কবি উমাপদ কর এর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি উমাপদ কর এর পরিচিতির পাতায় . . .
বিশ্বরূপ- ১
কবি উমাপদ কর
কবির "কয়েক আলোকবর্ষ দূরে" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

দাঁতের ফাঁকে ছোট সাপগুলো কিলবিল করে উঠতেই
তিনি হাঁ করলেন; দেখা গেল, গেওয়া-গরানের সুন্দরবনটা
রয়েল-বেঙ্গল, মৌ-মধু আর লোনাজলসহ ঢুকে যাচ্ছে
মুখের ভেতর, আর একপাশ থেকে বেরিয়ে আসছে
দ্বিতীয় হুগলিসেতু, ফারাক্কা ব্যারেজ আর অজস্র ক্যানেল।
তিনি থু করলেই স্কাইস্ক্র্যাপারগুলো বস্তি দুমড়ে দাঁড়িয়ে
পড়ছে, আর ঘন প্রশ্বাসে মুখের কাছে গিয়ে দুলছে
কালাহান্ডির মানুষগুলো; তিনি মুখ হাঁ করে হাসলেন,
তো, কেষ্টবিষ্টুরা সব প্রশ্রয়প্রাপ্ত সেনার মতো একে টিপছে
ওকে মারছে, তাকে বলাৎকার; আর উষ্মায় আর একটু
বেশি হাঁ করতেই সমস্ত থার্মাল পাওয়ার-স্টেশনগুলো বিকট শব্দে
ফেটে পড়ছে; অর্জুন চোখ বন্ধ করলেন, জোড় হাতে বললেন—
‘হে কৃষ্ণ! দয়া করে এবার মুখটা বন্ধ করুন।’

*********************









*
ছায়ার বিকল্প
কবি উমাপদ কর
কবির "পরিযায়ী চলো" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

ছায়ার বিকল্প এক ছায়া দাঁড়িয়ে থাকে
কী পাব্লিক, জো-হুজুর, মাছকাটা বাটনাবাটা
সব এক হাতে, বর্ষাতি এগিয়ে দেওয়া, হেলমেট তুলে দেওয়া
কোনও ভুল নেই
বোবা— বলে না, শুধু করেই যায়,
বধির— শোনে না, এমনকি গালাগাল,
দরজা খোলে, বন্ধ করে, সোফা ঝেড়ে দেয়
ফ্যান চালিয়ে দেয় জোরে
কী পাব্লিক, জানে ধর্ষিত হবে
তবু বিছানার চাদর পাল্টিয়ে দেয়

দাঁত চিপে ছায়া ক্রমে পাথর হতে থাকে

*********************









*
ব্ল্যাক-বোর্ড
কবি উমাপদ কর
কবির "পরিযায়ী চলো" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

অন্ধকারের শাটার তুলে নেওয়া একটা স্বপ্ন
প্লিজ ওয়েট, এক্ষুনি দেখো না ভেতরের মোটা রক্তকম্বল,
ঢুকতে চেষ্টা কোরো না, ওখানে অসীম ব্ল্যাকবোর্ড মুছে যায় ডাস্টার হাতে,
একটা ভেজা মৃত্যু পড়ে আছে, উড়ে গেছে ঘাতক অ্যানোফিলিস
হয়তো রবিশস্য ফলাচ্ছে দেহাতে, মাউসে রেখেছে বাধ্য আঙুল
হয়তো ভোট দিচ্ছে, ভেটো দিচ্ছে, নদীর নাব্যতা নিয়ে কথা বলছে!
ভেতরে ঢোকার আগে শবের নিথর শ্বাস-প্রশ্বাস শোনো,
ছুঁয়ে দাও শীতল কর্ণিয়া, এবং প্রার্থনা জানাও—
হে নিঃস্বপ্ন ভোর, মশারির জড়তা, টিক চিহ্ন ভরে দাও সব ফাঁকা বক্স
অনুনাদ শুনি যেন শব্দব্যবস্থায়, যেন স্পর্শে বুঝি রক্তরসে ভিজে মৃত্যু
এখনও শুকোয়নি, ঘুমোয়নি কফিনে মৃত,
শ্বাসশূন্য খাঁচা থেকে স্বপ্ন উড়েপুড়ে গেলে শাটার নেমে আসে

*********************









*
নীরবতা
কবি উমাপদ কর
কবির "ভাঙা পিয়ানোর পা" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

বলেছিলে দু-মিনিট নীরবতা

পেরিয়ে যাওয়া মাঠ, ভ্রমণগামী মেঘ
চলেই যাচ্ছে কতকাল থেকে
এখনও কি দু-মিনিট হয়নি?

ঠায় দাঁড়িয়ে আছি, নুয়ে পড়ছে স্মৃতির ডাল
হলুদ ডেওয়া ফলে ভরে আছে শাখা-প্রশাখা
দাঁড়িয়েই আছি, কবন্ধের গন্ধে ভেসে যাচ্ছে সভাঘর
স্মৃতি ফর্সা, বিস্মৃতি দাঁড়িয়ে কাঁধে ব্যাগ ক্রাচে ভর
সেই অনন্ত ফাঁকার মধ্যে ঢুকে পড়ছে বন্যার জল
ভেসে যাচ্ছে হাল-বৈঠা পাল-মাস্তুল
দ্রুতগামী ট্রেন সেঁধিয়ে যাচ্ছে হা-খোলা টানেলে
ঝমঝম শব্দের পিঠে ছড়িয়ে পড়ছে পরিত্যক্ত রান-ওয়ে
সেখানে নেমে আসছে হাজারটা বিমান
এখনও কি দু-মিনিট শেষ হয়নি?
বাজেনি দ্বিতীয় বেল? সভাপতি জানাননি ‘নীরবতা শেষ, বসুন’!

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাছ হয়ে গেছি, কাঠ হয়ে যাব
পাথর হব, প্লিজ, দু-মিনিট হলে আমাকে বলবেন—

*********************









*
অপর বসন্ত-৩৩
কবি উমাপদ কর
কবির "অপর বসন্ত" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

কী লিখতে চাই জানালার কাছে বসে
জানালা জানে না, আমাকেই লিখি কিনা
নিশ্চিত নয় জানালার ধারে বসে থাকা কাক
কী লিখতে চাই বা পারি বুঝতে চায় শুপুরিগাছ
ওদের সঙ্গ বসন্তে ভেসে যাওয়ার আগে জরুরি

গাছ শুনল কাক শুনল গ্রিল জ়ানালাও
কী যে লিখে গেছি এতকাল ওদের মুখেই
শুনুক মাইলপোস্টের কান, চুপচাপ থেকে যাওয়া
বসন্ত এবার তুমি বাতাস বয়ে জাগতে পারো, জাগাতেও

নিজেকেই লিখি কিনা জানার এর চেয়ে
বড়ো প্যারামিটার আর কিছুই হতে পারে না

*********************









*
অপর বসন্তঃ ৪৭
কবি উমাপদ কর
কবির "অপর বসন্ত" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

সিঁড়ি ঘুমিয়ে নীলু, প্রতিটি ধাপে ঘুম, প্রতিটি ধাপে নীলু
একদানা পুঁতি গড়িয়ে পড়ছে ওর প্রতিটি পা-ধা-নি তে
সহস্র পুঁতি গড়িয়ে পড়তে পড়তে ধাপে ধাপে ধ্বনি উল্লসিত
গতি বাড়ল গড়ানোর, জলতরঙ্গ-ঝালায় ঝমঝম হয়ে উঠলো কান

ছবি আর ধ্বনি শুধু, ভাবনার কথা হোক না এবার
ঘুম ভেঙে ভেঙেই সিঁড়ি কিছু ভাববে না বলা চলে না
সে ভাবছে চটকা ঘুমের আড়ালে স্বপ্ন কিছু ছিল কিনা!
পুঁতির যত না ভাব তার চেয়ে দৌড় বেশি, ফার্ষ্ট হতে হবে

সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে তিনটি ধারা, একটা জলের
একটা দুধের আর একটা রক্তের, কোথাও ওভারল্যাপিং নেই।

*********************









*
হাইফেন
কবি উমাপদ কর
মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

কোনো হাইফেনের কাছে হাঁটুমুড়ে বসে পড়লাম
চিবুকে আঙুল ঠেকিয়ে বসে রইলাম পুরোটা সময়
বাসনা জমল সর পড়ল ঘামল, টপটপ পড়তে চাইল
পূর্ণচ্ছেদের মাথায়, সেখান থেকেই বিস্ময়চিহ্ন
সেখান থেকে দ্রুতগতিতে মোটরগাড়ি তেরছা বাঁক খায়
প্রসেনিয়ামকে জিজ্ঞাসা করে প্রবেশ কিংবা প্রস্থানপথ
তারপর নিজেই জিজ্ঞাসাচিহ্নের মতো পাবলিকচোখে ফ্রিজ
পর্দা ওঠার আগেই একজোড়া ট্রেন দেখানো হবে
ওভারল্যাপিং করে চলে যাবে ওদের ঝাঁঝালো শব্দ
হাততালি ফেটে পড়বে চৌচির মঞ্চহীন নাটকে
আমি বসেছিলাম বসে আছি হয়তো বসেই থাকব
হাইফেনের হাত ধরে…

