মিলনসাগরে  কবি গিরিশচন্দ্র সেনের কবিতার পাতা তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।



উত্স -   



কবি গিরিশচন্দ্র সেনের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।



আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     



এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১৫.১০.২০২২
.                                                                                                                      
 ^^ উপরে ফেরত   





...
কবি গিরিশচন্দ্র সেন -  জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত
বাংলার  ঢাকা  জেলার  পাঁচদোনা  গ্রামে।  শশিভূষণ
বিদ্যালঙ্কার সম্পাদিত, “জীবনীকোষ ২য় খণ্ডে” তাঁর জন্ম
“সম্ভবতঃ ১২৪১ বাঙ্গালার (ইং ১৮৩৬) বৈশাখ মাসে”,  
বলে অনুমান করা হয়েছে। অন্যত্র জন্ম ১৯৩৫ সাল। ডঃ
গৌরী সাঁফুই-এর গবোষণা পত্র “গিরীশচন্দ্র সেন (১৮৩৪-
১৯১০) জীবন ও সাহিত্য”-এ তাঁর জন্ম ১৯৩৪ সালে  
দেওয়া রয়েছে।

তিনি ব্রাহ্ম সমাজের থেকে "ভাই" উপাধি পেয়েছিলেন
এবং মুসলমানরা তাঁকে মৌলভী বলেও ডাকতেন।
গিরিশচন্দ্রের  পিতা  মাধবরাম  সেন  রায়  ও  মাতা  জয়কালী দেবী।  পিতামহ  রামমোহন সেন।  তাঁর
খুল্ল  প্রপিতামহ দর্পনারারণ রায়, বঙ্গের সুবাদার নবাব আলী বর্দ্দী খাঁর সময়ে উচ্চ রাজ কার্য্যে নিযুক্ত
ছিলেন।

“মহিলা” পত্রিকার অক্টোবর ১৯০৬ সংখ্যার, গিরিশচন্দ্র সেনের “স্বর্গগতা দেবী বরদেশ্বরী গুপ্ত” প্রবন্ধে, ৭০
পৃষ্ঠায় তিনি জানিয়েছেন “আমরা সহোদরা ভাই ভগিনী ছয় জন ছিলাম, তন্মধ্যে তিন ভগিনী ও দুই ভ্রাতা  
ক্রমে পরলোকগত হইয়াছেন ; আমি সর্বকনিষ্ঠ তাঁহাদের অনুগমনের অপেক্ষায় আছি।” তাই  তিন ভাই ও
তিন বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন গিরিশচন্দ্র সেন। অন্য দুই ভাই ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র সেন ও হরচন্দ্র সেন
এবং তিন দিদিরা ছিলেন যথাক্রমে কাশীশ্বরী দেবী, বরদেশ্বরী দেবী ও তৃতীয় দিদির নাম আমরা জানতে  
পারি নি।

কবির পত্নীর নাম ছিলো ব্রহ্মময়ী দেবী, কবির ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে সর্বদা তাঁর পাশে থেকেছেন। তিনি বসন্ত  
রোগে পরলোক গমন করেন। তার পরেই কবির বৈরাগ্য ভাব আসে এবং তীর্থ ভ্রমণ ইত্যাদির পরে  
কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে ব্রাহ্ম ধর্মের প্রচারক হয়ে যান।

