কবি অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের পরিচিতির পাতায় . . .

উনিশশো অষ্টনব্বুই প্রায় বাহাত্তর বছর পর
কবি অরিন্দম মুখোপাধ্যায়
কবির ২০০৫ সালে প্রকাশিত "জীর্ণ ডায়েরির পাতা থেকে" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৮.২০২৩।

উনিশশো অষ্টনব্বুই প্রায় বাহাত্তর বছর পর
ঘুম ভাঙা চোখ মেলতেই দেখতে পেলাম
সমুদ্রের জলে পড়ে আছে তোমার রঙিন সিল্কের শার্ট
বাতাস যেন প্রহরীর মতো ফিরিয়ে দিচ্ছে সূর্যের লোলুপ দৃষ্টি
আর তার ফলে একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে
তোমার স্কার্ফে তারাদের নিপুন কারুকাজ
এই সব দেখে আনন্দ উচ্ছ্বাসে নেচে উঠছে মাটির শরীর;
তুমি দেখো অন্তত একবার চোখ মেলে দেখো
চারপাশে সংসার পেতে বসা মাছেরাও বউ-বাচ্চা নিয়ে
প্রচণ্ড উল্লাসে মদের ফোয়ারা তুলে
আকাশী নীল রাস্তা হেঁটে পার হয়ে যাচ্ছে
ফলে দীর্ঘতর হয়ে যাচ্ছে তাদের ছায়া
এমনকি দেবতাদের চেয়েও বড়

এই পর্যন্ত বলে একজন জার্মান কবি ডান হাত তুলে বললেন
আমি চললাম বন্ধুগন, কিন্তু আপনারা সতর্ক থেকে লক্ষ রাখুন
ফিরে না আসা পর্যন্ত সমুদ্রে ফেলে আসা পায়ের ছাপ
মাছেরা যেন মুছতে না পারে।

*********************









*

আহিরী টোলার গান শোনো
কবি অরিন্দম মুখোপাধ্যায়
কবির ২০০৫ সালে প্রকাশিত "জীর্ণ ডায়েরির পাতা থেকে" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৮.২০২৩।

আহিরী টোলার গান শোনো
জলে পূর্ণিমার চাঁদ যেন ব্যালেরিনা
#
বসন্ত বাতাসে রঙ
দূরে ভেসে যায় মন ভেসে যায় দূর
        বিশ্বব্যাপি
    মেলে দেয় শান্ত দুটো হাত
আকাশ ছাড়িয়ে জ্বলে অযুত নক্ষত্র
    চোখ বুজে দেখো গর্ভ-গৃহ
#
দেখো রূপ দেখো ছায়াপথ, জলে নাচে
    ব্যালেরিনা

*********************









*

স্বপ্নে কমলা রঙের ম্যাপেল পাতা আমি দেখেছি
কবি অরিন্দম মুখোপাধ্যায়
কবির ২০১০ সালে প্রকাশিত "এক প্রেমিকের আত্মকথন" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৮.২০২৩।

স্বপ্নে কমলা রঙের ম্যাপেল পাতা আমি দেখেছি
গ্রীষ্মের ভোরের গায়ে সেদিন রঙ লেগে গিয়েছিলো
ঝড়ে পাক খাওয়া ধূলোর মতো পাকে পাকে, রঙ লেগে গিয়েছিলো
শান্ত শীতের সাদা বরফ ঝরে যাওয়ার পর
উড়তে থাকা হলুদ পাখির ডানায় ভেসে যেতে যেতে…….

স্বপ্নে কমলা রঙের ম্যাপেল পাতা আমি দেখেছি

দূরে, যেখানে বাশির স্বর হয়ে আসে ক্ষীণ
সেই কবেকার বিস্তীর্ন পড়ে থাকা মাঠে
সদ্য তরুনীরা নিঝুম পায়ে আসতো সেখানে
তারপর তার বাহার বুকে মেখে বাতাসে মেলে দিত হাত…….

স্বপ্নে কমলা রঙের ম্যাপেল পাতা আমি ঝ’রে যেতে দেখেছি
যেন হাজার হাজার সূর্যাস্ত, পড়ে আছে ঘাসের উপর

*********************









*

ওভাবে চোখ দুটো নামিয়ে রেখোনা
কবি অরিন্দম মুখোপাধ্যায়
কবির ২০১০ সালে প্রকাশিত "এক প্রেমিকের আত্মকথন" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৮.২০২৩।

ওভাবে চোখ দুটো নামিয়ে রেখোনা
চৈত্র মাসের শেষ পড়ে আসা বসন্তের বেলা
চোখ নামিয়ে রেখোনা ;
কোমল দৃষ্টির ফলায় আমাকে বিদ্ধ করো
বিদ্ধ করো, যেভাবে উজ্জ্বল পূর্ণিমার রাত
আলোর তীর, বল্লম ছোড়ে তারায় তারায়
যেভাবে বসন্ত বাতাস ছুঁড়ে দেয় আবীর তরঙ্গে তরঙ্গে
বিদ্ধ করো আমার এই অস্থির আবেগ
তোমার কিশোরী রাত্রির গানে।

