কবি জলধর সেন - জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত
বাংলার নদীয়া জেলার কুমারখালি গ্রামে। বর্তমানে তা
বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলায়।
পিতা হলধর সেন এবং মাতা কালিকুমারী দাসী।
কবির প্রথম নাম ছিল যোগেন্দ্রনাথ। কাঙাল হরিনাথ,
কবির নাম রাখেন জলধর। পিতার মৃত্যু হয় কবির
তিন বছর বয়সে। তখন থেকে তাঁরা ভীষণ আর্থিক
সংকটে পড়ে যান।
কবির জলধর সেনের শিক্ষাজীবন - পাতার উপরে . . .
কবির শিক্ষা জীবন শুরু হয় কুমারখালীর বাঙ্গলা স্কুল বা বঙ্গ বিদ্যালয়ে। তিনি কোনোদিন গ্রামের টোল বা
পাঠশালায় পড়েন নি। এখানে কিছুদিন পর চোখের রোগ ধরা পড়ে। তার চিকিৎসার জন্য ২ বছর
কলকাতায় থেকেও কোনো লাভ হয়নি। গ্রামে ফিরে, লক্ষ্ণৌর এক হেকিমের চিকিৎসায় তাঁর চোখের অসুখ
সেরে যায়। ভর্তি হন গোয়ালন্দ মাইনর স্কুলের ৩য় শ্রেণীতে। ৩ বছর পর পরীক্ষায় ফরিদপুর জেলায়
শীর্ষস্থান পেয়ে মাসিক পাঁচ টাকা বিত্তি পান এবং রাজা সুকুমার গুহরায় প্রদত্ত রৌপ্য-পদক লাভ করেন।
১৮৭৮ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে, কৃষ্ণনগরে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে, প্রবেশিকা বা এন্ট্রান্স
পরীক্ষা পাশ করেন ২য় বিভাগে এবং বাংলা বিষয়ে ২য় সর্বোচ্চ নম্বর লাভ করেন। এতে মাসে থার্ড গ্রেড
জুনিয়র ১০টাকা স্কলারশিপ লাভ করেন। সেবার বাংলার পরীক্ষক ছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী। ২য় বিভাগে পাশ
করার জন্য শিবনাথ শাস্ত্রী নাকি ঠাট্টা করে বলেছিলেন “দূর জলধর, হরিনাথ মজুমদারের নামই ডুবিয়েছিস।
বাংলায় ফার্স্ট হতে পারিস নি”। সেবার কৃষ্ণনগর থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ১ম বিভাগে পাশ করেছিলেন
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, যাঁর সাথে কবির আমৃত্যু সখ্যতা গড়ে উঠেছিল।
কলকাতায় এসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন এবং জেনারেল এসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন
(যা পরে স্কটিশ চার্চ কলেজ হয়) থেকে ১৮৮০ সালে এল. এ. পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে পড়া ছেড়ে দেন
পরিবারের আর্থিক হাল ধরার জন্য।
কাঙাল হরিনাথ ও জলধর সেন - পাতার উপরে . . .
কাঙাল হরিনাথ ছিলেন জলধর সেনের শিক্ষাগুরু, দীক্ষাগুরু, এবং তাঁর জীবনের আদর্শ। তিনি কাঙাল
হরিনাথের “গ্রামবার্তা প্রকাশিকা” সম্পাদনা ও প্রকাশনার কাজে কাঙাল হরিনাথের অন্যতম প্রধান সহযোগী
ছিলেন। এছাড়া তাঁর হরিনাথের “ফিকিরচাঁদ”-এর বাউলসঙ্গীতের দল গঠনেও বিশেষ ভূমিকা ছিল। গান
গেয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করার কাজে হরিনাথের ছায়াসঙ্গী ছিলেন তিনি।
কবি জলধর সেনের কর্ম ও গার্হস্থ্য জীবন - পাতার উপরে . . .
