কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচিতির পাতায় . . .
আজকের উপেন
কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়
কবিতাটি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত “কৃত্তিবাস” পত্রিকার জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১০ এর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। মিলনসাগরে প্রকাশ ৭.৭.২০২৪।

দুই বিঘে জমির টানে দীর্ঘ পনেরো-ষোলো বছর পর উপেন ফিরে তো এসেছিল
তারপর সে কোথায় গেল?
যেদিন পাঁচিলের পাশের আমগাছের তলা থেকে ঝুঁটি বাঁধা উড়ে মালী
তাকে ধ'রে নিয়ে গেল পুকুরপাড়ে, বাবু যেখানে পারিষদ সাথে মাছ ধরছিলেন,
বাবু রেগে অপবাদ দিল, 'ব্যাটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়!'
উপেন মনে-মনে হেসে, চোখের জলে ভেসে, বাবুমশাইকে সাধুবাদ তো দিল,

তারপর উপেন কোথায় গেল?
ফিরতে লাগল মন্দির পেছনে ফেলে, হাটখোলা পেরিয়ে, নন্দীর গোলা ছাড়িয়ে,
রথতলা বামে রেখে, কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ফেলে,
চলতে লাগল...
তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে, পলাশডাঙার বন ছাড়িয়ে, আমবাগানের পথ মাড়িয়ে,
উপেন হাঁটছিল, হাঁটছিল...

এমন সময় কোনো এক পল্টুদা এসে বলল, 'কলকেতা যাবে?'
উপেন 'থ'!
পল্টুদা আবার বলল, 'যাবে? কোলকেতা ---
ময়দান --- অনেক লোক!
কত বন্ধু পাবে,
তোমার মতো তারাও
ভিটে নেই, মাটি নেই, ঘর নেই, বাড়ি নেই,
সবার জীবনের-ই ডিক্রি জারি করেছে কোনো না কোনো বাবুমশাই
অথবা তাদের দলের লোকেরা ।'
কিছু না বুঝে উপেন বলল, 'আমি হারিয়ে যাব যে!'
পল্টুদা অভয় দিল, 'হারাবে কেন --- আমি তো আছি---'

আজকাল আর উপেনরা হারায় না
পল্টুদাদের হাত ধ'রে ময়দানে যায়,
বক্তৃতা শোনে খিচুড়ি খায়, কিছু টাকাও পায়,
কিন্তু তারপর!

তারপর কিছুদিন পল্টুদাদের পেছন পেছন ঘুরতে ঘুরতে
নিজেই কোনোদিন উপেনদা হ'য়ে যায়।
গ'ড়ে তোলে এক সংগঠন
ধীরে ধীরে তা দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়
দল ভারী করতে বেরিয়ে পড়ে নতুন উপেনের খোঁজে
এখন কি আর চোখের জলে ভাসতে হয়?
যুগ পালটেছে, দিন বদলেছে, উপেনরা জেগে উঠেছে
উপেনদের এখন কত কাজ!!!
ময়দানে লোক জড়ো করতে হবে
কিংবা
অনাথ কচি-কাচা পাচার করতে হবে
অথবা
চারটে কিডনি লাগবে একমাসের মধ্যে
উপেনদের আজ অনেক কাজ !!!!!

*********************







*
ঝরা বকুলের কথা
কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়
কবিতাটি মিলনসাগরেই প্রথম প্রকাশিত হয় ৭.৭.২০২৪ তারিখে।

কোন কবিতা নয়, কেবল এক গণ্ডুষ কথা
একফালি পায়েচলা পথের মত
এঁকে বেঁকে ছড়িয়ে যাচ্ছে
মনের এ মাথা থেকে ও মাথা,
পাচ্ছে না কোন দিক্দর্শন্‌,
কারণ, নামী, অনামী, বেনামী
কোন বিশেষণই খাটে লা
এই কবির জ্ঞন্যে।
তাই মনের ভুলে এসে পড়া
এই এলোমেলো পথ চলায় বাজেনি নুপূর,
শোনা যায়নি কঙ্কণের কিন্ কিনি,
সেদিনের বীণায় ছিল না কোন সুর।
বিনা আভরণে চলতে চলতে আনমনে
ঝরে পড়া কিছু বুকুল কুড়িয়ে
গুঁজে দিয়েছিলাম শিথীল কবরীতে।

