কবি আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু –
জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার
বিক্রমপুরের মুন্সীগঞ্জে। পিতা ভগবানচন্দ্র বসু
ও মাতা বামাসুন্দরী দেবী ছিলেন ব্রাহ্ম। পিতা
ছিলেন ব্রিটিশ আমলের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট।
তাঁদের আদি বাসস্থান ছিল ঢাকা থেকে প্রায়
৫০ কিলোমিটার দূরে বিক্রমপুরের রাঢ়িখালে।
১৮৮৭ সালে তিনি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন
কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট পিতৃবন্ধু
দুর্গামোহন দাশের কন্যা শ্রীমতী অবলা বসুর
সঙ্গে।
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও অবলা বসু - পাতার উপরে . . .
১৮৮৭ সালে তিনি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট পিতৃবন্ধু দুর্গামোহন দাশের
কন্যা শ্রীমতী অবলা বসুর সঙ্গে। দুর্গামোহন দাশের ভ্রাতুষ্পুত্র ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। অবলা বসু
কলকাতা থেকে এফ.এ. পাশ করে মাদ্রাজে ডাক্তারি পড়তে যান। তখনও কলকাতা মেডিকেল কলেজে
মেয়েদের ভর্তি করা হতো না। ডাক্তারি পড়া শেষ করার আগেই তিনি বিবাহ করেন এবং তাঁর আর
ডাক্তারি পড়া শেষ হয় নি। তিনি আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর যোগ্য জীবনসঙ্গিনী ছিলেন এবং দেশ ও বিদেশে
সর্বদা তাঁর পাশে থেকেছেন।
অবলা বসু তার সারা জীবন নারী শিক্ষা, বাল্য বিবাহ রোধ, ইত্যাদির জন্য কাজ করে গিয়েছেন। সে সময়ে
নারীরা শিক্ষায় এবং আর্থ-সামাজিকভাবে পুরুষদের ওপর নির্ভশীল ছিল। অনেকে আবার অল্প বয়সে
বিধবা হয়ে সমাজে প্রতিনিয়ত নিগৃহিত হতেন। অল্প বয়সে বিধবা হয়ে সমাজের গলগ্রহ হয়ে, অবহেলিত
নারীদের জন্য অবলা বসু প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিদ্যাসাগর বাণীভবন’। অবলা বসু তাঁর দিদি সরলা রায়ের সাথে
যৌথভাবে গোখেল মেমোরিয়াল নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর মৃত্যুর
পর তাঁর সঞ্চিত এক লক্ষ টাকা দিয়ে তিনি সিস্টার নিবেদিতা উইমেন্স এডুকেশন ফান্ড প্রতিষ্ঠা করেন।
অবলা বসুর জামাইবাবু ও সরলা রায়ের স্বামীর ছিলেন প্রসন্নকুমার রায়, যিনি প্রেসিডেন্সী কলেজের প্রথম
ভারতীয় প্রিন্সিপাল।
ইউরোপে অবলা বসুর প্রথম ভ্রমণের গল্প নিয়ে ১৩৩২ সালে প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম ভ্রমণ
কাহিনী ‘বাঙ্গালী মহিলার পৃথিবী ভ্রমণ’। এছাড়া নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং নারী স্বাধীনতা নিয়ে তার
একাধিক প্রবন্ধ তৎকালীন বিখ্যাত ইংরেজি পত্রিকা ‘মর্ডান রিভিউ’-এ প্রকাশিত হয়।
জগদীশচন্দ্র বসুর সাহিত্য চর্চা, কল্পবিজ্ঞান ও কুন্তলীন পুরস্কার - পাতার উপরে . . .
জগদীশচন্দ্র বসুর বাংলাভাষায় সাহিত্যসাধনা কোনো অংশে কম ছিলো না। “প্রবাসী”, “সাহিত্য-পরিষৎ-
পত্রিকা”, “সাহিত্য”, “মুকুল”, “দাসী”, “ভারতবর্ষ”, “নারায়ণ” সহ নানা পত্র-পত্রিকায় তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধ
প্রকাশিত হয়েছে।
কেবল মাত্র বিজ্ঞান সাধনায় তিনি জীবন অতিবাহিত করেন নি। বাংলা ভাষার অগ্রণী ধারক ও বাহক
সংস্থা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ এর সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন এবং পরিষদের উন্নতিকল্পে
বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। ১৩২৩ সালের ১৪ শ্রাবণ (জুলাই ১৯১৬) দ্বাবিংশ বার্ষিক অধিবেশনে বিদায়ী
সভাপতি মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর আনা প্রস্তাবে, সর্বসম্মতিক্রমে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুকে
পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।
বন্ধুবর আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সঙ্গে, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার প্রবক্তা হিসেবে জগদীশচন্দ্রও পরিচিত
ছিলেন। তাঁর পরলোক গমনের পরে, তাঁর ইচ্ছানুযায়ী সহধর্মিণী শ্রীমতী অবলা বসু, বাংলা বৈজ্ঞানিক
পরিভাষার চর্চার জন্য পরিষৎকে তিন হাজার টাকা দান করে একটি স্মৃতিভাণ্ডার স্থাপন করেন।
বাংলা সাহিত্যে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুই কল্পবিজ্ঞানের পথীকৃত। ১৮৯৬ সালে, হেমেন্দ্রমোহন বসু প্রবর্তিত
কুন্তলীন গল্প-পুরস্কার-প্রতিযোগিতার প্রথমবারের প্রথম পুরস্কার লাভ করেছিল জগদীশচন্দ্র বসুর রচনা
"নিরুদ্দেশের কাহিনী"। তখন গল্পের লেখক নাম প্রকাশ করেন নি। কিন্তু তাঁর ইচ্ছানুসারে পুরস্কারের ৫০
টাকা সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের অন্তর্গত রবিবাসরীয় নীতিবিদ্যালয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে গল্পটি "অব্যক্ত" গ্রন্থে
(১৯২১) "পলাতক তুফান” নামে জগদীশচন্দ্রের রচনারূপে প্রকাশিত হয়।
এই নিয়ে সেবার গল্পটির শেষে কুন্তলীন থেকে লেখা হয়েছিল . . .
“এই উৎকৃষ্ট গল্পের লেখক নাম প্রকাশ করেন নাই। কিন্তু তাঁহার ইচ্ছানুসারে পুরস্কার (৫০ টাকা) সাধারণ
ব্রাহ্মসমাজের অন্তর্গত রবিবাসরীক নীতিবিদ্যালয়ে দেওয়া হইয়াছিল। সেই বৎসররের নিয়মাবলীতে
রচনাকারীর নামোল্লেখ সম্বন্ধে বিশেষ কোন নিয়ম না থাকায় আমরা বাধ্য হইয়া এই পুরস্কার দিয়াছিলাম।”
---কুন্তলীন পুরস্কার দ্বাদশ প্রথম (১৩০৩ - ১৩১৫), পৃষ্ঠা-৮, ১লা বৈশাখ ১৩১৭ তে প্রকাশিত।
একটু ভিন্ন সুরে, এখানে আমরা পাঠককে মনে করিয়ে দিতে চাই যে এরকম বেনামে কুন্তলীন পুরস্কার
বিজেতাদের মধ্যে ছিলেন কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও! এখানেই তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা বার
হয়েছিলো।
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর কবিতা - পাতার উপরে . . .
ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপানে বিজ্ঞানীসমাজে তাঁর আবিষ্কার প্রচারান্তে জগদীশচন্দ্র বসু দেশে ফেরার পরে
সাহিত্য পরিষৎ তাঁকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করে ১৫ই শ্রাবণ ১৩২২ তারিখে (সম্ভবতঃ ৩০শে জুলাই ১৯১৫)। সেই
সভায় হীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে আচার্য-প্রশস্তি করেন, তা সাহিত্য পরিযদ পত্রিকার ১৩২২ ভাদ্র সংখ্যায়
প্রকাশিত হয়। সেই বক্তৃতায় জদগীশচন্দ্রকে কবি আখ্যা দেওয়া হয়। আমরা বক্তৃতার সেই অংশটি এখানে
উদ্ধৃত করছি . . .
“এ দেশে যাঁহারা সত্য দর্শন করিতেন, তত্ত্ব সাক্ষাৎ করিতেন, তাঁহাদিগের প্রাচীন নাম ছিল কবি। যিনি
বৈদিক সত্যের আদি স্রষ্টা, প্রাচীন শাস্ত্রে তাঁহাকে আদি কবি বলে---
. তেনে ব্রহ্ম হৃদা য আদি কবয়ে।
আচার্য জগদীশচন্দ্র সেই আদি কবির প্রতিচ্ছবি। তিনিও তত্ত্বদ্রষ্টা, সত্যের আবিষ্কর্তা। অতএব তাঁহার
সমক্ষে আমাদের শির আপনি প্রণত হইতেছে। ভগবান তাঁহাকে দীর্ঘজীবী করুন।”
---অব্যক্ত, শ্রীজগদীশচন্দ্র বসু, ৫ম মুদ্রণ জুন ১৯৮৯, পৃষ্ঠা-২৩৪।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে যাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে কবি আখ্যা প্রদান করা হয়েছিলো, তাঁকে কি আমরা
মিলনসাগরের কবিদের সভা থেকে দূরে রাখতে পারি!? তাঁর লেখা সরাসরি কবিতা আমরা এখনও হাতে না
পেলেও তাঁর ভাষার বাঁধুনি ও মাধুর্য কবিতার চেয়ে কোনো অংশে কম যায় না!
আমরা জদগীশচন্দ্র বসুর, কবিতা-কবি-বিজ্ঞান-বিজ্ঞানী নিয়ে লেখা দুটি প্রবন্ধ, বাংলা আধুনিক কবিতার
জনক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে স্মরণ করে, তাঁর কবিতা হিসেবে তুলে নিজেদের ধন্য মনে করছি।
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর শিক্ষাজীবন - পাতার উপরে . . .
পিতা ব্রিটিশ সরকারের চাকুরে হলেও হৃদয়-মনে ছিলেন স্বদেশী। পুত্র জগদীশ যাতে এ দেশের আবহাওয়ায়
জীবন শুরু করে, তাই তিনি পুত্রকে একটি বাংলা ভাষার সাধারণ ইস্কুলে ভর্তি করে দেন। কোথাও আমরা
তাঁর প্রথম ইস্কুলের নামটির উল্লেখ পাইনি। কোথাও লেখা পেয়েছি যে তাঁর প্রথম স্কুল ছিলো ফরিদপুরে,
কোথাও দেওয়া রয়েছে ময়মনসিংহে। জগদীশচন্দ্রর লেখায় জানা যায় যে সেই স্কুলে তাঁর পাশে বসতেন
এক পাশে তাঁর পিতার মুসলমান পরিচারকের পুত্র এবং অন্য পাশে বসতেন এক জেলের পুত্র। তারাই তাঁর
খেলার সাথী ছিলেন। তাঁদের বাড়িতে নিয়ে এলে মাতা বামাসুন্দরী দেবী সবাইকে একসাথে বসিয়ে
খাওয়াতেন।
এরপর পিতা ভগবানচন্দ্রের বর্ধমানে বদলি হলে, তাঁকে তাঁর ১০/১১ বছর বয়সে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স
স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি করে দেওয়া হয়। সেখান থেকেই ১৮৭৫ সালে এন্ট্রাস পাশ করেন। ১৮৭৭ সালে
পাশ করেন এফ.এ. এবং ১৮৭৯ সালে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বি.এ. পাশ করেন। এর পর
জগদীশচন্দ্রের ইচ্ছে ছিলো সিভিল সার্ভিসে যোগ গিয়ে আই.সি.এস. হবার। কিন্তু তাঁর পিতার ঘোর আপত্তির
জন্য তিনি বিলেত গিয়ে লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক্তারিতে ভর্তি হলেন। বিলেত যাবার কিছুকাল পূর্বে, বি.এ.
পাশ করার পরে, এক বন্ধুর আসামে বাঘ ধরার নিমন্ত্রণে সারা দিয়ে গিয়ে, কালাজ্বরের আক্রান্ত হন এবং
বারবার সেই জ্বরে ভুগতে থাকেন। তখনও ডঃ উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর কালাজ্বরের মোক্ষম ওষুধ তৈরী হয়
নি। ভারত থেকে বিলেতে জাহাজ যাত্রার সারাটা সময় তাঁর অসুস্থতার মধ্যেই কেটেছিলো। ডাক্তারি
পড়তে গিয়েও জ্বরের প্রকোপে তাঁর আর পড়া সম্ভব হয়ে উঠলো না। অধ্যাপকদের পরামর্শে তিনি ডাক্তারি
পড়া ছেড়ে কেম্ব্রিজের ক্রাইস্ট চার্চ কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেন। ১৮৮৩ সালে তিনি লণ্ডন
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এসসি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৮৪ সালে লাভ করেন এডিনবরো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
সেখান থেকে পাশ করে ১৮৮৫ সালে তিনি কলকাতায় ফিরে এলেন। কেমব্রিজে পঠনকালে তাঁর সাথে
পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয় এডিনবরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সঙ্গে! এই সময়ে তিনি অধ্যাপক লর্ড
ব়্যালে এবং অধ্যাপক ভাইন্স এর স্নেহভাজন হন, যাঁরা তাঁকে তাঁর কাজে ভবিষ্যতে সমর্থন ও উৎসাহদান
করেছিলেন। লর্ড ব়্যালে ১৯০৪ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর কর্মজীবন - পাতার উপরে . . .
