| কবি হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কবিতা |
| প্রবাসে কবি হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায় কবিরত্ন কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার শ্রাবণ ১৩২৬ (জুলাই ১৯১৯) সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা। পিয়াসী হৃদয় হেথা কাঁদিয়া মরিছে শুধু আপনা আপনি, হেথা ত মিলে না স্নেহ, ভালবাসা প্রীতি, এ যে স্বার্থের বিপণি॥ কেহ কারো পানে ফিরে, নাহি চায়, শুধু বোঝে আপনার কাজ। অর্থহীন শূন্য দিঠি, চাহে এ উহার পানে নাহি শঙ্কা লাজ॥ এখানে চাঁদের আলো, তরল আনন্দ প্রায় মূর্চ্ছাতুর আসি। পড়িতে পারে না গায়, বাঁধা পেয়ে ফিরে যায় হতাশে নিঃশ্বাসি'॥ তরুণ অরুণ কর পরিচিত বন্ধু প্রায় না চুমে বদন। মলয় মারুত এসে বাধা পেয়ে ফিরে যায় করিয়া রোদন॥ সংক্ষেপে সকল কথা কহিতে হইবে হেথা কেহ যেন কার কোনো কথা নাহি বোঝে ; কেছ আর নাহি খোঁজে কি হারায় কার॥ এখানে বসন্ত আসে, না গায় কোকিল কভু বহে না মলয়। এখানে সকলি আছে, আছে সুগঠিত দেহ নাহিরে হৃদয়॥ হেথা নাহি উচ্চকণ্ঠে সরল উদার হাসি সরল বচন। আনন্দের চঞ্চলতা, নাহি হেথা ; তীব্র শোকে আকুল ক্রন্দন॥ হেথা যদি কাঁদে হাসে অমনি নিজেকে স্মরি’ লুকায় গোপনে। কি জানি কি হয় পাছে, সভ্যতার হানি বুঝি ভয় হয় মনে॥ আছে বটে বিচিত্রতা নাহি তাছে মধুরতা মাহি তাহে প্রাণ। নাহি তাহে কোমলতা স্যাম-স্নিগ্ধ সরলতা সবি যেন ভাণ॥ ঐস্বর্য্য সুষমা এর মদগর্ব্বে দরিদ্রের করিতে নিরাশ। উচ্চতা যা কিছু এর যেন সে দীনেরে শুধু করে উপহাস॥ নগণ্য যে তুচ্ছ দীন, তার হেথা স্থান কোথা? লাঞ্ছনা লভিতে। পড়ে থাকে এক কোণে, দেখে বোঝে ভাবে শোনে কাঁদিয়া মরিতে॥ ফিরে চল্ ওরে কবি, হেথা তোর স্থান কোথা রে দীনাতিদীন। জান নাকি তুচ্ছ তুমি একান্ত নগণ্য ক্ষুদ্র হায় ভাগ্যহীন॥ . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| সে নয় কবি হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায় কবিরত্ন কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার ফাল্গুন ১৩২৬ (ফেব্রুয়ারি ১৯১৯) সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা। সেই কাঁকণের কনকনানি চিনি আমি চিনি এতো সে নয় ! এতো সে নয়! বাতাস তখন চলতো না আকাশ নয়ন মেলতো ফুলের কুঁড়ির দল গুলি যে নিজে নিজেই খুলতো এতো সে নয় ! এতো সে নয় ! কোকিল তখন ডাকতো না ডাকার নিয়ম ভুলতো ধরার বুকের গোপন কথা নীরবতায় ফুটতো এতো সে নয় ! এতো সে নয় ! রূপালি নাচ নাচতো না নদীর জলের নীলায় আপনি চাঁদা থাকতো চেয়ে দেখে আপন ছায়ায় এতো সে নয় ! এতো সে নয় ! সেই কাঁকণের কনকনানি শুনি আমি শুনি এতো সে নয় ! এতো সে নয় ! রক্ত আমার রণরণিয়ে, উঠছে বেজে সেই তালে হিয়ায় আমার গুন্ গুনিয়ে বাজছে যে তা সবকালে এতো সে নয় ! এতো সে নয় ! সেই আকাশের তলে গো আয় সেই নদীটির ধারে তেমন করে’ বাজলে কাঁকণ বাজতো হিয়ার তারে এতো সে নয় ! এতো সে নয় ! . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| অনুমান কবি হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (১৯৮৮ - ১৯৩১) কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার কার্ত্তিক ১৩২৬ (অক্টোবর ১৯১৯) সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা। নদী জলে ভেসে যায় খসে'-পড়া পাতা নেচে' নেচে’ মৃদু বায় এক্-আকাশ জোছনায় স্নান করি'। বুকে লয়ে বনানীর গাথা। তরল সঙ্গীত তুলি’ ছোট ছোট্ট ঢোউ গুলি ফুটিছে টুটিছে কত নিমেষে নিমেষে রূপালি নদীর নীরে তরী গুলি ধীরে ধীরে কেবা জানে চলিয়াছে কোন্ বিদেশে ! অগণিত তারা লয়ে’ আকাশ স্তব্ধ হয়ে চেয়ে আছে অধো দিকে থির অপলক পড়েছে তারার ছায়া চিত্রিত চাঁদের মায়া নদী নীরে---কাঁপিতেছে আনন্দ পুলক আনন্দে কি বেদনায় মূরছি তটের গায় পড়ে এসে উর্ম্মিরাশি, জেগে উঠে গান। ওপারে বনানী-লেখা যেন মধ্য স্যাম-রেখা, দ্বিখণ্ডিত বিশ্ব-রও দিভাগ সমান যেন এক দিব্য ছবি আঁকি কোন্ মহা কবি কোথায় চলিয়া গেছে রহস্যের পারে হেরিয়া রচনা হায় স্বপনের মত প্রায় মাঝে মাঝে মনে হয় চিনি বুঝি তাঁরে। অর্থহীন একি সবি? সে কি রে উন্মাদ ববি আঁকিয়াছে ভাবহীন কেবলি অক্ষর? এই ছবি এই গান এই হাসি এই প্রাণ নাহি কি ইহাঁর মাঝে কিছু অনস্বর? . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| ভিক্ষা কবি হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (১৯৮৮ - ১৯৩১) দেবীপ্রসন্ন রায়চৌধুরী সম্পাদিত “নব্যভারত” পত্রিকার শ্রাবণ ১৩১৮ (জুলাই ১৯১১) সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা। বেলা দ্বিপ্রহর। রৌদ্র-দীপ্ত পথ পাশে, স্বেদ-সিক্ত কলেবর, পরিহিত চীরাম্বর, মলিন ভিক্ষুক এক বিশ্রামের আশে, বৃক্ষচ্ছায়ে তৃণাসনে, বসিল হতাশ মনে ; --- জীর্ণ শীর্ণ তনু খানি ক্লান্ত উপবাসে। গৃহে তার বৃদ্ধা মাতা ; আর শিশু দুটি,--- হায়, তা’রা মাতৃহীন, উপবাসী দুই দিন! আজি মিলিয়াছে শুধু অন্ন এক মুঠি। মধ্যাহ্ন সূর্য্যের কর, জ্বালাময় খরতর, যেন কোন দানবের করাল ভ্রুকুটি! দীপ্তিহীন আঁখি তারা তুলিয়া আকাশে, উদাস ব্যথিত স্বরে, ক্ষুব্ধ আবেগের ভরে, ডাকিলা “হে ভগবান” ! কম্পিত নিঃশ্বাসে। দূরে অই সৌধমালা বিলাসের নাট্যশালা--- ঐশ্বর্য্যের মদ-গর্ব্বে সৌরকরে হাসে ! হেন কালে দীন এক তাহারি মতন, ধনীদের গৃহ হতে, বিতাড়িত হয়ে পথে, দাঁড়াইল ঊর্দ্ধে তুলি বিযণ্ণ নয়ন ! হেরি এর ম্লান মুখ উদ্বেলিত হ'ল বুক। দুঃখীর প্রাণের ব্যথা বোঝে দুঃখী জন! বৃক্ষতল ত্যজি ধীরে উঠিলা তখন ; নিজ ভাণ্ড শূন্য করি, দিল তা’র পাত্র ভরি, এতক্ষণ কারো মুখে নাহিক বচন। তারপর, একি হায়--- এ উহার পানে চায়, দোহে দোহা গলা ধরি করিছে ক্রন্দন ! . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| তোমাতে কবি হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (১৯৮৮ - ১৯৩১) দেবীপ্রসন্ন রায়চৌধুরী সম্পাদিত “নব্যভারত” পত্রিকার অগ্রহায়ণ ১৩১৮ (নভেম্বর ১৯১১) সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা। তোমার মাঝারে করিয়াছি পাঠ বিশ্ব-কাব্য খানি ; তোমাতে মজিয়া চিনেছি স্বর্গ হে মোর হৃদয়-রাণী ! তোমারি দিব্য অমৃত-পরশে বুঝিতে পারি গো মনে--- কেন কাঁপি উঠে মাধবী-বল্লী মলয়ার পরশনে। তোমারি নয়নে মিলালে নয়ন সেই কথা প্রাণে জাগে--- কেন যে কুসুম বিকশিয়া উঠে উষার অরুণ-রাগে। তোমারে করিয়া হৃদয়ের দেবী বুঝিয়াছি আমি আজি--- কেন দেয় লোকে প্রতিমার পায়ে ভক্তি-আর্ঘ্য-রাজি। . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| প্রেমে কবি হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (১৯৮৮ - ১৯৩১) দেবীপ্রসন্ন রায়চৌধুরী সম্পাদিত “নব্যভারত” পত্রিকার পৌষ ১৩১৮ (ডিসেম্বর ১৯১১) সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা। চিরবাস করে চরম মুক্তি নিবিড় প্রেমের বন্ধনে, গোপন মধুর সুখ উঠে ফুটি, তীব্র-ব্যাকুল ক্রন্দনে। দেহের বিরহে প্রাণের মিলন প্রগাঢ় হইয়া উঠে। বেড়ে বায় ক্রমে “আমি”র প্রসার স্বার্থ চরণে লুঠে অন্তর মাঝে পশে অনায়াসে বাহিরে রয়েছে যারা, গণ্ডীবদ্ধ প্রাণ, বাহিরায় ভাঙ্গিয়া বক্ষ-কারা। . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |