কবি ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতা
*
জীবনের লক্ষ্য ও পরিণতি
কবি ডঃ মোহম্মদ শহীদুল্লাহ্
“আল্-এসলাম” পত্রিকার কার্ত্তিক ১৩২২ (অক্টোবর ১৯১৫) সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা।

“নিশ্চয় আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করিব।” কোরআন।
“আমি জিন এবং মানবকে আমার সেবা করিবে এতদ্ভিন্ন সৃষ্টি করি নাই।” কোরআন।
“অনন্তর তোমরা কি মনে করিয়াছ যে আমি তোমাদিগকে অনর্থক সৃষ্টি করিয়াছি এবং
তোমরা আমার দিকে ফিরিয়া আসিবে না?” কোরআন।
“নিশ্চয় আমরা আল্লার জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁহার দিকে ফিরিয়া যাইব।” কোরআন।

ভুলেছ কি একেবারে? ভুলেছ কি নর!
কে তুমি? কিসের তরে এলে ধরা পর?
রক্ত তুমি? মাংস তুমি? ভুতময় দেহ?
জড় পৃথিবীর কিংবা জড়ময় কেহ?
মাটি হ'তে জনমিয়া উদ্ভিদের মত,
মাটিতে মিশিয়া যাবে---এই তব ব্রত?
গো গর্দ্ধভের মতন খেয়ে দেয়ে শুয়ে,
কীট পতঙ্গের মত নেচে কুদে নিয়ে,

দিন দুই পরে মরে পচে গ'লে যাবে
এজন্যে শুধু এ জন্যে জনমেছ ভবে?
নীল বারিধির কোলে বুদ্ধুদ যেমতি
জনমি মিটিয়া যাবে এ তব নিয়তি?
হে নর! হে জীব শ্রেষ্ঠ! হে ধরা-ঈশ্বর!
অনন্তের বক্ষোজাত তুমি অনশ্বর।
ভুলে গেছ আপনার জনমের কথা,
তাই দীনহীন তুমি, রাজপুত্র যথা
আশৈশব কাঙ্গালের ভবনে পালিত
পিতার বিভব বার্ত্তা নহে সে বিদিত।
সাজায়েছে ধরারাজ্য তব তরে বিধি,
রাজ রাজেশের তুমি প্রিয় প্রতিনিধি।
পাপ, তাপ, শোক, দুঃখ, অভাব, দীনতা,
নর হ’য়ে নরে ঘৃণা, মোহ, অজ্ঞানতা,
জড়তা, ভীরুতা, হিংসা, নীচতা, মাৎসর্য্য
বিদলিবে বিনাশিবে এই তব কার্য্য।
ধরার সুন্দর মুখে অসুন্দর যত
সৌন্দর্য্যে ছাইয়া দিবে--- এই তব ব্রত।
জীবে সেবি জীবেশেরে করিবে ভকতি
জীবনের এই তব মুল মহানীতি।
সমার্পিয়া ব্রত তব কার্য্যকাল শেষে
যেথা হ'তে এসেছিলে যাবে সেথা হেসে।
বুঝেছে কি এইবার? বুঝেছ কি নর!
কে তুমি? কিসের তরে এলে ধরা পর?

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পত্র
কবি ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এম-এ, বি-এল, ডি-লিট (পেরিস)
ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ভারতবর্ষ চৈত্র ১৩৩৮ (মার্চ ১৯৩২) সংখ্যায় প্রকাশিত
কবিতা।

( হাফিয হইতে। মূলের ছন্দের অনুকরণে )