*********************









*

আপাত দৃষ্টিতে অনেক কিছুই বোকা বোকা লাগে
কবি অরিন্দম মুখোপাধ্যায়
কবির ২০১০ সালে প্রকাশিত "এক প্রেমিকের আত্মকথন" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৮.২০২৩।

আপাত দৃষ্টিতে অনেক কিছুই বোকা বোকা লাগে
হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে যাওয়া রাস্তার মাঝখানে
নিভৃতে হৃদয়ে মাঝে ফুটে ওঠা মুখ, উজ্জ্বল হাসি
কোন কিছু দেখতে দেখতে হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টি
কিম্বা অবুঝ দৃষ্টি নিয়ে তলিয়ে যেতে যেতে
তখন সজোর ধাক্কাও কোন রকম গ্রাহ্য হয় না

শুধু ফ্যাল ফ্যাল ক’রে চেয়ে থাকা বোকা মুখ
বেবাক পৃথিবীকে মন্ত্রমুগ্ধ ক’রে দেয়
দূর থেকে ভেসে আসা এসরাজের সুরে
জমাট বেঁধে থাকা একরাশ ঠাণ্ডা বাতাস
            মন্ত্রমুগ্ধ ক’রে দেয়
সেই দূরে হয়তো তাদের বসবাস ছিল
সহজ সরল এক ডুবে যাওয়া ছিলো বোকার মতো

তবু একবার তুমি এমন এক প্রেমিকের বোকা মুখ
তোমার কোমল দুটো হাতে শান্ত তুলে ধ’রো
যা নিখাদ কান্নার মতো সরল।

*********************









*

হয়তো আলোর আকাশ ছড়িয়ে গিয়েছিলো দৃষ্টির বাইরে
কবি অরিন্দম মুখোপাধ্যায়
কবির ২০১০ সালে প্রকাশিত "এক প্রেমিকের আত্মকথন" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৮.২০২৩।

হয়তো আলোর আকাশ ছড়িয়ে গিয়েছিলো দৃষ্টির বাইরে
ধীরে ধীরে নেমে আসা কোন এক চৈত্র পূর্ণিমা
সফেদ ওড়না ফেলে রেখে ছুয়ে গিয়েছিলো কারোর হৃদয়
ফুলের গন্ধে মিশে মিশে গিয়েছিলো প্রতিটি আনাচে কানাচে।

আজও চৈত্র পূর্ণিমার রাত
যদি তুমি একবার শান্ত চোখ তুলে তাকাতে
যদি তুমি চুল খুলে দিয়ে বাড়িয়ে ধরতে চাইতে হাত
হয়তো ছড়িয়ে যেতো আলো
আলোর আকাশ হয়ে যেতো দৃষ্টির এপার ওপার
তোমার ফেলে যাওয়া ওড়নার মতো ......... সাদা

*********************









*

কাঁচের ওপাশে বৃষ্টির ফোঁটারা ক্লান্ত ধীরে নামে
কবি অরিন্দম মুখোপাধ্যায়
মিলনসাগরে এই পাতা প্রকাশ-কালে ১৪.৮.২০২৩ তারিখে, কবির প্রকাশিতব্য "সংস অফ স্প্যারো’স" কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

চের ওপাশে বৃষ্টির ফোঁটারা ক্লান্ত ধীরে নামে
যে বৃষ্টি আমাকে ভিজিয়ে জমাট বেঁধে ছিলো বহুদিন কাঁচের এপাশে
অনেক দিনের গান আমার মায়ের মুখে শুনেছি হয়তো দু-একবার
শিশির চাদর ফেলে ঘাসে চলে গেছে শীতের দিন হঠাৎ
নিজেকে একলা করে দিয়ে মাঠের কিনারে, আমি দূর থেকে দেখতাম
আমাদের পিতামহ চড়াই পাখিদের জন্য আনন্দের গান গাইতেন

প্রায় বিস্মৃত মাটির পৃথিবীর স্বাদ, প্রত্যেকটি জিনিস, আসবাবপত্র, লতা, বৃক্ষ আর পাথরগুলো। দলনেতা বদলে রাজা বা ফ্যারাও, ফ্যারাও বদলে রাষ্ট্রনেতা, ঘুরে ফিরে বিষয়টা একই। হিংস্রতা রক্তের বদলে ফুলের ফোয়ারা ঝরাতে পারবেনা কোনদিন। তাহলে আকাশে বাতাসে সেতারে বসন্ত বাহার শোনা যেত, আর কিনিয়ার স্কুল পড়ুয়ারা ধষির্ত, রক্তাক্ত বাঁচাতো না। কৃষকের তেজস্বী লাঙলের ফলায় পৃথিবী ব্যাপ্ত সবুজ পাতার সুমিষ্ট বাতাস ফুসফুস ভরা আতরের গন্ধে সারাজেভোর নিরীহ মানুষরা বিভোর হয়ে থাকতো। বারুদের গন্ধ কখনো সবুজ বাতাস হতে পারে না। নিথর সন্তানের দেহ দুহাতে তুলে আশ্রয়ের খোঁজে পালাতে চাওয়া প্যালেস্তানীয় মা, আমাকে ক্ষমা করুন। বাঁচাতে পারিনি প্রাণ মানুষের অহংকারে। প্রেমিকাকে আর গোলাপের তোরা নয়, দেবো AK 47 আর কার্তুজের মালা।

