কবি শাশ্বতী নন্দর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি শাশ্বতী নন্দর পরিচিতির পাতায় . . .
লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ
কবি শাশ্বতী নন্দ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৭.১০.২০২৩।

লক্ষ্মীকে আবাহন জানাতে
কোনদিনই আমাকে আঁকতে হয়নি
তাঁর পায়ের ছাপ।
তিনি নিজেই তো রোজ রোজ
আসেন আমাদের বাড়িতে
তাঁর ভিজে পায়ের
ছোট্ট ছোট্ট জলছাপ এঁকে দিতে দিতে।

তারপর– ডালভাত লেগে থাকা
নোংরা আঁশটে বাসনগুলো ঘষে ধুয়ে
ঝকঝকে পরিপাটি করে
রেখে দেন উনুনের একপাশে,
ফ্যান দুধ আটা লাঞ্ছিত রান্নাঘরটাকে
ফিরিয়ে দেন তার আগেকার কুমারী রূপ,
ন্যাতানো বাতিল জামাকাপড়গুলো
আবার টানটান সুরভিত হয়ে ফিরে যায়
যে যার জায়গায়– তাঁর হাতের ছোঁওয়ায়,
মরুঝড় বিধ্বস্ত বাড়িটার
যাবতীয় আবর্জনা ঝেঁটিয়ে বিদায় করে
ভিজে কাপড়ে ধরে ফেলেন
বাকি আর সব নাছোড়বান্দা চঞ্চল ধুলোবালিকে।

    কারা যেন কেড়ে নিয়েছে
    লক্ষ্মীর ঝাঁপিটি,
    ধানের ছড়াটিও পথ বেভুল।
    তাই তিনি বাঁধা রেখেছেন
    আমাদের ঘরে–
    রোজরোজ তাঁর পায়ের ছাপ।

*********************









*
বক্ষলগ্ন সে নির্জন
কবি শাশ্বতী নন্দ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৭.১০.২০২৩।

পাওয়া গেল না বাস ট্রাম
নিদেন একটা অটোও,
চড়তে হয়েছে ভাঙা হুড
জং ধরা পাগল এক রিক্সায়।

পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে
রোমাঞ্চিত গবাক্ষ
দুরন্তগতি সব যান,
এদিকে দুবার ঘোরালে
একবার চেন পড়ে
এ ত্রিচক্রযানের
এমনই কপাল আমার।
শোনে না বারণ,
রোজকার চেনা বড়োরাস্তাটা ছেড়ে
পাড়ি দিয়েছে দিচ্ছে
ছোটো আরও ছোটো
ভুলভুলাইয়া যত অলিগলি পথে।

ভাদ্রের পুকুর
আম সজনে বকুল
ডাহুক চড়াই বুলবুল,
ছোটো ছোটো ছাদ–
কুঞ্জ রাধা ধাম কৈলাশ,
ঝিমধরা একমাথা শারদ আকাশ–
সময়ের বুদ্‌বুদে থমকে থাকা
টুকরো এক মহাকালপথে
ঘোরে, ঘুরে চলে
    অনন্ত ত্রিচক্রমান্দাস।

ফিরতি পথে ট্যাক্সি,
বড়োরাস্তা– জট ধোঁয়া ক্ষিপ্ততা হর্ন।
    এত কাছে তবু কী সুদূর,
    শ্লথগতি বিশুদ্ধ পাগল–
      বক্ষলগ্ন সে নির্জন।


*********************









*
তবে কেন
কবি শাশ্বতী নন্দ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৭.১০.২০২৩।


এসে গেছি বলেই কি
থেকে যেতে হবে নাকি
এখানে এখন!

রাখি না কি খোঁজ আমি
জনগণমন সম্রাট সম্রাজ্ঞীর
নক্ষত্রনগরীর আর স্বাদু প্রকৃতির,
যেখানে রাজপথ উদার
পুরুষসিংহ বৃক্ষসার
আবহমান প্রাসাদ
কৌমুদী হর্ম্য মর্মর, হাওয়ামহল
আর পর্ণকুটীর শুশ্রূষা?

