কবি দীপন মিত্রর কবিতা
*
তুমি যে নিবিড় তাঁত এ বাংলার, নও তো রেশমি
কবি দীপন মিত্র

তুমি যে নিবিড় তাঁত এ বাংলার, নও তো রেশমি
তোমার হাঁসের গন্ধ আমি পাই ঘোর ধাত্রীগ্রামে
সারা রাত ভীত বোনা, ঊষাকালে ক্লান্ত নিদ্রা যাও
তোমার সে মীন-ঘুমে স্বপ্নবৎ কত যে গিয়েছি
হয়তো শরৎ আসবে এমন বোধের গুপ্ত স্নানে
পঞ্চদশ শতাব্দীর রাজবলহাটে দেখি তুমি
এঁকে বেঁকে ছায়াচ্ছন্ন গ্রামপথে গভীর কুটীরে।
আমি কত জন্ম কাটিয়েছি হায় --- তোমাতে শ্রী-লীন
আজ সব ব্যর্থ করে পদচিহ্ন মুছে দিতে চাও
হয় না, হয় না, বক্ষে ধরেছি কালের হংসধ্বনি!

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তোমাকে আসতে হবে জানি আমি, নদী ধারে বাস
কবি দীপন মিত্র

তোমাকে আসতে হবে জানি আমি, নদী ধারে বাস
সাধুসন্ত আসতেন জ্যেতিষিগণের এই ঠেকে
সে সব শতক বর্ষ পূর্বেকার আরেক জগৎ
তোমার মতোই নেশা করতেন সিদ্ধি গাঁজা ভাঙ
মঙ্গলকাব্যের এই ঘাটে তুমি না এসে পারো না
তুষার, ভাস্কর কাছে থাকতেন --- কবিতায় দূরে
তাঁদের ভালোই তুমি জেনেছিলে তাঁরাও মোক্ষম
চিনতেন তোমাকেও আসলে তো সন্ত ছিল তাঁরা
ফাল্গুনী রায়কে মনে পড়ে? তাঁর সংক্রামক হাসি
সক্রেটিস সঙ্গে তাঁর কথোপকথন, বিষ পান
এত শত আরণ্যক আত্মাগুলি দেয় গুণে টান
আমার নৌকাখানি গাছেদের পাশে এসে থামে
তুমি জানি বসে থাকো নৌকার কুটিরে একা একা

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পউষের মধ্যরাতে মনে পড়ে তিন বন্ধু হাঁটি
কবি দীপন মিত্র

পউষের মধ্যরাতে মনে পড়ে তিন বন্ধু হাঁটি
পাটনার হৃদপিণ্ডে জনহীন রাস্তায় রাস্তায়
তখন তারারা ছিল জাহাজের মাথায় প্রোজ্জ্বল
লিচুর গুচ্ছের মতো লঘু সপ্তর্ষিরা নেমে আসে
একটি পাখির বুকে তুমি ছিলে আঁধারে বিলীন
দুর্মূল্য মানিক্য-মণি যেন তুমি --- লুকিয়ে রেখেছি
স্টেশনের পাশে খোলা এক ফালি চায়ের দোকান
মাটির খুরিতে ধোঁয়া, কণ্ঠে ধারা তপ্ত চুম্বনের
সিগারেটে উড়ছিল জোনাকিরা ঘোর অন্ধকারে
মিনির মাথায় চেপে খালাসিরা জলে ধোয় বাস
আমার কলিজা বুক সেই থেকে প্রতি রাতে ধুই
বুকের নিভৃত ঘর ছিমছাম থাক, চাও তুমি!