আয্ থুনে।         দিল্ নভিশ্ তম।         নয্ দীকে।         য়ার নামাঃ,---

লিখিনু                 দিলের খুনে                 বঁধুরে                 পত্রখানি,---
“পলকে                বিয়োগ তব                 প্রলয়-                 মতন মানি।
কত না                করি পরখ,                 হ’ল না                 লভ্য কিছু
পরখে                 পরখ-করার                 কেবলি                পাইনু হানি।
তোমারি               বিচ্ছেদে গো                 নয়নে                 চিহ্ন শত,
নিশানি                নয় কি চোখে               অঝোর এ            চোখের পানি?
হকীমে                 জিজ্ঞাসিনু,                  ‘জান কি              বঁধূর ধারা?’
‘দুরেতে               নরক জ্বালা,                 নিকটে                চোখ রাঙানি।'
বলিনু,                 ‘খাই গালি                   তার পিছনে           বেড়াই যদি ;’
বলিল,                 ‘খোদার কসম!              গালি যে               প্রেমের বাণী।'
ভিতরে                দগংদগি ঘা,                মুখেতে                 কাজ কি ব’লে?
দেখনা                 কলম-চোখে                 ঝরিছে                 কতই পানি।
মলয়া                 ঘোমটা খুলে                 দেখা'ল                 আমার চাঁদে
যেন গো               মেঘ সরায়ে                 বেরুল                 সূরজ খানি
পরাণী                 বদল দিয়ে                  পেয়ালা                হাফিয মাগে,---
পিয়াসী                পাছে তব                   পিয়িতে               মেহেরবাণি।”

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সন্ধান
ডক্টর মুহণ্মদ শহীহুল্লাহ্‌ এম-এ, বি-এল, ডি-লিট (পেরিস)
ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ভারতবর্ষ শ্রাবণ ১৩৩৯ জুলাই ১৯৩২) সংখ্যায় প্রকাশিত
কবিতা।

( হাফিয হইতে মূলের ছন্দের অনুকরণে )

সন্ধানে                 থামবো না তায়,        যাবৎ না          পাই তার মিলন,
হয় পাবো             সেই জীবন নাথ,         নয় দেহ           ছাড়বে জীবন।

দেখো গো             মরণ পরে               আমায় সে         কবর খুঁড়ে,
অন্তরের              আগুন হ'তে             উঠছে ধূম         “কাফন” ফুঁড়ে।

মুখখানি               একটু দেখাও,             হ'ক সারা         বিশ্ব ব্যাকুল ;
ঠোঁট দু’টী             একটু খোলো,             লোক হউক       কেঁদে আকুল।

পরাণ মোর          ঠোঁটে এল,                 মনে খেদ           তার অধরে
কিছুই না            পেয়েই বুঝি                পরাণ মোর         যাত্রা করে।

তোমায় ঐ          মুখের খেদে                 প’ড়েছি            প্রাণ সঙ্কটে,
গরীবের             মনের আশা                 ঐ মুখে            পূর্ণ বটে।

বলিলাম             নিজের মনে,                 “তার থেকে       মন ফিরে নে ;”
বলিল                "এ কাজ সাজে               নিজ পরে         হয় প্রভু যে।”

তোমার কি'        চুলের পেঁচে                  পঞ্চাশটী          ফাঁদ রয়েছে ;
এ ভাঙ্গা            মনের কি ছাই                সে পেঁচে          উদ্ধার আছে?

ফুটবে ফুল         গোলাপ-বাগে                 তোমায় ঐ        মুখটী হেন,
এই আশে          মলয় আসে                   বাগিচায়          পুনঃ পুনঃ।

শঠের ন্যায়         নিতুই নব                    বধুঁ কি            করবো গ্রহণ!
আমি আর         আস্তানা তার                 যাবৎ না          ছাড়বো জীবন।

দাঁড়াও হে,         তোমার গঠন                 আর গতির       মাধুরীতে,
জন্বাবে             “সার্ভ”---“আনার”             বাগিচার           চারি ভিতে।

প্রেমিকের          দলের মাঝে                   হাফেযের         সুনাম রটে,
যেখানেই           নামটী তাহার                 লোক-মুখে        বেরোয় ঠোঁটে


.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর