কবি নির্মাল্য ব্যানার্জ্জীর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি নির্মাল্য ব্যানার্জ্জীর পরিচিতির পাতায় . . .
জননীকে
কবি নির্মাল্য ব্যানার্জ্জী
মিলনসাগরে প্রকাশ ৮.১০.২০২৩।

সব কথা ভুলে গেছি আমি ;
ভুলে গেছি দীর্ঘকাল নীরবে বহন,
ভুলে গেছি জননীর জঠর যন্ত্রণা,
অন্তরে বাহিরে খাদ্যরস আহরণ ।

ভুলে গেছি চিনে নেওয়া হাত, পা, মুখ,
ভুলে গেছি হাত ধরে টলোমলো চলা,
প্রথম অক্ষর চেনা, তোমারই কৃপায়,
ভুলে গেছি তোমার নকলে কথা বলা ।

ভুলে গেছি স্কুল বাস, টিফিন সাজানো,
আদরে গোছানো খাতা বইয়ের তাক,
কলেজ জীবনে সাথে রাত্রি জাগরণ,
ভোরের অ্যালার্ম ঘড়ি, সস্নেহ ডাক ।

দেখো আজ এ সমাজে প্রতিষ্ঠিত আমি
তাই আজ নির্দ্বিধায় ভুলে গেছি সব,
ক্ষমা করো হে জননী অধম সন্তানে,
তোমার বৃদ্ধাবাস নির্জন, নীরব ।

*********************









*
রাধিকা কীর্তন
কবি নির্মাল্য ব্যানার্জ্জী
মিলনসাগরে প্রকাশ ৮.১০.২০২৩।

ভগ্ন বাঁশি, যমুনা তীর
নিরন্ধ্র নির্জন,
নতুন করে লিখতে বসি,
রাধিকা কীর্তন ।

ভালবাসার প্রহর শেষে
কৃষ্ণ মথুরায়,
পরিত্যক্তা রাধিকারাণী
বিষন্ন সন্ধ্যায় ।

স্মৃতির জলে নৌকো বাওয়া,
স্বপ্নে আনাগোনা,
বাজেনা বাঁশি আর তো রাধা,
হয়না অন্যমনা !

মথুরা বিজয়, দ্বারকা গমন,
ব্যস্ততা রাজ কাজে,
তবু হে কেশব, মনে পড়তো সে -
কিশোরী, সকাল সাঁঝে ?

রুকমিনি ছিল, রাণীর আসনে
এবং সত্যভামা,
রাধিকারমণ ছিলে না তো আর,
তুমি কি ব্যর্থনামা ?

কেন সে রাধিকা, পল্লীর বধু,
ভারতে উপেক্ষিতা ?
হে কৃষ্ণ, বড় নিষ্ঠুর তুমি,
নিজে জানো সেই কথা ।

কৃষ্ণ বিরহে একা রাধারাণী,
শতাব্দী হলো পার,
অভিশাপ ? নাকি শুধু বঞ্চনা ?
হিসেব দেবেনা তার ?

এই টুকু শুধু আছে সান্তনা,
ব্রজভূমি হতে দূরে,
অন্তিমক্ষণ ভরা রাধিকার,
তোমারই বাঁশির সুরে !

*********************









*
একটা বোকা লোকের গল্প
কবি নির্মাল্য ব্যানার্জ্জী
মিলনসাগরে প্রকাশ ৮.১০.২০২৩।

অনেক কিছু বেঠিক হলেও,
লক্ষ্যটা তার ঠিক ছিলো,
বিশ্বাসে তার, গভীর রাতেও,
একখানা পূব দিক ছিলো ।

প্রতিবাদের সাতটি কাহন,
লোকটা দিব্যি লিখছিলো,
আদতে সে ভীতু হলেও,
কলমে নির্ভীক ছিলো ।

সেই লোকটার হাতের তুলি,
বড়ই নান্দনিক ছিলো,
ভালোবাসার সংসার আর
অযথা ঝিক ঝিক ছিলো ।