১৮৮১ সালে তিনি গোয়ালন্দ স্কুলে শিক্ষক হয়ে যোগ দেন। নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের দেওয়ান
রঘুনন্দন মিত্রের প্রপৌত্রী সুকুমারী দেবীর সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন ১৮৮৫ সালে। ১৮৮৭ সালে, মাত্র চার
মাসের মধ্যে জলধর সেনের সদ্যজাত কন্যা, স্ত্রী সুকুমারী দেবী ও মাতা কালিকুমারী দাসীর মৃত্যুর পরে তাঁর
মনে বৈরাগ্য আসায় তিনি হিমালয় ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। সেই সব ভ্রমণ কাহিনী ও লেখার জন্য পরে তিনি
খ্যাতি লাভ করেন।
১৮৯১ সালে হিমালয় থেকে ফিরে এসে মহিষাদল রাজস্কুলে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন। বন্ধু দীনেন্দ্রনাথ
রায়ের চেষ্টায় কবি দ্রিতীয়বার পাণিগ্রহণ করেন ২৪ পরগণা জেলার, ডায়মণ্ডহারবারের উস্তি গ্রামের
হরগোবিন্দ দত্ত ও বগলাসুন্দরী দাসীর কন্যা হরিদাসী দেবীর সঙ্গে। এই বিবাহ সুখের ও দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং
তাঁরা সাত পুত্র ও ছয় কন্যার জনক-জননী হয়োছিলেন।
মহিষাদলে শিক্ষকতার সময়ে তিনি সন্তোষের জমিদার প্রমথনাথ রায়চৌধুরীর পুত্র-কন্যাদের গৃহশিক্ষক ও
জমিদারী এস্টেটের দেওয়ানের কাজও করেছিলেন।
“বঙ্গবাসী” সাপ্তাহিক পত্রে মাস দেড়েক সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করার পরে, ১৩২০ বঙ্গাব্দ (১৯১৩) থেকে
১৩৪৫ বঙ্গাব্দ (১৯৩৯) পর্যন্ত দীর্ঘ ২৬ বছর তিনি “ভারতবর্ষ” মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এছাড়া তিনি
সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন “বসুমতী”, “সন্ধ্যা”, “হিতবাদী”, “সুলভ সমাচার” ও “গ্রামবার্তা প্রকাশিকা” প্রভৃতি
পত্রিকার সঙ্গে।
কবি জলধর সেনের ধর্ম ভাবনা - পাতার উপরে . . .
জলধর সেন ধর্ম সম্পর্কে উদার মনের মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন রক্ষণশীলতা মুক্ত এবং অসাম্প্রদায়িক।
দেব-দ্বিজে ভক্তি থাকলেও কোনো বাড়াবাড়ি ছিলো না। কাঙাল হরিনাথের শিষ্য ছিলেন বলে ধর্মীয় আচার
অনুষ্টান সম্বন্ধে ছিলেন উদাসীন। তন্ত্রশাস্ত্র ও তান্ত্রিকদের সম্বন্ধে তিনি রিতিমত আতঙ্কিত ছিলেন। এই নিয়ে
তাঁকে হিন্দুধর্ম-বিদ্বেষী বলাও হয়েছে খোলাখুলিভাবে। রামকৃষ্ণ পরমহংসকে তিনি দরজা থেকেই প্রণাম
করে ফিরে এসেছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দের জীবন রক্ষা করার পরে তাঁর সাথে কিছু সময় কাটিয়েও তিনি
তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করার কথা ভাবেন নি। ব্রাহ্মধর্মের মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রণাম করেছিলেন।
আচার্য্য কেশবচন্দ্র সেন, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী প্রমুখরা তাঁকে ভালো বাসতেন। ব্রাহ্মসমাজে তিনি বাল্যকাল
থেকে যাতায়াত করতেন। কিন্তু সেখানেও তিনি দীক্ষাগ্রহণ করেন নি।
গোয়ালন্দে শিক্ষকতা করার সময়ে সেখানে একটি ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানকার রক্ষণশীল হিন্দুরা
নব্য ব্রাহ্মদের উপরে নানা অপমান-নির্যাতন শুরু করেছিলেন। এতে জলধর ব্যথিত হন। তাঁর গুরু কাঙাল
হরিনাথের উদ্যোগে এই বিবাদের একটি প্রীতিকর মিমাংসা করা সম্ভব হয়েছিলো। তখন জলধর সেন ছিলেন
কাঙাল হরিনাথের ডান হাত।
পূর্ববঙ্গে ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের সময় এমন ঘটনা আমরা ময়মনসিংহে, কোরাণ শরিফের অনুবাদক ও কবি
গিরিশচন্দ্র সেনের সময়েও দেখতে পাই। ১৯৩৮ সালে (১৩৪৫ বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত, শশিভূষণ বিদ্যালঙ্কার
সম্পাদিত, জীবনীকোষ ২য় খণ্ডের ৩৮৮-পৃষ্ঠায় কবি গিরিশচন্দ্র সেনের ধর্মান্তর নিয়ে তিনি লিখেছেন . . .
