৫০) রচিত 'To the Skylark' অবলম্বনে। রচনাকাল ২০২১। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
চারণ তুই ঊর্ধ্ববিহারী! তীর্থযাত্রী আকাশপথের!
তুচ্ছ করিস বুঝি মায়া-ভরা ধরার ধূলায়?
না কি, যবে ডানা তোর অভিসারী ঊর্ধ্বলোকের,
আঁখি-মন পড়ে আছে শিশিরেতে ভেজা এ কুলায়ে?
সে কুলায়, যেখানে তুই নামতে পারিস ইচ্ছেমতো
বন্ধ করে কূজনের গান, কম্প্রপক্ষকে করে সংহত!
নির্ভয় গায়ক তুই! উঠিস ঊর্ধ্বে দৃষ্টিসীমা ছেড়ে,
ঢেলে দিস প্রেমগীতিধারা তোর সন্তানের ওপরে,
রয়েছে কুলায়ে যারা, অব্যর্থ বাঁধন এক সে রে,
ধরণীও কম উৎফুল্ল হয় না সে আনন্দ-শিহরে!
তবু তোর গর্ব এই, গান গাস নিজের গরিমায় --
গাস না তো নবপত্রে ভরা বসন্তের প্রেরণায়!
ছেড়ে দে না বুলবুলিকে তার ছায়াচ্ছন্ন বনদেশ,
তোর জন্য রয়েছে তো আলোকের গরিম নির্জন-
যেখান থেকে ঢেলে দিস আরও স্বর্গীয় সুরাবেশ,
পৃথিবীর ওপরে সে যেন এক বন্যার প্লাবন!
তুই যেন সেই প্রজ্ঞা, যা ঊর্ধ্বে ওঠে, করে না ভ্রমণ -
বিশ্বাস করেছিস তুই স্বর্গে মর্ত্যে প্রেমের বন্ধন!
*********************
সুভাষ
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
অচেনা কুসুম। দিলীপকুমার রায় (১৮৯৭- ১৯৮০) রচিত ইংরেজি কবিতার রূপান্তর। রচনাকাল ১৯৬৯। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
তোমার অগ্নি-অভীপ্সা ছিল - পাবে স্বাধীনতা-সুধা –
কোন রাক্ষসী রাত্রি পারেনি নেভাতে তোমার ক্ষুধা;
হেলাভরে ছিঁড়ে ফেলে লঘুতর যতেক আকর্ষণ
ছুটে গেলে পেতে দেশজননীর সাগ্রহ চুম্বন
সে-সাহস নিয়ে, ভীরু-দল যাকে করেছিল উপহাস,
আর পেলে তুমি তাদের প্রাণের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস –
তোমার বহ্নি-প্রাণের পরশে জীবন পেয়েছে যারা,
দেশ-জননীর ডাকে সাড়া দিতে ছুটেছে পাগলপারা!
তন্দ্রা কাটাতে তুলেছ যে ঝড় আমাদের অন্ধ ঘরে ,
তূর্যে তোমার বাজালে প্রভাত-রাগিনী গভীর সুরে,
জাগাতে জাতিকে জন্মসিদ্ধ অধিকার-দিবালোকে
তুমিই গাইলেঃ- ‘আমরা এগোব পূর্বাচলের দিকে,
যেখানে উঠেছে অখন্ড স্বাধীনতার সূর্য লাল –
মরে ভারতের যশের জন্য বেঁচে রব চিরকাল!’
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
অচেনা কুসুম। দিলীপকুমার রায় (১৮৯৭- ১৯৮০) রচিত ইংরেজি কবিতার রূপান্তর। রচনাকাল ১৯৬৯। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
তোমার অগ্নি-অভীপ্সা ছিল - পাবে স্বাধীনতা-সুধা –
কোন রাক্ষসী রাত্রি পারেনি নেভাতে তোমার ক্ষুধা;
হেলাভরে ছিঁড়ে ফেলে লঘুতর যতেক আকর্ষণ
ছুটে গেলে পেতে দেশজননীর সাগ্রহ চুম্বন
সে-সাহস নিয়ে, ভীরু-দল যাকে করেছিল উপহাস,
আর পেলে তুমি তাদের প্রাণের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস –
তোমার বহ্নি-প্রাণের পরশে জীবন পেয়েছে যারা,
দেশ-জননীর ডাকে সাড়া দিতে ছুটেছে পাগলপারা!
