কবি বোরহানুল ইসলাম লিটন এর কবিতা
*
কবি বোরহানুল ইসলাম লিটন এর পরিচিতির পাতায় . . .
স্বপ্নিল নদীর ধারা
কবি বোরহানুল ইসলাম লিটন

একটা নদীর প্রেমে হাবুডুবু খাই
স্বপনে সম্মুখে পাই তারে শুধু আমি,
গভীর মায়াবী তার টলটলে জল
দানে এ’ হৃদয়ে আশা বুঝি তা নিশ্চিত
হীরকের চেয়ে নয় গুণে মানে কিঞ্চিত অদামী।

দেখতে দু’অক্ষি ভরে লহরির খেলা
চন্দ্রের আহ্বানে একা ওই বুকে বেয়ে চলি তরী,
জোছনার ধারে এনে রূপালী আবাস
আমাকে তখন যাচে চুপিসারে সেই বিভাবরী।

বুঝাতে পারি না আমি ক্ষীণ ভাষা দিয়ে
কেমনে বেড়ায় ভেসে স্রোতের সে’ সুর,
তবু রচি আনমনে হয়তো বা হবে
অভিসারিণীর কোন সাজা দেয়া রূপালী ঘুঙুর।

খুব উদ্বেলিত হই দেখে তার রূপ
খুশিতে হৃদয়ে গাঁথি কাঙ্খিত এ’ ছিরি,
পাশেই যখন দেখি জেগে আছে এক
জোড়া ডাহুকের ডাকে চির চেনা স্নিগ্ধ ধানসিঁড়ি।

*************************************








*
সবাই আমায় ভাববে জানি
কবি বোরহানুল ইসলাম লিটন

সবাই আমায় ভাববে জানি
যেদিন আমি থাকবো না,
ডাক দিয়ে ফের আপন মেনে
মায়ার জালে বাঁধবো না।

গাইবো না গান শ্যামল বাটে
অবাক দু’টি চোখ মেলে,
ছুটবো না আর আজান শুনে
গল্প আসর সব ফেলে।

ডাক দিবো না মা মা বলে
ফিরেই বাড়ি সাঁঝ বেলা,
বকবো না ’আয় কই রে খুকি
পড়তে করিস ক্যান হেলা!’

চাইবো না ঢেউ ছন্দে নাচুক
নীল গগনের রঙ মেখে,
বলবো না আজ খসুক তারা
জোনাক বাতির রূপ দেখে।

জল ফেলে কেউ যতোই যাচুক
কাব্য ছড়া লিখবো না,
সবাই আমায় ভাববে জানি
যেদিন আমি থাকবো না।

*************************************








*
গোধূলির আঁখি
কবি বোরহানুল ইসলাম লিটন

এখনো রয়েছে পাটে লাজে রাঙা বেলা
ষোড়শী মেঘেরা করে লুকোচুরি খেলা,
বুকের পাঁজরে পুষে প্রেম ঝরা জ্যোতি
সেজেছে এ কোন রূপে নীলিমার মতি!

এ কি অপরূপ আহা অরুণের দানা!
মায়াবী সবুজ ক্ষেত খুঁটে মেলে ডানা,
গা-ঘেঁষা কোমল বায়ে গান গায় পাখি
‘আয় কে দেখবি আজি গোধুলির আঁখি!’

নিবিড় ছায়ায় ভাবে কবুতর জোড়া,
ক্যামনে গো-ছাগ পেলো বাঈজির তোড়া!
শুধায় তৃষিত চিল লহরীরে ডেকে
‘দেব কি বুকে রে তোর তারা শশী এঁকে?’

ঘোলা চোখে ভোলা বসে খুঁজে তকদির,
ব্যাকুল ধুলিরা চষে আঁধারের নীড়।

*************************************








*
হুঁশের আড়ে
কবি বোরহানুল ইসলাম লিটন

খোঁজ করে কে ক্যামনে বাঁচে
চিন্তনের হুঁশ?
জন্ম নিয়েই আমরা তো ভাই
সবাই মানুষ।

ভবের বুকে সখ্য সুরের
গড়ে মেলা,
স্বপ্ন আশার পসরা মেলে
গুনছি বেলা।

তবু ভাবি সবাই জ্ঞানী
আপন তেজে,
চোখ বেঁধে রোজ কানামাছির
বুড়ি সেজে।

থাকবো না কেউ এই দুনিয়ায়
জেনেই খাঁটি,
চলছে গো তাই মিথ্যা মায়ার
ঝগড়া ঝাঁটি।

*************************************








*
হৃদয়ের আকাশ
কবি বোরহানুল ইসলাম লিটন

আমার হৃদয় হয় না পয়োদ হারা
পাশেই উড়ে চিলের আহাজারি,
ক্ষণ-প্রতিক্ষণ বয়ে দুখের ধারা
সেই আকাশটা ভীষণ নীলের বাড়ি।

দিনে ক্ষণিক সূর্য ‍দিলে দেখা
রাত্রে শশীর ঘোমটা থাকে বেঁকে,
ব্যঙ্গ সুরে বিজলী আঁকে রেখা
যায় যখনি ঘোর আঁধারে ঢেকে।

চাইলে দিতে স্নিগ্ধ পরশ মাখি
হিমেল বায়ু বৃষ্টি থামার শেষে,
ফের মেলে না তবু সতেজ আঁখি
রামধনু আজ খিল খিলিয়ে হেসে।

পাক-প্রকৃতি দেখে বেহাল দশা
দিলেই কভু সবুজ আঁচল পাতি,
হঠাৎ খসে ঋক্ষ করে গোসা
কাড়তে শুধুই সলতে হারা বাতি।

*************************************








*
স্বপ্ন এঁকো
কবি বোরহানুল ইসলাম লিটন

খুব বিকেলে নিরজনে
আমার কথা পড়লে মনে
সজ্জিত সেই মেঘের বুকে স্বপ্ন এঁকো!
কাঁচা ধানের চুষে দানা
ঘাস ফড়িংটা মেললে ডানা
দামাল ক্ষেতের আস্তরণে স্বপ্ন এঁকো!

রাখালিয়া বাঁশির ভাষা
চষলে গো ছাগ ভেড়ার আশা
গামছা বাঁধা চাষির মাথে স্বপ্ন এঁকো!
অস্তাচলের ব্যাকুল পাখি
ঢাকলে বাটের কাজল আঁখি
‘বিদায়’ বলে ভানুর ভালে স্বপ্ন এঁকো!

ঝিঁঝিঁ ডাকা ঝোপের আড়ে
জ্বললে জোনাক বারে বারে
পিদিম হারা সাঁঝের দোরে স্বপ্ন এঁকো!
খেঁক শিয়ালের নীরস ডাকে
ঢুললে শশী পাতার ফাঁকে
ছন্দে চলা নদীর বুকে স্বপ্ন এঁকো!

*************************************








*
পারি না আমি
কবি বোরহানুল ইসলাম লিটন

হাসতে পারি না আজো পলাশের মতো
দখিনা সমীরে শাখে আড়াআড়ি দুলে,
পারি না কলমি ফুল গুঁজতে সোহাগে
ষোড়শী মেঘের ঘন কোঁকড়ানো অগোছালো চুলে।

দূর্বা ঘাস ডাক দিলে লাজে রাঙা প্রাতে
শানিত মস্তকে রেখে হাস্যোজ্জ্বল শিশিরের কণা,
ভীষণ ব্যাকুলে দেখি আশাহত চোখে
ক্যামনে ডাহুক দানে অবশেষে বেনোজলে লোনা।

পথের দু’পাশে জাগা শিশুগাছ যতো
তৃষ্ণার্ত বৈকাল চষে সদ্ভাবের সাক্ষী হয় যদি,
আহত ক্ষেতের ঠিক ওপারেই মিলে
খুঁজছে ধবল বক অতি চুপিসারে
আছে কি না থেমে গেছে ভেবে সেই টগবগে নদী।

পারি না দেখতে আমি পায়রার নীড়ে
দুষ্টুমীর স্বরে গড়া শালিকের বাঁকা আবেদন,
পারি না দেখতে আমি টলটলে জলে
টাকির সদরে ক’টা খলশের বৃথা আস্ফালন।

*************************************








*
তুই শুধু এনে দে
কবি বোরহানুল ইসলাম লিটন

ফের এসে সেই চাঁদের বুড়ি
যতোই যাচুক দর,
করবো না আর রৌদ্র স্নানে
চিলের পিঠে ভর।

নদীর বুকে উঠুক মেতে
ব্যাকুল আশায় ঢেউ,
চাইবো না এই মনটা সাজুক
আলাদিনের দেউ।

ডাক যদি দেয় বরই তলা
দামাল মেঘের দল,
চাপবো না হয় হুড়কা এঁটে
বুকের কোলাহল।

গড়বো না মা স্বপ্ন বুনে
রঙ মহলের ছাদ,
বাঁশ বাগানের মাথায় শুধু
তুই এনে দে চাঁদ!

*************************************








*
এ’ মন হারাতে চায়!
কবি বোরহানুল ইসলাম লিটন

এ’ মন হারাতে চায় কাজলার ধারে
যেখানে আকাশ থাকে লম্বা কোন তালগাছে বসে,
আরক্ত বরন বলে গোধূলির আঁখি
দোয়েল বাজায় শিস বারে বারে ক্ষীণ আফসোসে।

ঘুরলে ফড়িঙ ছানা লকলকে ঘাসে
অপেক্ষার দড়ি টানা ছাগলকে ছুঁড়ে কিরে আড়ি,
চিলের পাখার পাশে খুঁজবো এ’ আমি
সাদাটে পালকে উড়া পাশাপাশি নীরদের সারি।

নীলিমার রূপ দেখে ফসলের মাঠ
যেখানে স্বপন চষে হেলে-দুলে বলাকার ঝাঁকে,
সূর্যকে বিদায় দিতে এলোকেশী চাঁদ
বিরহে আটকে থাকে চুপিসারে অশ্বত্থের ফাঁকে।

হয়তো কাঁদবে খুব বাঁশরির সুর
ক্ষণিক বাদেই যাবে মিশে ভেবে আঁধারের ক্রোড়ে,
তবুও হারাতে চাই খুব নিরজনে
হলেও শালিক ক’টা ভাঙা চালে ভীরু ধড়ফড়ে।

*************************************








*
আমার গাঁ
কবি বোরহানুল ইসলাম লিটন

আমার গাঁয়ের দুই দিকেতে
নৌকা দুলে নদীর ঘাটে,
অব্দ ভরই ঝির ঝিরে বায়
সবজি নাচে শ্যামল বাটে।

ফুল পাকা ফল সজীব শাখে
পাতার তালে করে খেলা,
ঘাস ফড়িঙের দুষ্টুমিতে
ছাগ ভুলে পথ সাঁঝের বেলা।

সবুজ মাঠেই সূর্য জাগে
যায় ডুবে ফের গাছের আড়ে,
হরেক পাখি গান গেয়ে ক্ষণ
সরস রাখে কাজের সারে।

দিনে ব্যাকুল ঢেউ ধারা রোজ
আশায় গড়ে মেঘের ঘুড়ি,
চাঁদ জোনাকির ঝলকানিতে
রাত হয়ে যায় স্বপ্নপুরী।

*************************************