চিরকালীনতা, আমি --- তোমাকে কি চিনি? কবি দীপন মিত্র
চিরকালীনতা, আমি --- তোমাকে কি চিনি? ভাবি মনে খুব চিনি, শৈশবে দিদির বন্ধু ছিলে লেবু গাছ নীচে ছিল তোমাদের গাঢ়তম খেলা শুনেছি তোমার স্বর কত কত কাল ধরে আমি সন্ধের বোনের মতো তোমার হাসিটি মোছে না তো
চিরকালীনতা, আরতিদির ওই উদাসী হাওয়ায়... কাঠের চওড়া সিঁড়ি বেয়ে ঝরা নিঃশব্দ সন্ধ্যায় সে সব নশ্বর করে দিলে কেন অদ্ভুত অকালে! তুমি কি আমাকে চেনো, আমার কবিতা পড়েছ কি? মনে হয় খুব চিনি, শৈশবে দিদির বন্ধু ছিলে! . **************** . সূচীতে . . .
যে ডেকেছিল সকালে কোন, যায়নি পাওয়া আর কবি দীপন মিত্র
যে ডেকেছিল সকালে কোন, যায়নি পাওয়া আর সাদা তরু গেয়েছিল গান, সে যে গন্ধর্ব সাক্ষাৎ উদ্বন্ধনে চলে গেল শান্তিনিকেতনে একা ঘরে স্বর তার শরতের হিমে রন্ধ্রময়, স্বল্প উষ্ণ ছিল যে ছাতিমতলা বুকে তার, দেবর্ষি নন্দিত তৃণভূমি ভরেছিল দ্রুতপদলাঞ্ছিত বেদনা
গীতা ঘটকের মত ছোট এক মেয়ে চিরকাল বাংলার আকাশে নৃত্য করবে, গাইবে রবীন্দ্রগীতি বুড়ো চোখে মাখবে সে গাদা গাদা কাজল, সুরমা মুখভঙ্গি, বিড়ম্বনা? অথৈ জীবন কারো কাছে!
সেই ছোট মেয়ে যেই করে গান, মেঘ ডেকে ওঠে মানুষকে ভালোবেসে ঘরে ফেরে গরু - বৃষ্টি নামে গাছপালা নাচানাচি, চান করে নুয়ে – ঝুঁকে বেঁকে চড়ুইরা ভেজে ডালে চুপচাপ, আরো কতো পাখি বাড়িঘর, ল্যাম্পপোস্ট, রাস্তাঘাট, নৌকারাও ভেজে নিতান্ত নরম হয়ে কান পাতে মোবাইল টাওয়ার এলিয়ে দুলিয়ে মাথা, খোলা চুল, অলকে কুসুম গান ভাসে দশদিশে – পথে, গৃহে, বিবাহ-বাসরে এ কেমন আবদার করা গান, আকুলি-বিকুলি হয়ে ডাকা? এ কেমন চাওয়া-পাওয়া উন্মাদিনী মেয়ে? . **************** . সূচীতে . . .
বিষাদ অনেক কাল সঙ্গে ছিল দিবারাত্রিভোর ত্বকের মতন ছিল, গাঢ় ছায়া গায়ে ছিল সেঁটে ; বটের ঝুরিতে ঢাকা সরু সিঁড়ি হুগলীর ঘাট - অথবা ঈদের চাঁদ কালোবর্ণ আকাশের বুকে
জানলার ধারে তার মুখপার্শ্ব - যেন দীর্ঘ যুগ কঠিন চিবুক, গাল পাথরের - বসন্তের দাগ। বিষাদ অনেককাল সঙ্গে ছিল দিবারাত্রিভোর আজ চেয়ে দেখি তার রেলপথ চলে গেছে দূরে - পোস্টকার্ডে লেখা চিঠি অনেক বছর পর আসে কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা, গ্রাম, নদী সবই চোখে ভাসে . **************** . সূচীতে . . .
পাইকপাড়ার বস্তি থেকে হেঁটে সেলুলয়েডের জ্যোৎস্নারাতে মিশে যান চুনীবালা দেবী ঠাকুরুন গ্রামের জঙ্গলে একা ক্ষীণ কণ্ঠে গান গেয়ে গেয়ে আমরা শুনতে পাই ইহকাল পরকাল একাকার করে “হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো পার করো আমারে...”
কাশের পালক নাকি নক্ষত্রের পাপড়িরা ঝরে ঝরে পড়ে আকাশে আকাশে আরো দূর মহাকাশে মাঠে বনে চুনিবালা দেবী যেতে যেতে একা ক্ষীণ কণ্ঠে গান গেয়ে গেয়ে যান
অনেক অনেক নীচে পাইকপাড়ার বস্তি ঘুমোয় তখন . **************** . সূচীতে . . .
বাহাদুরপুর গুমটির কাছে পৃথিবীর শেষ। তারপর শুরু হয় অনন্তের দেশ ; খর-রঙা বড় গোল চাঁদ ওঠে জলাভূমি থেকে খুব ধীরে ঘাঘড়ার আঁচলটি তুলে - গায়ে লেগে থাকে কিছু তৃণ। চাঁদের পিছনে ছিল তোমাদের ইহুদি অঞ্চল সরু গলি, পাড়া ঘর, খেত, মাঠ, গাছ, রেল-লাইন গিটারের ধ্বনি আর ছাদে গল্প চা-মুড়ির সঙ্গে গড়াতো দিগন্ত তক – পায়রার নেচে নেচে ডাকা গায়ের আঁধার ঝেরে সন্ধেবেলা চলে যেত ট্রেন কালো কালো ধোঁয়া ঢাকা জোনাকির ঝাঁক ছুঁড়ে দিয়ে
মরিয়া হাতের চাপ দরজার পাল্লা ধরে একা ত্রন্দত আরক্ত মুখ বলেনি একটি কোনো কথা তবুও নিঃশব্দ সেই বলাগুলো নিয়ে আমি লিখি গেয়ে চলি, যতদিন বেঁচে থাকি রক্তের লেগুনে। . **************** . সূচীতে . . .
যদি সে আবার ফেরে রক্তে ঘুঙ্ঘুরের মতো বেজে যদি সে আবার ঘোরে নদীতে কম্পাশের দাগ গেঁথে সে রাতে একাকী চাঁদ গোয়েন্দার মতো চেয়ে ছিল চামড়ার দস্তানা হাতে আগ্নেয়াস্ত্র কবির পিছনে দু'শতকব্যাপী কতো হতাহত গুম শত শত এদেশে ওদেশে, তিক্ত যন্ত্রণায় বেঁকে গেছে হাতের লেখনী জেটি থেকে একটু দূরে হেলমেটে ঝলসে ওঠা আলো পোস্টম্যান ফিরে আসে বড় হতে থাঁকা বয়সের মতো বিকেলের তেরছা রোদ মুখে নিয়ে জনতা এক্সপ্রেসে গরিবতম নকশাল হাংরি কবি, নোংরা-জামা ফেরে “জন্মভূমি কলকাতা” - অমল ধবল হাসি বাজে . **************** . সূচীতে . . .
ভাস্করদা, আপনাকে বড় মনে পড়ে থেকে থেকে ছোট জুতো যেরকম কামড়ে ধরে পা, অর্থকষ্ট তেমনই আত্মাকে - আপনার থেকে কে বেশি বুঝবে? এই পোড়া দেশে যে কী লিখলেন ভাস্করদা, আপনি! নিম্নবিত্ত মানুষের মহাকাব্য, বিষণ্ণ প্রেমিক শালপ্রাংশু, চওড়া বুক, ফর্সা লাল স্মিতহাস্য মুখ - বাংলা কবিতার প্রিন্স, তাজহীন বিশাল সম্রাট। বান আসা হুগলির মতো গায়ে ও কলামে জোর বুল-ফাইটার, শিং-দুটো ধরে ঠেলছেন বুনো ক্রুদ্ধ ষাঁড় এ জীবন-টাকে একটু একটু করে আপনি না জানলেও বিজয়ী ঘোষণা করে দেয় ট্রাম্পেটার, আর গোটা স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে পড়েছে করতালি, জোরে, আরো জোরে দেয় সমস্ট লিটল ম্যাগের পাতারা, স্যার গ্রহণ করুন আপনারই প্রাপ্য এই অভিবাদন ; রাস্তায়, চা-খানায় হাত ধরে বাংলা কবিতাকে এনেছেন, স্যার, আপনি ছাড়া কে? . **************** . সূচীতে . . .