সেই লোকটার জীবনযাপন
একান্ত লৌকিক ছিলো,
অন্যায়টা সইবো কেন,
এইটুকু বাতিক ছিলো ।

কাজেই তাকে সরিয়ে দেওয়া
বড়ই আবশ্যিক ছিলো,
এবং তাতে দেশের মানুষ
নেহাৎ স্বাভাবিক ছিলো ।

বোকা লোকটার লাশ দেখে সব,
গা বাঁচানো শিখছিলো !
বোকা লোকটা এই দেশেরই
কোথাও বাস্তবিক ছিলো ।

*********************









*
বকুল, তোরই জন্যে ...
কবি নির্মাল্য ব্যানার্জ্জী
মিলনসাগরে প্রকাশ ৮.১০.২০২৩।

বকুল, তোর কি মনে পড়ে,
শান বাঁধানো পুকুরটাকে ?
এখনও সেই চৌধুরীদের
আমবাগানের দুপুর ডাকে ?

আম কুড়োনোর সেই দুপুরে,
আমিই কিন্তু জিতেছিলাম,
গাছের নিচে গোণাগাঁথা,
তোর ঝুলিতে একুশটা আম !

আমি কিন্তু পুরো পঁচিশ,
তোর চে’ পুরো চারটে বেশি,
তখন আমি চোদ্দ বছর,
তুইও তখন চতুর্দশী !

ঠিক তখনই নামলো বৃষ্টি,
গাছের নিচে খানিকটা ক্ষণ,
আধ ভেজা গায় শীত ধরেছে,
ঘেঁষে বসা, আমরা দু’জন ।

বৃষ্টিভেজা সেই বিকেলে,
মনটা কেমন এলোমেলো,
একটা ছেলে একটা মেয়ে,
আমের ভাগে সমান পেলো ।

দুপুরবেলা যারা দু’জন
আম কুড়োতে গিয়েছিলাম,
বিকেলবেলা তারাই যেন
হঠাৎ বড়ো হয়ে গেলাম ।

দিব্যি ছিলাম, হঠাৎ কখন
বাধ সাধলো পল্লীসমাজ !
জাতের ফারাক, অর্থ, শিক্ষা,
নানান রকম উঠলো আওয়াজ ।

ত্রস্ত হলো দুই পরিবার,
হারিয়ে গেলো সে’দিনগুলোই,
চল্‌না বকুল, সেই সোনালী
আখরগুলোয় আঙুল বুলোই !

এখন তো তুই ঘোর গৃহিণী,
ভরা সংসার, ছেলে, মেয়ে,
সারা দিনরাত সময় কোথায়,
গুছিয়ে রেঁধে, বেড়ে, খেয়ে !

আমিও এখন সংসারি খুব,
ভীষণ রকম দায়িত্বশীল,
মাথায় নানান উষ্ণীষ আর,
মনের ভেতর অনেক পাঁচিল ।

তবু বকুল, সেদিনগুলোয়
ইচ্ছে করে ফিরে যেতে ?
ইচ্ছে করে বৃষ্টি ভিজতে ?
ইচ্ছে করে আম কুড়োতে ?

বকুল ! আমার কিশোরবেলার
রূপকথার এক রাজার কন্যে,
একটা গোটা জীবন লিখে
দিতেই পারি তোরই জন্যে !

*********************









*
সিঁদুর-দান
কবি নির্মাল্য ব্যানার্জ্জী
মিলনসাগরে প্রকাশ ৮.১০.২০২৩।

মেয়েটাকে কেউ দেখেও দেখেনি,
পোড়া আবলুশ কাঠ,
শ্রাবণ এলেও বর্ষা আসেনি,
রোদে ফুটি ফাটা মাঠ ।

জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত সৈন্য,
দিন যায়, কাটে রাত,
চোখে তার কোন স্বপ্ন ছিলো না,
তবুও অকস্মাৎ -

শুকনো জীবনে হঠাৎ বাতাস,
দক্ষিণ সমীরণ ?
প্রথম পরশে শরীরে কাঁপন,
কে জানে সে কোন জন !

হা’ অদৃষ্ট সেই স্বপ্নটা
ভেঙ্গে হলো খানখান,
হে মদনদেব, ব্যর্থ তোমার
অমোঘ ধনুক বাণ !

সেই মেয়েটাই কড়িকাঠে তার
গাঁটছড়া বেঁধে নিলো,
লাশকাটা ঘরে বিষের বাসর,
আগুনই সিঁদুর দিলো !

*********************









*
উর্বশী, তোমাকে
কবি নির্মাল্য ব্যানার্জ্জী
মিলনসাগরে প্রকাশ ৮.১০.২০২৩।

স্বর্গপুরীর অপ্সরী গো
স্বপ্ন দিয়েই বোনা,
হে সুন্দরী আজও তুমি
অনন্তযৌবনা ?

অনেক ঋষির ধ্যান ভাঙানো
সেই রূপকেই খুঁজি !
শরীর শুধু শরীর কুসুম,
মন নেই তোর বুঝি ?

হয়তো ছিল তোমারও মনে
ঘর বাঁধবার আশা,
তুলসিতলায় প্রদীপ জ্বালা,
আকুল ভালোবাসা !

আলপনাতে সাজিয়ে তোলা
মাটির ঘরের খুঁটি,
ইন্দ্র রাজার চতুরঙ্গে,
শুধুই খেলার ঘুঁটি ।

কেউ নেয়নি মনের খবর
শরীর খোঁজে শুধু,
তুমি তো আর মানবী নও
স্বর্গীয় বারবধূ !

তুমি কেবল ব্যবহৃত,
রাজার যেমন খুশী,
দিনের শেষে একলা ঘরে
কাঁদছো কি, উর্বশী ?

*********************









*
মেঘলা দিন
কবি নির্মাল্য ব্যানার্জ্জী
মিলনসাগরে প্রকাশ ৮.১০.২০২৩।

মেঘলা দিনে দুপুরবেলা, ইস্ !
আপন মনেই স্বপ্ন বুনেছিস !

সেই স্বপ্নের স্বপ্নপরী - যাঃ,
নরম ঠোঁটের স্নিগ্ধ ছোঁয়াটা ।

সোনা রুপোর কাঠিতে মন খুশ,
কাজের মধ্যে ভাবতে আছে ? ধ্যুস্ !

জানিস না কি, দায়িত্ব তোর কত !
তবুও দেখিস স্বপ্ন অবিরত !

হিসেবি মন ধমক দিলো যেই,
ওমনি দেখি, রাজকন্যে নেই !

হারিয়ে গেল আবছা আলোছায়া,
বৃষ্টি ভেজা মেঘলা দিনের মায়া !

*********************









*
একুশ শতকের পাঁচালী
কবি নির্মাল্য ব্যানার্জ্জী
মিলনসাগরে প্রকাশ ৮.১০.২০২৩।
( পরীক্ষামূলক ভাবে সম্পূর্ণ পয়ার ছন্দে অক্ষরবৃত্তের ১৪ অক্ষরের পুরোনো দিনের নিয়ম মেনে লেখা । কিন্তু বিষয়টা বোধহয় একেবারে আজকের রুঢ় বাস্তব । )