তবে কেন মেনে নেব
এই সব শেয়ালের আঁচড় কামড়,
অঞ্জলি ভরে ভরে পান করে যাব
শুধুই অসুস্থ জল,
তাস বালি দুর্গে খুঁজে খুঁজে বেড়াব
আকাট আশ্রয়?

আমি কি জানি না খোঁজ
শুশ্রূষা পর্ণকুটীর আর নক্ষত্রনগরীর,
তবে কেন ......?

*********************









*
জানালার ওপারে
কবি শাশ্বতী নন্দ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৭.১০.২০২৩।


শূন্যে ভাসমান আকাশযান
তন্দ্রালু পরিতৃপ্ত পানে ভোজনে-
বন্ধ জানালা, ওপরে সারিসারি আলো
মৃদু বৈদ্যুতিন, অন্তহীন ভূতুড়ে সুড়ঙ্গ যেন।

একচিলতে পর্দা তুলে চুপিসারে
উঁকি দেওয়া ওপারের উজ্জ্বল বিস্তারে-
স্বচ্ছ আলোয় সরে সরে যায় স্বপ্নিল নিসর্গ
প্যারিস মায়ানগরী ফ্র্যাঙ্কফুর্ট নুরেমবার্গ
কিরীটধবল রহস্যময়ী আল্পস পরীস্তান
উত্তরসাগর মুখে ধীরে বয় রাইন
কৃষ্ণ অরণ্যভূমি থেকে অজগর দানিয়ুব
প্রাঞ্জল শাখানদী উপনদী কত
যেন নাগভূমি হেলে লাউডগা বিচিত্র বিন্যাসে।

নিভৃত রোমাঞ্চিত একান্ত অবসর
পাখির চোখের মতো দেখা
অপরূপ শান্ত পৃথিবী
যুদ্ধ থেকে হিংসা থেকে দূর
অচেনা অজানা ছবিছায়া-
ভিয়েনার কোল ছেড়ে শস্পক্ষেত্র বুদাপেস্ট
আবার শৃঙ্গশ্রেণী বড়ো ছোটো
ডানার বিস্তার ছুঁয়ে দুই পারে
ডাক দেয় বুখারেস্ট, প্রান্ত বল্‌কান।
উচ্ছল বেলাভূমি সমাহিত কৃষ্ণসাগর
উত্তরে ক্রিমিয়া বন্দরে আলোছায়া
জাহাজে কালচে নীলে লুকোচুরি খেলা,
দূরে কত দূর দক্ষিণে ইউরেশিয়া
মেঘলা আভাসে ইস্তান্‌বুল কনস্টান্‌টিনপ্‌ল।

জল শুধু জল ছেড়ে ত্‌বিলিসি
উদ্ধত ককেশাসশৃঙ্গপার
তন্বী সাগরপ্রিয়া ঝিলমিল মোহময়ী বাকু,
সূক্ষ্ম তুলিটানে আঁকা তটরেখা কাস্পিয়ান-
প্রকৃতির অদ্ভূত খেয়াল
একপার সুগাঢ় সবুজ অন্যপার সোনালি মরুচর
আজারবাইজান থেকে তুর্কমেনিস্তান ঊষর প্রান্তর।

দলছুট মেঘেদের টুকরো ছায়ার আবডালে
ইতিউতি উঁকি দেয় আশ্‌খাবাদ,
অমোঘ আরল প্রেমে পামিরের জটা ছেড়ে
ছুটে চলা উন্মাদিনী আমুদরিয়ার কপোল ছুঁয়ে
গিরিকন্দর হিন্দুকুশ ভীষণ বিপুল বিস্তার
কান্দাহার গজনী মূলতান, প্রখর আকাশ।

তারপর সিন্ধু ঝিলম রবি শতদ্রুর আর্দ্র ঘন ঘ্রাণ
উচাটন হাতছানি দূরের ঠিকানা থেকে ঘরের সীমানা
দীর্ঘ ডানার ছায়া যমুনা কোকিলজলে এঁকে অবশেষে
অলোকসামান্য এক ভ্রমণের পটকথা যবনিকা টানে-
উদ্ধত গৌরবে ধীর লয়ে ইন্দ্রপুরী দিল্লির মাটি ছোঁয়
দুরন্ত আশ্চর্য রকপাখী আর দুটি সিন্দবাদ চোখ।

পর্দার ওই পারে টানটান আলোর ভুবন
এইপারে নিশ্চল আরাম আর বিবশ আঁধার-
জানালার এপার ওপার, মর্জি যার যার।

*********************









*
পড়া যাক
কবি শাশ্বতী নন্দ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৭.১০.২০২৩।


পড়া যাক, পড়া যাক
রাস্তাঘাট দোকানপাট হাটবাজার
বইপত্তর সিনেমা থিয়েটার
মানুষজন, বিম্বিত নিজেকে...
পড়া যাক লাগাতার।

নইলে প্রশ্নপত্র হাতে
সাদা পাতা সামনে
বিষণ্ণ বসে থাকা চুপচাপ
হাবিজাবি লিখে যাওয়া
আড়চোখে খুনচাপা মাথায়
দেখে যাওয়া ফার্স্ট বয়দের
কখনোবা শেষঘণ্টা পড়ার
আগেই স্বেচ্ছানিষ্ক্রমণ।

জানা থাকলে কিছু প্রশ্ন
কিছু কিছু উত্তর
সময় কেটে যায় হুহু করে
মুখ তোলার ফুরসতই থাকে না,
মনে হয় যেন
আরও অনেক অনেক
সাদা পাতা নেওয়ার ছিল।

*********************









*
মৃত্যুজিৎ
কবি শাশ্বতী নন্দ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৭.১০.২০২৩।


আমি তো তৈরি।
যে কোনো দিন যে কোনো সময়
এসে যদি বলো, চলো-
চলে যাব।

নির্লজ্জ তুমি তো চিরদিন,
অপেক্ষা করো না কারো ডাকের
মানো না বয়স, স্থান কাল পাত্র
একমাত্র সন্তান- কিচ্ছু না।
যে কোনো দিন যে কোনো পোশাকে
শ্যামের অথবা শয়তানের,
এসে যদি বলো, চলো-
চলে যেতে হবে তা জানি
তাই আজন্ম
সেরে রেখেছি বিদায় সম্ভাষণ।

    তবু তুমি জেনে রাখো
    আবারও বোনা হবে বীজ,
    মাঠ ভরে যাবে
    হিল্লোলিত সোনালি সবুজে,
    সন্তানের হাত ধরে
    সূর্যোদয়ের দিকে হেঁটে যাবে
    আমি না হলেও- অন্য কেউ।

*********************









*
ইচ্ছাপত্র
কবি শাশ্বতী নন্দ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৭.১০.২০২৩।


ইচ্ছাপত্রে লিখে দিলাম তোমাদের
আমার এই কুবেরের বিষয়-আশয়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস, মেঘলা আকাশ
কদমের আলো, শিউলি-বকুল সিতবাস
ঘুম না আসা মধ্যরাতে কৃষ্ণানবমীর চাঁদ
আর দক্ষিণের বারান্দার একফালি
এই আয়ত অবকাশ–

সামলে রেখো এ উত্তরাধিকার।

*********************









*
মহাদ্রুম অবিনশ্বর
কবি শাশ্বতী নন্দ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৭.১০.২০২৩।


কবে যেন কোন সে সুদূর
শেকড় পেয়েছিল কোষ্ণ মাটি
দুহাত বাড়ানো পল্লব আলো,
নদী বৃষ্টির দ্বৈমাতৃক এ দেশে
ছড়িয়েছি তারপর
বিপুল কাণ্ড শাখা শামিয়ানা।

দেখেছি যুদ্ধ-দাঙ্গা কত
অনাহূত পরিযায়ী শোষণ-শাসন
জাতীয়তা নবজাগরণ,
পেরিয়েছি পূর্ণাহুতি স্বাধীনতা
বিখণ্ডিত তবুও দেখেছি কত বিশ্বজয়।

সহ্য করেছি কত রক্তচক্ষু ঝড়
মহাঝঞ্ঝা ঘূর্ণি তাণ্ডব
হারিয়েছি মূল কাণ্ড পরজীবী আক্রমণে,
তবু দ্যাখো রেখে চোখে চোখ
কী প্রবল বেঁচে আছি স্বরাট সম্রাট-
প্রাচীন হয়েছি, বৃদ্ধ নই এখনও সবুজ,
অজস্র ঝুরিতে দৃঢ়মূল এই পুণ্যভূমিতে
স্তম্ভ দিয়ে ধরে আছি বিস্তৃত সাম্রাজ্য
হাজারো মানুষের মাথার ছায়া
শুধু মহীরুহ নই, এককে অরণ্য
গোটা এক বাস্তুভূমি, হাজারো প্রাণের আশ্রয়-

কত যুগ, কত যুগান্তর
এমনি করেই ঝড়ে পড়ি বারবার-
ভেবো না এ আমার অস্তিত্ব অন্তিম,
যেখানে নিয়েছি ভূমিশয্যা
উঠে দাঁড়াবোই সেই মাটি আঁকড়ে আবার।
আমি দ্যা গ্রেট বেঙ্গল,
হ্যাঁ সহস্র শাখা মেলে দ্যা গ্রেট ব্যানিঅ্যান্‌ বেঙ্গল
তোমাদের আদরে শুশ্রুষায় মহাদ্রুম অবিনশ্বর-

*********************









*
তুমিও সজীব তাই
কবি শাশ্বতী নন্দ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৭.১০.২০২৩।

তোমার চোখের
অধিত্যকায়
ঈশানে নৈর্ঋতে
জমে উঠছে মেঘ
বজ্রগর্ভ ভ্রমরকালো,
স্পষ্ট দেখছি ফাটবে এখুনি-
ভেসে যাবে উপত্যকা
নিভে যাবে উৎক্ষিপ্ত আগুন
ভস্মরাশি লাভাস্রোত
হারাবে দাহিকাশক্তি।

আমি তো
মৃত আগ্নেয়গিরি নই
সুপ্ত কেবল-
জেগে উঠি কখনও কখনও।
ভাগ্যিস তুমিও সজীব
ভোলোনি প্লাবন
তাই ত্রাণ, দহনমুক্তিস্নান
শিলায়িত লাভাস্রোতে
বন্দি হয়নি ইতিহাস।

*********************









*
জানি পৌঁছোবই
কবি শাশ্বতী নন্দ
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৭.১০.২০২৩।


আসতে যেতে
বড়ো কালো গেটটাকে দেখি প্রায়ই।
ভ্রূক্ষেপ করিনি কোনোদিন,
জানতে চাইনি কী আছে ওদিকে।

    একদিন ডাক দিল এক বন্ধু,
    ‘আমি তো যাচ্ছি ওদিকে
    তুইও দেখে নে জায়গাটা’।

দৌড় ঘাম উদ্বেগ
যানজট পেরিয়ে ওপাশে দৃশ্যান্তর-
বৃক্ষছায়া ঝরাফুল নদীতীর,
ইতি-উতি সূর্য-
নবোদিত, প্রখর, অস্তমিত।
বন্ধু শুয়েছিল হাসিমুখে,
বলল- ‘কী, চমৎকার না?’

সেই থেকে ধোঁয়া ধুলো ভণ্ডামির
আলগা হয়েছে কামড়,
    জানি পৌঁছোবই দৃশ্যান্তরে-
    নদীতীর, ঝরাফুল বৃক্ষছায়ায়।

*********************