*********************









*

কবি উমাপদ কর
মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

শেষপর্যন্ত কল্পনাই রেফার করল কল্পনাকে
দোলাচলের দুলুনিতে হাঁড়িমুখ কালিঝুলি উড়িয়ে
সাফসুতরো উনুনে বসে গুনগুন কলি
চাল ফেলে দে বিশ্বাস একসময় ফুটে ভাতকুসুম

কেন যে ভাতের কথাই আসে নষ্ট হয়ে যাওয়ার
আগে, ভাত বুঝতে পারে না, ভ্যাপসা ঘেমে নেয়ে
টকমুখো আমানি, রিকেটগুলোর কার্বনকপি দেশমাটি
তোমাদের কাছের লোক, তোমাদের বড়ো ভালোবাসার ফিকিরবাজ

অর্ধেক নারী হতে হয় অন্তত একবার পোয়াতি
প্রথম-প্রথম প্রচুর ওয়াকে স্বপ্নবমি ফিরিয়ে ফ্যাকাসে
নীল আকাশে ঝুমকোপারা চাঁদগুঁড়ো চাঁদনি আলো
আলো নেমে এসে যোনিমুখ ভরে দেয় অজস্র জলকণা

রে-রে ভূমিষ্ট হৈ-হৈ ভূমিবাচ্চা হো-হো আনন্দানি
মানুষের ম মায়ের ম মম করে ওঠে মনস্ক মৌয়েরা

*********************









*
গলুই ভরতি আমি
কবি উমাপদ কর
রচনা - ২৪.০৯.২০১১। কবির "নদীতে সায়ং ভেঙে যায়" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

আয়নায় দেখা মুখটা বেঁকে যেতে-যেতে আর পারে না। সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। থাকতে-থাকতে সন্ধ্যা—

সকালের হলুদ থেকে কয়েকজন প্রাতঃভ্রমণকারীর মধ্যে সরল যাপনচর্চার কথা হতে থাকে। হতে-হতে সন্ধ্যা—

ছাদবাগানের টবে শরৎ হাওয়ায় মালতী ফুলেদের খুনসুটি আর রং বদলানোর অভিসার চলতে-চলতেও সন্ধ্যা—

এইসব সন্ধ্যাদের মুখমালতী বকুলছায়া কিংবা জোনাই নিবু-জ্বলা বড়ো ভালোবাসা হয়ে গেল। মা-কে তো কবেই বলেছি যাবো… এবার স্ত্রী-কেও বলতে হবে, যাবো…, ছেলেদের

*********************









*
গলুই ভরতি আমি
কবি উমাপদ কর
রচনা - ২১.০৩.২০১২। কবির "নদীতে সায়ং ভেঙে যায়" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

দহনপর্বে দাহ্যের সঙ্গে কিছু কথা হতেই পারে। দূরত্বে থেকে। মরণের রুঠো থেকে ছাই, ছাই রঙের গল্প… তাপ জন্মে মুখ লাল আমার… হৃদয় থেকে একটু আহা একটু শীত-শীত কাতরধ্বনি… আমার দেখায় কিছুই যায় আসে না… বন্ধ চোখে মৃদু হাসি লেগে বুদ্ধ তখন নির্বাণে…

তোমাকে একদিন পোড়াতে নিয়ে যাবে আমার বান্ধব। সে-ও আমি। পলাশবন্ধু শিমুলবন্ধু… দাহচুল্লির নিজস্ব একটা গান বেজে উঠবে… দাহ্যের সঙ্গে আমার কবে সেই মোলাকাত তার নষ্টালজিয়ায়… সে-ও এক গান… মিলে যাচ্ছে… মিশে যাচ্ছে…

এবার আলোর কথা। দাহ্যের আলোকণাগুলো ঝলকে আমাকে চিনতেও পারে বা… আলো কেন্দ্রে আমি দহনে দহনে… চলো, এবার যাওয়া যাক যে-কোনও দিকে…

*********************