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আমার মাসিদের মতো আজ চাঁদ মধ্যরাতে
কবি দীপন মিত্র

আমার মাসিদের মতো আজ চাঁদ মধ্যরাতে
আকাশে ; তাকিয়ে দেখি সেই সুধামাখা ভণিতারা ---
কবে ঝরে গেছে তারা পাখনায় পাখনায় একে একে
লাল ইট খড়খড়ি সবুজ জানলার --- গলিটার শেষে।
এন্টালি, মৌলালি মোড়ে কলকলে রাজহংস ছিল
তারা ; বঙ্গোরসাগর আসত পদপ্রান্তে কী উচ্ছ্বাসে!
এপাশ ওপাশ হয়ে ঢুকে পড়ত ফিরিঙ্গি বস্তিতে
মউলা আলির দরগা --- মাথা ছুঁত সমুদ্রের জল

জোছনার টোল পড়া ফর্সা গাল, বৈকালিক স্নান
সেরে ধোপভাঙা স্ফীত তাঁত, সাবানের বাস ---
ম ম করত ৪নং, সুরেশ সরকার রোড
গির্জার ঘড়িতে সন্ধে, মহগনি টেবিলটি ঘিরে
কিন্নর-কিন্নরী কন্ঠে গল্প-গান রবীন্দ্র, অতুল
ছাতিম ফুলের গন্ধ রেনেশাঁর বাড়ত আরো রাতে

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মধ্যরাতে দেখি আমি পুবের আকাশ থেকে ওঠে আলো ঢেউ
কবি দীপন মিত্র

মধ্যরাতে দেখি আমি পুবের আকাশ থেকে ওঠে আলো ঢেউ
সমুদ্র কল্লোল ভাঙে --- অন্ধকারও মনে হয় সুধাময় আলো
শিউলি গাছটি দেখি শ্বেতবস্ত্র পরিহিতা শুভ্র এক পরি
যাদু দণ্ড ঘিরে তার কত তারা গ্রহ ঘোরে, ছায়াপথ হাসে
সমুদ্র সৈকতে যত উজ্জ্বল দোকানপাট নিভে গেছে কবে
এদিকে শহরে দেখ বাড়িগুলো নিদ্রারত, ল্যাম্পপোস্ট খোঁজে
পাথরে বাজিয়ে যেত বুকে তার সেই সব ছেলেদের দল!

আলো ওঠে আলো ওঠে মধ্যরাতে দেখি আমি পুবের দিগন্তে
কালপুরুষের জঙ্ঘা কটি ডুবে যায় বনাঞ্চলে শত বন্যাজলে
কম্পিত সপ্তর্ষি, অত্রি, অরুন্ধুতী, --- পুলস্থ, পুলহ, উচ্ছ্বসিত
প্রাণী-বনস্পতি-নীড়ে, প্রেমে ও বিরহে, সুখ-দুঃখে ভেজা আলো
অন্ধকার এত আলোময়, আমি ডুবি, লিখে যাই সেই কথা!

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তোমার পিছনে ছুটে কেটে যায় একটা জীবন
কবি দীপন মিত্র

তোমার পিছনে ছুটে কেটে যায় একটা জীবন
তবু কি তোমাকে পায়? সংশয়ে সংশয়ে এত ক্ষয়!
রেসের অনেক ঘোড়া ব্যর্থকাম, ফেনা মুখে মরে
না হয় সে জীর্ণ শীর্ণ, পরিত্যক্ত --- ময়দানে ঘোরে
তাদের বিষণ্ণ মুখ কালের জানলায় বড় হয়ে
চেয়ে থাকে পৃথিবীর দিকে, খোঁজে কোনো পরিণতি
কেউ বা তরুণ সদ্য, পাখির নরম বুক কাঁপে
দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটে, নীচে অন্ধকার খাদ
কেউ ড্রাগে, কেউ যায় উদ্বন্ধনে, কেউ বা উন্মাদ!
কে তুমি নিষ্টুরতমা, হিংস্র রহস্যময়তা, কে? কে?

তোমার সোনার সুতো বাঁধা হয় তারায় তারায়
তার নীচে নৃত্য করে ব়্যাঁবো আর তাঁর সন্ততিরা

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শুধু ভয় কখন হারাই! বলিনি করেছি জয়
কবি দীপন মিত্র

শুধু ভয় কখন হারাই! বলিনি করেছি জয়
একবারও ; অত হনু নই। সে এসেছে তার ইচ্ছে
মতো ; আমি সমর্পিত, তার কাছে ভীষণ কৃতজ্ঞ
নামী দামি মানুষেরা ঘরে এলে অতি তৎপরতা
কী করি কী করি ভাব! সে রকমই হয়, আমারও যে!
গাড়িওলা অতিথিরা এলে হয় যেরকম --- চাই
উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখে চারপাশে প্রতিবেশী যেন
এক্ষেত্রে সতর্ক থাকি, অহংকারে আস্ফালনে যদি
সে আমাকে ছাড়ে? নেই কোনো চিরায়ত বন্দোবস্ত!