তবু নীল আকাশের বুকে ভেসে বেড়ানো
পেঁজা তুলোর মত মেঘের বুক চিড়ে
নেমে আসে অক্লান্ত এক সুরের ধারা
সপ্তক আর পঞ্চমের মিলনে
বেজে ওঠে কোন নাম না জানা মেঠো ভাব
সুরহীন বীণার তারে লাগে টঙ্কার।
পেছনে ফেলে আসা পথ হয় ঝাপসা
অবসাদের ভারে অলস মন
অশক্তির বিদ্রোহকে করে পরাজিত।
ভাষাহীন আবেশের তর্জনী তাকে করে প্রতিহত।

তারপর ---
পাহাড়ী নদীর মত টলটলে ভাবনাগুলো
ছুটে চলে কোন অজানা সাগরের টানে
যেতে যেতে বাঁক নেয় কত অচিন পথে
চলতে চলতে কখন যেন
খোঁপায় গোঁজা ঝোরো বকুলগুলো
মালা হয়ে ওঠে
পাড়াণীর কড়ি ছাড়াই যে পাটিনী তুলে নিল দাঁড়,
কাঁচা হাতে ধরেছিল হাল
ভরাডুবীর ভয়কে জয় ক'রে
এবার সে পার হবে
এই ভব পারাবার।

*********************







*
উড়ো পাখি
কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়
কবিতাটি মিলনসাগরেই প্রথম প্রকাশিত হয় ৭.৭.২০২৪ তারিখে।

নীরবতার স্রোতে ডুবে গেল কোলাহল
উজানের জল ঠেলে ভেসে এল
ঐ দূরের আকাশের সাথে ঘিরে
নিশ্চুপ হাহাকার
এইবার আমার অভিসার।

পৃথিবীর শিরা-উপশিরা থেকে
নাড়ি কেটে গেছিলাম উড়ে
সবুজ জলের গভীরে কার ভারী চোখ
তাকাইনি পিছুটানে।
নালার ধারে ছুঁড়ে ফেলা
মাটির ভাঁড়ের ব্যথা নিয়ে
দূর নক্ষত্রের দিকে গেছিলাম উড়ে,
শুধু শিশিরের কান্না
আর হিমের ভেজা সুর,
ফুলেশ্বরের গঙ্গা আর
ডায়মন্ডহারবারের সমুদ্র
কাঙারুর ছানার মত
বুকের সাথে জ্ঞাপটে
চলেছিল সাথে।

সকলের মত সহজ নিশ্চিন্ততা
ছিল না লেখা কপালে
সহজ শরীরের স্বাদ
দেয়নি কোন অলীক সুখ
সহজ প্রাণের আহ্লাদ
সহজে পারেনি ভোলাতে
পিঁপড়ের ডানার মত নিমেষের জন্যে
নিয়ে যায়নি ভাসিয়ে।

তবুও তো বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে
এসেছিল কাছে
মানুষের কথা ব'লে
মানুষের জন্য দেবে ব'লে।
সেদিন তো বাসনা ছিল,
ছিল সাধ, স্বপ্নও ছিল।
তারই মাঝে কিছু
অবহেলা, ঘৃণা আর আক্রোশ
ভুতের মত তাড়া কবে ফিরত,
কিন্তু,
আন্তরিক উপেক্ষার ভাষা ছিল না।

তারপর মাঝপথে ---
কখন ঝরে গেল তারা সব -
উদর-তৃপ্ত ঈগলের মত
ডানা মেলে বহুদূরে কোন অচেনা পথে
চলে গেল উড়ে
দুটো শৈশবকে ফেলে রেখে
গভীর শূন্যের বুকে।

সেইদিন দেবতা আর মানুষকে ছেড়ে
চলে আসি একান্ত প্রাণের কাছে,
বাস্তবের রক্তদৃষ্টি অবজ্ঞা করে
ভুলে যাই অন্তরের আন্তরিক অতৃপ্তিকে
নিজেকে স্বপ্নের হাতে ছেড়ে দিয়ে
চোখের পাতায় জেগে থাকে
শুধু দুটো নাড়ীর স্পন্দন।

আজ, এতদিন পরে
সাত সাগর আর তের নদীর ওপারে
আমারি উডিয়ে দেওয়া পাখিদুটো
চলে গেল উড়ে ---
হয়ত আমারি হারিয়ে ফেলা
স্বপ্নের দেশে ---
হয়ত খনেকের তরে বাঁধবে বাসা
কোন বিজন জলার ধারে
তারপর আবার ডানা মেলবে
চোখের পাতায় নতুন স্বপ্ন মেখে
মানুষকে ভালবেসে
মানুষের জন্ম দেবে ব'লে।

*********************