কবি রজত পুরকায়স্থের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি রজত পুরকায়স্থের পরিচিতির পাতায় . . .

বিপন্ন ভারত
কবি রজত পুরকায়স্থ
কবির ২০২২ সালে প্রকাশিত "রাজার কলম হোক ক্রীতদাস" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। এই কবিতাটি ভারত এবং বাংলাদেশের বহু আবৃত্তিকার বিভিন্ন সভা সমিতি এবং আবৃত্তির অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করেছেন।

ভাবনারা অবসরে গেলে নিশুতি রাতে
ওরা আসে।
একটা জ্বলন্ত দেশলাইকাঠি ছুঁড়ে দিই ওদের দিকে,
অদ্ভুত শব্দে কাঠিটা নিমেষে নিস্তেজ হয়ে যায়।

আমার চারদিকে তখন ভারি বুটের আওয়াজ,
লঙ্কার গুঁড়োয় দগ্ধ যোনির যন্ত্রণায় কাঁদে
মুক্তির মা।
সাজানো ফাঁসির মঞ্চ থেকে ভেসে আসে,
"একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি" ।

বুকের ওপর খোলা "আনন্দমঠ"।
বাতাসে পাতাগুলো থেকে ধূলো উড়ছে,
যেন লক্ষ অশ্বের গতিপথে অন্ধকার চারপাশ।
আমার সামনে এসে দাঁড়ায় একদল সন্ন্যাসী ;
মুখে তাদের অগ্নিমন্ত্র, "বন্দেমাতরম"!
একজনের গেরুয়া বসন ধরে টান দিতেই
ওদের শরীরে জ্বলে ওঠে দাউদাউ আগুন,
হাসি মুখে ওরা গিলতে থাকে
চারদিক থেকে ধেয়ে আসা দুরন্ত বুলেট-বৃষ্টি।

ভীত সন্ত্রস্ত আমি
রাজপথ ধরে ছুটতে থাকি প্রাণ ভয়ে।
শুনতে পাই কে যেন চিৎকার করে বলছে,
"তোরা আমাকে ঘরে ফিরতে দিলিনা।
তোদের ঘরের প্রতি কোণে
আমি মুক্তির বাতাস ভরে দিতে চেয়েছিলাম।"
চেয়ে দেখি
সুভাষ বসুর চোখে জলের দাগ মুছে দিচ্ছে
পাখির গরম বিষ্ঠা।

আত্মরক্ষার নিষ্ঠায়
একটা মন্দিরে ঢুকে পড়ি।
ধার্মিকেরা তখন নরমুণ্ড দিয়ে বানাচ্ছে
সুসজ্জিত একটা চেয়ার।
বিবেকানন্দ চিৎকার করে বলছে,
"তোরা আমার সঙ্গে চিকাগো চল
বিশ্ব যে ধর্মের কাছে মাথা নোয়ায় সম্ভ্রমে
তোরা শুধু সওদাগরি করে গেলি সে ধর্মের।"

আমি ছুটছি …. আরো জোরে ছুটছি……
হঠাৎ বজ্রকন্ঠে কেঁপে ওঠে চারদিক,
"করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে!"
চেয়ে দেখি
তেজী সৈনিকের মতো এক বৃদ্ধ।
তার হাতের লাঠি শতখণ্ড হয়ে পড়ে আছে মাটিতে।
পলকে ছুটে আসে একদল উন্মাদ,
ভাঙা লাঠির টুকরো দখলের লড়াই শুরু হয়।
ওদের মধ্যে ছিল
নেতা, মন্ত্রী, আর ক্লাবের আড্ডাবাজ কিছু ছেলে।
যারা অবিরাম লাঠি ঘোরায় সনাতনী কায়দায়,
লাঠি বড়ই দরকার ওদের।
অসহায় চোখে চেয়ে থাকে
জাতীর জনক
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী।

কবিগুরুর হাতের রাখী ছড়িয়ে পড়ছে মাটিতে,
এক একটা রাখীতে রাম, রহিম, যীশুর তাজা রক্ত।
ক্ষোভে দুঃখে বিশ্বকবি গাইছেন,
হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী………

ভোর হতেই দরজায় ধাক্কা দেয় বিপন্ন ভারত!
শৃঙ্খলিত ভারত!
ঘুম চোখে দরজা খুলে দিই। তারপর
সবার সাথে আমিও পা রাখি পরাধীন ভারতে।
পতাকা হাতে রাজু মিত্রের ডাকে মিলিয়ে যাই
মরা মানুষের মিছিলে।

তখনও আমার চোখের ঝাপসা আলোয়
উড়ছিল আনন্দমঠের পাতা,
গেরুয়া পোশাকের ছদ্মবেশে কারা যেন বলছিল
"বন্দেমাতরম্"...... "বন্দেমাতরম্"!

*********************









*

চল রঙ মাখি
কবি রজত পুরকায়স্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫ই অগাস্ট ২০২৩।

রঙ ছাড়া যদি রাঙাতে পারিস,
বারোমাস ভাসতে পারিস সেই রঙের দুর্নিবার স্রোতে,
তবে তোকে নিয়ে তৈরী করতে পারি
অন্য এক বৃন্দাবন।

বাঁশি আমি বাজাতে পারিনা,
তাই মন চুরি করা সুর তোকে শোনাতে না পারলেও
আমার বুকে কান রাখলে শুনতে পাবি
পরিচিত সুর,
সেখানে শুধু তোরই নামের মায়াময় প্রতিধ্বনি হচ্ছে অবিরাম।

ফেলে আসা সময়ের হাত ধরে আমি দাঁড়িয়ে আছি ,
বর্তমানের কত নুড়ি পাথরে
চাপা পড়েছে তোর অতীত বাগান।
আমি শুধু ভেসে আছি সর্বনাশের ভেলায়।

যেসব পরাজয় তোকে কষ্ট দেয় নিভৃতে,
আমি সেগুলো জমা করি
ক্লান্তিহীন কষ্টের অধিশ্বর হবার বাসনায়।

গণ্ডিটা অতিক্রম ক'রে একবার সাহসে বুক বাঁধ,
রঙ না মেখেও রঙিন হবার মন্ত্রটা
তোকে ফিরিয়ে দেবে তোর কাছে।

*********************









*

মুক্তির প্রত্যাশায়
কবি রজত পুরকায়স্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫ই অগাস্ট ২০২৩।

যদি উপহার চাও
তোমাকে অন্ধকারে মোড়া আস্ত একটা রাত দিতে পারি।
যে রাতে আমি মন্দিরের পূজারী হই,
তুমি দেবত্বের আসনে বসে সবটুকু অবহেলা
উজাড় করে দাও
অকৃপণ কৃপা প্রার্থনার বিনিময়ে।

আমার একান্ত আপন রাত
হয়তো দুর্বোধ্য হবে তোমার আপাত সুস্থ
গৃহকোণে,
তোমার অবকাশহীন নির্মমতায়
অনাবিষ্কৃত রয়ে যাবে নির্মম চলন্ত একটা জীবন।

যদি উপহার চাও
আগুনে ঝলসে যাওয়া শরীর থেকে
খসে পড়া মাংসের মতো
বিছিন্ন কিছু মুহূর্ত দিতে পারি তোমাকে।

একদিন তুমি ছিনিয়ে নিয়েছিলে বেহিসাবি সময়।
সাবলীল ভঙ্গিতে তুমি বলবে জানি,
সবটাই ছিল সময়ের অভিশাপ।

যদি চাও
আমি তন্ন তন্ন করে
উধাও তোমাকে ফিরিয়ে দেবো
তোমার কাছে।
উপহার নয়।
সশ্রম কারাবাস থেকে
অনুর্বর আমাকে খালাশ করতে।

*********************









*

সমাপ্ত বাসনা
কবি রজত পুরকায়স্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫ই অগাস্ট ২০২৩।

তোমার সাথে জীবনের একটা নিবিড় অন্ত্যমিল চেয়েছিলাম,
যেখানে সাহারার গরম বালুকণা মুঠোতে ভ'রে
আমার সাথে গলা মিলিয়ে তুমি বলবে,
আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে……

নবোদিত অরুণের আলোয় ভাসতে ভাসতে
বন্ধ চোখে
তারাদের সংসারের মাঝে পাতবো আমাদের মুকুলিত প্রেমের শৈশব বিছানা।

পরস্পরের সম্মিলিত ঘামে ভিজতে ভিজতে
হেঁটে যাবো মেঠো পথ ধরে
উদাসী বাউলের সর্বনাশা অনন্ত প্রাপ্তির
গান গেয়ে।

ঠোঁটে লেগে থাকা অমৃত কণায় ইহকালের সর্বস্ব বিকিয়ে
খুঁজবো না গভীর প্রশান্তি।

একটা অন্ত্যমিলের প্রত্যাশায় গরমিলের ভরা য‍ৌবনেও
আমি সাধনার শেষতম সীমানায়
তোমাকে কামনা করেছি একান্ত নির্মমতায়।

হেমলকের শেষতম অস্তিত্ব
আমার শিরায় আধিপত্য স্থাপনের আগে
চেয়েছি একটা অন্ত্যমিল,
উপসংহারের প্রাক মুহূর্তে কামনা করেছি
একমুঠো ভিজে জীবনের দুরন্ত অশ্বের গতি।

*********************









*

আশ্চর্য বিপরীত
কবি রজত পুরকায়স্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫ই অগাস্ট ২০২৩।

ছুটি যখন ছুটি কাটায়,
ক্লান্তি অক্লান্ত অপেক্ষার পর ফিরে যায়
অজানা পীঠস্থানে।

সত্তরের শরীরে নামে আঠারোর স্বেদ,
আঠারো
অন্ধকার ঘরের কোণে
একান্তে গোনে আলোর কঙ্কাল।

যৌবনহীন রাস্তায়
একদল ফেরিওলা পরিচিত সুরে
স্বপ্ন ফেরি করে,
গৃহস্থের উঠোনে আলপনার দাগ মোছে
অযাচিত রক্তের ফোঁটা।
বোঁটা আলগা হয় কুঁড়িদের,
পরাগ মিলনের মনোরম দৃশ্য উপভোগের আগে
সমবেত কন্ঠে গেয়ে ওঠে
মৃত্যুর গান।

উন্নয়ন বেঁচে থাকে আলোর সার্কাসে,
লজ্জা সগৌরবে হয় হৃষ্টপুষ্ট।
কথার তরজা লড়াইয়ের শাণিত হাতিয়ারকে সম্বল ক'রে
দেবতারা ব্যস্ত হয় কালো পোশাক খুলতে।
শুধু সত্তর ভুলতে পারেনা আঠারোর অভিশাপ,
আঠারোর শরীরে নামে অকাল বার্ধক্য।

*********************









*

আলোর জন্ম দাও
কবি রজত পুরকায়স্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫ই অগাস্ট ২০২৩।

যদি ভালোবাসো
পূজা করো আমার দূরত্বকে।
ছুঁয়ে থাকো তোমার ঘামে না ভেজা
আমার শরীর।

যদি ভালোবাসো
দু'হাত ভ'রে দাও নির্মম দূরত্ব।
তোমার অবিরাম উপবাসে হোক আমার
উদর পূরণ।

যদি ভালো না বাসো
তবে চলো ভেসে যাই পরিচিত স্রোতে,
শরীরে শরীর মিলিয়ে
জন্মদিই অন্য এক শরীর।

তারপর কোনো এক রূপকথার দিনে
তেলশূন্য প্রদীপের উপহারে
আমাদের অর্জিত শরীর মিশে যাক
অশরীরী ছায়ার ভিড়ে।

শুধু জীবনের ধর্ষিত মহাকাব্য পাঠে
আমরা বেঁচে থাকি অনুগত অভিনয়ে
অবাধ্য যৌবনের প্রতিবেশী হয়ে।

*********************









*

নিষিদ্ধ
কবি রজত পুরকায়স্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫ই অগাস্ট ২০২৩।

নিষিদ্ধ পল্লীর ভিতর দিয়ে
যে মানুষটা মাথা নিচু করে হেঁটে যায়,
গায়ে কাদা লাগার ভয়ে
অনুগত গৃহস্থের ভানে সামলে নেয় নিজেকে।
নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে
স্বস্তির নিশ্বাস নিতে নিতে সে আপন মনে বলে,
বাঁচা গেল! আর একটু হলে……

নিষিদ্ধ শব্দটার সাথে তার সখ্যতা নেই বোঝাই যায়।

তবুও বেহায়া সময়
প্রসব করে কিছু নিষিদ্ধ মুহূর্ত।
তাই বাড়ি ফেরার পথে আপাদমস্তক সজ্জন লোকটা
গোপনে বিধবা অঙুর বৌ'কে বলে,
তোর পেটের বাচ্চাটাকে খালাস করে আয়
শহরের কোন হাসপাতাল থেকে।
টাকা যা লাগে দিয়ে দেবো।

রাতে নিষিদ্ধ সময়ের বেড়া টপকে
ঋতুমতি বৌটার শরীরে ঢালে
লালিত পৌরুষত্বের অভিজ্ঞান।

সকালে নিষিদ্ধ স্রোত সাঁতরে
তুলে আনে অবৈধ রাশি।
নিয়োগের বরাত পায় সগৌরবে,
কখনোবা ভগবানের নির্দেশে দানা ভরে দেয়
প্রতিপক্ষের বুকে।

নিষিদ্ধ শব্দটা মাঝেমাঝেই নিষিদ্ধ হয়,
প্রগতি এগিয়ে যায় দুর্নিবার আলোর অভিনয়ে।

*********************









*

জয়
কবি রজত পুরকায়স্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫ই অগাস্ট ২০২৩।

সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র,
প্রথম কথাটা শুনেছি ঠাকুরমার মুখে।
ছেলেবেলায় বুঝতাম না
চারটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে
কতটা অধঃপতন আর অবিচার।

মনের ভিতর আবর্জনার চোরা স্রোত বয়ে গেলেও
শুধুমাত্র সুন্দর মুখের কারণে তাকে তারিফ করতে হবে,
জয় তার পক্ষে থাকবে অহর্নিশি।

সুন্দর মুখটা
যখন শিকারির ভূমিকা পালন করে,
একাধিক পতঙ্গকে
একই সময়ে পুড়িয়ে মারে রূপের মোহে,
তখনও জয় তার বিপক্ষে যায়না।

অসুন্দর মুখের গভীরে সমুজ্জ্বল মন্দিরটা
চোখ এড়িয়ে যায় অদ্ভূত কারণে।
অনায়াসে নষ্ট শরীরের ঘ্রাণ
গ্রাস করে ধূপের সুবাস।

কিছু শব্দ সশব্দে কালজয়ী হয় বিনা বিচারে।
আবর্জনার জয়ের উল্লাসে
দৃশ্যমান হয়না অনিন্দ্য সুন্দর।

*********************









*

শিকারী না থাকলে
কবি রজত পুরকায়স্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫ই অগাস্ট ২০২৩।

জেলের হাত থেকে যদি জাল কেড়ে নেওয়া হয় ;
কিংবা যদি তাকে বলা হয়,
তুমি আর মাছ ধরতে পারবেনা।
তোমার মাছ ধরার অধিকার কেড়ে নেওয়া হলো।
মাছেদের তো আনন্দ হবে।
লেজ তুলে লাফাবে পুঁটি, তপসে, বোয়াল, রুই, কাতলা
আরো ছোট বড় কত মাছ।

ওরা তো মানুষ নয়।
তাই মানবিক হবার দায় ওদের নেই।
জলের গভীরে খাবার খোঁজে,
ঘুরে বেড়ায় ইচ্ছে মতো,
বংশ বাড়াতে নিজস্ব অনুপ্রেরণায় স্বতঃস্ফুর্ত উদ্যোগে সঙ্গম করে।

ওরা তো মানুষ নয়,
তাই জলের স্রোতে ওদের শরীরের
সব ময়লা ধুয়ে যায়।
আবর্জনারা ওদের স্পর্শ করার বরাত পায়না।

শিকারীর নির্বাসনে মানুষ দুহাত তুলে নাচে,
ওরাও পাখনা নেড়ে স্বস্তির প্রকাশ করে।
মুক্তির আনন্দে ওরা নাচে,
মানুষ নাচে মানবিক হবার কারণে।

*********************









*

অপরিবর্তনীয়
কবি রজত পুরকায়স্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫ই অগাস্ট ২০২৩।

অদ্ভুত কিছু সময়ে
ভূত দেখি দিনের কড়া আলোতে।
কিছু ভূতুড়ে সময়ে
ভূমিকম্পের অজানা ভৌগলিক কারণে
জীবনের ভূমিকা খোলশ পাল্টায়
মরশুমি আলোয়।

তুমি আছো আমি আছি
আমাদের সম্মিলিত তৃষ্ণা আছে,
মাটির গভীরে শূন্যতার জবরদখল আছে,
শুধু জল নেই পিপাসার।

হঠাৎ বেড়ে ওঠা কিছু শব্দের মহফিলে
সুন্দরতম দিনগুলো হারিয়ে যায়।
তলব, হেফাজত, তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ
শব্দগুলো
শিকড় বিছিয়ে মজবুত করে মাটির বুক।
নতুন নতুন আরো কত শব্দবিভ্রাটে
জনজীবন বিপর্যস্ত হয়।

শুধু চোখের জল, বঞ্চনা, আর হাহুতাশ
এই শব্দগুলো
অজানা কারণে লাভ করে অমরত্ব।

তাই বুকের ডান দিকে আমরা লালন করি মন্দির,
বামদিকে ফুলে ঢাকা কবরের পাশে।

*********************