দিনের শুরুর সব গান বুকের ভিতর থেকে ওরা তুলে আনে
তারপর সারাদিন ধরে ঘুরে ফিরে চারিপাশে
আমাদের ছোট ছোট ঘরে বাড়ি, তারা ভরা রাত্রি
অজানা কারণ তবু হঠাৎ সন্তানেরা ডুকরে কেঁদে ওঠে
প্রচন্ড বিকট শব্দে রক্তে রক্তে ভরে ওঠে পাঁচিল দেয়াল
আমাদের ভালোবাসা, শান্ত কবিতার কথা, প্রেমিকার নিশ্বাস প্রশ্বাস

কাঁচের ওপাশে বৃষ্টির ফোঁটারা ক্লান্ত ধীরে নামে
আমাদের পিতামহ চড়াই পাখিদের জন্য আনন্দের গান গাইতেন।

*********************









*

যে বাচ্ছা মেয়েটা আমার সামনে হাত নেড়ে গেল
কবি অরিন্দম মুখোপাধ্যায়
মিলনসাগরে এই পাতা প্রকাশ-কালে ১৪.৮.২০২৩ তারিখে, কবির প্রকাশিতব্য "সংস অফ স্প্যারো’স" কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

যে বাচ্ছা মেয়েটা আমার সামনে হাত নেড়ে গেল
তাকে কি আমি দেখেছি কখনো ধারে কাছে কিংবা
আমার বাড়ির দু একটা বাড়ি পরে অথবা পাড়ায়
তা না হলে যতদূর মনে পড়ে মৌরীগ্রামের খোলা মাঠে
যেখানে বহু বছর আগে হঠাৎই একদিন চলে গিয়েছিলাম
চোখে প্রাচীন ব্যাবিলন আর তার সাজানো বাগান
বাচ্ছা মেয়েটাই কি সেদিনও এমনি ভাবে হাত নেড়েছিল?
এর উত্তর হ্যাঁ অথবা না দুটোই সম্ভবত হতে পারে
কেননা যেখানে দেশ কাল সব মিলেমিশে একাকার
এখনো মিশর পেড়িয়ে রাইন নদীর ধারে অথবা ভেনিস
ঘোড়ার পিঠে চড়ে গ্রীসের রাজকুমারি নিঃশব্দে
আঙুল ইশারায় মোহগ্রস্থ নেশার ঘোর লেগে গিয়েছিল
তারপর বহুদিন, বহুযুগ পরে আজ আবার
বাচ্ছা মেয়েটা আমার সামনে হাত নেড়ে চলে গেল
পিছনে পড়ে রইল মৌরীগ্রাম, ব্যাবিলন, রাইন,
মিশরের মঠোপথ তার আল ধরে নামা সূর্যের আলো
ছুটে যাওয়া ঘোড়ার রেখা-পথ
আমি হাটে বাজারে অনেকবার খুঁজে দেখেছি
ঝোড়ো চুল আর মুখে ধুলো মাখা মেঠো হাসি
এভাবেই তার অবয়ব আঁকেন ছবি আঁকিয়েরা
ক্যানভাস রঙ তুলি আরো নানা ধরনের যন্ত্রপাতি
ছবির দেশ ছেড়ে চলে গেছি আবার অন্য কোনোখানে
কেনোনা সেখানেও মোহগ্রস্থ আঙুল ইশারায়
বাচ্ছা মেয়েটা আমার সামনে হাত নেড়ে চলে যায়।

*********************









*

দুচোখ ভ’রে দ্যাখো শুভ্র অরণ্য সুজাত
কবি অরিন্দম মুখোপাধ্যায়
মিলনসাগরে এই পাতা প্রকাশ-কালে ১৪.৮.২০২৩ তারিখে, কবির প্রকাশিতব্য "সংস অফ স্প্যারো’স" কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

দুচোখ ভ’রে দ্যাখো শুভ্র অরণ্য সুজাত
এক মনে কে যেন বাজায় লোলিত পঞ্চম
দেহাতি মন বাঁধে ছ-অঙ্গে মায়াবী নিষাদ
আকাশ সমুদ্র নীলে সাদা পাখিদের ঝাঁক
শুনেছি কার এক লেখা আছে হাঁসুলির বাঁক
তাদের গল্পরা জমে ওঠে কথায় কথায়
সৃজন আলো চোখে উজ্জ্বল মূর্তি তোমার
হৃদয়ে শত হৃদয়ের শিকড় লতা জড়িয়ে
জেনেছি মন অন্তরের, গহন আত্মায়
জন্ম ঘুমে মৃত্যু শ্বেত পত্রে সাক্ষর
#
দুচোখ ভ’রে দ্যাখো শুভ্র অরণ্য সুজাত
এক মনে কে যেন বাজায় লোলিত পঞ্চম

*********************