তন্দ্রা কাটাতে তুলেছ যে ঝড় আমাদের অন্ধ ঘরে ,
তূর্যে তোমার বাজালে প্রভাত-রাগিনী গভীর সুরে,
জাগাতে জাতিকে জন্মসিদ্ধ অধিকার-দিবালোকে
তুমিই গাইলেঃ- ‘আমরা এগোব পূর্বাচলের দিকে,
যেখানে উঠেছে অখন্ড স্বাধীনতার সূর্য লাল –
মরে ভারতের যশের জন্য বেঁচে রব চিরকাল!’
*********************
দক্ষিণেশ্বরের কালিকাদেবী
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
অচেনা কুসুম। হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় (১৮৯৮- ১৯৯০) রচিত ইংরেজি কবিতা অবলম্বনে। রচনাকাল ১৯৭৮। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
শত শতাব্দীর অতিপ্রাকৃত শক্তি রয়েছে নিথর হয়ে
ঘোর তামসবর্ণা তাঁর ওই নিকষকৃষ্ণ নগ্ন দেহে,
যে দেহটি হয়েছে উৎকীর্ণ চিন্ময় এক কুসুম রূপে
কত শতকের হৃদয়মথিত প্রার্থনা থেকে খোদাই করে!
ধূপের সুরভি শ্বাসবায়ু তাঁর, অচলা হয়েও স্পন্দিতা তিনি --
জীবন মৃত্যুর অমর সায়ক ছুঁড়ে নাড়া দেন আমাদের মূলে!
যদিও বন্দী পাষাণপ্রতীকে, মুক্তির তিনি মূর্তি স্বয়ং,
হৃদয়কে করে ঝঞ্ঝামথিত শান্তিতে তাকে স্থিতি দেন তিনি!
আননেতে তাঁর দীপ্তি -- মিশেছে শত শতকের চিতার বহ্নি,
সৃষ্টি করেছে করুণার জাদু স্থির প্রশান্ত চোখের তারায়!
জননী, তোমার উত্তাল বুকে অতি সযতনে রেখেছ সুপ্ত,
তামসী বিষাদ, পাবক এবং পুঞ্জিত সব উপাদানপিন্ড,
আর আশ্চর্য! পৃথিবীকে তুমি দিয়েছ এমন একটি মানুষ -
এই জগতের ঘরে ঘরে আজ পরিচয় যার-ঈশ্বর রূপে!
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
অচেনা কুসুম। হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় (১৮৯৮- ১৯৯০) রচিত ইংরেজি কবিতা অবলম্বনে। রচনাকাল ১৯৭৮। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
শত শতাব্দীর অতিপ্রাকৃত শক্তি রয়েছে নিথর হয়ে
ঘোর তামসবর্ণা তাঁর ওই নিকষকৃষ্ণ নগ্ন দেহে,
যে দেহটি হয়েছে উৎকীর্ণ চিন্ময় এক কুসুম রূপে
কত শতকের হৃদয়মথিত প্রার্থনা থেকে খোদাই করে!
ধূপের সুরভি শ্বাসবায়ু তাঁর, অচলা হয়েও স্পন্দিতা তিনি --
জীবন মৃত্যুর অমর সায়ক ছুঁড়ে নাড়া দেন আমাদের মূলে!
যদিও বন্দী পাষাণপ্রতীকে, মুক্তির তিনি মূর্তি স্বয়ং,
হৃদয়কে করে ঝঞ্ঝামথিত শান্তিতে তাকে স্থিতি দেন তিনি!