“১৮৬৫ ইং সালে ময়মনসিংহ নগরে “কৃষি প্রদর্শিনী”মেলা হয়। ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেন সেই সময়ে সাধু
অঘোর নাথ রায়কে সঙ্গে করিয়া ময়মসিংহ সহরে গমন করেন। বলাবাহুল্য তাঁহার বাগ্মীতায় সকলে মুগ্ধ
হইলেন, ব্রাহ্মসমাজে নূতন উত্তেজনার সৃষ্টি হইল। এই ঘটনার দুই বৎসর পরে ভক্ত বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী
ময়মনসিংহ নগরে উপস্থিত হইলেন। তাঁহার বক্তৃতা উপদেশ শ্রবণে সহরে তুমুল আন্দোলনের সৃষ্টি করিল।
কেহ কেহ উপবীত ত্যাগ করিলেন। ইহাতে প্রাচীন হিন্দু নেতারা অতিশয় বিচলিত হইলেন। ব্রাহ্মদের উপর
নির্য্যাতন আরম্ভ হইল। অনেকে সমাজ ভয়ে প্রায়শ্চিত্ত করিল ও ব্রাহ্ম সংশ্রব পরিত্যাগ করিল। কিন্তু
গিরিশচন্দ্র দৃঢ় রহিলেন। তিনি প্রায়শ্চিত্ত করিলেন না।”
মিলনসাগরে কবি গিরিশচন্দ্র সেনের কবিতার পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
কবি জলধর সেনের পত্রিকার সম্পাদনা ও রচনাসম্ভার - পাতার উপরে . . .
“বঙ্গবাসী” সাপ্তাহিক পত্রে মাস দেড়েক সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করার পরে, ১৩২০ বঙ্গাব্দ (১৯১৩) থেকে
১৩৪৫ বঙ্গাব্দ (১৯৩৯) পর্যন্ত দীর্ঘ ২৬ বছর তিনি “ভারতবর্ষ” মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এছাড়া তিনি
সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন “বসুমতী”, “সন্ধ্যা”, “হিতবাদী”, “সুলভ সমাচার” ও “গ্রামবার্তা প্রকাশিকা” প্রভৃতি
পত্রিকার সঙ্গে।
জলধর সেনের রচনাসম্ভারে রয়েছে ভ্রমণ সাহিত্য, উপন্যাস, গল্প, শিশুপাঠ্য, পাঠ্য পুস্তক, জীবনী গ্রন্থ এবং
সম্পাদিত গ্রন্থ। তাঁর ভ্রমণ বিষয়ক রচনার মধ্যে রয়েছে “প্রবাস-চিত্র”, “হিমালয় পথিক”, “হিমাচল-বক্ষে”,
“হিমাদ্রি”, “দশদিন”, “আমার য়ুরোপ ভ্রমণ” (অনুবাদ), “মুসাফির মঞ্জিল”, “দক্ষিণাপথ”, “মধ্যভারত” প্রভৃতি।
তাঁর উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে “দুঃখিনী”, “বিশুদাদা”, “করিম সেখ”, “আলাল কোয়াটারমেন” (অনুবাদ),
“অভাগী”, “বড়বাড়ি”, “হরিশ ভাণ্ডারী”, “ঈশানী”, “পাগল”, “চোখের জল”, “ষোল-আনি”, “সোনার বাংলা”,
“দানপত্র”, “পরশপাথর”, “ভবিতব্য”, “তিনপুরুষ”, “উৎস”, “চাহার দরবেশ” (উর্দু উপন্যাস, অনুবাদিত) প্রভৃতি।
তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “হরিনাথ গ্রন্থাবলী”, “জাতীয় উচ্ছ্বাস”, “প্রমথনাথের কাব্যগ্রন্থাবলী” প্রমুখ।
তাঁর জীবনী গ্রন্থ “কাঙাল হরিনাথ”। তাঁর গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “নৈবেদ্য”, “ছোটকাকী ও অন্যান্য গল্প”, “নূতন