১৮৮৫ সালে তিনি কলকাতায় ফিরে আসার পূর্বে তিনি আনন্দমোহন বসুর বন্ধু, অর্থনীতির প্রখ্যাত
অধ্যাপক ও সাংসদ হেনরি ফসেটের কাছ থেকে ভারতের বড়লাট বা গভর্নর জেনারেল লর্ড রিপনের সঙ্গে
দেখা করার জন্য একটি সুপারিশ পত্র সঙ্গে আনেন। আনন্দমোহন ছিলেন কেমব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজ থেকে
উচ্চতর গণিত নিয়ে অনার্সসহ ডিগ্রী পরীক্ষা ও ট্রাইপস পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণী লাভ করে প্রথম ভারতীয়
ব়্যাংলার।
লর্ড রিপন জগদীশচন্দ্রকে প্রেসিডেন্সী কলেজের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক পদের সুপারিশও করেন। তখন
শিক্ষা বিভাগে ইম্পেরিয়াল ও প্রভিন্সিয়াল সার্ভিস নামে দুরকমের চাকরি ছিল। লর্ড রিপনের সুপারিশ এবং
বিলেতের উপযুক্ত ডিগ্রী থাকা সত্তেও তখনকার বাংলার শিক্ষা বিভাগের অধিকর্তা জগদীশচন্দ্রকে
প্রভিন্সিয়াল সার্ভিসে যোগ দিতে বলেন। পদ মর্ষাদা ও বেতনে ইম্পিরিয়াল সার্ভিস ছিল প্রভিন্সিয়াল
সার্ভিসের চেয়ে ভালো, তাই জগদীশচন্দ্র শিক্ষা অধিকর্তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। পরে লর্ড রিপনের
হস্তক্ষেপে জগদীশচন্দ্র অস্থায়ীভাবে ইম্পিরিয়াল সার্ভিসেই নিযুক্ত হন, কিন্তু এক অপূর্ব সর্তে। সর্তটা হল এই
যে তখনকার দিনের প্রভু ইংরেজদের আইন অনুসারে তিনি স্থায়ীভাবে ইম্পিরিয়াল সার্ভিসে নিযুক্ত হলেও
একই যোগ্যতা একই কাজ করা সত্বেও ইউরোপীয় অধ্যাপকদের প্রাপ্য বেতনের দুই তৃতীয়াংশ মাত্র বেতন
পাবেন। জগদীশচন্দ্র কাজে যোগ দিলেন কিন্তু এ জাতীয় অন্যায় বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তিনি
বেতন নিতেই অস্বীকার করেন এবং তিন বছর বিনা বেতনে প্রেসিডেন্সী কলেজে অধ্যাপনা করেন। এই তিন
বছর জগদীশচন্দ্রকে অত্যন্ত আর্থিক অনটনের মধ্যেই কাটাতে হয়, ঋণগ্রস্ত পিতার পক্ষে তাকে অর্থ সাহায্য
করা সম্ভব ছিল না এবং জগদীশচন্দ্রও বিবাহিত, তাই তিনি সস্ত্রীক চন্দননগরে একটা ছোট বাড়ী ভাড়া করে
সেখান থেকেই রোজ কলেজে যাতায়াত করতেন। তিন বছর বিনা বেতনে কাজ করার পর সরকার নতি
স্বীকার করতে বাধ্য হন এবং নিয়োগের প্রথম দিন থেকেই ইউরোপীয় অধ্যাপকদের সমহারে প্রাপ্য বেতন
একসঙ্গে দিয়ে দেন। ওই টাকা দিয়ে তিনি পিতা ভগবানচন্দ্রকে সম্পূর্ণ ঋণমুক্ত করতে সমর্থ হন, পিতার
জীবদ্দশাতেই।
প্রেসিডেন্সী কলেজে সেই সময় যোগ দিয়েছিলেন তাঁর বন্ধু প্রফুল্লচন্দ্র রায়, যিনি পরবর্তিতে ফাদার অফ
নাইট্রাইটস উপাধিতে খ্যাতি লাভ করেন। একজন পদার্থ বিজ্ঞানে ও অন্যজন রসায়ন শাস্ত্রে, দুজনেই
ভারতীয় বিজ্ঞানকে আধুনিক বিশ্বের দরবারের উচ্চাসনে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এই দুই আচার্যই ভারতীয়
বিজ্ঞানের ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছেন। আমরা এই দুই আচার্যকেই মিলনসাগরের কবিদের সভায়
আসন দিয়ে ধন্য হয়েছি।
জগদীশচন্দ্র বসুর বিজ্ঞান সাধনা - পাতার উপরে . . .
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর বিশাল কর্মকাণ্ড নিয়ে লেখার ক্ষমতা ও স্পর্ধা আমাদের নেই। তবুও আমরা চেষ্টা
করবো তাঁর কাজের কয়েকটি দিক খুব সাধারণভাবে, সরল ভাষায় ছুঁয়ে যাওয়ার। বোদ্ধা পাঠকেরা যদি
আমাদের এই লেখায় ভুল-ত্রুটি দেখতে পান, তাহলে দয়া করে আমাদের সংশোধন করে দিলে আমরা কৃতজ্ঞ
থাকবো।
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর দীর্ঘ ৩৫ বছরের বিজ্ঞান সাধনাকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
১। ১৮৯৪ – ১৮৯৭ বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা (Pioneering work on Electro-magnetic waves.
Generation and shortwave transmission)। বলা চলে আজকের বিশ্বব্যাপি ওয়াই-ফাই যুগের সূচনা হয়েছিলো
তাঁর কাজের মধ্য দিয়েই। এই সময়কার গবেষণা তিনি করেন কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজের
গবেষণাগারেই। এই গবেষণাটি তিনি করেছিলেন প্রেসিডেন্সী কলেজের গবেষণাগারে এবং প্রয়োজনীয় প্রায়
সমস্ত যন্তপাতি তিনি নিজেই তৈরী করে নিয়েছিলেন!