শশিভূষণ বিদ্যালঙ্কার সম্পাদিত, জীবনীকোষ ২য় খণ্ড থেকে জানা যায় যে গিরিশচন্দ্র সেন কোনো  
রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দিতেন না। বঙ্গভঙ্গের তিনি বিরোধী ছিলেন না। বরং বঙ্গভঙ্গের দ্বারা বাঙ্গালী
জাতির পরম কল্যাণ সাধিত হবে, এই তাঁর বিশ্বাস ছিল।
কবির শিক্ষা জীবন    
কবির কর্মজীবন    
গিরিশচন্দ্রের ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষাগ্রহণ    
গিরিশচন্দ্রের “কোর আন্-শরীফ”ও “হাদিস” এর অনুবাদ  
গিরিশচন্দ্র সেন ও বেগম রোকেয়া    
গিরিশচন্দ্র সেন ও মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ    
গিরিশচন্দ্রের অন্যান্য সাহিত্য কীর্তি    
সম্পাদনা, “মহিলা” পত্রিকা ও বিধান রায়ের মাতৃদেবী   
গিরিশচন্দ্রের কবিতা ও “মহিলা” পত্রিকার শ্রীমতী গ---  
কবির শিক্ষা জীবন -                                                                     পাতার উপরে . . .  
বাল্যকালে বাংলা, সংস্কৃত ও ফার্সি ভাষা অধ্যয়ন করেন। পরে ঢাকা ও ময়মনসিংহে ফার্সি শিক্ষা করেন।
ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করার পরে, ১৮৭৬ সালে গিরিশচন্দ্র আববী ভাষা ও ঐসলামিক ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে
লখনৌ যান।
.
কবির কর্ম জীবন -                                                                     পাতার উপরে . . .  
কর্মজীবনের প্রারম্ভে, ২৫ বৎসর বয়সে, ময়মনসিংহ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটর কাছারিতে কিছুকাল নকলনবিশের
কাজ এবং ময়মনসিংহের জেলা স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করার পরে তিনি প্রচারকের ব্রত
ধারণ করেন।
.
গিরিশচন্দ্রের ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষাগ্রহণ -                                                  পাতার উপরে . . .  
গোঁড়া হিন্দু পরিবারের থেকে আসার জন্য, প্রথম জীবনে গিরিশচন্দ্র ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতি বিরূপ ছিলেন। কিন্তু  
ময়মনসিংহে কেশবচন্দ্র সেনের (১৮৬৫) ও বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর (১৮৬৭) প্রচারকার্য তাঁকে গভীরভাবে  
প্রভাবিত করে এবং তিনি ১৮৭১ সালে ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেন।

১৮৭৪ সালে কলকাতায় এসে তিনি ব্রাহ্মধর্মের নববিধান শাখার প্রধান, কেশবচন্দ্র সেনের সান্নিধ্যে আসেন
এবং প্রচারক ব্রত গ্রহণ করেন। তিনি আচার্য্য কেশবচন্দ্রের সঙ্গে, কখনও বা একাকী বাঙ্গালা,  বিহার,  
উড়িষ্যা ও আসামের নানাস্থানে প্রচারের কাজে ঘুরে বেডিয়েছেন। ব্রাহ্মসমাজ তার কর্তব্যনিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে
তাকে “ভাই” উপাধিতে ভূষিত করে।

১৯৩৮ সালে (১৩৪৫ বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত, শশিভূষণ বিদ্যালঙ্কার সম্পাদিত, জীবনীকোষ ২য় খণ্ডের ৩৮৮পৃষ্ঠায়
গিরিশচন্দ্র সেনের ধর্মান্তর নিয়ে তিনি লিখেছেন . . .

“
যৌবন প্রারম্ভেই মূলপাড়া নিবাসী কুলগুরু পণ্ডিত বিশ্বনাথ পঞ্চাননের নিকট শিবমন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ
করিয়াছিলেন। দীক্ষা গ্রহণের পর প্রত্যহ স্নানান্তে পুষ্পাদিদ্বারা শিবার্চ্চনা করিতেন। কিন্তু এই প্রকার নিষ্ঠা
বেশী দিন স্থায়ী হইল না। ক্রমে শিথিলতা আসিল, এই সময়ে ময়মনসিংহে ব্রাহ্ম সমাজ স্থাপিত হইয়াছে।
তাঁহার ভগ্নীপতি জমিদার কালীনারায়ণ গুপ্ত মহাশয়, ব্রাহ্ম সমাজের খুব অনুরাগী ছিলেন। কিন্তু গিরিশচন্দ্র
ব্রাহ্মসমাজের নামও শুনিতে পারিতেন না। কিন্তু মানুষ ভাবে একরকম হয় অন্য রকম। কিছুদিন মধ্যেই
তাঁহার উপার্জ্জনক্ষম অগ্রজ হরচন্দ্র রায় কলেরা রোগে পরলোক গমন করেন। তিনি ব্রাহ্ম ধর্মানুরাগী ছিলেন।
এই বিপদে তিনি বড়ই কাতর হইয়া পড়েন। কিছুদিন পরে ময়মনসিং সহরে যাইয়া অগ্রজের বন্ধুদের সহ
মিলিত হইলেন। তাঁহারা প্রায় সকলেই ব্রাহ্মধর্ম্মানুরাগী ছিলেন। তন্মধ্যে মুড়াপাড়ার জমিদার রামচন্দ্র
বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যতম। তাঁহার সহিত ঘনিষ্টতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে, তাঁহার ব্রাহ্মবিদ্বেষ দূর হয় এবং অল্পকাল
মধ্যেই ব্রাহ্মধর্ম্মের দিকে আকৃষ্ট হন।

১৮৬৫ ইং আলে ময়মনসিংহ নগরে “কৃষি প্রদর্শিনী” মেলা হয়। ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেন সেই সময়ে সাধু
অঘোর নাথ রায়কে সঙ্গে করিয়া ময়মসিংহ সহরে গমন করেন। বলাবাহুল্য তাঁহার বাগ্মীতায় সকলে মুগ্ধ
হইলেন, ব্রাহ্মসমাজে নূতন উত্তেজনার সৃষ্টি হইল। এই ঘটনার দুই বৎসর পরে ভক্ত বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী
ময়মনসিংহ নগরে উপস্থিত হইলেন। তাঁহার বক্তৃতা উপদেশ শ্রবণে সহরে তুমুল আন্দোলনের সৃষ্টি করিল।
কেহ কেহ উপবীত ত্যাগ করিলেন। ইহাতে প্রাচীন হিন্দু নেতারা অতিশয় বিচলিত হইলেন। ব্রাহ্মদের উপর
নির্য্যাতন আরম্ভ হইল। অনেকে সমাজ ভয়ে প্রায়শ্চিত্ত করিল ও ব্রাহ্ম সংশ্রব পরিত্যাগ করিল। কিন্তু
গিরিশচন্দ্র দৃঢ় রহিলেন।  তিনি প্রায়শ্চিত্ত করিলেন না।  তাঁহার  সহধর্মিণী  ব্রহ্মময়ী  তাঁহার প্রধান সহায়
হইলেন। এই সংগ্রাম ও নির্য্যাতন যাইতে না যাইতেই পত্নী ব্রহ্মময়ী বসন্ত রোগে পরলোক গমন করেন।
বৈরাগ্য প্রবণ গিরিশচন্দ্রের হৃদয়ে আরও প্রবল বৈরাগ্যানুরাগ সঞ্চারিত হয়। তিনি কলিকাতা আসিয়া ধর্ম্ম
বন্ধুদের সহিত মিলিত হইলেন। তাহার পরেই তিনি কিছুকাল ভারতের নানা তীর্থ ভ্রমণে যাপন করেন। পরে
কর্মস্থল ময়মনসিংহ নগরে আসিয়া কর্ম্ম পরিত্যাগ পূর্ব্বক প্রচারক হইবার উদ্দেশ্যে কলিকাতা আগমন করেন
এবং কেশবচন্দ্র কর্ত্তৃক প্রতিষ্ঠিত ভারতআশ্রমে স্থান লাভ করেন
।”
.
গিরিশচন্দ্রের “কোর আন্-শরীফ”ও “হাদিস” এর অনুবাদ -                      পাতার উপরে . . .  
কেশবচন্দ্র সেনের সর্বধর্মসমন্বয়ের আদর্শে তিনি উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। কেশবচন্দ্র সেনই মুসলমান ধর্ম তাঁর  
অনুশীলনের বিশেষ ক্ষেত্র হিসাবে নির্দেশ করেন। ১৮৭৬ সালে গিরিশচন্দ্র আববী ভাষা ও ঐসলামিক  
ধর্মশাস্ত্র পাঠের উদ্দেশ্যে লখনৌ যান। লখনৌ থেকে ফিরে ৬ বছরের পরিশ্রমের পর ১৮৮১ - ৮৬ সালের  
মধ্যে তিনি “কোর আন্-শরীফ”-এর পূর্ণাঙ্গ ও সটীক অনুবাদ প্রকাশ করেন। এটিই কোরানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ  
বঙ্গানুবাদ এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান।

আমরা এখানে ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত, ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের অনুদিত  কোরআন শরীফ-এর  ভূমিকার  
একটি অংশ তুলে দিচ্ছি . . .

“
পৃথিবীর যাবতীয় সভ্যভাষায় বাইবেল পুস্তক অনুবাদিত হইয়া সর্বত্র সকল জাতির মধ্যে প্রচার হওয়ায়  
সাধারণের পক্ষে তাহা যাহাক পর নাই সুলভ হইয়াছে। তজ্জন্যই দেবাত্মা ঈসার দেবচরিত্র ও তাঁহার স্বর্গীয়
জীবন-প্রদ উপদেশ সকল বাইবেলে জাতিধর্ম নির্বিশেষে সহজে পাঠ করিতে পারিয়া নানা দেশের  নানা  
জাতীয় অগণ্য লোক আলোক ও জীবন লাভ করিয়াছে। কিন্তু বিধানমণ্ডলীভুক্ত ভূমণ্ডলের একটি প্রধান ও  
পরাক্রান্ত জাতি মোসলমান, তাঁহাদের মূল বিধান-পুস্তক কোরআন শরীফ শুদ্ধ তাঁহাদের মধ্যেই দুরূহ আরব্য
ভাষারূপ দুর্ভেদ্য দুর্গের ভিতরে বদ্ধ রহিয়াছে। অন্য জাতির নিকট মোসলমানেরা কোরআন বিক্রয় পর্যন্ত  
করেন না, অপর লোকে তাহা পড়িবে দূরে থাকুক স্পর্শ করিতেও পারে না। অন্য জাতির মধ্যে আরব্য  
ভাষার চর্চাও বিরল। কেহ কোরআন হস্তগত করিতে পারিলেও ভাষাজ্ঞানের অভাবে তাহার মর্ম কিছুই  
অবধারণ করিতে সমর্থ হয় না। সুতরাং ইহা কতিপয় মোসলমান মৌলবীর একচেটিয়া সম্পত্তি হইয়া  
রহিয়াছে। মৌলবী শাহ্ রফিয়োদ্দীন উর্দু ভাষায় এবং শাহ্ অলী আল্লাহ্ ফতেহোর্ রহমান নামে পারস্য  
ভাষায় কোরআনের অনুবাদ করিয়া প্রচার করিয়াছেন ; কিন্তু তাহা মূল পুস্তকের সঙ্গে একত্র সংবদ্ধ আছে,
স্বতন্ত্র পুস্তকাকারে পাওয়া যায় না। সেই অনুবাদিত পুস্তকদ্বয় সুপ্রাপ্য হইলে ও উর্দু ও পারস্য ভাষানভিজ্ঞ
বাঙালীর পক্ষে তাহা অন্ধজনের পক্ষে দর্পণের ন্যায় নিষ্ফল। ইংরাজী ভাষায় কোর-আনের অনুবাদ প্রচার
হইয়াছে সত্য ; কিন্তু এ-দেশে তাহা সচরাচর প্রাপ্য নহে। অপিচ যাঁহারা ইংরাজী জানেন না তাঁহাদের পক্ষে
উহা প্রাপ্ত হওয়া না হওয়া তুল্য। আমি আরব্য ভাষা শিক্ষায় প্রবৃত্ত হইলে অনেক বন্ধু বঙ্গভাষায় মূল  
কোরআন অনুবাদ করিয়া প্রচার করিতে আমাকে অনুরোধ করেন, এ বিষয়ে আমি কোন কোন মোসলমান
বন্ধু কর্তৃকও বিশেষরূপে অনুরুদ্ধ হই। কোরআন অধ্যয়ন ও তাহা অনুবাদ করাই আরব্য-ভাষা শিক্ষায়  
প্রবৃত্ত হওয়ার আমার প্রধান উদ্দেশ্য। বন্ধুদিগের আগ্রহে ও স্বীয় কর্তব্যানুরোধে ঈশ্বর কৃপায় আমি এক্ষণ  
কোরআন বঙ্গভাষায় অনুবাদ করিয়া প্রকটন করিয়াছি
।”. . .

কোর আন্-শরীফ এর পর তাঁর আর একটি বড় কাজ “হাদিস”-এর অনুবাদ। প্রথম খণ্ড হাদিস-পূর্ব-বিভাগ   
(১ম খণ্ড)  প্রকাশিত  হয়  ১৮৯২ সালে  এবং  শেষ খণ্ড হাদিস-উত্তর-বিভাগ (৪র্থ খন্ড) প্রকাশিত হয় ১৯০৮
সালে।
.
গিরিশচন্দ্র সেন ও বেগম রোকেয়া -                                                 পাতার উপরে . . .   
গিরিশচন্দ্র বাঙালী মুসলমান সমাজে যে কী আন্তরিকভাবে গৃহীত হয়েছিলেন তার প্রমাণ মেলে বেগম  
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের (১৮৮০-১৯৩২) সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ সম্পর্কের দৃষ্টান্তে। তিনি বলেছেন . . .

“
মোসলমানদের প্রতিভাশালিনী বিদূষী কন্যা “মতিচুর” পুস্তকের রচয়িত্রী শ্রীমতী আর. এস. হোসেন (রোকেয়া
সাখাওয়াত হোসেন) মৎকর্তৃক অনুবাদিত ধর্ম্মসাধন নীতিপুস্তকের সমালোচনায় আমাকে “মোসলমান ব্রাহ্ম”
বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি আকৃতি প্রকৃতি ভোজ্য পরিচ্ছেদ আকার ব্যবহারাদি দেখিয়া আমাকে  
মোসলমান ব্রাহ্ম বলেন নাই, আমি মোসলমান জাতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করিয়া থাকি তজ্জন্য সেরূপ  
বলিয়াছেন, ইহা নিশ্চিত। তাঁহার সঙ্গে আমার মাতৃপুত্র সম্বন্ধ স্থাপিত। সেই মনস্বিনী মহিলা উক্ত ঘনিষ্ঠতার
পরিচয় নিজেই প্রদান নাম না লিখিয়া নামের পরিবর্তে “মা” “আপনার স্নেহের মা” বলিয়া স্বাক্ষর করিয়া  
থাকেন
।”
----- ডঃ গৌরী সাঁফুই এর গবোষণা পত্র “গিরীশচন্দ্র সেন (১৮৩৪-১৯১০) জীবন ও সাহিত্য”, পৃষ্ঠা ১৩৯।
.
গিরিশচন্দ্র সেন ও মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ -                               পাতার উপরে . . .   
“মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮) গিরিশচন্দ্রের অনুবাদিত কোরআন শরীফের চতুর্থ  
সংস্করণের (কলিকাতা, ১৯৩৬) ভূমিকায় বলেছেন . . .
“
তিনকোটি মোসলমানের মাতৃভাষা যে বাংলা তাহাতে কোরআনের অনুবাদ প্রকাশের কল্পনা ১৮৭৬ খৃঃ
পর্যন্ত এদেশের কোন মনীষীর দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারে নাই। তখন আরবি-পার্শী ভাষায় সুপণ্ডিত  
মোছলমানের অভাব বাংলাদেশে ছিল না। তাঁহাদের মধ্যকার কাহারও কাহারও যে বাংলা সাহিত্যের  
উপরও যথেষ্ট অধিকার ছিল, তাঁহাদের রচিত বা অনুবাদিত বিভিন্ন পুস্তক হইতে তাহার অনেক প্রমাণ  
পাওয়া যায়। কিন্তু এদিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তাহাদের একজনেরও ঘটিয়া উঠে নাই। এই গুরু  
কর্তব্যভার বহন করার জন্য সুদৃঢ় সঙ্কল্প নিয়া, সর্বপ্রথমে প্রস্তুত হইলেন বাংলার একজন হিন্দু সম্তান, ভাই
গিরিশচন্দ্র সেন --- বিধান আচার্য কেশবচন্দ্রের নির্দেশ অনুসারে। গিরিশচন্দ্রের এই অসাধারণ সাধনা ও
অনুপম সিদ্ধিকে জগতের অষ্টম আশ্চর্য বলিয়া উল্লেখ করা যাইতে পারে
।”

মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ পরে মাওলানা আব্বাছ আলীর সঙ্গে যৌথভাবে ১৯০৫ সালে কোরআন
অনুবাদে অংশগ্রহণ করেন। যৌথ অনুবাদটি ছিল তিনটি ভাষায়। আরবি, বাংলা ও উর্দু ভাষায় এই
কোরআন অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল।
.
গিরিশচন্দ্রের অন্যান্য সাহিত্য কীর্তি -                                               পাতার উপরে . . .   
“কোর আন্-শরীফ”-এর সটীক অনুবাদের পাশাপাশি তাঁর অন্যান্য সাহিত্যকীর্তি -- জীবনীগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে
“পরমহংসের উক্তি ও জীবনী” (১৮৯৩), “ইমাম হাসান ও হোসাইন” (১৯০১), “বিশ্বাসী সাধক গিরিন্দ্রনাথ”  
(১৯০৩), “চারিজন ধর্মনেতা” (প্রথম চার খলিফা, তথা হজরত আবুবকর সিদ্দিক (রা.), হজরত ওমর (রা.),
হজরত ওসমান (রা.)  এবং  হজরত আলী (রা.)-এর  জীবনী  (১৯০৬), “সতীচরিত্র” (মহারাণী শরৎ সুন্দরী
দেবী-র  জীবনী (১৯১১), লেখকের মৃত্যুর পর প্রকাশিত, “চারি সাধ্বী মোসলমান নারী” (হজরত খোদেজা,
ফাতেমা, আয়েশা ও রাবেয়ার জীবনী) প্রভৃতি।

অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “তত্ত্ব কুসুম” (১৮৮২), “তত্ত্বরত্নমালা” (ফার্সি ভাষা থেকে ধর্মীয় নীতিকথার  
অনুবাদ, ১৮৮২), ১৮৮৫ সালের ৮ আইনের সহজ বাংলা অনুবাদ (দুখন্ড), ১৮৮৫, “নববিধান প্রেরিতগণের
প্রতিনিধি” (ব্রাহ্মধর্মের নববিধান সংঘের কার্যক্রমবিষয়ক গ্রন্থ, ১৮৮৭), “নববিধান কি?” (১৮৮৭), “তত্ত্ব  
সন্দর্ভমালা” (নববিধানের মূলতত্ত্ব, ১৮৯৩), “কাব্যলহরী” (কবিতা, ১৮৯৭), “দরবেশী” (তাসাউফ, ১৯০২),  
“ধর্মবন্ধুর প্রতি কর্তব্য” (১৯০৬), “আত্নজীবন” (১৯০৭), “মহালিপি” (পারস্যের শরাফত-আল-দীন আহমদ  
মালিরির পত্রাবলীর অনুবাদ, ১৯০৯), স্ত্রীশিক্ষার আবশ্যকতা প্রচারকল্পে “বনিতা বিনোদন” (বনিতাবিনোদ!)
প্রভৃতি।
.
গিরিশচন্দ্রের সম্পাদনা, “মহিলা” পত্রিকা ও বিধানচন্দ্র রায়ের মাতৃদেবী -    পাতার উপরে . . .   
ভাই গিরিশচন্দ্র সেন, ঢাকা থেকে প্রকাশিত “বঙ্গবন্ধু” ও “সুলভ সমাচার” নামের দুটি পত্রিকার সহযোগী
সম্পাদক ছিলেন।

গিরিশচন্দ্র সেন “মহিলা” নামের একটি মাসিক পত্রিকা, বঙ্গ মহিলাদের উপকারার্থে প্রচার করে সম্পাদন  
করেছিলেন।  পত্রিকাটি  প্রকাশিত  হয়েছিল  কেশবচন্দ্র  সেন  প্রতিষ্ঠিত  নববিধান  ব্রাহ্মসমাজের  
পৃষ্ঠপোষকতায়। “মহিলা” পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৩০২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে (জুলাই ১৮৯৫)।
মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি তাঁহার সম্পাদক ছিলেন। ১৩১৭ বঙ্গাব্দের ৩০শে শ্রাবণ (১৫ই অগাস্ট ১৯১০) ঢাকায়
সম্পাদক গিরিশচন্দ্র সেনের মৃত্যু হলে ব্রজগোপাল নিয়োগী সম্পাদক নিযুক্ত হন।

অবসর.নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত, দীপক সেনগুপ্তর অবশ্যপাঠ্য “মহিলা” প্রবন্ধটি থেকে জানা যায় যে এই
পত্রিকার ২য় ও ৩য়  ভাগে (সংখ্যায়) “ক্রোড়পত্রে” প্রকাশিত হয়েছিল  “স্বর্গগতা  দেবী  অঘোরকামিনীর  
পত্রাবলী”। তাঁর চিঠিপত্র পাঠে মহিলা পাঠকদের অশেষ উপকার হবে মনে করেই সম্পাদক গিরিশচন্দ্র  
ধারাবাহিকভাবে এই রচনা প্রকাশ করেছিলেন। ২৯ বছর বয়সে অঘোরকামিনী দেবী ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন।
এইরকম সময়েই, একবার প্রবল ঝড়ে বংলার বহু সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে, তিনি তাদের সাহায্যার্থে  
নিজের সোনার কবচ ও অলঙ্কারাদি বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন।  

এই মহান মহিলা, অঘোরকামিনী দেবীর বড় পরিচয় হচ্ছে, তিনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের রূপকার
মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের (১ জুলাই ১৮৮২ – ১ জুলাই ১৯৬২) জননী !

দুঃখের বিষয় এই যে মাতা অঘোরকামিনী দেবী এবং নারীদের হিতাকাঙ্ক্ষী “মহিলা” পত্রিকার সম্পাদক  
গিরিশচন্দ্র সেন, কেউই ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের, দেশভাগে বিধ্বস্ত পশ্চিমবঙ্গের নব রূপকার হয়ে ওঠা দেখে
যেতে পারেননি, কালের নিয়মে।
.
গিরিশচন্দ্রের কবিতা ও “মহিলা” পত্রিকার শ্রীমতী গ---                         পাতার উপরে . . .   
কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “কাব্যলহরী” (১৮৯৭), শিক্ষার আবশ্যকতার জন্য “বনিতাবিনোদ”
প্রভৃতি। “বনিতাবিনোদ” পাঠ্যপুস্তক হিসেবেও পড়ানো হয়েছে।

আমরা তাঁর একটি মাত্র কবিতা “অত্যাচার” পেয়েছি ১৯৬০ সালে প্রকাশিত, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য দ্বারা  
সঙ্কলিত ও সম্পাদিত “মাতৃবন্দনা দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও কবিতার সঙ্কলন ১৭৪১ -১৯৪৭” থেকে।

তাঁরই সম্পাদিত “মহিলা” পত্রিকার সেপ্টেম্বর ১৯০৬ সংখ্যার ৫৫পৃষ্ঠায়, মে ১৯০৮ সংখ্যার ২৭৬পৃষ্ঠায়,  
জুলাই ১৯০৮ সংখ্যার ৩২৩পৃষ্ঠায়,
শ্রীমতী গ--- নামের এক কবির কবিতা প্রকাশিত রয়েছে। তখনকার  
দিনে মহিলা লেখক ও কবিদের পুরো নাম না দেওয়ারই চল ছিল, এবং বেশীরভাগ নামই এরকম আদ্যক্ষর
ধরে  দেওয়া হতো। অনেকের তো নামই দেওয়া হতো না। পুরুষদের ক্ষেত্রেও, যাঁরা সদ্য লেখা শুরু  
করেছেন!  আমরা এই
শ্রীমতী গ--- কবির আসল পরিচয় নিয়ে খানিকটা চিন্তা-বিলাসিতা করেই ভাবছি যে
গিরিশচন্দ্র সেন, নিজেই তাঁর নামের আদ্যক্ষর গ--- দিয়ে কবিতা লিখে নিজের পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন
কি না! কারণ এই কবি
শ্রীমতী গ--- এর গ্রাম আর গিরিশচন্দ্রের গ্রামের নাম একই --- পাঁচকোনা! আমাদের
অনুমান সম্পূর্ণ ভুল হয়ে থাকতে পারে। তার জন্য আমরা পাঠকের কাছে অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কিন্তু
এই কবিতাগুলি আমরা এখানে তুলে দিচ্ছি। যদি কোনোদিন কবি
শ্রীমতী গ--- এর আসল নাম ও পরিচয়
জানা সম্ভব হয় তাহলে তাঁর জন্য নতুন পাতা তৈরী করে সেখানে এই কবিতাগুলি তুলে দেওয়া হবে।
.