গিন্নী ও অন্যান্য গল্প”, “পুরাতন পঞ্জিকা” (গল্প ও ভ্রমণ), “আমার বর ও অন্যান্য গল্প”, “পরাণ মণ্ডল ও অন্যান্য
গল্প”, “আশীর্ব্বাদ”, “এক পেয়ালা চা”, “কাঙালের ঠাকুর”, “মায়ের নাম”, “বড় মানুষ”। তাঁর শিশুপাঠ্য গ্রন্থের
মধ্যে রয়েছে “সীতাদেবী”, “কিশোর”, “শিব সীমন্তিনী”, “মায়ের পূজা”, “আফ্রিকায় সিংহ শিকার”, “রামচন্দ্র”,
“আইসক্রিম সন্দেশ”।
হৃষিকেশে মরণাপন্ন স্বামী বিবেকানন্দ ও পরিব্রাজক জলধর সেন - পাতার উপরে . . .
নরেন্দ্রনাথ দত্ত যিনি পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দ নামে খ্যাত হন, জলধর সেনের কলেজ জেনারেল
এসেমব্লিজ ইন্সটিটিউশনেরই জুনিয়ার ছাত্র ছিলেন। জলধর সেনের কলেজ ছাড়ার পরে নরেন্দ্রনাথ সেই
কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। তাই কলেজে পরস্পরের দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। কিন্তু তাঁর বিবেকানন্দ হয়ে ওঠার
খবর ইত্যাদি, তিনি ব্রাহ্মসমাজের সূত্রে পেয়েছিলেন।
মাত্র তিন মাসের মধ্যে জলধর সেনের প্রথম স্ত্রী কন্যা ও মাতার মৃত্যুর পরে বৈরাগ্যের কালে তিনি
হিমালয় ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছিলেন। দেরাদুনের একটি স্কুলে কিছুকাল থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে শিক্ষকতা
করেছিলেন এবং সেখান থেকে মাঝে মাঝেই ভ্রমণে বেরিয়ে পড়তেন পদব্রজেই। তেমনি সময়ে একবার
পরিব্রাজকের বেশে, হেঁটে, ঋষিকেশে গিয়ে দেখেন যে স্বামী বিবেকানন্দ মৃত্যুসজ্জায়, অজ্ঞান অবস্থায়।
তখন তিনি পূর্বে তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়া হিমালয়ের কোনো সাধুর থেকে শেখা গাছের পাতার ওষুধ, নদীর
পাড়ে খুঁজে পেয়ে, তা প্রয়োগ করে, মারাত্মকভাবে পীড়িত বিবেকানন্দের প্রাণরক্ষা করেন। কয়েকদিন পরে
দেরাদুনে একদিনের জন্য তিনি বিবেকানন্দের সাহচর্য লাভ করেন শুধু গান, আনন্দ, গল্পগুজবের মধ্য দিয়ে।
দেরাদুনে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁকে হৃষিকেশের সেই সাধু বলে চিনতে পারেন নি। অনেক জায়গায়
বিবেকানন্দের জীবনীতে এই ঘটনাটির উল্লেখ থাকলেও সেই সাধুর পরিচয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় না।
বিবেকানন্দের পরলোক গমনের পরে কলকাতার টাউন হলের শোকসভায় জলধর সেন এই ঘটনাটি প্রথম
ব্যক্ত করেন। আমরা ঘটনাটি নিয়েছি তাঁর “স্মৃতি-তর্পণ” প্রবন্ধ থেকে যা তাঁর দ্বারা সম্পাদিত “ভারতবর্ষ”
পত্রিকার ফাল্গুন ১৩৪২ এর সংখ্যায় (ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬) প্রকাশিত হয়েছিল।
কবি জলধর সেনের কবিতা নিয়ে তাঁর নিজের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . .
১৯৬৯ সালে বাংলা একাডেমী ঢাকা থেকে প্রকাশিত, আবুল আহসান চৌধুরীর “জলধর সেন ১৮৬০-১৯৩৯”
জীবনী গ্রন্থের ৫৫-পৃষ্ঠায় জলধর সেনের কবিতা রচনা নিয়ে তিনি লিখেছেন . . .
“সব্যসাচী লেখক ছিলেন জলধর। সৃষ্টিধর্মী সাহিত্যের প্রায় সকল শাখাকেই তিনি স্পর্শ করেছেন। গল্প -
উপন্যাস লিখেছেন, ভ্রমণকাহিনী রচনা করেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন, মনীষী-জীবনকথা রচনায় আগ্রহ
দেখিয়েছেন, স্মৃতিচিত্র আত্মজীবনীর খসড়া উপহার দিয়েছেন, সংকলন-সম্পাদনা করেছেন গ্রন্থ, অনুবাদকর্মে
হাত দিয়েছেন, শিশুতোষ কিংবা স্কুলপাঠ্য পুস্তকও তাঁর মনোযোগ-লাভে ব্যর্থ হয়নি। কেবল কবিতা ও
নাটক --- এই দুই ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগের কোনো পরিচয় নেই। কবিতা না লেখা সম্পর্কে কৈফিয়ৎ দিয়েছেন :
আমি বাল্যকাল থেকেই কাঙ্গাল হরিনাথের ভক্ত ছিলাম। তিনি আমাকে বড়ই ভালবাসতেন। তাঁরই আদেশে
আমি যখন যে কবিতার বই পেয়েছি তার আগাগোড়া মুখস্থ করে ফেলেছি। বহুদিন পর্যন্ত আমার এ অভ্যাস
ছিল ; ইংরেজী ও বাংলা কবিতা যে কত কণ্ঠস্থ করেছিলাম, তার হিসাব দিতে পারিনে ; অথচ আমি হরফ
করে বলতে পারি, এই, সুদীর্ঘ জীবনে আমি কোনদিন দুই লাইন কবিতাও লিখতে পারিনি।
অন্যত্রও একটু কৌতুক-রঙ্গ করে বলেছেন :
দিব্য করে বলতে পারি, এই সুদীর্ঘ জীবনে কোনও দিন কবিতা লেখারূপ দুষ্কর্ম আমার দ্বারা কৃত হয়নি।
তবে তাঁর “দুঃখিনী” উপন্যাসের উৎসর্গ-পত্রে অকালপ্রয়াত অনুজ শশধরের উদ্দেশ্যে চতুর্দশ পংক্তির একটি
পদ্য স্থান পেয়েছে। বলা যায় এটিই জলধরের মুদ্রিত একমাত্র কবিতা। ব্যক্তিগত শোকোচ্ছ্বাসের ভেতর
দিয়ে স্মরণ করেছেন স্নেহাস্পদ অনুজকে : ”
এরপর সেই পাতায় “ভাই। পঞ্চদশী বয়সের তুচ্ছ আঁকিবুকি” কবিতাটি দেওয়া রয়েছে, যা আমরা আমাদের
কবিতার পাতায় তুলে দিয়েছি।
আমাদের অনুমানে জলধর সেনের ছদ্মনাম পরিব্রাজক - পাতার উপরে . . .
আমরা মনে করি যে, তাঁর কবিতা না লেখার উপরোক্ত উদ্ধৃতি বা তাঁর কৈফিয়ৎ বা রঙ্গ-কৌতুকের লেখাকে
আমাদের ধ্রুব সত্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কারণ ওইভাবে লেখা সত্তেও তো তাঁর একটি কবিতা
পাওয়া গিয়েছে! আমরা মনে করছি যে তাঁর রচিত আরও কবিতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যা আমরা
এখনও উদ্ধার করে উঠতে পারিনি। আমাদের মনে হয় যে কোনো কারণবশতঃ জলধর সেন কাউকে
জানাতে চান নি যে তিনি কবিতাও লিখেছেন। আমরা অনুমান করছি যে তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করেও
কবিতা প্রকাশ করে থাকতে পারেন!
