কবি আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর কবিতা
*
অদৃশ্য আলোক
কবি আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু
এই রচনাটি ১৩২৮ ভাদ্র  (অগাস্ট ১৯২১)  সংখ্যা মোসলেম ভারত পত্রিকাতে প্রকাশিত
হয়েছিল। আমরা এই লেখাটি নিয়েছি আশ্বিন ১৩২৮ (সেপ্টেম্বর ১৯২১) এ, কলকাতার বসু  
বিজ্ঞান মন্দির থেকে প্রকাশিত, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর “অব্যক্ত” প্রবন্ধ সংকলন গ্রন্থ থেকে।
লেখাটি আরও বহু পূর্বের রচনা বলে মনে করা হয়।

আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু এত মাধুরি মিশিয়ে, কবি ও কবিতা নিয়ে লেখাটি লিখেছিলেন যে,
বাঙালীর কানে তা কবিতা হয়েই বাজবে! বাংলা আধুনিক  কবিতার জনক বঙ্কিমচন্দ্র
চট্টোপাধ্যায়কে স্মরণ করে এই লেখাটিকে আমরা আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর কবিতা হিসেবে
এখানে যেমন পেয়েছি, হুবহু প্রকাশ করলাম।


কবিতা ও বিজ্ঞানের কি ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ তাহার উদাহরণস্বরূপ
আপনাদিগকে এক অত্যাশ্চর্য অদৃশ্য জগতে প্রবেশ করিতে
আহ্বান করিব। সেই অসীম রহস্যপূর্ণ জগতের এক ক্ষুদ্র
কোণে আমি যাহা কতক স্পষ্ট কতক অস্পষ্ট -ভাবে উপলব্ধি
করিয়াছি, কেবলমাত্র তাহার সন্বন্ধেই দুই একটি কথা বলিব।
কবির চক্ষু এই বহু রঙে রঞ্জিত আলোক-সমুদ্র দেখিয়াও অতৃপ্ত
রহিয়াছে । এই সাতটি রঙ তাহার চক্ষুর তৃষা মিটাইতে পারে
নাই । তবে কি এই দৃশ্য-আলোকের সীমা পার হইয়াও অসীম
আলোকপুঞ্জ প্রসারিত রহিয়াছে?

এইরূপ অচিন্তনীয় অদৃশ্য আলোকের রহস্য যে আছে
তাহার পথ জার্মানির অধ্যাপক হার্টজ প্রথম দেখাইয়া দেন।
তড়িৎ-ঊর্মিসঞ্জাত সেই অদৃশ্য আলোকের প্রকৃতি সম্বন্ধে কতক-
গুলি তত্ত্ব প্রেসিডেন্সি কলেজের পরীক্ষাগারে আলোচিত
হইয়াছে। সময় থাকিলে দেখাইতে পারিতাম, কিরূপে অস্বচ্ছ
বস্তুর আভ্যন্তরিক আণবিক সন্নিবেশ এই অদৃশ্য আলোকের
দ্বারা ধরা যাইতে পারে । আপনারা আরও দেখিতেন, বস্তুর
স্বচ্ছতা ও অস্বচ্ছতা সম্বন্ধে অনেক ধারণাই ভূল। যাহা অস্বচ্ছ
মনে করি তাহার ভিতর দিয়া আলো অবাধে যাইতেছে।
আবার এমন অদ্ভুত বস্তুও আছে যাহা এক দিক ধরিয়া দেখিলে
স্বচ্ছ, অন্য দিক ধরিয়া দেখিলে অস্বচ্ছ। আরও দেখিতে
পাইতেন যে, দৃশ্য আলোক যেরূপ বহুমূল্য কাচ-বর্তুল দ্বারা
দূরে অক্ষীণভাবে প্রেরণ করা যাইতে পারে সেইরূপ মৃৎ-বর্তুল
সাহায্যে অদৃশ্য আলোকপুঞ্জও বহু দূরে প্রেরিত হয়। ফলতঃ
দৃশ্য আলোক সংহত করিবার জন্য হীরকখণ্ডের যেরূপ ক্ষমতা,
অদৃশ্য আলোক সংহত করিবার জন্য মৃৎপিণ্ডের ক্ষমতা তাহা
অপেক্ষাও অধিক।