আননেতে তাঁর দীপ্তি -- মিশেছে শত শতকের চিতার বহ্নি,
সৃষ্টি করেছে করুণার জাদু স্থির প্রশান্ত চোখের তারায়!
জননী, তোমার উত্তাল বুকে অতি সযতনে রেখেছ সুপ্ত,
তামসী বিষাদ, পাবক এবং পুঞ্জিত সব উপাদানপিন্ড,
আর আশ্চর্য! পৃথিবীকে তুমি দিয়েছ এমন একটি মানুষ -
এই জগতের ঘরে ঘরে আজ পরিচয় যার-ঈশ্বর রূপে!
*********************
হিমেল সাঁঝে বনের ধারে থেমে
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
অচেনা কুসুম। মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্ট (১৮৭৪- ১৯৬৩) রচিত 'Stopping by Woods on a Snowy Evening' কবিতার অনুবাদ। রচনাকাল ২০২০। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
এই বনভূমি কার -- সেই কথা মনে হয় আমি জানি;
যদিও গ্রামের ভেতরেই তার রয়েছে বসতবাড়ি,
সে তো আজ দেখবে না, যেতে যেতে এখানে থেমেছি আমি,
দেখছি কেমন বরফে বরফে ভরে গেছে তার এ বন!
আমার এই ছোট ঘোড়া ভাববেই, এই কাজ অদ্ভুত --
কারণ এই জমে যাওয়া দীঘি আর বনের মধ্যপথে,
কাছে নেই কোনো খামারবাড়িও, থেমেছি তবুও আমি,
থেমেছি এখানে বছরের এই সবচে' আঁধার সাঁঝে।
সে-প্রাণীটি যেন গলার ঘন্টা বাজিয়ে জানতে চায় --
হঠাৎ এখানে থেমে গেছি কেন, ভুল কি হয়েছে কিছু!
ঘন্টার সেই ধ্বনি ছাড়া শুধু আওয়াজ আসে শনশন--
ধেয়ে আসে খোলা হাওয়া, তার সাথে নরম বরফকুচি!
কী চমৎকার এ অরণ্যানী - গভীর আর সুনিবিড়!
কিন্তু এখনো হয়নি পূরণ আমার শপথগুলোর --
ঘুমোবার আগে এখনো আমাকে যেতে হবে বহু পথ ,
ছুটতে হবে যে আমাকে এখনো অনেক অনেক দূর!
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
অচেনা কুসুম। মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্ট (১৮৭৪- ১৯৬৩) রচিত 'Stopping by Woods on a Snowy Evening' কবিতার অনুবাদ। রচনাকাল ২০২০। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
এই বনভূমি কার -- সেই কথা মনে হয় আমি জানি;
যদিও গ্রামের ভেতরেই তার রয়েছে বসতবাড়ি,
সে তো আজ দেখবে না, যেতে যেতে এখানে থেমেছি আমি,
দেখছি কেমন বরফে বরফে ভরে গেছে তার এ বন!
আমার এই ছোট ঘোড়া ভাববেই, এই কাজ অদ্ভুত --
কারণ এই জমে যাওয়া দীঘি আর বনের মধ্যপথে,
কাছে নেই কোনো খামারবাড়িও, থেমেছি তবুও আমি,
থেমেছি এখানে বছরের এই সবচে' আঁধার সাঁঝে।
সে-প্রাণীটি যেন গলার ঘন্টা বাজিয়ে জানতে চায় --
হঠাৎ এখানে থেমে গেছি কেন, ভুল কি হয়েছে কিছু!
ঘন্টার সেই ধ্বনি ছাড়া শুধু আওয়াজ আসে শনশন--
ধেয়ে আসে খোলা হাওয়া, তার সাথে নরম বরফকুচি!
কী চমৎকার এ অরণ্যানী - গভীর আর সুনিবিড়!
কিন্তু এখনো হয়নি পূরণ আমার শপথগুলোর --
ঘুমোবার আগে এখনো আমাকে যেতে হবে বহু পথ ,
ছুটতে হবে যে আমাকে এখনো অনেক অনেক দূর!
*********************
দেড়শো বছরের পুরানো চশমা
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
চটজলদি। দেবরাজ গোস্বামীর আঁকা একটি ছবি দেখে। রচনাকাল ২০১৯। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
চশমা কোথায় খুঁজছ বাপু,
দেখবে কী আর চশমা দিয়ে ?
তার চে' ভালো, অন্ধ থাকো-
অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে!
সত্য প্রেম আর অহিংসাকে
এই ভারতে খুঁজবে তুমি ?
সহিষ্ণুতা উধাও যে আজ --
আজকে ভারত মিথ্যাভূমি!
এদেশে আজ হা-রামরাজ্য
ভাই এখানে ভাইয়ের বৈরী --
'স্বচ্ছ ভারত' ধুয়ো তুলে
নষ্ট ভারত হচ্ছে তৈরি!
চশমা তোমার হারিয়ে গেছে
নেতার হাটে, ভোটের জোটে--
সে চশমা হায় ঠাঁই পেয়েছে
আজকে শুধু টাকার নোটে!
পুরানো সেই চশমা তোমার
আজ যে অচল - তার চে' ভালো,
রং-বেরং-এর পরকলা নাও -
দেখবে সাদা সকল কালো!
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
চটজলদি। দেবরাজ গোস্বামীর আঁকা একটি ছবি দেখে। রচনাকাল ২০১৯। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
চশমা কোথায় খুঁজছ বাপু,
দেখবে কী আর চশমা দিয়ে ?
তার চে' ভালো, অন্ধ থাকো-
অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে!
সত্য প্রেম আর অহিংসাকে
এই ভারতে খুঁজবে তুমি ?
সহিষ্ণুতা উধাও যে আজ --
আজকে ভারত মিথ্যাভূমি!
এদেশে আজ হা-রামরাজ্য
ভাই এখানে ভাইয়ের বৈরী --
'স্বচ্ছ ভারত' ধুয়ো তুলে
নষ্ট ভারত হচ্ছে তৈরি!
চশমা তোমার হারিয়ে গেছে
নেতার হাটে, ভোটের জোটে--
সে চশমা হায় ঠাঁই পেয়েছে
আজকে শুধু টাকার নোটে!
পুরানো সেই চশমা তোমার
আজ যে অচল - তার চে' ভালো,
রং-বেরং-এর পরকলা নাও -
দেখবে সাদা সকল কালো!
*********************
বছরশেষের মধ্যরাতের সোচ্চারচিন্তা
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
চটজলদি। নতুন বছরের শুভেচ্ছা। রচনাকাল ২০২০। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
নতুন বছর এসে গেছে,
রাত্রি এখন সোয়া বারো,
ভাবছি, সবাই সুখে থাকুক
সক্কলের হোক পোয়া বারো!!
যার কিছু নেই, সেও কিছু পাক,
না যাক কিছু খোয়া কারো-
দু হাতে যার মোয়া আছে,
সেও যেন পায় মোয়া আরো!
আমার মতো অকম্মা যে,
থাক ফেসবুক, হোয়া তারও-
বন্ধুরা কন, সুস্থ থাকো,
রাত্রি করে শোয়া ছাড়ো!
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
চটজলদি। নতুন বছরের শুভেচ্ছা। রচনাকাল ২০২০। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
নতুন বছর এসে গেছে,
রাত্রি এখন সোয়া বারো,
ভাবছি, সবাই সুখে থাকুক
সক্কলের হোক পোয়া বারো!!
যার কিছু নেই, সেও কিছু পাক,
না যাক কিছু খোয়া কারো-
দু হাতে যার মোয়া আছে,
সেও যেন পায় মোয়া আরো!
