কবি চন্দন মিত্রর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি চন্দন মিত্রর পরিচিতির পাতায় . . .
আমার আত্মার পায়ে বাঁধার ঘুঙুর
কবি চন্দন মিত্র
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫.১০.২০২৩।

পাংশু এক শঙ্খিনীর চুম্বনে নীল হয়ে
আমার প্রাচীন আত্মা নীলাভ ঘুড়ির মতো
ঝুলে আছে কর্ণিকার গাছে
প্রতিটি বসন্তে তার উচাটন টের পাই
সে আমাকে ডাক দেয় ফেলে আসা গুরুদাসপুরে

এক নবীন আত্মাকে আমি পুষেছি খাঁচায়
তাকে দিই কোপাইয়ের জল
কৌপীন কড়োয়া ও কৌমুদী সেবা
সে আশ্লেষে শিস দেয়
তাকে আমি বহ্মতালুর দাঁড়ে দোলাতে দোলাতে
হেমন্ত-সন্ধ্যায় নিয়ে যাই আসাননগরে

বন্ধুদের তাঁবু জেগে আছে
নিভন্ত চিতার পাশে মজানদী ছুঁয়ে
যে সকল নরনারী যাতায়াত করে তারাও আত্মজন
চিতা না-জ্বললেও জ্বলে আছে ধুনি একাধিক
বোধিবৃক্ষ থেকে কয়েকটি কার্তিক নেমে বসেছে ধুলোয়
তারাও কী ভোরবেলা সাধুও ফকির দেখে সঙ্গ-উৎসুক

গাছে গাছে বন্ধুদের তুলির আঁচড়
বাতাসে সাঁতার কাটে লালনের গান
আসশ্যাওড়া ঝোপ ফুঁড়ে তিরের মতন
রাস্তা বিঁধে গেছে সেগুনের বনে
তার পাশে মজানদী ভোর ও কুয়াশা সেখানেও গান
আমার নবীন-আত্মা
নিপাট শিশুর মতো দু-চার পা হেঁটে শেষে উড়ে যায়
আজমত শাহ ফকিরের কাছে

প্রকৃত এই মেলার বাইরে মঞ্চে মঞ্চে গান
প্রকৃত এই মেলার বাইরে প্রকৃত গৃহস্থভিড়
দোকানে দোকানে নিয়ে দামের সন্ধান
কেনে তারা চাহিদামোচন
উপরি পাওনা নেয় মহাজনী পদ থেকে তত্ত্বসারাৎসার
কীভাবে উত্তাল নদী পার হতে হয় ...

মৃৎপাত্র যেন কলকেফুল পরাগ আগুনরাঙা
পান করেছে যে সে তো ঝিম-ভোমরা
সুঘ্রাণ ও মাদকতা আনে
তাঁবুর ভিতরে এইসব নিয়ে জাগা প্রতীক্ষার রাত
আসেননি তিনি
অথবা এলেও বেলেল্লা এড়াতে
আছেন নিসর্গে কুয়াশার গর্ভের ভিতর

সচেষ্ট হয় কেউ কেউ
রাতের আঁধার ঢুঁড়ে
পৌঁছে যায় বাংলাদেশ সীমানার কাছে
তবুও অধরা তিনি

আমার প্রাচীন আত্মায়
তাঁর হস্তাবলেপন আছে
আমার প্রাচীন আত্মার পায়ে
তাঁর ঘুঙুর জড়ানো ছিল
ঘুঙুরটি আজ আমি নবীন আত্মার পায়ে বেঁধে নেব ...

*********************









*
হিরণ্য আপেল
কবি চন্দন মিত্র
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫.১০.২০২৩।

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত হিরণ্য আপেল এল হাতে
সুবর্ণ রোমে ছাওয়া সুবর্ণ ত্বকের গভীরে
আমি কামড় বসাব না সাজিয়ে রাখব ভাবি
ভাবতে ভাবতে আপাদমস্তক দুলে উঠি
যেন প্রলয়পয়োধি জলে ধৃতবানসি বেদম
অথবা জ্ঞানবৃক্ষ থেকে ছিঁড়ে আনা ফল
ইভের নৈবেদ্য আর আমি মাখননির্মিত ছেলে
দাঁতে কাটতেই মুহূর্তে তরল হই সান্দ্র হই ...

*********************









*
গল্পদিন
কবি চন্দন মিত্র
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫.১০.২০২৩।

গল্পদিন শেষ হয় আগুন নেভে না
বরং বাড়তে থাকে
পিপাসাও বেড়ে যায়

যে কষ্ট পাথরের মতো
হৃৎপিণ্ডে আটকে থেকে রক্তে চাপ দেয়
গল্পদিন সেসব ভাসায়
যদিও তা তাৎক্ষণিক

গল্প শুরুই হয় শেষ হবে বলে
গল্পদিনও তাই

অতঃপর আবার আগুন
আবার গল্পের খিদে
দুপুরের ট্রেন ঝমঝম চলতেই থাকে

এবং আবার মধ্যরাতে ভূতগ্রস্ত কবি...

*********************









*
প্রতিবেদন নয় আমাদের ভূমিকা
কবি চন্দন মিত্র
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫.১০.২০২৩।

তারাগুনিয়া গ্রামের হাঁসেরা ইদানীং
নক্ষত্রদের সংখ্যা নির্ণয়ে মাথা ঘামাচ্ছে খুব
ফলত পণ্ডিতদের পুথি গিলে মরার উপক্রম।

দেখতে দেখতে ভাদ্রমাসও এসে গেল
মনসার থানও জেগে উঠল যথারীতি
সমস্যা হল এই যে— হাঁসেরা এখন
নিজেদের মাথার দাম বুঝে গেছে।
বলি হবে কী হবে না এই নিয়ে
গাঁ-গঞ্জে চলছে ব্যাপক জল্পনাকল্পনা।

বলি না-হলে পুরুত মুণ্ড পাবে না
ভক্ত মাংস পাবে না, থান রক্ত পাবে না।
মনসার কথা আর কী বলব—
সে হয়ত শেষে পুরুতের মুণ্ডু আর
ভক্তের মাংস খেতে চাইবে,
সাপেদের তো তেতে ওঠাই স্বাভাবিক।

এমতাবস্থায় আমরা কেবল দর্শক বা শ্রোতা
শ্রোতা বা দর্শক কেবল আমরা এমতাবস্থায় !

*********************









*
বাই সাইকেল
কবি চন্দন মিত্র
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫.১০.২০২৩।

আমি তো বাইসাইকেলের মতো
টিং টং ঘণ্টি বাজিয়ে
গ্রামের পথে গড়িয়ে যাই

আমার হেডলাইট নেই
লুকিংগ্লাস নেই
পেট্রোল খাই না

শহরতলির ছোকরাগুলো পর্যন্ত
আমার হুলিয়া দেখে হাসে ...

*********************









*
সরলতা ক্রমশ গায়েব হইতেছে
কবি চন্দন মিত্র
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫.১০.২০২৩।

সরলতা ক্রমশ গায়েব হইতেছে।
আর আমি হুঁকা হাতে হিজলতলার মাচায় বসিয়া
জলের শোভা দেখিতেছি, হিজল ফুলের পতন দেখিতেছি।
দেখিতেছি বাতাস এখনও সুঘ্রাণ বহিয়া আনিতেছে ...

বহুদিন হইল বন্ধুরা হুঁকা টানিয়া কাশিতে কাশিতে বিদায় লইয়াছে।
শুনিতেছি তাহারা এখন নিয়মিত হুক্কাবারে যায়।
আমি হুক্কাবার কী তাহা জানি না, জানিতে চাহিও না।

বউ কলিকায় ফুঁ দিতে দিতে আসিল।
পাশে বসিয়া চুমু খাইয়া বলিল —

তুমি বৃথাই স্মৃতিতাড়িত হইতেছ, আর কেহই আসিবে না।
যে কাল আমরা যাপন করিতেছি তাহা পৃথিবীতে অতীত হইয়াছে।
তুমি আমাকে ভালোবাসো, আমিও তোমাকে ভালোবাসি।
আমরা ভালোবাসায় কোনো বিকল্প রাখি নাই।
অথচ পৃথিবীতে এখন পরকীয়া পরব শুরু হইয়াছে।
সুতরাং আমরা ক্রমশ নিঃসঙ্গ হইব, ক্রমশ অবজ্ঞাত হইব এবং শান্তি পাইব।
আমরা কখনও প্রশংসিত হইব না।
আমরা কখনও প্রশংসিত হইতেও চাহি নাই ...

*********************









*
মোক্ষণ
কবি চন্দন মিত্র
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫.১০.২০২৩।

তুমি ডাক দিলে মহামতি
আমি মন্ত্র বেচতে গেলাম
তোমার সাক্ষাৎ সরস্বতী
দিল আমাকেই ঠুকে সেলাম।

ফিরি গায়ে মেখে ধুমজ্বর
ঘোরে আছড়াই একা ভুঁয়ে
প্রিয় বন্ধুরা বলে, মর
বোকা ওকে একবার ছুঁয়ে।

আমি চরৈবেতির পাঠে
আছি এখনও আন্তরিক
যারা মজে আছে চৌকাঠে
তারা একাজে খুব সঠিক।

বেচি মন্ত্র ও উপবীত
তবু নির্বেদে আছে মন
আমি নাস্তিক পুরোহিত
খাঁটি শূদ্র ও নির্ধন ...

*********************









*
শুশ্রূষা
কবি চন্দন মিত্র
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫.১০.২০২৩।

কখনো যাইনি যে গ্রামে
সে গ্রাম আমাকে ঘর দিল
সে ঘরের আপনজনেরা
বহুদিন পর হয়ে ছিল।
সে ঘরের একজন প্রাণ
হঠাৎ আপনপর ভুলে
আমাকে যখন দিল টান
ছাই দিই আমি তিনকুলে।
দুইটি গ্রামেই আছে ঘর
যখন যে ডাক দেয় যাই
আমরাও দৃঢ়-তৎপর
দুঘরের শুশ্রূষা চাই।

*********************









*
আমাদের ভাইবোন
কবি চন্দন মিত্র
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫.১০.২০২৩।

আমাদের বোনগুলি
বনের গভীরে বাস করে
বোনেদের মনগুলি
মালা ভেবে মায়াপাশ পরে।

আমাদের ভাইগুলি
খর খুব কোমরে কৃপাণ
কেউ ধরে রং-তুলি
কেউ কাড়ে অনাহত প্রাণ।

বোনেদের সাইকেল
সহজ পাঠের মতো রং
বনের গভীরে বেল
বেজে ওঠে ক্রিং টিং টং

ভিতরে সবুজ বয়ে
বোনেদের বনপথে চলা
মায়াপাশ ফাঁস হয়ে
চেপে ধরে বোনেদের গলা।

*********************









*
আবহমান
কবি চন্দন মিত্র
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫.১০.২০২৩।

আমরা দুলব পরম্পরার ডালে,
সাপ ও শেয়াল চুম্বন দেবে গালে।
আমরা আঁকব কুয়াশা-অন্ধ বন,
আবহে থাকবে ধামাধরা কীর্তন।
আমরা মঞ্চে নাচব নেশার ঝোঁকে,
হাততালি দেবে সুদৃশ্য সব জোঁকে।

আমরা এহেন বলিয়ে-কইয়ে জুটে,
চাতুরি খেলব সিংহের পিঠে উঠে।
সিংহ মরলে আবার আনব খুঁজে,
কেশর সাজাব গোলাপ পুষ্প গুঁজে।
সিংহ চাইবে প্রতিদিন একজন—
আমরা খুঁজব কার কার ভালো মন...

*********************