কর্পোরেট অফিসার, কর্ম অন্ত প্রাণ,
টি এ, ডি এ, কমিশন, জে ক্লাস উড়ান ।
সপ্তাহান্তে ট্যুর শেষে অলস বৈকাল –
ঘরে ফেরা, কর্মক্লান্ত, ফ্ল্যাটের আড়াল ।
হঠাৎই মনে আসে পুরাতন কথা -
ঠাকুমার গল্পবলা - খাট ভরা শ্রোতা ।
পিতা-কন্যা সুখে বসি করে আলাপন -
রাজপুত্র, তলোয়ার, মৃগয়া গমন ।
দোমিনোজ পিজা, ড্রিঙ্ক্‌স্‌, গল্পের গোড়া -
গহন অরণ্য আর পক্ষিরাজ ঘোড়া ।
কেশবতী রাজকন্যা, কুলো মুলো ভাঁটা -
রূপকথা বয়ে চলে, অঙ্গে জাড়কাঁটা ।
তেপান্তর, শূন্যপুরী, যুদ্ধ আয়োজন -
বেজে ওঠে মোবাইল, মিষ্টি রিংটোন ।
টার্গেট, অর্ডার, ট্যুর, নিউ শিডিউল -
ঢাকা পড়ে রাজকন্যা, মেঘবর্ণ চুল ।
কন্যা ফের মৃদু পায়ে তার বাঁধা গতে -
হ্যারি, রন, হোগার্ডের নিজস্ব জগতে ।
টিভি খোলা, সিরিয়াল, বিপণি বিপুল -
প্রসাধনী, সেলফোন, যত্নে রাখা চুল ।
অসমাপ্ত রূপকথা, মন আনচান -
কবি তার কাব্য রচে - শোনে পণ্য-বান ?

*********************









*
চাঁদ
কবি নির্মাল্য ব্যানার্জ্জী
মিলনসাগরে প্রকাশ ৮.১০.২০২৩।

কারো কাছে বড় অশ্লীল চাঁদ
কারো কাছে নিতান্ত আস্বাদ,
আবশ্যিক সকালে বিকেলে,
দ্রিমি দ্রিমি আরণ্যক মাদলের তালে ।

আর আমার দুহাতে চাঁদ
তিলে তিলে গড়ে ওঠে,
যান্ত্রিক স্ট্যাম্প পড়ে
প্রসারিত ঠোঁটে,
আমিও দেখেছি চাঁদে
মোহময়, অশালীন
রক্তের ছিটে !

বিষন্ন সন্ধ্যায় চলন্ত যানে,
দেখেছি গভীর চাঁদ
সাথে সাথে ছোটে
অদৃশ্য কোন এক লাগামের টানে ।

কখনও সে ঢাকা পড়ে
ইঁটের পাহাড়ে,
টের পাই ঘুন ধরা
প্রত্যেকটি হাড়ে,
পড়ে কিছু দীর্ঘ শ্বাস ।

নগন্য মানুষ বাঁচে
সদা মৃত্যুভিত,
অথচ আকাশ আজ,
চন্দ্রালোকিত !
একটানা ছবি চলে
গৃহস্থ কোটরে,
ঢেকে রাখে প্রাত্যহিক চাঁদ,
মানবিক নাগালের পারে,
নিয়মিত সুষম আহারে
কোথায় আমার চাঁদ ?
এখন কি অমাবস্যা রোজ ?
প্রত্যেক সকালে বিকেলে,
এমন কি পূর্ণিমা রাতে ?

*********************









*
নীলকন্ঠ পালকের ছোঁয়া
কবি নির্মাল্য ব্যানার্জ্জী
মিলনসাগরে প্রকাশ ৮.১০.২০২৩।

কপালে দিয়ে যেও ভিজে হাতে শ্রাবণের ছোঁয়া ।
দিন আসে দিন যায় ।
অশক্ত গাভীর মত অজানা আশঙ্কায়,
অব্যক্ত যন্ত্রণায়,
কেঁপে কেঁপে উঠি,
অথচ দৃঢ় অঙ্গীকারে বদ্ধ হয় মুঠি ।
রাঙাও আকাশ তবু, হে নীলাঞ্জনা ।

বিষাক্ত চুম্বন দাও আমার দু চোখে ।
আমার দুহাতে দাও ফুলকুঁড়ি ভোর ।
সজীব বাতাস পাক প্রত্যেক পাঁজর,
আঘাত সজোর, উত্তপ্ত আসবের,
কোনখানে পুনশ্চর জের,
ফুটুক গন্ধরাজ মাটিছোঁয়া মুখে ।

যদিও পৃথিবী জুড়ে ছাই রঙা ধোঁয়া,
তবু নীলাঞ্জনা,
উত্তপ্ত কপালে দিও
নিলকন্ঠ পালকের ছোঁয়া ।

*********************