কবি জয়দেব মণ্ডলের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি জয়দেব মণ্ডলের পরিচিতির পাতায় . . .
অধর্মের রাজসভা
কবি জয়দেব মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৬.৬.২০২৫।

কুরুসভা মাঝে দ্রৌপদী যখন লাঞ্ছিতা,
গান্ধারীর চোখে তখনো কাপড় ছিল বাঁধা৷
অধর্মের খেলায় ছিলেন তিনি নীরব-
কুপুত্রের কুকর্মে অন্ধস্নেহ ছিল সরব৷

শাসন নয়, আশীর্বাদ দিলেন বারবার,
অধর্মের বিজয়ে নির্লজ্জ সাক্ষী তার।
শতপুত্র বাঁধা অন্ধস্নেহের বাঁধনে-
কলুষিত রাজসভা হাসে নারীর ক্রন্দনে৷

ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর—নীরব সব মহান,
ধর্মাসনে বসে দেখে নারীর অপমান।
রাজদণ্ড নত হয় দুর্বৃত্তের চরণে,
সত্যসূর্য উদিত হয় কুরুক্ষেত্রের রণে৷

“স্বয়ং কৃষ্ণ” ছুটে আসেন, করতে অধর্মের অবসান
রক্তময় যুদ্ধ নয়, ছিল তাঁর উদ্দেশ্য মহান৷
যেখানে ন্যায়হীনতা, সেখানে ধ্বংস লেখা,
কৌরবের পতনে পেলাম ন্যায়ের দেখা।

*********************









*
অপারেশন সিঁদুর
কবি জয়দেব মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৬.৬.২০২৫।

সিঁথিতে ছিল সিঁদুর,
ছিল শাঁখা, টিপ—আলো ঝলমলে দিন,
সুখের খোঁজে বেরিয়েছিল তারা
পরিবারে গাঁথা, জীবনের খুশিতে লীন।

কিন্তু হায়!
প্রকাশ্য দিবালোকে গর্জে উঠল রাইফেল—
এক মুহূর্তেই বদলে গেল জীবনের ছন্দ৷
কারও কোলে, কারও চোখের সামনে
ঝাঁঝরা হলো স্বামী, ভাই বা প্রিয় পিতা,
প্রিয়জন রইল নিথর, নিঃশেষ হলো কথা।

রক্তে ভিজে গেল যাত্রাপথ,
দিগন্ত জুড়ে ছড়াল মৃত্যুর আর্তনাদ।
সিঁথির সিঁদুর মুছে দিল
ধর্মের নামে উন্মত্ত একদল পৈশাচিক উন্মাদ।

মর্মান্তিক ঘটনায় শোকস্তব্ধ বিশ্ব—
অনেকেই কাঁদলো হৃদয়ভাঙা কণ্ঠে,
পথে নামলো জনগণ প্রতিবাদে।
কেউ লিখলো শোক, কেউ তুললো প্রশ্ন—
আর কিছু চোখ প্রতিজ্ঞায় জ্বলে উঠলো নিঃশব্দে।

অপারেশন সিঁদুর—
ছিল না কোনো যুদ্ধের উন্মাদনা,
এ ছিল স্বামীহারা নারীদের নীরব শপথ,
একটি দেশের হৃদয়ে জমে থাকা জ্বালা,
এক জাতির মনে লুকিয়ে থাকা দাবানল।
যাদের সিঁদুর মুছে দিয়েছিল
পৈশাচিক হিংসার নির্লজ্জ থাবা-
তাদের প্রতিটি অশ্রুবিন্দু হয়ে উঠেছিল
বারুদের আগুন, প্রতিজ্ঞা, ন্যায়ের ভাষা।

এ ছিল প্রতিশোধ—
ঘৃণার নয়, ন্যায়ের দাবিতে জ্বলে ওঠা আগুন,
যাতে আর কোনো নারীর সিঁদুর
স্বামীর রক্তস্রোতে ধুয়ে না যায়,
যাতে কেউ—পরিচয়ের অপরাধে
মৃত্যুর টিকিট না পায়।

*********************









*
নিস্তেজ কলম
কবি জয়দেব মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৬.৬.২০২৫।

কবির কলমে আর আগুন নেই,
শব্দ আসে, নিস্তেজ স্বরে৷
কাগজ পায় না প্রতিবাদের আঁচ,
শিরোনামে কবিতারা নিঃশব্দে মরে।

যাঁরা একদিন জাগাতেন বিবেক,
আজ তাঁরা মগ্ন সুবিধার আঙিনায়।
আলোচনার টেবিলে দাম ওঠে চেতনার,
তাদের বিবেক আজ নিলামে বিকায়।

সাহস এখন স্পনসর চায়,
নিরপেক্ষতা পোশাক হয়ে ঝুলে করিডোরে।
নিরবতাই যেন এখন নবতর কাব্যধারা—
এই ধারাতেই এখন পকেট ভরে৷

তবুও কোথাও, কেউ কি লিখে যাবে না—
একটি সত্য, একটি প্রশ্ন, ন্যায় বিচারের দাবি?
নাকি কবিতাও একদিন নেবে অবসরের ছুটি—
বিক্রি হবে শব্দমালা, কবিতার ঘরে পড়বে চাবি?

*********************









*
বর্মের আড়ালে মুখ
কবি জয়দেব মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৬.৬.২০২৫।

শব্দহীন এক মিছিল চলে, পায়ে পায়ে ধুলো,
জীবন মুঠোয় আজ, ঘাম-ভেজা প্রাণ গুলো।
নম্র কণ্ঠে জ্বলছে প্রশ্ন, উঠেছে নাভিশ্বাস—
যারা ছিল সম্ভাবনাময়, তারা আজ ইতিহাস।

দগদগে বুকে আজ উড়ছে স্বপ্নের ছাই,
শুধু ক্ষুধার পেটে অন্ন দিতে রোজগার চাই।
নীরব মিছিলে বাজে অবরুদ্ধ কালের সুর,
বধির বিবেকে, অন্ধ চোখে আলো বহু দূর।

বুকে বুট চাপা, লাঠিতে লেখা নীতির নাম,
চায় না দিতে তাদের অশ্রু আর ঘামের দাম।
বর্মের আড়ালে মুখ, শাসকের চোখে নেই জল—
আলোকে তার ভয়, পুঁতেছে আঁধারের বিষফল।

*********************









*
ইমোজির আবেগ
কবি জয়দেব মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৬.৬.২০২৫।

আজ অনুভূতির প্রকাশ নেই মুখের রেখায়,
হাসি-কান্নার সব ভার ইমোজিই পায়।
চোখের জলে গলে না আজ ব্যথিত প্রাণ
মোবাইলের আলোয় সবার কাটছে দিনমান।

নীল অশ্রু ইমোজিতে কষ্ট লুকিয়ে রাখে,
লাল হৃদয়ে প্রেম শুধু উষ্ণতা মনে মাখে।
ভালোবাসার খামে নেই হাতের লেখা,
ইমোজির হাসিতে ঠৌটের শুক্ন রেখা।

আলাপ গুলো হারিয়ে যায় চ্যাটের মাঝে,
শব্দেরা বন্দি আজ রঙিন ইমোজির সাজে
বুকের গভীরে জমে থাকা যত না বলা ব্যথা,
একটি ইমোজিতেই হারায় তার ব্যাকুলতা৷

কোথাও যেন নিঃশব্দে হারিয়েছে স্পর্শের আবেদন,
শব্দহীন কথায় নেই হৃদয়ের কম্পন৷
মনের ভাষা বুঝবে কে? যান্ত্রিক এই শহর!
ইমোজি-হাসির নিচে লুকানো ব্যথিত অন্তর৷

*********************









*
অভিধানে অনুভূতি
কবি জয়দেব মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৬.৬.২০২৫।

অনুভূতির বাজারে আমি খালি হাতে,
চলে দেখি বেচাকেনা নিদারুণ সুখে,
এখানে মুদ্রায় মাপা হয় হৃদয়ের দাম,
প্রেমও বেসাতি আজ পণ্যের সাথে।

সম্পর্কের মেলায় স্বার্থের দর্পণে,
প্রিয়জন বাঁধা প্রয়োজনের ফ্রেমে,
যতটুকু প্রয়োজন, ততক্ষণ পাশে,
তারপর হারিয়ে যায় সুবিধার বাঁকে।

বিশ্বাসের গোধূলিতে ধূসর আকাশ,
আশার প্রদীপ নিভে যায় নিঃশব্দে৷
কান্না জমে থাকে অভিধানের পাতায়,
অনুভূতিগুলো সব মৃত পড়ে থাকে।

সংসারের খেলাঘরে সুখের সন্ধানে
রঙিন স্বপ্ন আঁকে ধূসর ক্যানভাসে,
অতৃপ্তি লেগে থাকে তুলির ছোঁয়ায়,
অপূর্ণতার ছায়া নামে সময়ের পাশে।

স্বপ্নের মিছিল শেষে, সন্ধ্যার বিষাদে,
জীবন খাতায় শুধু শূন্য পড়ে থাকে,
কখনো হয় না রঙিন নিরাশার রঙে,
খেলা শেষে বিষণ্ণতা পুড়ে চিতার আগুনে।

*********************









*
মিথ্যার ইমারত
কবি জয়দেব মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৬.৬.২০২৫।

উঠেছে ঝড়—নয় সে প্রকৃতির রোষ,
এই ঝড় বেকার হৃদয়ে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ।
চাকরি-হারা নিঃস্ব মুখ—লক্ষ তরুণ প্রাণ,
ভবিষ্যৎ আজ ঘনকালো, কারো লালসার দান।

ঘরে ঘরে ওঠে বুকফাটা হাহাকার,
মায়ের মুখ নিঃশব্দ, শিশুর চোখে প্রশ্ন-ভার।
ভ্রষ্টাচার, পাহাড়সম দুর্নীতির ফল-
বেঁচে থাকার ইচ্ছেটুকুও হয় নিঃশেষ, নিস্ফল।

শেষ সম্বল বিকিয়ে কিনেছিল তারা স্বপ্ন,
ডিগ্রি হাতে ঘুরে আজ ক্লান্ত, নিঃস্ব, শূন্য।
লালসার যূপকাষ্ঠে বলি আজ সমস্ত বিকাশ,
শোষণের চক্রব্যুহে হয় সম্ভাবনার বিনাশ।

আশ্বাসনের আকাশে উড়ে মিথ্যার ফানুস,
ক্ষমতার অত্যাচারে নীরব অসহায় মানুষ।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণ উঠবে যখন জেগে,
জেনো, মিথ্যার ইমারত পড়বে সেদিন ভেঙে।

দিন বদলের এসেছে সময় এবার,
নবীন হৃদয় চাইছে অন্যায়ের প্রতিকার।
তাদের রক্তে ফুটছে প্রতিবাদের আগুন,
হতাশার হবে বিদায়—আসবে আবার ফাগুন।

*********************









*
সাধ্য সাধের মাঝে
কবি জয়দেব মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৬.৬.২০২৫।

মধ্যবিত্তের জীবন দোলে সাধ্য সাধের মাঝে
চাওয়া পাওয়ার করছে হিসাব শুধু সকাল সাঁঝে৷
ভাবছে মনে, অনেক কিছু পাওয়ার আছে বাকি
কেমন করে উপরে যাই মধ্যিখানে থাকি৷

উচ্চবিত্তের বিশাল বৈভব পারেনি সে ছুঁতে
নিম্নবিত্ত ভাবতেও তার মন করে খুঁতখুঁতে।
দুই তরীতে চরণ রেখে সাগরজলে ভাসে,
উঠবে দুলে নৌকা কবে জীবন কাটে ত্রাসে৷

ঘটবে কোথায় কোন্ অঘটন থাকে অনিশ্চয়ে
হয়তো কখন ডুববে তরী সদাই মরে ভয়ে৷
নেইকো সাহস করতে লড়াই তলোয়ার নেই হাতে
সইতে পারে অত্যাচার-সব হয় না ক্ষতি তাতে।

ভয়ে লাজে জীবন কাটে ভাগ্যের ঘাড়ে দোষ
অপ্রাপ্তিতে জ্বলছে হৃদয় নেইকো মনে জোশ।
মুখের উপরে হাসির মুখোশ ঢেকে রাখে কষ্ট
ভালো থাকার অভিনয়ে জীবনটাই নষ্ট।

*********************









*
আঁচল ও স্বাধীনতা
কবি জয়দেব মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৬.৬.২০২৫।

চলছে ভীষণ তর্কাতর্কি, দ্বন্দ্ব শাড়ির আঁচলে,
বিভাজিকা থাকবে খোলা, নাকি অন্তরালে?
যুগে যুগে প্রশ্ন জাগে, কেমন হবে আবরণ,
লজ্জাহীন, না সংযমী? কী বলবে সমাজমন?

আদিম যুগেও মানুষ ঢাকতো শরীর বাকলে
এখন তবে কিসের দ্বিধা ঢাকতে শরীর আঁচলে,
যুক্তি তর্কের নেইকো শেষ, পোষাকে নেই পরিত্রাণ
কেউ বলে স্বাধীন দেশ, কেউ চায় বাঁচাতে সম্মান।

আঁচল ধরে টানে সমাজ, বদলাতে চায় নিয়ম-কানুন,
যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বদলায় কি নারী-মন?
উন্মুক্ততা কি স্বাধীনতা, নাকি দিশাহীনতার পরিচয়
বিচারের এই টানাপোড়েনে নারীমনও রয়েছে সংশয়।

তুমি যদি আমার দিকে কামনার চোখে দেখো
তাহলে দৃষ্টিকে আনো ধুয়ে, মনকে করো জয়
তোমার চোখে নারী যখন শুধুই শরীর-
তখন আমার আঁচল তোমার অসভ্যতার পর্দা হয়।

আঁচল উড়ে, বাতাস বয়, সমাজ দেখে কুচোখে
কিন্তু সে তো উড়তে চায়, স্বাধীনতার আলোকে।
ঢাকা থাক, না থাক, সংশয় তবু রইবে চিরকাল
আঁচল নয়, চরিত্রের দ্বন্দ্ব মানুষের মনের জঞ্জাল।

*********************









*
রক্তাক্ত প্রজন্ম
কবি জয়দেব মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৬.৬.২০২৫।

ওরা বুটের তলায় থেঁতলে দেয় ভবিষ্যৎ,
নুনের প্রলেপ লাগায় বঞ্চিতের রক্তাক্ত ঘায়ে।
স্বপ্নভাঙা চোখে আজ মিছিল হাঁটে অন্ধকারে,
বিচারের খোঁজে দুর্নীতির দ্বারে ক্লান্ত পায়ে৷

শিক্ষার স্তম্ভে পড়েছে পুলিশের লাঠি
ধসে পড়ে একসময়ের গৌরবের ছাদ।
বুটে মাড়ানো মুখে ফুটে না আর হাসি,
লাথি খাওয়া পেটে মেলে না ভাতের স্বাদ।

কানে গুঁজে তুলো, চোখে লোভের কাপড়,
আন্দোলনের আগুনে ছিটায় ছলনার জল।
ব্যালটের দেশে গর্জে ওঠে বুলেটের শাসন,
ভুলের ফসল কাটে আজ জনতার দল।

সাদা আর নীলিমায় মোড়া জর্জর স্তম্ভ,
মিথ্যার উপর দাঁড়ানো ভঙ্গুর ইমারত
ভ্রষ্টাচার দুর্নীতিতে ঢাকা পড়েছে সত্য,
অন্ধকারে লুকানো সভ্যতার ক্ষত।

ধসে পড়ে একে একে বিশ্বাসের মিনার,
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ন্যায় নীতি হয় ছারখার।
তবু কি ফুটবে একদিন নতুন সকাল,
যেখানে আবার পাবো দেখা—মানবিকতার?

*********************