আমরা জানি যে জলধর সেন পরিব্রাজক হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছিলেন। তাঁর বহু ভ্রমণমূলক লেখাও
রয়েছে। পরিব্রাজক হয়ে হিমালয় ভ্রমণের সময়ে তাঁর সাথে অসুস্থ স্বামী বিবেকানন্দের দেখা হয়েছিল এবং
তিনি তাঁকে কোনো সন্ন্যাসী প্রদত্ত ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলেছিলেন।
“প্রদীপ”পত্রিকার শ্রাবণ ১৩০৮ (জুলাই ১৯০১) সংখ্যার ২৯১-পৃষ্ঠায়, জলধর সেনের “হিমালয় বক্ষে” প্রবন্ধের
সাথে তাঁর “পরিব্রাজক বেশে শ্রীযুক্ত জলধর সেন” শিরোনামের একটি ফটোও দেওয়া হয়েছিলো আমরা সেই
ছবিটিও এই পাতায় তুলে দিয়েছি। “কুশদহ” পত্রিকার ১৯০৯ ও ১৯১০ সালের সংখ্যাগুলির মধ্যে দুটি
কবিতা পেয়েছি যাতে কবির নাম “পরিব্রাজক”। এই ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন এমন অন্য কোনো কবি
আমরা খুঁজে পাই নি। আমাদের মনে হয়েছে যে এই কবিতা দুটি জলধর সেন “পরিব্রাজক” ছদ্মনামে লিখে
প্রকাশ করেছিলেন। এটা আমাদের অনুমান মাত্র। অন্যথা হলে, প্রমাণ সহ আমাদের জানালে আমরা
প্রেরকের প্রতি কৃতজ্ঞতাসহ এখানে তা তুলে দেবো।
স্বামী বিবেকানন্দও পরিব্রাজক হিসেবে প্রায় ৫ বছর ধরে সারা ভারতবর্ষ এবং পরে য়ুরোপ তথা
আমেরিকাও ঘুরেছিলেন। তাঁর তিরোধানের তিন বছর পরে ১৯০৫ সালে কলকাতা রামকৃষ্ণ মিশনের
"উদ্বোধন" পত্রিকার অফিস থেকে, স্বামী সারদানন্দের ভূমিকা সহ, স্বামী বিবেকানন্দের লেখা সমুদ্রপথে, মূলত
জাহাজে, মিশর-ইউরোপ ভ্রমণ বৃত্তান্ত নিয়ে “পরিব্রাজক” নামে একটি ভ্রমণ বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিলো।
আমরা দেখে নিয়েছি যে সেই গ্রন্থে এই পাতায় দেওয়া "পরিব্রাজক" ছদ্মনামে লেখা এই কবিতা দুটি নেই।
সেই গ্রন্থে কোনো কবিতাই নেই। এ ছাড়া এই পাতায় প্রকাশিত কবিতার প্রকাশকাল ১৯০৯-১৯১০, যা
উদ্বোধন থেকে প্রকাশিত "পরিব্রাজক" গ্রন্থের অনেক পরে। তাই আমাদের মনে হয়েছে যে এই কবিতা স্বামী
বিবেকানন্দের রচিত নয়, বরং এই পাতার পরিব্রাজক জলধর সেনেরই রচিত।
মিলনসাগরে স্বামী বিবেকানন্দের কবিতা ও গানের পাতায় যেতে . . . ।
জলধর সেনের প্রাপ্ত সম্মাননা - পাতার উপরে . . .
১৯১৩ সালে “ভারতবর্ষ” পত্রিকা সম্পাদনার কাজে যুক্ত হওয়ার ৯ বছর পরে ১৯২২-এর ৩রা জুন ভারতের
তৎকালীন গর্ভনর জেনারেল জলধর সেনকে “রায় বাহাদুর” উপাধি প্রদান করেন।
জলধর সেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ১৩২৯-৩০ এবং ১৩৪৩-৪৫ এর সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মিলন, ইন্দৌর এর সাহিত্য শাখার সভাপতি, হয়েছিলেন ১৩৩৫ সালে।
রবিবাসর এর সর্বাধ্যক্ষ ছিলেন ১৩৩৮ সালে।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন ১৩৪১ সালে।