আকাশ-সংগীতের অসংখ্য সুরসপ্তকের মধ্যে একটি সপ্তক-
মাত্র আমাদের দর্শনেন্দ্রিয়কে উত্তেজিত করে । সেই ক্ষুদ্র
গণ্ডিটিই আমাদের দৃশ্য-রাজ্য। অসীম জ্যোতিরাশির মধ্যে
আমরা অন্ধবৎ ঘুরিতেছি। অসহ্য এই মানুষের অপূর্ণতা ! কিন্তু
তাহা সত্ত্বেও মানুষের মন একেবারে ভাঙিয়া যায় নাই ; সে
অদম্য উৎসাহে নিজের অপূর্ণতার ভেলায় অজানা সমুদ্র পার
হইয়া নূতন দেশের সন্ধানে ছুটিয়াছে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কবিতা ও বিজ্ঞান
কবি আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু
এই লেখাটি প্রবাসী পত্রিকার বৈশাখ ১৩১৮ (এপ্রিল ১৯১১) সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত আচার্য
জগদীশচন্দ্র বসুর “বিজ্ঞানে সাহিত্য” প্রবন্ধের শেষ অধ্যায়। আমরা এই লেখাটি নিয়েছি
আশ্বিন ১৩২৮ (সেপ্টেম্বর ১৯২১) এ, কলকাতার বসু বিজ্ঞান মন্দির থেকে প্রকাশিত, আচার্য
জগদীশচন্দ্র বসুর “অব্যক্ত” প্রবন্ধ সংকলন গ্রন্থ থেকে।

আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু এত মাধুরি মিশিয়ে, কবি ও কবিতা নিয়ে লেখাটি লিখেছিলেন যে,
বাঙালীর কানে তা কবিতা হয়েই বাজবে! বাংলা আধুনিক কবিতার জনক বঙ্কিমচন্দ্র
চট্টোপাধ্যায়কে স্মরণ করে এই লেখাটিকে আমরা আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর কবিতা হিসেবে
এখানে, যেমন পেয়েছি, হুবহু প্রকাশ করলাম।

কবি এই বিশ্বজগতে তাহার হৃদয়ের দৃষ্টি দিয়া একটি অরূপকে
দেখিতে পান, তাহাকেই তিনি রূপের মধ্যে প্রকাশ করিতে
চেষ্টা করেন। অন্যের দেখা যেখানে ফুরাইয়া যায় সেখানেও
তাঁহার ভাবের দৃষ্টি অবরুদ্ধ হয় না। সেই অপরূপ দেশের
বার্তা তাঁহার কাব্যের ছন্দে ছন্দে নানা আভাসে বাজিয়া
উঠিতে থাকে। বৈজ্ঞানিকের পন্থা স্বতন্ত্র হইতে পারে, কিন্তু
কবিত্ব-সাধনার সহিত তাঁহার সাধনার ঐক্য আছে। দৃষ্টির
আলোক যেখানে শেষ হইয়া যায় সেখানেও তিনি আলোকের
অনুসরণ করিতে থাকেন, শ্রুতির শক্তি যেখানে সুরের শেষ
সীমার পৌঁছায় সেখান হইতেও তিনি কম্পমান বাণী আহরণ
করিয়া আনেন। প্রকাশের অতীত যে রহস্য প্রকাশের আড়ালে
বসিয়া দিনরাত্রি কাজ করিতেছে, বৈজ্ঞানিক তাহাকেই
প্রশ্ন করিয়া দুর্বোধ উত্তর বাহির করিতেছেন এবং সেই
উত্তরকেই মানব-ভাষায় যথাযথ করিয়া ব্যক্ত করিতে নিযুক্ত
আছেন।