জার্মান পদার্থ বিজ্ঞানী হাইনরিক রুডলফ হার্ৎজ ১৮৮৮ সালে সর্বপ্রথম একটি যন্ত্রের সাহায্যে অত্যন্ত উচ্চ
কম্পাঙ্কের বেতার তরঙ্গ তৈরি ও শনাক্ত করেন এবং এর সাহায্যে তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রমাণ
করেন। তার নামেই কম্পাঙ্কের আন্তর্জাতিক এককের নামকরণ করা হয়েছে হার্ৎজ (সাইকেলস্ পার
সেকেণ্ড)। হার্ৎজ এর আবিস্কারের পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বৈজ্ঞানিকরা এই অদৃশ্য আলোক তরঙ্গ
নিয়ে নানা গবেষণা আরম্ভ করেন এবং জগদীশচন্দ্রও সেই গবেষণায় পা বাড়ান।
হার্ৎজ তাঁর সুবিশাল যন্ত্রের মাধ্যমে যে নতুন বিদ্যুত তরঙ্গের সৃষ্টি করেন তার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ছিল অনেক
বেশী প্রায় ৯৬০ সেন্টিমিটার, পরে অবশা তা আরও ছোট প্রায় ৬৬ সেন্টিমিটার মাপের তরঙ্গ তৈরী
করতে সমর্থ হয়েছিলেন। জগদীশচন্দ্রই প্রথম বৈজ্ঞানিক যিনি নিজে প্রেসিডেন্সী কলেজে তাঁর তৈরী যন্ত্রে ২.৫
থেকে ০.৫ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের ক্ষুদ্র মাপের বিদ্যুৎ তরঙ্গ (Short wave) সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন (short
wave transmitter )। এবং এই বৈদ্যেতিক তরঙ্গ, ঘরে ধরবার জন্য গ্রাহক যন্ত্রও তৈরী করেছিলেন (receiver)।
জগদীশচন্দ্রের আবিস্কৃত এই যন্ত্র ছিল বেশ ছোট এবং অনায়াসে পরিবহন যোগ্য।
জগদীশচন্দ্রই সর্বপ্রথম বিজ্ঞানী যিনি সর্বসমক্ষে তাঁর এই যন্ত্রের প্রয়োগ দেখিয়েছিলেন। ১৮৯৬ সালে
কলকাতা টাউন হলে, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীর গভর্ণর অ্যালেক্সাণ্ডার ম্যাকেঞ্জির উপস্থিতিতে তিনি তাঁর নতুন
আবিষ্কারের পরীক্ষা দেখিয়েছিলেন এবং সকলেই দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন যে বক্তৃতা মঞ্চ থেকে অদৃশ্য
তরঙ্গ, অন্য দুটি বদ্ধ কক্ষ ভেদ করে তৃতীয় কক্ষে নানা রকম তোলপাড় সৃষ্টি করে একটা লোহার গোলোক
নিক্ষেপ করে এবং বারুদের স্তুপও উড়িয়ে দেয়। এই সভাতেই জশদীশচন্দ্র বলেছেন যে এর সাহায্যে বিনা
তারে (বেতারে) সংবাদ প্রেরণ করা যেতে পারে।
এই সাফল্যই বিশ্বের বিজ্ঞান জগতে জগদীশচন্দ্রকে প্রতিষ্ঠিত করে। জগদীশচন্দ্র তাঁর এই আবিচ্কৃত যন্ত্রের
সাহায্যে প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে এক মাইল দূরে নিজের বাড়ীতেও সংবাদ পাঠাতে সক্ষম হন। এই
সময়কার গবেষণা প্রবন্ধ-গুলিকে তিনি ক্ষুদ্র পুস্তিকার আকারে প্রকাশ করেন এবং লর্ড কেলভিনের মত
বৈজ্ঞানিকের উচ্চ প্রশংসাও লাভ করেন। মিলিমিটার মাপের বিদুৎ রশ্মির তরঙ্গ দৈর্ঘ্য নির্ণয়ের কৌশল
সম্বন্ধে তাঁর গবেষণা প্রবন্ধের জন্য লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁদের প্রথা ভঙ্গ ক’রে ১৮৯৬ সালে জগদীশচন্দ্রর
অনুপস্থিতিতে তাঁকে ডি.এস.সি. ডিগ্রী প্রদান করেন।
বৈদ্যুতিক যন্ত্র তৈরীতে তিনি তখন এতই পারদর্শী হয়ে ওঠেছিলেন যে নিজের গবেষণার কাজে ব্যস্ত থাকার
সময়ই ডাক্তার নীলরতন সরকারের অনুরোধে নিজে কলেজে একস্-রে যন্ত্র তৈরী করে তার দ্বারা একস্-রে
ফটোও তুলেছিলেন।
১৮৯৬ সালের ইউরোপ যাত্রায়, তিনি ইংল্যাণ্ডে ইটালিয়ান বিজ্ঞানী গুগলিয়েলমো মার্কোনির সাথেও দেখা
করেছিলেন, যিনি সেই সময় বেতার যন্ত্রের উপর কাজ করছিলেন। এই সময়কালে জগদীশচন্দ্র তাঁর যন্ত্র ও
আবিষ্কার পেটেংন্ট করানোর পক্ষপাতি ছিলেন না। এরই মধ্যে ইতালির বিজ্ঞানী গুগলিয়েলমো মার্কোনি
Wireless transmission পেটেন্ট করান এবং আধুনিক রেডিওর জনক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
২। ১৮৯৭ – ১৯০২ জৈব এবং অজৈব বা জড় পদার্থের উত্তেজনার ফলে সাড়ার সমতা বিষয়ে গবেষণা।
এই সময় তিনি জৈব এবং অজৈব বা জড় পদার্থের উত্তেজনার ফলে সাড়ার সমতা বিষয়ে গবেষণা করেন।
জড় ও জীবের মধ্যে উত্তেজনা প্রসূত বৈদ্যুতিক সাড়ার সমতা নামের একটি প্রবন্ধ তিনি পাঠ করেন ১৯০০
সালে প্যারিস আন্তর্জাতিক পদার্থ বিদ্যা কংগ্রেসে। ওই গবেষণা ও পরীক্ষার জন্য তিনি তৈরী করেন বিশ্বের
সর্বপ্রথম অর্ধপরিবাহী বস্তু দিয়ে তৈরী রেক্টিফায়ার এবং প্রথম ফটোকন্ডাক্টিং সেল একত্রে (world's first
semi-conducter rectifier and photo conducting cell)। এখন বেতার, ইলেকট্রনিক হিসাব যন্ত্র বা কম্পিউটার
ইত্যাদির সাহাযো মানষের ঐচ্ছিক কাজের যে অনুকরণ করা হচ্ছে জগদীশচন্দ্রের সেই পরীক্ষা গুলিকে
তাহার অগ্রদূত বলা যায়।
১৯৭৭ সালের পদার্থবিদ্যায় নোবেল জয়ী স্যার নেভিল মট (Sir Nevill Mott) বলেছেন যে জগদীশচন্দ্র বসু তাঁর
সময়কাল থেকে অন্তত ষাট বছর এগিয়ে ছিলেন। এমন কি তিনি P-type and N-type সেমিকনডাকটারের
প্রত্যাশাও করেছিলেন। "J.C. Bose was at least 60 years ahead of his time. In fact, he had anticipated the
existence of P-type and N-type semiconductors."
৩। ১৯০৩ – ১৯৩২ উদ্ভিদ ও প্রাণীর পেশীর তুলনামূলক বিষয়ক গবেষণা। উদ্ভিদের জল শোষন করার
উপায় সম্বন্ধে তখন যে সব মতবাদ প্রচলিত ছিল তার কোনটাই জগদীশচন্দ্রের কাছে সন্তোষজনক মনে হয়
নি। শোষণগ্রাফ বা ফটোগ্রাফ নামক যন্ত্র তৈরী করে উদ্ভিদের জলশোষণ করার প্রকৃত পদ্ধতিও আবিষ্কার
করলেন। তিনি দেখালেন যে এই জলশোষণ বিভিন্ন উষ্ণতায় বিভিন্ন, একটি তাপমাত্রার নীচে জল শোষণ
ক্রিয়া একেবারে থেমে যায় আবার একটি নির্দিষ্ট উষ্ণতায় শোষণের বেগ সর্বোচ্চ হয়। অবসাদক রসায়নের
সামান্য প্রয়োগে জলশোষণ মাত্রা বৃদ্ধি পায় ; আবার ঐ জাতীয় রসায়ন বেশী প্রয়োগ করলে বিষ প্রয়োগের
মত ব্যাপার ঘটে, শোষণ একবারেই বন্ধ হয়ে যায়। পূর্বের প্রচলিত যান্ত্রিক এবং আস্রাবন প্রক্রিয়া
(Filtration process) দ্বারা চারশ ফুটের মত উচ্চ বৃক্ষের জল শোষণ যেমন বাখ্যা করা সম্ভব নয়,
জলশোষণের তীব্র গতিবেগও আস্রাবন পদ্ধতিতে ব্যাখা করা যায় না। তাঁর দেওয়া ব্যাখ্যাকে Push & Pull
Theory of JC Bose বলা হয়।
১৯১৭ সালে জগদীশচন্দ্র ক্রেস্কোগ্রাফ বা বৃদ্ধিমান যন্ত্র তৈরী করেন। এই যন্ত্রের সাহায্যে গাছের বৃদ্ধির হার
দশহাজার গুণ বাড়িয়ে দেখানো যায় এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে যন্ত্রে লিপিবদ্ধও হয়। এই যন্ত্রটির কথা তিনি ঐ
বছরই রয়াল সোসাইটর পত্রিকায় প্রকাশ করেন। এর পরে তিনি চৌম্বক ক্রেস্কোগ্রাফ তৈরী করেন যাতে
গাছের বৃদ্ধির হার পাঁচ কোটি গুণ বাড়িয়ে দেখানো যায়, যার ফলে বিভিন্ন পরিবেশে গাছের বৃদ্ধির
তারতম্য কয়েক মিনিটের মধ্যেই জানা সম্ভবপর হয়। এই সময়ে গবেষণার বিষয়গুলি ১৯২৩ থেকে ১৯২৯
সালের মধ্যে প্রকাশিত Physiology of the Ascent of sap, Physiology of Photosynthesis, Nervous Mechanism of
Plants, Collected Physical Papers, Motor Mechanism of Plants এবং Growth and Tropic Movement of Plants
নামের বইগুলিতে বর্ণিত হয়। তিনি তাঁর এই সময়কার কিছ কিছু আবিষ্কার রয়াল সোসাইটিতেও প্রকাশের
জন্য পাঠান। কিন্তু কয়েকজন উদ্ভিদবিজ্ঞানীর আপত্তিতে রয়াল সোসাইটি সে সব প্রবন্ধ প্রকাশ করেন নি।
জগদীশচন্দ্র বসুর প্রকাশিত গ্রন্থ ও গবেষণামূলক প্রবন্ধাদি - পাতার উপরে . . .