সোনার সুতোর কাজ তারা থেকে তারা --- বলেনি কি
ব়্যাঁবো? ছিল যে প্রথম দ্রষ্টা-কবি, সোনালি তরুণ?

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আমার কিছুই নেই হারাবার জেতবারও আর
কবি দীপন মিত্র

আমার কিছুই নেই হারাবার জেতবারও আর
আনন্দবাগান আছে, মধ্যরাতে চাঁদ ফোটে গাছে
বাউলেরা, ফকিরেরা আসে, গায়, নাচে নিজ মনে
চিনি না তাদের আমি, আসে তারা হেসে ভালোবেসে
অজয়ের ধারে কবে আখড়ায় বসেছি গাঁজায়
বটের ঝুরির থেকে সুর স্বাতী নক্ষত্রকে ছোঁয়
প্রেমের তৃষার্ত ঠোঁটে দেয় ঠাণ্ডা এক ফোঁটা জল
সহসা অজয় গায়, সমস্ত জলেরা উর্ধ্বগামী
মহাকর্ষ মাখামাথি --- আলোর বিশাল স্রোত ওঠে
এবং তোরণ প্রায় দরজা খোলে আমার বাগানেঃ
এস আলো, এসো রাত্রি, এসো শুভ্র পূর্বপিতামাতা
তোমাদের পদরজে ধুয়ে দাও এই আলোভূমি!

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নক্ষত্রসমূহ যেন বাদ্যযন্ত্র শারদ আকাশে
কবি দীপন মিত্র

নক্ষত্রসমূহ যেন বাদ্যযন্ত্র শারদ আকাশে
তাদের আশ্চর্য ধ্বনি শুনি আমি নৌকারা ঘুমোলে
আমার সঙ্গেই শোনে কুটিঘাট, জেলেদের মাঠ
জয় মিত্র কালীবাড়ি, নাটমন্দিরের চওড়া থাম
সবুজ ঘাসেরা শোনে ; ছাতিমের উগ্রগন্ধা ফুল
অপ্সরার ঘুমে ঢোকে --- নেচে নেচে ক্লান্ত সেও শোনে
নাকফুল, মাকড়ি, চিক, চূড়, বিছে, অঙ্গুরি, পায়েল
জেগে থাকে --- ছোট ছোট জ্যোতিষ্কের মতো --- গান করে
শরীরের ভেতরে যে সাদা সাদা ইচ্ছেগুলো তার
হতে চায় শ্বেত মূর্তি গীতরতা উদ্যানে বাগানে

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রতিটি ঘটনা, দৃশ্য মাটি ফুঁড়ে দেখি বের হয়
কবি দীপন মিত্র

প্রতিটি ঘটনা, দৃশ্য মাটি ফুঁড়ে দেখি বের হয়
বেহালাবাদক আমি সেই লুপ্ত শহরের বুকে
ফিরে এসে খুঁজি ফের ফেলে যাওয়া সামান্য বাগান
এখন কার্তিক মাস সারারাত আলো জ্বলে ছাদে
পূর্বপিতৃমাতৃগণ এই আলো দেখে ফিরবেন
লেবুগাছ, ফুলগন্ধে মনে পড়বে, ঘর গেরস্থালি
তখন চড়ুইভাতি তখন উৎসব সারারাত
অতীত ও বর্তমান মদ খেয়ে ঘুরবে ভবিষ্যতে

নীলকণ্ঠ পাখি হাতে অখিলে ওড়ায় মানুষেরা
আকাশও তো পৃথিবীর মাটি ফুঁড়ে পেখম ছড়ায়
তাদের ডানার থেকে চুরি করি আমার নয়ন
তাইতো কবিতা লেখা, অফুরান দৃশ্য জন্ম দেওয়া
কুসুমের কাছে আমি চিরঋণী ঢেলেছে হৃদয়
রঙ মিস্তিরির মতো নানা বর্ণে সাজাই আকাশ!

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর