কবি শ্রীশ্রীঅন্নদা ঠাকুর - এর আসল নাম অন্নদাচরণ ভট্টাচার্য। তিনি জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার, অধুনা বাংলাদেশের, চট্টগ্রাম জেলার, রাউজানের গুজরায়। পিতা অভয়চরণ ভট্টাচার্য ও মাতা তিলোত্তমা দেবী। কবিরা তিন ভাই দুই বোন (স্বপ্নজীবন পৃঃ১)।
.

কবি শ্রীশ্রীঅন্নদা ঠাকুর - এর আসল নাম অন্নদাচরণ ভট্টাচার্য। তিনি জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার, অধুনা বাংলাদেশের, চট্টগ্রাম জেলার, রাউজানের গুজরায়। পিতা অভয়চরণ ভট্টাচার্য ও মাতা তিলোত্তমা দেবী। কবিরা তিন ভাই দুই বোন (স্বপ্নজীবন পৃঃ১)।
.


শ্রীশ্রীঅন্নদা ঠাকুরের শিক্ষাজীবন -     ^^ উপরে ফেরত
কবি অন্নদা ঠাকুর মেধাবী ছাত্র ছিলেন। আয়ুর্বেদ চিকিৎসক হতে লেখাপড়ার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন। ঝামাপুকুরের মহারাজা দিগম্বর মিত্রের গৃহে আয়ুরব্বেদ কলেজের প্রথম ব্যাচেই বৃত্তিসহ ভর্ত্তি হয়ে, ১৩২১ বঙ্গাব্দে (১৯১৪খৃঃ) সালে কবিরাজি পাশ করেন। বৃত্তির বদলে তিনি দিগম্বর মিত্রের ফ্রি বোর্ডিংএ দু-বেলা খাওয়ার বন্দোবস্ত করেছিলেন। দারোগা রসিকচন্দ্র বিশ্বাস ও চট্টগ্রামের উকিল ব্রজমোহন বিশ্বাস তাঁকে বেশ কিছুদিন আর্থিক সাহায্য করেছিলেন। থাকতেন প্রায় দেড় বছর কলেজের উপরতলায় ও পরে পটলডাঙ্গায় কবিরাজ শরচ্চন্দ্র সাংখ্যতীর্থের বাড়ীতে।

.


শ্রীশ্রীঅন্নদা ঠাকুরের কর্মজীবন -     ^^ উপরে ফেরত
কবিরাজি পাশ করার পরে, বন্ধুবর যতীন্দ্রনাখ বসুর পিতা সিদ্ধেশ্বর বসুর অনুরোধে কবি, অম্লরোগের উপসমকারী একটি ওষুধ তৈরী করেন। ওষুধের উপকারিতায় মুগ্ধ হয়ে সিদ্ধেশ্বর বসু ২০০০ টাকা ও সহযোগিতায় একটি কবিরাজী ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা শুরু করেন কলকাতায় সিদ্ধেশ্বর বসুর ১০০ আমহার্স্ট স্ট্রীটের ঠিকানায়। তিনি কবিরাজ এ. সি. কবিরত্ন এবং ম্যানেজার বন্ধুবর জে. এন. বসু! অন্নদা ঠাকুর তাঁর পিতার নামে সংস্থার নাম রেখেছিলেন “অভয়াসুধা কার্য্যালয়”।

তাঁরা তাঁদের এই চিন্তা ভাবনা নিয়ে, বেঙ্গল কেমিক্যাল ওয়ার্কস এর ডাঃ পি. সি. রায়ের সঙ্গে গিয়ে দেখা করেছিলেন। তিনি দু একটি উপদেশ দিয়ে তাঁর ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিয়েছিলেন। ম্যানেজার খুবই ভদ্র মানুষ ছিলেন। তিনি তাঁদের সব কথা শুনে সকল উপায় নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন (স্বপ্নজীবন পৃঃ১৬)। কবি এখানে বেঙ্গল কেমিক্যালসের যে ম্যানেজারের কথা উল্লেখ করেছেন, তাঁর নাম না করলেও আমাদের অনুমান এই যে তিনি সম্ভবতঃ ছিলেন রাজশেখর বসু যাঁর ছদ্দনাম ছিল পরশুরাম!

তিনি এর পরে ব্যথা, বেদনা, জ্বর প্রভৃতি অশুখের জন্য আরও ওষুধ তৈরী করেছিলেন, যার ৭টি সিদ্ধেশ্বর বসু মহাশয়ের কথায় পেটেন্ট করা হয়।
.


কবির গার্হস্থ জীবন ও স্ত্রী মণিকুন্তলা দেবী - ^^ উপরে ফেরত
কবিরাজি পড়ার সময়ে একবার তাঁর মায়ের শরীর খুব খারাপ হয়ে পড়ে এবং প্রায় অন্তীম শয্যায় তিনি কবিকে বিয়ে করতে বলেন। সন্যাস নেবার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি মায়ের কথা রেখে বিবাহে রাজি হলেন এবং তাঁর বিবাহ দেওয়া হলো মণিকুন্তলা দেবীর সাথে (স্বপ্নজীবন পৃঃ১২-১৩)। এর পরই মায়ের অবস্থার উন্নতি হতে থাকে এবং তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। স্বাভাবিকভাবে মায়ের এই আশ্চর্য উন্নতির জন্য তাঁর পরিবার নতুন বৌয়ের শুভপ্রভাবকেই দায়ী মনে করেন। কবি তাঁর আত্মজীবনী “স্বপ্নজীবন”-এ তার স্ত্রীর কথা খুবই অল্প উল্লেখ করেছেন, কিন্তু স্ত্রীর প্রতি তাঁর টান ছিল পূর্ণ মাত্রায় (স্বপ্নজীবন পৃঃ২৭)। যেহেতু তিনি কলকাতায় থেকে কাজকর্ম করতেন, এরবার বাড়ী থেকে বিদায়ের সময়ে তাঁর ছোট ভাই শ্যামকে বলে এসেছিলেন তার বৌদিকে দেখতে (স্বপ্নজীবন পৃঃ৩০)।

.


শ্রীশ্রীঅন্নদা ঠাকুরের আধ্যাত্মিক জীবন -     ^^ উপরে ফেরত
জানা যায়, কলকাতায় তাঁর কবিরাজি ওষুধের ব্যবসা চলাকালীন একদিন শ্রীরামকৃষ্ণ ঠাকুর তাঁকে স্বপ্নে আদেশ দেন কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে গিয়ে সেখানকার ঝিলের পাশে নারকেল আর পাকুড় গাছের কাছ থেকে, একটি কালীমূর্তি নিয়ে আসতে। স্বপ্নাদেশ মেনেই ঝিলের পাশ থেকে উদ্ধার করেন ওই দশ ইঞ্চি থেকে এক ফুট লম্বা কালীমূর্তি যা আজ “আদ্যা মা” নামে খ্যাত। আরও জানা যায়, ওই দেবীর অর্থাৎ আদ্যা মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়েই দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর তিথিতে সেই আদ্যামূর্তিটি বিসর্জন দেন অন্নদা ঠাকুর। গঙ্গায় বিসর্জনের আগে তিনি সেই দশ ইঞ্চি থেকে এক ফুট লম্বা মূর্তির ছবি তুলিয়ে রাখেন। কলকাতার যাদুঘর, Indian Museum থেকেও তিনজন সাহেব যাদের মধ্যে দুজন সম্ভবত মাদ্রাজী ছিলেন, গিয়ে সেই মূর্তি ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে নিরীক্ষণ করে জানান যে সেটি গৌতম বুদ্ধের আমলের এবং তাঁর সেটা যাদুঘরে নিয়ে যেতে চাইলেন। অন্নদাঠাকুর অবশ্য তাঁদের না করে দেন (স্বপ্নজীবন পৃঃ৫১-৫২)। সেই ছবি দেখেই তৈরি করা হয় আদ্যাপীঠের বিগ্রহ। অন্নদা ঠাকুর স্বপ্নেই দীক্ষা পান ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস (১৮.২.১৮৩৬ – ১৬.৮.১৮৮৬) এর কাছ থেকে ১৩২৫ বঙ্গাব্দে (১৯১৮খৃঃ)।
.


দক্ষিণেশ্বরে রামকৃষ্ণ সংঘ ও আদ্যাপীঠ -     ^^ উপরে ফেরত
১৯১৩ সালে, মকর সংক্রান্তির দিনে দেবীর প্রথম ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, অস্থায়ীভাবে অধিষ্ঠিত জমিতে। অন্নদাঠাকুর, দক্ষিণেশ্বরে রামকৃষ্ণ সংঘ নামে একটি মিশনারি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আদ্যপীঠ প্রতিষ্ঠা করেন। দক্ষিণেশ্বরে জমি কেনা হয় এবং ১৯২০ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। আজ আদ্যাপীঠের এই সংগঠনটি সেখানকার ব্রহ্মচারী ও ব্রহ্মচারিণীরা পরিচালন করছেন সুনামের সঙ্গে। পর্যটকদের জন্য কলকাতা কেন্দ্রিক দর্শনীয় স্থানের মধ্যে আদ্যাপীঠ অন্যতম।

কবি অন্নদাঠাকুরের তিরোধানের পরে মণিকুন্তলা দেবী আদ্যাপীঠের হাল ধরেছিলেন। তাঁর দেহাবসানের পরে বর্তমানে তাঁরা দুজনেই সেখানে পূজিত হন।

অন্নদাঠাকুরের আদেশানুসারে আদ্যাপীঠে, মানুষের সেবায়, বিশাল কর্মযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে। যার মধ্যে রয়েছে...

১। ছেলেদের জন্য একটি অনাথ আশ্রম।
২। দক্ষিণেশ্বর বালিকা অনাথ আশ্রম।
৩। সাধক আশ্রম এবং সাধিকা আশ্রম দুটি মঠ।
৪। বৃদ্ধাশ্রম-বানপ্রস্থ আশ্রম দুটি।
৫। বিধবাদের জন্য আশ্রম।
৬। দাতব্য চিকিৎসালয় - আধুনিক চিকিৎসার সুবিধাসহ।
৭। দরিদ্রদের খাওয়ানো এবং পোশাক বিতরণ অন্যতম প্রধান বিষয়।
৮। বালক বিদ্যালয় - দক্ষিণেশ্বর আদ্যাপীঠ অন্নদা বিদ্যামন্দির বিনামূল্যে।
৯। আদ্যাপীঠ অন্নদা প্রাথমিক বিদ্যালয় - ছেলেদের জন্য।
১০। বালিকা বিদ্যালয় – মণিকুন্তলা উচ্চমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় বিনামূল্যে।
১১। সংস্কৃত কলেজ - সংস্কৃত মহাবিদ্যালয়।
১২। অতিথি সেবা - ক্ষুধার্ত অতিথিকে কখনও প্রত্যাখ্যান করা হয় না।
১৩। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্যোগের সময় সেবা করা।
১৪। বালিকা আশ্রমে "শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট" এবং গ্রন্থাগার।
১৫। শববাহন (মৃতদেহ বহনকারী) – সার্বক্ষণিক সেবা।
১৬। ১০০ শয্যা বিশিষ্ট, সুসজ্জিত হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প।

শ্রীশ্রীঅন্নদা ঠাকুর মাত্র ৩৮ বছর বয়সে পুরীতে প্রয়াত হন।
.


শ্রীশ্রীঅন্নদা ঠাকুরের পরিচিত সেযুগের বিশিষ্টরা - ^^ উপরে ফেরত
কবি অন্নদা ঠাকুরের সঙ্গে সেই সময়ে যে যে বিশিষ্টজনদের আলাপ ও পরিচয় হয়েছিল তাঁদের মধ্যে রয়েছেন
রায়বাহাদুর জলধর সেন,
রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন,
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়,
নাট্যাচার্য অমৃতলাল বসু,
মহেন্দ্র কবিরাজ (মহেন্দ্রলাল গুপ্ত বা শ্রীম) এবং
আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং
সম্ভবতঃ রাজশেখর বসু, ছদ্দনামে পরশুরাম প্রমুখরা।

মিলনসাগরে এই সকল বিশিষ্টজনদের কবিতার পাতা রয়েছে তা এখানে সোনালী অক্ষরে দেওয়া রয়েছে। তাঁদের কবিতা পড়তে তাঁদের নামের উপর ক্লিক করুন।

শ্রীশ্রীঅন্নদা ঠাকুর মাত্র ৩৮ বছর বয়সে পুরীতে প্রয়াত হন।

.


শ্রীশ্রীঅন্নদা ঠাকুরের রচনাবলী -     ^^ উপরে ফেরত
তাঁর রচনার মধ্যে রয়েছে পণপ্রথা নিবারণ কল্পে লেখা নাটক “স্নেহলতা”। নাটকটি লিখেছিলেন ভবানী ভট্টাচার্য্য নামে। কিন্তু তা আর প্রকাশিত হয়নি কারণ তখন তিনি প্রায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন (স্বপ্নজীবন পৃঃ৮১)।

তাঁর অন্যান্য প্রকাশিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে রয়েছে “রামকৃষ্ণ মনঃ শিক্ষা”, কাব্যগ্রন্থ “মা”, “সখা”, অমৃতাক্ষর ছন্দে কাব্যগ্রন্থ “মণিহারা”, আত্মজীবনী “স্বপ্নজীবন” প্রভৃতি।

এখানে আমরা কবির "মা" কাব্যগ্রন্থ এবং "স্বপ্নজীবন" আত্মজীবনী থেকে কিছু কবিতা ও গান তুলেছি।

এখানে ক্লিক করে Jiosaavn ওয়েবসাইটে তাঁর রচিত চারটে গান, এবং আদ্যা মা কে নিয়ে অন্যান্যদের রচিত গানও শুনতে পারবেন। আমরা শ্রীশ্রীঅন্নদা ঠাকুরের সেই চারটে গানের সঙ্গে সেই সেই গানের লিংকও তুলে দিয়েছি গানের পাতায়।

আমরা মিলনসাগরে কবি শ্রীশ্রীঅন্নদা ঠাকুরের কবিতা, গান ও তাঁর জীবন ও কর্মযজ্ঞ আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা। এই পাতা শ্রীশ্রীঅন্নদা ঠাকুরের প্রতি মিলনসাগরের শ্রদ্ধাঞ্জলি।



কবি শ্রীশ্রীঅন্নদা ঠাকুরের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন



উৎস -
আমাদের ই-মেল
: srimilansengupta@yahoo.co.in
হোয়াটসঅ্যাপ
: +৯১ ৯৮৩০৬৮১০১৭



এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১.৫.২০২৫