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর প্রকাশিত গবেষণামূলক প্রবন্ধ ও পুস্তকাদির মধ্যে রয়েছে . . .
- Polarisation of electric rays by double-refracting crystals, The Asiatic Society of Bengal, May 1895.
- A new electro-polariscope, Sumitted to The Royal Society of London in October 1895, and was
published by The Electrician in December 1895.
- In 1899, Bose announced the development of an "iron-mercury-iron coherer (a term for radio wave
receiver) with telephone detector" in a paper presented at the Royal Society, London.
- Response in the Living and Non-living, 1902.
- Plant response as a means of physiological investigation, 1906.
- Comparative Electro-physiology: A Physico-physiological Study, 1907.
- Response in the Living and Non-Living, 1910.
- Researches on Irritability of Plants, 1913.
- Life Movements in Plants (vol.1), First Published 1918, Reprinted 1985.
- Life Movements in Plants, Volume II, 1919.
- Physiology of the Ascent of Sap, 1923.
- The physiology of photosynthesis, 1924.
- The Nervous Mechanism of Plants, 1926, Dedicated to his long friend Rabindra Nath Tagore.
- Plant Autographs and Their Revelations, 1927.
- Growth and tropic movements of plants, 1929.
- Motor mechanism of plants, 1928.
- অব্যক্ত – আশ্বিন ১৩২৮-এ (সেপ্টেম্বর ১৯২১) প্রকাশিত, তাঁর লেখা বাংলা প্রবন্ধের সংকলন যা তাঁর
সাহিত্যপ্রীতি ও বাংলাভাষার উপর দখলের প্রামাণিক গ্রন্থ। এছাড়া “প্রবাসী”, “সাহিত্য-পরিষৎ-
পত্রিকা”, “সাহিত্য”, “মুকুল”, “দাসী”, “ভারতবর্ষ”, “নারায়ণ” সহ নানা পত্র-পত্রিকায় তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধ
প্রকাশিত হয়েছে।
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর - পাতার উপরে . . .
জগদীশচন্দ্র বসু ও তাঁর চেয়ে তিন বছরের কনিষ্ঠ গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বন্ধুত্ব শুরু হয় ১৮৯৬ সালে,
যখন জগদীশচন্দ্র তাঁর সফল ইউরোপীয় বৈজ্ঞানিক সফর শেষ করে দেশে ফিরে এলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর
জমিদারী শিলাইদহে থাকার সময়ে জগদীশচন্দ্র প্রায়ই সেখানে যেতেন সস্ত্রীক লেডি অবলা বসুর সঙ্গে।
সকালে কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে মিলে অবলা বসু নানা রকম রান্নাবান্না করতেন এবং বিকেলে সবাই
মিলে নৌকাবিহারে বার হতেন। সেখানে অবশ্যই বসতো গানের আসর।
জগদীশচন্দ্র বসু ও গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায় একে অপরের পরিপূরক হিসেবে জীবন কাটিয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের উৎসাহদানে জগদীশচন্দ্র রচনা করেছেন বিভিন্ন বৈজ্ঞনিক প্রবন্ধ। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত তাঁর
The Nervous Mechanism of Plants গবেষণা গ্রন্থটি উৎসর্গ করেন দীর্ঘকালীন বন্ধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। ঠিক
তেমনি জগদীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিলেন তাঁর মহাভারতের প্রিয় চরিত্র কর্ণের উপরে
বিখ্যাত কবিতা “কর্ণকুন্তী সংবাদ” সহ প্রচুর গল্প, কবিতা, গান। বিলাতে থাকাকালীন জগদীশচন্দ্র
রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন লেখা ইংরেজীতে অনুবাদ করে সেখানকার পত্র-পত্রিকায় ছাপাতেন।
জগদীশচন্দ্রের ১৯০০ সাল নাগাদ ইউরোপে অবস্থানকালে আর্থিক সমস্যার সময়ে রবীন্দ্রনাথ ত্রিপুরার
মহারাজা রাধাকিশোর দেবমাণিক্যের কাছে আবেদন করেন। মহারাজা, রবীন্দ্রনাথের সেই ভিক্ষানুরোধ
একাধিকবার রক্ষা করেছিলেন।
১৯০২ সনের অক্টোবরে জগদীশচন্দ্র স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। “ভারত সঙ্গীত সমাজ” নামে একটি সংগঠন
জগদীশচন্দ্র বসুকে সংবর্ধনা প্রদান করেন। এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতি ছিলেন কুচবিহারের মহারাজা
নৃপেন্দ্র নারায়ণ। এই অনুষ্ঠানের সম্বর্ধনা সঙ্গীতের জন্য রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন “জয় তব হোক জয়” গানটি।
এর উপরে রয়েছে জগদীশচন্দ্র বসুকে নিয়ে লেখা কবিতা “ভারতের কোন্ বৃদ্ধ ঋষির তরুণ মূর্ত্তি তুমি” যা
বঙ্গদর্শন পত্রিকার আষাঢ় ১৩০৮ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।
বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রতিষ্ঠা উৎসবে ১৪ই অগ্রহায়ণ ১৩২৪ (৩০শে নভেম্বর ১৯১৭) রবীন্দ্রনাথ রচনা
করেছিলেন “মাতৃমন্দির-পুণ্য-অঙ্গন কর' মহোজ্জ্বল আজ হে” গানটি। সেই অনুষ্ঠানে জগদীশচন্দ্রের আচার্য
পদে বরণের পরে গানটি গাওয়া হয়েছিল। আচার্যের অভিভাষণ পাঠের পরে গাওয়া হয় রবীন্দ্রনাথের
ভারতভাগ্যবিধাতার বন্দনা গীত “জনগণমন অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা”।
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও সিসটার নিবেদিতা - পাতার উপরে . . .
১৯০০ সালে প্যারিসে যে বিষয়ে জগদীশচন্দ্র বসু বক্তৃতা দেন, সেই একই বিষয়ে ইংল্যাণ্ডের বিভিন্ন
সংস্থায়ও তিনি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এইসময়েই তাঁকে এক শ্রেণীর পশ্চিমী বৈজ্ঞানিকদের কাছে অনেক
বাধা পেতে হয় এবং অনেকেই তাঁকে ভ্রান্ত প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। তাঁদের বিশ্বাস অর্জন করার জন্য
জগদীশচন্দ্রকেও প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। এই সময়েই তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান সিসটার নিবেদিতা এবং
মিসেস ওলি বুল, স্বামী বিবেকানন্দের ধীরামাতা। সিসটার নিবেদিতা এবং শ্রীমতী বুলের অকুণ্ঠ সহযোগিতা
না পেলে সেই পরিবেশে সংগ্রাম চালানো হয়ত জগদীশচন্দ্র বসুর পক্ষে খুব কঠিন হয়ে উঠত।
জগদীশচন্দ্র তাঁর আবিষ্কৃত যন্ত্রের পেটেন্ট নেবার তীব্র বিরোধী ছিলেন। কিন্তু সিসটার নিবেদিতার আন্তরিক
ইচ্ছায় এবং শ্রীমতী সারা বুলের দরখাস্তে ১৯০৪ সালে তাঁর পেটেন্ট গ্রাহ্য হয়। আমেরিকাতেও ১৯০১ সালে
পেটেন্টের দরখাস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তা গ্রাহ্য হয় ১৯০৫ সালে।
লংমান গ্রীন এণ্ড কোং জগদীশচন্দ্রের প্রথম গ্রন্থ Responses in the Living and non-Living প্রকাশ করে ১৯০২
সালে। এই সময়কালে সিসটার নিবেদিতা জগদীশচন্দ্রকে শুধু সাহায্যই করেন নি, তাঁর গ্রন্থের ভাষারও
সম্পাদনা করে দেন। ১৯০২ থেকে ১৯০৭ সালের মধ্যে প্রকাশিত প্রসিদ্ধ Living and non-Living, Plant
Response, Comparative Electro-physiology গ্রন্থগুলিও সিসটার নিবেদিতা দ্বারাই সম্পাদিত। এমন কি
জগদীশচন্দ্রের যে সকল প্রবন্ধ পরে রয়াল সোসাইটির পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছে, তার
সবগুলিই সিসটার নিবেদিতা সম্পাদন করে দিয়েছিলেন। জগদীশচন্দ্রের, পরে প্রকাশিত গ্রন্থ Irritability of
Plant ও তিনি সম্পদনা করে দিয়েছিলেন।
১৯০৪ সালে জগদীশচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও পুত্র রথীন্দ্রনাথ, যদুনাথ সরকার, সিসেটার নিবেদিতা, স্বামী শঙ্করানন্দ
সহ আরও অনেকে বুদ্ধগয়া বেড়াতে গিয়েছিলেন যেখানে তাঁরা বোধিবৃক্ষ তলে বসে অনেক রাত পর্যন্ত
বৌদ্ধধর্ম নিয়ে আলোচনা করতেন। ১৯০৮ সালে সস্ত্রীক জগদীশচন্দ্রের আমেরিকা যাত্রায় সিসটার নিবেদিতা
তাঁদের সঙ্গে গিয়েছিলেন। ১৯১০ সালের গরমের ছুটিতে তাঁরা একসাথে কেদার-বদরী তার্থ দর্শন করে
আসেন। তাঁদের সঙ্গেই ১৯১১ সালে সিসটার নিবেদিতা, দার্জ্জিলিং বেড়াতে গিয়ে, পরলোক গমন করেন।
১৯০১ সালের ১০ই মে রয়াল ইনস্টিটিউশনের ২য় বক্তৃতা সম্বন্ধে সিসটার নিবেদিতা বন্ধু রবীন্দ্রনাথকে চিঠি
দিয়ে জানান এবং রবীন্দ্রনাথ সেই বিখ্যাত চিঠি তখনকার বঙ্গদর্শন পত্রিকার (নবপর্যায়) আষাঢ় ১৩০৮
সংখ্যায় (জুন ১৯০১) প্রকাশ করেন। আমরা সেই অংশটি পুরোটাই এখানে তুলে দিলাম কারণ সিসটার
নিবেদিতার লেখা এবং রবীন্দ্রনাথের অনুবাদের মধ্যে সেই সময়ের যুগান্তকারী ঘটনাটি যেমন আমরা
প্রত্যক্ষ করতে পারি তেমনি একটি অবদমিত জাতিসত্তার উত্থান বাণীর সুরও মনে প্রাণে বেজে ওঠে . . .
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন . . .
". . . এই সভায় উপস্থিত কোন বিদুষী ইংরাজ-মহিলা, সভার যে বিবরণ আমাদের নিকট পাঠাইয়াছেন, নিম্নে
তাহা হইতে স্থানে স্থানে অনুবাদ করিয়া দিলাম।
“সন্ধ্যা নয়টা বাজিলে দ্বার উন্মুক্ত হইল এবং বসু-জায়াকে লইয়া সভাপতি সভায় প্রবেশ করিলেন। সমস্ত
শ্রোতৃমণ্ডলী অধ্যাপকপত্নীকে সাদরে অভ্যর্থনা করিল। তিনি অবগুঠনাবৃতা এবং শাড়ী ও ভারতবর্ষীয়
অলঙ্কারে সুশোভনা। তাঁহাদের পশ্চাতে যশস্বী লোকের দল, এবং সর্ব্বপশ্চাতে আচার্য্য বসু নিজে। তিনি
শান্তনেত্রে একবার সমস্ত সভার প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন এবং অতি স্বচ্ছন্দ সমাহিত ভাবে বলিতে প্রবৃত্ত
হইলেন।
তাঁহার পশ্চাতে রেখাঙ্কন-চিত্রিত বড় বড় পট টাঙান রহিয়াছে। তাহাতে বিষপ্রয়োগে, শ্রান্তির অবস্থায়,
ধনুষ্টঙ্কার প্রভৃতি আক্ষেপে, উত্তাপের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় স্নায়ু ও পেশীর এবং তাহার সহিত তুলনীয়
ধাতুপদার্থের স্পন্দনরেখা অঙ্কিত রহিয়াছে। তাঁহার সম্মুখের টেবিলে যন্ত্রোপকরণ সজ্জিত।
তুমি জান, আচার্য্যবসু বাগ্মী নহেন বাক্যরচনা তাঁহার পক্ষে সহজসাধ্য নহে ; এবং তাঁহার বলিবার ধরণও
আবেগে ও সাধ্বসে পূর্ণ। কিন্তু সে রাত্রে তাঁহার বাক্যের বাধা কোথায় অন্তর্ধান করিল। এত সহজে তাঁহাকে
বলিতে আমি শুনি নাই। মাঝে মাঝে তাঁহার পদবিন্যাস গাম্ভীর্য্যে ও সৌন্দর্য্যে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতে লাগিল,
এবং মাঝে মাঝে তিনি সহাস্যে সুনিপুণ পরিহাস সহকারে অত্যন্ত উজ্জ্বল সরলভাবে বৈজ্ঞানিকব্যূহের মধ্যে
অস্ত্রের পর অস্ত্র নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তিনি রসায়ন, পদার্থতত্ত্ব ও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাপ্রশাখার
ভেদ অত্যন্ত সহজ উপহাসেই যেন মিটাইয়া দিলেন।
তাহার পরে বিজ্ঞান শাস্ত্রে জীব ও অজীবের মধ্যে যে ভেদ নিরূপক সংজ্ঞা ছিল তাহা তিনি মাকড়সার
জালের মত ঝাড়িয়া ফেলিলেন---অবশেষে অধ্যাপক বসু তাঁহার স্বনির্মিত কৃত্রিম চক্ষু সভার সম্মুখে উপস্থিত
করিলেন এবং দেখাইলেন যে আমাদের চক্ষু অপেক্ষা তাহার শক্তি অধিক, তখন সকলের বিস্ময়ের অন্ত
রহিল না। ভারতবর্ষ যুগে যুগে যে মহৎ ঐক্যের বাণী অকুণ্ঠিত চিত্তে ঘোষণা করিয়া আসিয়াছে, আজ যখন
সে ঐক্যের সংবাদ আধুনিক কালের ভাষায় উচ্চারিত হইল, তখন আমাদের কিরূপ পুলক সঞ্চার হইল
তাহা আমি বর্ণনা করিতে পারি না। মনে হইল বক্তা যেন নিজস্ব আবরণ পরিত্যাগ করিলেন, তিনি যেন
অন্ধকারের মধ্যে অন্তর্হিত হইলেন, কেবল তাঁহার দেশ এবং তাঁহার জাতি আমাদের সম্মুখে উত্থিত হইল, ---
এবং বক্তার নিম্নলিখিত উপসংহারভাগ যেন সেই তাহারই উক্তি!
I have shown you this evening the autographic records of the history of Stress and Strain in both the living and
non-living. How similar are the two sets of writings, so similar indeed that you cannot tell them one from the
other ! They show you the waxing and waning pulsations of life - the climax due to stimulants, the gradual
decline of fatigue, the rapid setting in of death-vigor from the toxic effect of poison. It was when I came on this
mute witness of life and saw an all-pervading unity that binds together all things --- the mote that thrills on
ripples of light, the teeming life on earth and the radiant suns that shine on it --- it was then that for the first
time I understood the message proclaimed by my ancestors on the banks of the Ganges thirty centuries ago
---
“They who behold the one, in all the changing manifoldness of this universe, unto them belongs eternal truth,
unto none else, unto none else.”
বৈজ্ঞানিকদের মনে উৎসাহ ও সমাজের অগ্রণীদের মনে শ্রদ্ধা পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। সভাস্থ দুই এক জন
সর্ব্বশ্রেষ্ঠ মনীষী ধীরে ধীরে আচার্য্যের নিকট উপস্থিত হইলেন এবং তাঁহার উচ্চারিত বচনের জন্য ভক্তি ও
বিস্ময় স্বীকার করিলেন।
আমরা অনুভব করিলাম যে, এতদিন পরে ভারতবর্ষ --- শিষ্যভাবেও নহে, সমকক্ষভাবেও নহে, গুরুভাবে
পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক-সভায় উত্থিত হইয়া আপনার জ্ঞানশ্রেষ্ঠতা সপ্রমাণ করিল, ---পদার্থতত্ত্বসন্ধানী ও ব্রহ্ম-
জ্ঞানীর মধ্যে যে প্রভেদ, তাহা পরিস্ফুট করিয়া দিল।”
জগদীশচন্দ্রও সিসটার নিবেদিতাকে চিরজীবন স্মরণে রেখেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সময় তিনি সিসটার
নিবেদিতার জন্য ১ লক্ষ টাকা রেখে যান। সেই টাকায় লেডি অবলা বসু, তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাণীমন্দিরে
নিবেদিতা হল এবং সিস্টার নিবেদিতা উইমেন্স এডুকেশন ফান্ড প্রতিষ্ঠা করেন।
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও স্বামী বিবেকানন্দ - পাতার উপরে . . .
১৯০০ সালের ২৩শে অক্টোবর, প্যারিসে পদার্থবিদ্যা সম্মেলনে একমাত্র ভারতীয় হিসেবে অংশগ্রহণ করেন
সস্ত্রীক জগদীশচন্দ্র বসু। সেই দিন স্বামী বিবেকানন্দ প্যারিসের সেই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাঁর
১৯০৬ সালে প্রকাশিত প্রব্রাজক গ্রন্থের ১৪২-১৪৩ পৃষ্ঠায় খুব সুন্দরভাবে জগদীশচন্দ্র বসু ও তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে
লিখেছেন . . .
“আজ ২৩শে অক্টোবর ; কাল সন্ধ্যার সময় পারিস হতে বিদায়। এ বৎসর এ পারিস সভ্য-জগতের এক
কেন্দ্র, এ বৎসর মহাপ্রদর্শনী । নানা দিক্ দেশ সমাগত সজ্জন সঙ্গম। দেশ দেশান্তরের মনীষিগণ নিজ নিজ
প্রতিভা প্রকাশে স্বদেশের মহিমা বিস্তার করছেন, আজ এ পারিসে। এ মহা কেন্দ্রের ভেরী-ধ্বনি আজ যাঁর
নাম উচ্চারণ করবে, সে নাদ-তরঙ্গ সঙ্গে সঙ্গে তাঁর স্বদেশকে সর্ব্বজন সমক্ষে গৌরবান্বিত করবে। আর
আমার জম্মভূমি---এ জার্ম্মান, ফরাসী, ইংরাজ, ইতালী প্রভৃতি বুধমণ্ডলী-মণ্ডিত মহা রাজধানীতে তুমি
কোথায়, বঙ্গভৃমি? কে তোমার নাম নেয়? কে তোমার অস্তিত্ব ঘোষণা করে? সে বহু গৌরবর্ণ প্রাতিভ
মণ্ডলীর মধ্য হতে এক যুবা যশস্বী বীর বঙ্গভূমির, আমাদের মাতৃভূমির, নাম ঘোষণা করলেন,---সে বীর
জগৎপ্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক ডাক্তার জে, সি, বোস! একা, যুবা বাঙ্গালী বৈদ্যুতিক, আজ বিদ্যুৎবেগে পাশ্চাত্য
মণ্ডলীকে নিজের প্রতিভা মহিমায় মুগ্ধ করলেন---সে বিদ্যুৎসঞ্চার, মাতৃভূমির মৃতপ্রায় শরীরে নবজীবন
তরঙ্গ সঞ্চার করলে! সমগ্র বৈদ্যুতিক মণ্ডলীর শীর্ষস্থানীয় আজ---জগদীশ বসু---ভারতবাসী, বঙ্গবাসী! ধন্য
বীর! বসুজ ও তাঁহার সতী, সাধ্বী, সর্ব্বগুণসম্পন্না গেহিনী যে দেশে যান, সেথায়ই ভারতের মুখ উজ্জ্বল
করেন---বাঙ্গালির গৌরব বর্দ্ধন করেন। ধন্য দম্পতী!”
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও সরলা দেবীচৌধুরাণী - পাতার উপরে . . .
১৯০২ সনের অক্টোবরে জগদীশচন্দ্র স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলে সরলা দেবীচৌধুরাণী রচনা করেন “বন্দি
তোমায় ভারত-জননী, বিদ্যা-মুকুট-ধারিণী” গানটি।
বসু বিজ্ঞান মন্দির, কলকাতা - পাতার উপরে . . .
১৯১৭ সালের ৩০শে নভেম্বর, কেবলমাত্র ভারতীয় উদ্যোগ ও অর্থবলে, ইংরেজদের কোনো সাহায্য না নিয়ে,
বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার জন্য তিনি কলকাতায় ‘‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’’ প্রতিষ্ঠা করেন। জগদীশচন্দ্র আমৃত্যু
এখানে গবেষণাকার্যের পরিচালক বা অধিকর্তা হিসেবে যুক্ত ছিলেন। এর জন্য তাঁর বসতবাড়ি সংলগ্ন ৫০
কাঠা জমি নিজেই কিনে রেখেছিলেন। এর উপর ১৯২০ সালে বাংলার মুখ্য সচিব পি.সি. লায়ন তাঁকে
সরকারী খরচায় সাড়ে তিন বিঘা জমি কিনে দিয়ে যান, নিজের কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে! এই বিজ্ঞান
মন্দিরের জন্য জগদীশচন্দ্র নিজের যথাসর্বস্ব তো উৎসর্গ করেছিলেনই, অন্যান্যদের কাছ থেকে দানও গ্রহণ
করেছিলেন। বসু বিজ্ঞান মন্দিরের ওয়েবসাইটে যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর প্রাপ্ত সম্মাননা - পাতার উপরে . . .
- ১৯০৩ সালে তাঁকে CIE (Companion of the Order of the Indian Empire) উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
- ১৯১১ সালে রাজা ৫ম জর্জের রাজ্যাভিষেকের সময়ে তাঁকে C.S.I (Companion of the Order of the Star
of India) উপাধি প্রদান করা হয়।
- ১৯১৭ সালে জগদীশচন্দ্র বসুকে Knight Bachelor উপাধি প্রদান করা হয়। অর্থাৎ তাঁকে স্যার (Sir)
সম্বোধন করা শুরু হয়।
- ১৯২০ সালে তিনি রয়াল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। Fellow of the Royal Society (FRS)
- ১৯২৭ সালে তিনি ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের ১৪তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
- ১৯২৮ সালে The Vienna Academy of Sciences এর সদস্য (Member) নির্বাচিত হন।
- ১৯২৯ সালে The Finnish Society of Sciences and Letters এর সদস্য (Member) নির্বাচিত হন।
- ১৯২৪ থেকে ১৯৩১ পর্যন্ত তিনি The League of Nations' Committee for Intellectual Cooperation এর
সদস্য (Member) ছিলেন।
- ১৯৫৮ সালে, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর জন্মশতবর্ষে বিধানচন্দ্র রায়ের মূখ্যমন্ত্রীত্বে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার
JBNSTS (Jagadis Bose National Science Talent Search) স্কলারশিপ দেওয়া শুরু করেন।
- ১৯৫৮ সালে ভারত সরকারের ফিল্ম ডিভিশন থেকে পীযূষ বসুর নির্দেশনায় তৈরী করা হয় আচার্য
জগদীশচন্দ্র বসু নামের তথ্যচিত্র।
- ১৯৫৮ সালে ভারত সরকারের ডাক ও তার বিভাগ থেকে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর নামে একটি
ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়।
- ২০০৯ সালে, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর মূখ্যমন্ত্রীত্বে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, হাওড়ায়, হুগলী নদীর পাড়ে
অবস্থিত বোটানিকাল গার্ডেনটির নাম রাখেন Acharya Jagadish Chandra Bose Indian Botanic
Garden।
- ২০০৯ সালে হরিয়ানায় J.C. Bose University of Science and Technology, YMCA তাঁরই নাম প্রতিষ্টা
করা হয়।
- ১৪.৯.২০১২ তারিখে তাঁর গবেষণাকে Institute of Electrical and Electronics Engineers, Inc. দ্বারা IEEE
Milestone in Electrical and Computer Engineering এর সম্মান প্রদান করা হয়।
- কিছুকাল আগে, ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যাণ্ড তাঁদের ৫০ পাউণ্ড নোটে কোনো একজন বৈজ্ঞানিকের ছবি
দেবার কথা ঘোষণা করেছিলেন। বিশ্বব্যাপী সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে এক বিশাল সংখ্যক মানুষ
আচার্য জগদীশচন্দ্রের নামে মনোনয়ন পাঠিয়েছিলেন!
- তাঁর ১৫৮তম জন্মদিনে, ৩০.১১.২০১৬ তারিখে, তাঁর প্রতি, Google Search Engine থেকে সম্মান
প্রদর্শন করা হয় গূগল্-ডূডল্ (Google-Doodle) -তৈরী করে।
তথ্যাদির উৎস - পাতার উপরে . . .
- হিমাংশু ভট্টাচার্যর লেখা জগদীশচন্দ্র বসু, বাংলার মনীষা, ২য় খণ্ড, ১৯৮৭।
- সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, “সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান ১ম খণ্ড”।
- সংসদ বাংলা সাহিত্যসঙ্গী, শিশিরকুমার দাশ, ২০০৩।
- এ.এম. হারুন-অর-রশীদ ও সালাম আজাদ দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত “রবীন্দ্রনাথকে লেখা
জগদীশচন্দ্র বসুর পত্রাবলী”, বাংলা একাডেমী ঢাকা, মে ১৯৭১।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত বঙ্গদর্শন পত্রিকার (নবপর্যায়) আষাঢ় ১৩০৮ সংখ্যা (জুন ১৯০১)।
- স্বামী বিবেকানন্দ, পরিব্রাজক, উদ্বোধন কার্যালয় কলকাতা, রামকৃষ্ণ মিশন থেকে প্রকাশিত, ১৯০৬।
- বসু বিজ্ঞান মন্দির www.jcbose.ac.in/home
- উইকিপেডিয়া ইংরেজী
- উইকিপেডিয়া বাংলা
- বাংলাপেডিয়া
- BBC News বাংলা
- প্রথম বাঙালী “লেডি ডাক্তার” কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়, বাঙালীয়ানা.কম
- অবলা বসু : স্বামীর কীর্তিতে চাপা পড়া এক মহিয়সী নারীর কথা https://roar.media/bangla/
- Master of Nitrites: Acharya Prafulla Chandra Ray https://www.rajeevsingh.org/
- J.C. Bose University of Science and Technology, YMCA, Haryana http://www.jcbose.ac.in/home
- Google doodle on JC Bose https://www.google.com
- Sarala Roy, Wikipedia https://en.wikipedia.org/
- A Travelling Wife's Tale: A Gendered Reading of Travelogues by Lady Abala Bose www.academia.
edu