এই যে প্রকৃতির রহস্য-নিকেতন, ইহার নানা মহল, ইহার
দ্বার অসংখ্য । প্রকৃতি-বিজ্ঞানবিৎ, রাসায়নিক, জীবতত্ত্ববিৎ
ভিন্ন ভিন্ন দ্বার দিয়া এক-এক মহলে প্রবেশ করিয়াছেন ; মনে
করিয়াছেন সেই সেই মহলই বুঝি তাঁহার বিশেষ স্থান, অন্য
মহলে বুঝি তাঁহার গতিবিধি নাই। তাই জড়কে, উদ্ভিদ্‌কে
সচেতনকে তাঁহারা অলঙ্ঘ্যভাবে বিভক্ত করিয়াছেন । কিন্তু এই
বিভাগকে দেখাই যে বৈজ্ঞানিক দেখা, এ কথা আমি স্বীকার
করি না। কক্ষে কক্ষে সুবিধার জন্য যত দেয়াল তোলাই যাক্‌-
না, সকল মহলেরই এক অধিষ্ঠাতা। সকল বিজ্ঞানই পরিশেষে
এই সত্যকে আবিষ্কার করিবে বলিয়া ভিন্ন ভিন্ন পথ দিয়া যাত্রা
করিয়াছে। সকল পথই যেখানে একত্র মিলিয়াছে সেইখানেই
পূর্ণ সত্য। সত্য খণ্ড খণ্ড হইয়া আপনার মধ্যে অসংখ্য বিরোধ
ঘটাইয়া অবস্থিত নহে। সেইজন্য প্রতি দিনই দেখিতে পাই ;
জীবতত্ত্ব, রসায়নতত্ত্ব, প্রকৃতিতত্ত্ব, আপন আপন সীমা হারাইয়া
ফেলিতেছে।

বৈজ্ঞানিক ও কবি, উভয়েরই অনুভূতি অনির্বচনীয় একের
সন্ধানে বাহির হইয়াছে । প্রভেদ এই, কবি পথের কথা ভাবেন ৷
না, বৈজ্ঞানিক পথটাকে উপেক্ষা করেন না। কবিকে সর্বদা
আত্মহারা হইতে হয়, আত্মসংবরণ করা তাঁহার পক্ষে অসাধ্য ।
কিন্তু কবির কবিত্ব নিজের আবেগের মধ্য হইতে তো প্রমাণ
বাহির করিতে পারে না! এজন্য তাঁহাকে উপমার ভাষা
ব্যবহার করিতে হয়। সকল কথায় তাঁহাকে “যেন” যোগ
করিয়া দিতে হয়।

বৈজ্ঞানিককে যে পথ অনুসরণ করিতে হয় তাহা একান্ত
বন্ধুর এবং পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের কঠোর পথে তাঁহাকে সর্বদা
আত্মসংবরণ করিয়া চলিতে হয়। সর্বদা তাঁহার ভাবনা, পাছে
নিজের মন নিজকে ফাঁকি দেয়। এজন্য পদে পদে মনের
কথাটা বাহিরের সঙ্গে মিলাইয়া চলিতে হয়। দুই দিক হইতে
যেখানে না মিলে সেখানে তিনি এক দিকের কথা কোনোমতেই
গ্রহণ করিতে পারেন না।

ইহার পুরস্কার এই যে, তিনি যেটুকু পান তাহার চেয়ে
কিছুমাত্র বেশি দাবি করিতে পারেন না বটে, কিন্তু সেটুকু তিনি
নিশ্চিতরপেই পান এবং ভাবি পাওয়ার সম্ভাবনাকে তিনি
কখনও কোনো অংশে দুর্বল করিয়া রাখেন না।

কিন্ত এমন যে কঠিন নিশ্চিতের পথ, এই পথ দিয়াও
বৈজ্ঞানিক সেই অপরিসীম রহস্যের অভিমুখেই চলিয়াছেন।
এমন বিস্ময়ের রাজ্যের মধ্যে গিয়া উত্তীর্ণ হইতেছেন যেখানে
অদৃশ্য আলোকরশ্মির পথের সম্মুখে স্থুল পদার্থের বাধা একে-
বারেই শূন্য হইয়া যাইতেছে এবং যেখানে বস্তু ও শক্তি এক
হইয়া দাঁড়াইতেছে। এইরূপ হঠাৎ চক্ষুর আবরণ অপসারিত
হইয়া এক অচিন্তনীয় রাজ্যের দৃশ্য যখন বৈজ্ঞানিককে অভিভূত
করে তখন মুহূর্তের জন্য তিনিও আপনার স্বাভাবিক আত্মসংবরণ
করিতে বিস্মৃত হন এবং বলিয়া উঠেন  ‘“যেন” নহে--- এই
সেই'।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর