কবি ঋত্বিক ঠাকুর এর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি ঋত্বিক ঠাকুর এর পরিচিতির পাতায় . . .
বাবুই
কবি ঋত্বিক ঠাকুর
মিলনসাগরে প্রকাশ - ০৭.০৯.২০২৫।

উড়ছে। উড়ে যাচ্ছে। দু'ডানায় বাঁধা জল। জলের সম্বল
শুধু ভুবনের খিদে। আর‌ও আর‌ও বিশ্ব ও বিস্ময়
চোখে এ উড়াল নিরুদ্দেশ ধেয়ে যাচ্ছে। কার কাছে, কেন, জানে না তা পথ ও পথিক।
দেখছেই না নীচে। বারোয়ারি জ্বরে কে তুলল পতাকা। কারা বলছে, কাঁটাতারে এখন‌ও মুমূর্ষু ঘুড়ি বিঁধে। থাক পড়ে, থাক। পূবগাঁয়ে পীরের কবর আর পশ্চিমে পাথর ভগবান। কার কব্জিতে জোরালো মোক্ষ? এসব কচালি থেকে বহুদূরে সে মেলেছে চরৈবেতি।
মনে পড়ছে, একবার ভাগ্যবন্তপুরে কাঁদরের ঘাটে ডুবতে দেখেছিলাম পাখিকে। গলায় মেঘের দীর্ঘ আলিঙ্গন। মেঘ নাকি পাখি, পাখি নাকি মেঘ, আলাদা আলাদা কোন‌ও পরিচয়ে বাঁচে মরে, বারে বারে খোঁজে জন্মঘোর। ভেবেছি বিস্তর। শেষে মা এসে দিয়েছে টান ভরা উজানের দিকে। সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কুমোরপাড়ার মাটিব‌উ। আকাশে অবাক ভাসছে নীলকণ্ঠ চুমু। কাশফুলে সাজানো পরানডাঙা। গান গাইছে তাধিন সকাল।
অমিমাংসায় ধাঁধায় বুড়ো হচ্ছে কুটুম নিয়তি। উত্তরের অপেক্ষা না করে উড়ে যাচ্ছে, উড়েই চলেছে ওই আনন্দ বাবুই। দেখছি, স্পষ্ট দেখছি।

*********************









*
আতিথ‌্য
কবি ঋত্বিক ঠাকুর
মিলনসাগরে প্রকাশ - ০৭.০৯.২০২৫।

এভাবে আসবে দাওনি পূর্বাভাস
সামান্য আমি সঙ্গী সর্বনাশ
কী দিয়ে তোমাকে জানাব সম্ভাষণ
এ অন্ধকার আমার আপনজন
আলো থেকে দূরে ঘোর নিশাচর আমি
চাঁদের সঙ্গে দুধগঙ্গায় নামি
সূর্যর কাছে করি না তো দরবার
প্রতিষ্ঠা যশ মহাজন কারবার
প্যাঁচা আর আমি দুজন কোটরবাসী
চুপ জেগে থাকি রাত্রির প্রত্যাশী
গলাডুব নেশা তারা নিঙড়িয়ে খাই
শুকশালাতেই মাতাল নিদ্রা যাই
কেউ আসে নাকি এমন লোকের ঘরে
মদ সম্বল আতিথ্য অন্তরে

*********************









*
ডুব বিষয়ক
কবি ঋত্বিক ঠাকুর
মিলনসাগরে প্রকাশ - ০৭.০৯.২০২৫।

নৌকোই ডুবল না
এ কেমন ভাসান চরিত
হাওয়া মাঝি হাসছে মিটিমিটি
বলছে, চ, বাকল ছেড়ে বাঁচি
#
সে বড়ো কঠিন কম্ম
খোলনলচে মায়া দড়া বাঁধা
পরজীবী পরবশ আয়ু
ছেড়েছুড়ে ডোবা যায় নাকি
#
মাঝি নির্বিকার
জলে আঁকা মেঘের প্রস্তাব
দূরবীনে বৃষ্টিনামা চোখ
পা টানছে শ্যাওলা জন্মখুঁটো
#
বৃথা শোক আত্মগাথা লেখে
নৌকোডুবি অদূর নাগালে
ও কবি, কাঙাল নদীচরা
কবে ডুববি পোশাকবর্জিত

*********************









*
ঠাঁই
কবি ঋত্বিক ঠাকুর
মিলনসাগরে প্রকাশ - ০৭.০৯.২০২৫।

এবং নদীটি আসমানি স্রোত মেলে
বলল, ভয় কী, ডুব দাও অবহেলে
কিছু দ্বিধা কিছু দ্বন্দ্বের পিছুটান
সম্বল শুধু ভিতু শ্রাবণের গান
নৌকোটি ছিল টলোমলো অস্থির
যাব কি যাব না মনচোরা মুসাফির
পায়ে বাঁধা গৎ চোখ জুড়ে ঢেউ চাওয়া
নদীর বাড়িতে হলো ক‌ই, বলো, যাওয়া
মাঝেমাঝে তবু বৃষ্টিরা আসে কাছে
ভিজে যাই তা-ও নদীর নিয়তি নাচে
কে দেবে নিদান কোন চিকিৎসা পাই
তার চেয়ে হোক নদীর নাভিতে ঠাঁই

*********************









*
অনিবার্য
কবি ঋত্বিক ঠাকুর
মিলনসাগরে প্রকাশ - ০৭.০৯.২০২৫।

সব অন্ধকার পোড়াইনি
তুলে রেখেছি সযত্নে ভাঁজ করে
পুরোনো অসুখ
পুষে রাখতে বেশ লাগে
নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে সন্তর্পণে
চুমু খাই আদরে জড়িয়ে
এক একটা কাতর অক্ষর
কম বয়সের লেখা কাঁচা কবিতা
আগুনদানা বসন্ত শুশ্রূষা
খাতা জুড়ে ক্ষতদাগ
আঁচড়ে আঁচড়ে জেগে থাকা লাইন লাইন
ভাসমান নষ্টবীর্য রাত্রির প্রার্থনা
কিছু কিছু অন্ধকার নেমে আসে
খুব খুব কাছে নিবিড় পরম
শ্বাসবায়ুসখা
বাজায় আয়ুর ধ্বনি
বলে, আয়, বাইরে গোল্লামাঠে
দিগন্ত'র হাতে হাত রেখে আমিও দাঁড়াই গিয়ে
মহাশূন্যটানা ঝুল বারান্দায়
আত্মঘাতী আলোর যমজ
অনিবার্য আঁধার অন্ত্যেষ্টি আঁকা
পরমায়ু মাপি

*********************









*
লাশ-লীলা
কবি ঋত্বিক ঠাকুর
মিলনসাগরে প্রকাশ - ০৭.০৯.২০২৫।

এ কেমন মাটি এ কোন ভূমিতে বাস
লাশে লাশে লেখা ধর্মের সন্ত্রাস
জন্মদিনের কান্নায় কবে, বলো
ধর্মের ভাষা বেঁধে দেয় বল্কল‌ও
কোরান নয়ত ভাগবত বুলি ঠোঁটে
কোন মা-র শিশু রোজ ঘুম থেকে ওঠে
যাও গো, জননী, যাও, করো দরবার
চিহ্নিত হোক যত জন্মের দ্বার
ধর্ম টিকিটে, ঈশ্বর আল্লায়
রসেবশে থাক বিভেদের পাল্লায়
যেমন চলছে চলুক হত্যালীলা
কাশ্মীর আর বোম্বাই বোমডিলা
দেখুক মৃত্যু, লাশ নিয়ে উল্লাস
বেঁচে থাক, বাপু, বাঁচুক ধর্মদাস

*********************









*
জলার্তি
কবি ঋত্বিক ঠাকুর
মিলনসাগরে প্রকাশ - ০৭.০৯.২০২৫।

নদী বিশ্রামে কাটালে জল বড় একা
সে কথা থাকে না লেখা সামান্য আঁচড়ে
জলে ফেরো, ও নদী, আবার হোক দেখা
স্রোতে এসো, একসঙ্গে ডুবি জন্মান্তরে
বলেছিলে দেখাবে ভেতর টানে বাঁধা
এক গল্প, বোবা জ্বরে নুড়ির সংসার
সাজিয়ে রেখেছে কথা অশ্রুঠাটে সাধা
সে গানে আমাকে দাও সম্মতি তোমার
জুড়ে দেব এক পশলা একলা বিসর্জন
না হয় তা তুচ্ছ তবু জলের আরতি
নাও, নাও, ফিরিও না এ চুপ তর্পণ
এ জীবন মানে ভাসা, নেই অন্য গতি
তবে কোন অভিমানে রয়েছ এ ঘুমে
চলো যাই, জলসা হ‌ই জলদোঁহা ধুমে

*********************









*
একটা চিঠি : খসড়া
কবি ঋত্বিক ঠাকুর
মিলনসাগরে প্রকাশ - ০৭.০৯.২০২৫।

(১)
 এখন ঘুমোচ্ছ হয়ত। তুলোয় মোড়ানো কোলপুতুল। আদর খাচ্ছে। তোমাদের দেশ বড্ড শীতকাতুরে। ফায়ারপ্লেসে শখের সংসার। যাক। ছাড়ো। নতুন বছরে কী কী করলে? পুরোনো সঙ্গতে নাকি আবার নতুন করে..? জানিও সম্ভব হলে। আচ্ছা,বলো, কোন রঙে দোল খেলবে এবছর? খেলবে না? এ চিঠি লিখলাম রুদ্রপলাশের খুশবু দিয়ে। দেখো, চিনতে পারো কিনা। তোমার ফ্ল্যাটের কাছাকাছি আবির বাজার আছে? রাসমাঠ? হলুদপুকুর? স্নানটান করে খোলা চুলে দল বেঁধে বাড়ি ফেরে থোড়াইকেয়ার বেনেব‌উ? দেখেছ খেয়াল করে?
(২)
 বেশ দেরি করলে লিখতে। এত রকমারি কাটাকুটি। লিখেছ। ভেবেছ বেশি। মেনে নিচ্ছি। বাংলা এখন তোমার ভিনদেশি। তা'বলে আকাশ? এমনকি নীল খাম‌ও পাওয়া যায় না ওখানে! ল্যাপটপে আঁকাই যায় না বুঝি বাঁধিয়ে রাখার মতো আদিগন্ত লম্বা চুমু-রোদ?
আপাতত বারান্দায় পায়চারি করছে আমার গেরস্ত অন্ধকার। ছায়া ফিকে হয়ে আসছে। সামনে ঠাঠা সন্ধে। এই এল ব'লে চাঁদ। মাদুরপাটিতে জড়ো হচ্ছে একটা দু'টো আড্ডাবাজ তারা। আজ ভাবছি ঘুমোব না। তোমাকে না হয় ফের লিখব নিশুতি উপুড় করে এ যাবৎ সব খোয়ানোর শুদ্ধ জলনামা। কি, পড়বে তো?

*********************









*
ফিরে দেখা : রামনবমী
কবি ঋত্বিক ঠাকুর
মিলনসাগরে প্রকাশ - ০৭.০৯.২০২৫।

দু'পয়সায় শালপাতার বাটিতে বসিরচাচার গুগলি চচ্চড়ির আশ্চর্য সুবাস এখন‌ও টাটকা। ফিরে যাই। রোজ ফিরে ফিরে যাই। আমার মায়ের দেশে রামসীতার ময়দানে। সে এক আজব গাঁ। মা আমাকে নবমী মেলা দেখতে ছেড়ে দিত তালপাতার ভেঁপুতে অনর্গল ফুঁয়ে। না। মিছিল দেখিনি কখন‌ও। জানতাম‌ই না রাম কোন দলে। কাদের ঠাকুর বীর হনুমান। শুধু অপেক্ষায় কেটে যেত কবে আসবে রামযাত্রার পুতুলদাদু। আবার দেখাবে লঙ্কাকাণ্ড। অশোকবাগান পুড়ে ছারখার। সীতা বসে আছে চুপটি করে আগুনের কড়া পাহারায়। চোখ ছানাবড়া হয়ে যেত দেখতে দেখতে। এই তো আমার দেখা মেলা। আনন্দহাটের শিশু মজা।
শুনেছি এখন রামনবমীর মেলা জুড়ে পুলিশ পিকেট বসে। খোলা মাঠে কেউ আর বসে না পসরা নিয়ে। এখন ম্যারাপ স্টল। বিকিকিনি চলে টাকায়। আধুলি পয়সা কবে চাপা পড়ে গেছে ইতিহাসে। মাটির কুঁজোতে ঠান্ডা জল আনে না কোন‌ও পুন্যিঠাকমা। এখন পানীয় মানে বোতলে বোতলে পোরা তেষ্টার সতর্ক ঢোকঢোক ঢুকঢুক। শুনতে পাচ্ছি, এবার আমার মা-র গাঁয়ে দূর দূরান্ত পেরিয়ে আসবে রামলালার মিছিল। লাখ লাখ ধ্বজা উড়বে। যেটুকু বা ধুলো বেঁচে আছে সব ঢাকা পড়ে যাবে 'আমি'-ব্র্যান্ড জুতোর তলায়।
বেশ ক'বছর হলো মা নেই। না হলে হয়ত..

*********************









*
তুমিই আশিস
কবি ঋত্বিক ঠাকুর
মিলনসাগরে প্রকাশ - ০৭.০৯.২০২৫।

আমাদের ছোট নদী নেই, নেই সেই এঁকেবেঁকে চলা
আছে শুধু উঁচু ইমারত, আকাশ ছুঁয়েছে বহুতলা
ক‌ই সে গরুর গাড়ি, কোথায় রয়েছে তেপান্তর
বাঁধানো সড়ক জুড়ে অবিরাম গাড়ির বহর
সকলেই ছুটছে শুধু, না ছুটলে নির্ঘাত ফেল
এ শহর স্বপ্নে নয়, খোলা চোখে মাদারির খেল
তার মধ্যে কার আছে বাউন্ডুলে অঢেল সময়
উল্টেপাল্টে নেড়েচেড়ে খুঁজতে যাবে রবিপরিচয়
জোড়াসাঁকো বোলপুর উইক‌এন্ড প্যাকেজের ট্যুর
বাঙালির হেরিটেজ সবেধন কবিগুরু রবীন্দ্র ঠাকুর
পঁচিশে বোশেখ মানে ছুটি ছুটি রবীন্দ্রসদনে গানমেলা
জনান্তিকে অন্যদিনে বুনোফুল‌ও জোটে না একবেলা
কোন পুজো নেবে, বলো, গঙ্গাজলে ভরা পুণ্যবিষ
বরং হৃদয়ে থাকো, সুখে দুঃখে অহরহ তুমিই আশিস

*********************