আমার মতো অকম্মা যে,
থাক ফেসবুক, হোয়া তারও-
বন্ধুরা কন, সুস্থ থাকো,
রাত্রি করে শোয়া ছাড়ো!
*********************
প্রচ্ছদ-দুর্গা
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
চটজলদি। পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলার প্রচ্ছদ অবলম্বনে। রচনাকাল ২০২১। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
★ সপ্তমী : আগমনী
সুনীলবরণ আকাশে ওই ভাসছে মেঘের ভেলা,
সোনা-রোদে হাসছে ভুবন, কাশ ফুটেছে মেলা!
শরতে আজ কোন অতিথি এল আলোয় নেয়ে !
উমা এলো বাপের ঘরে সঙ্গে ছেলে মেয়ে।
কোলের খোকা গণেশ, সে যে বড়ই সরলমতি,
একতারাতে আগমনী গাইছে সরস্বতী!
লক্ষ্মীর হাতে ধানের ছরা, ধনুক কাতুর হাতে-
এ রূপ দেখে গিরিরানীর মন খুশিতে মাতে!
★ অষ্টমী : দুগ্গাপরিবারের বঙ্গদর্শন
(শ্রীমান কার্তিককুমার ষড়ানন রচিত)
মনে করো যেন পুজোর ট্যুরে
কলকাতাটা দেখছি মোরা ঘুরে।
যাচ্ছি মোরা জুড়িগাড়ি চড়ে
সবাই মিলে আনন্দে হুল্লোড়ে।
আমি যেন মা, গাড়ির কোচোয়ান,
লাগাম হাতে, বুকখানা টানটান!
গুনগুনিয়ে গণেশ ধরে গান--
পথের শোভা দেখছে দু চোখ ভরে॥
সরস্বতী ফোন-ক্যামেরা খুলে
সেসব শোভা রাখছে তাতে ধরে!
ওই দেখা যায় ভিক্টোরিয়ার বাড়ি,
এবার তবে থামাই জুড়িগাড়ি।
নামো সবাই, বলছি আমি হেঁকে,
তোমরা সবাই নামছ একে একে।
গণশা দেখি স্মার্ট যে সবার থেকে,
সামলে কোঁচা নামল তাড়াতাড়ি!
তুমিও মা নামো দেখি এবার,
লক্ষ্মীদিদি হাতটা ধরুক তোমার!
সরস্বতীর নেই দেখি খুব তাড়া
ধীরে সুস্থে নামবে সে বেচারা!
ঘুরব মোরা এ পাড়া ও পাড়া
দুই বোনেতে নামলে সবার শেষে॥
দেখব সবই আজ যা কিছু আছে
দর্শনীয় মামাবাড়ির দেশে॥
বসব শেষে সবাই গড়ের মাঠে
ফুচকা খাব, পেটে যত আঁটে।
ফেরার পথে মানুষের ভিড় ঠেলে
মারব উঁকি দু চারটা প্যান্ডেলে,
ধীরে ধীরে রাত্রি নেবে এলে
মহানন্দে ফিরব ঘরে মোরা --
তুমি বলবে, "ভাগ্যে কাতু ছিল,
তাইতো হল এমন দারুণ ঘোরা!"
★ নবমী : করোনা সংহার পাঁচালি
কলিকালে ধরাধামে করোনা-অসুর নামে
দানব এক হৈল উদয়।
বিপন্ন মানবদল তার কোপে হীনবল
অন্তরে সদাই মৃত্যুভয়!
বিশ্বব্যাপী মহামারী স্বাস্থ্যবিধি করি জারী
তবু তারে রোখা নাহি যায়!
কৈলাস শিখর 'পরে গৌরী কন মহেশ্বরে
কহ নাথ কী হবে উপায়!
করোনাসুরের হাতে মরে যদি অপঘাতে
বিশ্ব জুড়ে ভক্তেরা আমার!
কহ দেব কহ তবে কী করে সম্ভব হবে
বিশ্বে মম পূজার প্রসার!.
মহাদেব বারেবারে সান্ত্বনিয়া কন তাঁরে,
হে প্রিয়ে, এ চিন্তা তব মিছে ।
তব আবির্ভাব তরে চেয়ে দেখ ভক্তিভরে
বিশ্ববাসী অপেক্ষা করিছে!
সমাগত শারদীয়া পূজা, পুত্রকন্যা নিয়া
ধরাধামে হও গো অবতীর্ণ,
তেজ সর্ব দেবতার পুঞ্জিত দেহে তোমার
করোনার বক্ষ কর দীর্ণ!
এতেক শুনিয়া তেজে দেবী রণসাজে সেজে
অবতীর্ণা হৈলেন এই বঙ্গে,
হের শোভা চমৎকার, চারি পুত্রকন্যা তাঁর
যথারীতি আসিল তাঁর সঙ্গে!
দেখিয়া করোনা-অরি প্রচন্ড ত্রিশূল ধরি
রণরঙ্গে মাতেন ভবানী,
গণপতি পুত্র তাঁর ভাইরাসে করে প্রহার
তুলিয়া সে ভীম গদাখানি!
অন্য পুত্র কার্তিকেয় কম নাহি যায় সেও
উঠায়ে নিজের ধনু:শর
অন্তরীক্ষ লক্ষ্য করে ঘনঘন তীর ছোঁড়ে
অদৃশ্য সেই ভাইরাসের উপর!
সরস্বতী ভগ্নী তার হস্তেতে স্যানিটাইজার
শত্রু'পরে করিছে সিঞ্চন,
লক্ষ্মী ভাবে ঝাঁপি ধরি, আমি এক কাজ করি,
রুগ্নজনে বিতরিব ধন!
কী করিয়া তাড়াতাড়ি কাবু হৈল অতিমারী
হোক সেই রহস্যভঞ্জন --
দেবীমাহাত্ম্যকথন শুনে সর্ব ফেবু-জন--
ভনে কবি অলকরঞ্জন!
*********************
কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী
চটজলদি। পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলার প্রচ্ছদ অবলম্বনে। রচনাকাল ২০২১। মিলনসাগরে প্রকাশ - মহালয়া, ১৪.১০.২০২৩।
★ সপ্তমী : আগমনী
সুনীলবরণ আকাশে ওই ভাসছে মেঘের ভেলা,
সোনা-রোদে হাসছে ভুবন, কাশ ফুটেছে মেলা!
শরতে আজ কোন অতিথি এল আলোয় নেয়ে !
উমা এলো বাপের ঘরে সঙ্গে ছেলে মেয়ে।
কোলের খোকা গণেশ, সে যে বড়ই সরলমতি,
একতারাতে আগমনী গাইছে সরস্বতী!
লক্ষ্মীর হাতে ধানের ছরা, ধনুক কাতুর হাতে-
এ রূপ দেখে গিরিরানীর মন খুশিতে মাতে!
★ অষ্টমী : দুগ্গাপরিবারের বঙ্গদর্শন
(শ্রীমান কার্তিককুমার ষড়ানন রচিত)
মনে করো যেন পুজোর ট্যুরে
কলকাতাটা দেখছি মোরা ঘুরে।
যাচ্ছি মোরা জুড়িগাড়ি চড়ে
সবাই মিলে আনন্দে হুল্লোড়ে।
আমি যেন মা, গাড়ির কোচোয়ান,
লাগাম হাতে, বুকখানা টানটান!
গুনগুনিয়ে গণেশ ধরে গান--
পথের শোভা দেখছে দু চোখ ভরে॥
সরস্বতী ফোন-ক্যামেরা খুলে
সেসব শোভা রাখছে তাতে ধরে!
ওই দেখা যায় ভিক্টোরিয়ার বাড়ি,
এবার তবে থামাই জুড়িগাড়ি।
নামো সবাই, বলছি আমি হেঁকে,
তোমরা সবাই নামছ একে একে।
গণশা দেখি স্মার্ট যে সবার থেকে,
সামলে কোঁচা নামল তাড়াতাড়ি!
তুমিও মা নামো দেখি এবার,
লক্ষ্মীদিদি হাতটা ধরুক তোমার!
সরস্বতীর নেই দেখি খুব তাড়া
ধীরে সুস্থে নামবে সে বেচারা!
ঘুরব মোরা এ পাড়া ও পাড়া
দুই বোনেতে নামলে সবার শেষে॥
দেখব সবই আজ যা কিছু আছে
দর্শনীয় মামাবাড়ির দেশে॥
বসব শেষে সবাই গড়ের মাঠে
ফুচকা খাব, পেটে যত আঁটে।
ফেরার পথে মানুষের ভিড় ঠেলে
মারব উঁকি দু চারটা প্যান্ডেলে,
ধীরে ধীরে রাত্রি নেবে এলে
মহানন্দে ফিরব ঘরে মোরা --
তুমি বলবে, "ভাগ্যে কাতু ছিল,
তাইতো হল এমন দারুণ ঘোরা!"
★ নবমী : করোনা সংহার পাঁচালি
কলিকালে ধরাধামে করোনা-অসুর নামে
দানব এক হৈল উদয়।
বিপন্ন মানবদল তার কোপে হীনবল
অন্তরে সদাই মৃত্যুভয়!
বিশ্বব্যাপী মহামারী স্বাস্থ্যবিধি করি জারী
তবু তারে রোখা নাহি যায়!
কৈলাস শিখর 'পরে গৌরী কন মহেশ্বরে
কহ নাথ কী হবে উপায়!
করোনাসুরের হাতে মরে যদি অপঘাতে
বিশ্ব জুড়ে ভক্তেরা আমার!
কহ দেব কহ তবে কী করে সম্ভব হবে
বিশ্বে মম পূজার প্রসার!.
মহাদেব বারেবারে সান্ত্বনিয়া কন তাঁরে,
হে প্রিয়ে, এ চিন্তা তব মিছে ।
তব আবির্ভাব তরে চেয়ে দেখ ভক্তিভরে
বিশ্ববাসী অপেক্ষা করিছে!
সমাগত শারদীয়া পূজা, পুত্রকন্যা নিয়া
ধরাধামে হও গো অবতীর্ণ,
তেজ সর্ব দেবতার পুঞ্জিত দেহে তোমার
করোনার বক্ষ কর দীর্ণ!
এতেক শুনিয়া তেজে দেবী রণসাজে সেজে
অবতীর্ণা হৈলেন এই বঙ্গে,
হের শোভা চমৎকার, চারি পুত্রকন্যা তাঁর
যথারীতি আসিল তাঁর সঙ্গে!
দেখিয়া করোনা-অরি প্রচন্ড ত্রিশূল ধরি
রণরঙ্গে মাতেন ভবানী,
গণপতি পুত্র তাঁর ভাইরাসে করে প্রহার
তুলিয়া সে ভীম গদাখানি!
অন্য পুত্র কার্তিকেয় কম নাহি যায় সেও
উঠায়ে নিজের ধনু:শর
অন্তরীক্ষ লক্ষ্য করে ঘনঘন তীর ছোঁড়ে
অদৃশ্য সেই ভাইরাসের উপর!
সরস্বতী ভগ্নী তার হস্তেতে স্যানিটাইজার
শত্রু'পরে করিছে সিঞ্চন,
লক্ষ্মী ভাবে ঝাঁপি ধরি, আমি এক কাজ করি,
রুগ্নজনে বিতরিব ধন!
কী করিয়া তাড়াতাড়ি কাবু হৈল অতিমারী
হোক সেই রহস্যভঞ্জন --
দেবীমাহাত্ম্যকথন শুনে সর্ব ফেবু-জন--
ভনে কবি অলকরঞ্জন!
*********************
