কবি উমাপদ কর এর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি উমাপদ কর এর পরিচিতির পাতায় . . .
নাবিক
কবি উমাপদ কর
কবির "আলোর হাঁসুয়া" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

ঘর লুকিয়ে ফেলি
তার জানালা দুটো কেটে চোরা পকেটে ঢোকাই
দরজা একটাই হাট-খোলা
তাকে রাখি বুক পকেটে
দেয়াল মেঝে ছাত সব এক থলিতে ভরে রেখে দিই
এখন আর কোনো ঘর আস্ত নেই
কেউ আর এই ঘরে ঢুকতে পারবে না
কেউ কেউ অবশ্য বলতেই পারে
‘এখানে যে একটা ঘর ছিল!’
আমি তাদের মনে করিয়ে দেব ‘হ্যাঁ ছিল’
প্রয়োজনে দেখিয়ে দেব টুকরো টুকরো ঘরের অস্তিত্ব
পকেট থেকে থলে থেকে বুক থেকে
ওরাও লাফিয়ে উঠবে
কিন্তু ঘরে ঢুকতে পারবে না সাজাতে পারবে না
আমি ঘর বইতে বইতে নাবিক হতে থাকব...

*********************









*
বালুমানুষের ঝুনঝুনাৎ (দীর্ঘ কবিতা)
কবি উমাপদ কর
রচনা - মে-২০০৮। কবির "বালুমানুষের ঝুনঝুনাৎ" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

সোমালিয়া রোদ আর জাপানি জ্যোৎস্নার ককটেলে
আজকের এই সান্ধ্যপানের টেবিল আত্মসমীক্ষু
কে দিল বরফটুকরো না-চাইতেই
কে আলো ডিম-ডিম ভুবনভোলানো নিচু নীল
কে যে ওরা সার্ভড গ্লাসে মেশালো জল-তরঙ্গ
পান, আরও পান, গান প্লাস ধেই-ধিং নাচ
লাউডস্পিকার জুড়ে ক্রমাগত ঘাড় ধাক্কা, হো-হো
বাহুতোলা গাছের নীচে লট্‌কে থাকা নীরসঠোঁট
কথা বলো, চুমু খাও, আনন্দে গড়িয়ে যাও আরও নীচে—
পাহারা, দুরুদুরু উরু, দাঁড়িয়ে থাকো পুল/পুশ অন ক’রে


কী হারাতে পারে? বড়জোর এক ছিলিম গাঁজার মালকোষ
কমসে কম হাসিবারান্দা থেকে উড়ে যাওয়া লোহার হাঁস
অসময়ে বৃষ্টিহ্যাপায় সুখের রোম কিছু শিহরণ তোলা সারস
রোদের গুণগানে কর্তাল বাজাতে-বাজাতে দুটো কাক
পড়শির ঘুমের আঠা স্রেফ জল করে দিল
নগর জেগে ওঠে যখন রবিমামা তখন আটটা-আলো, পিসির বাড়ি

হেই-হেই ফিরি হরকরা, মসকরা মারা সেলসে্‌র লোক
রোস্টেড স্লাইস পাউরুটি জ্যাম ধরানো নিকেল ছুরি
ছড়-ছড় বাগ না মানা সাওয়ার, রৈ রৈ নিক্কো-পার্ক-প্রেম
তোমাদের সবাইকে কদমবুশি, আ-ছানাপোনা সব্বাইকে স্যালুট
শুরু হয়ে যাক আরেকটা লেফট-রাইট-লেফট দিন


কোনও রোম জ্বলে না, কোনও নীরো বাজায় না ব্যাঞ্জো
হাত ধরে চলে যায় সার সার গোরু শূকর বাজার আর মরফিন গাছ
আলাদা ক্যাপ, জাতিসঙ্ঘের নম্বর, চুলের পাসপোর্ট
জ্যাক লাগিয়ে তোলা বাতাসে হেলানদেওয়া খোলা নাভি
ডাম্বুস ঊরু আর হাতভরতি ঝালর, বেদানা দানার রস কাহানিয়া
দানাতুতো বোন ধর্ষিত হওয়ার ভয়েথাকা পুলিশ কিংবা সহিস

ঘোড়া ছুটে দিগন্ত ধা, ঝুমঝুম ধ্বনিরাত, ভোরে রওনাহওয়া
হরকরানো রণ-পা, বাজার ধরার কর্কট বিজ্ঞপ্তি
সবার রঙে দিল মেশাতে হবে, সামনে দাঁড়িয়ে কুচ-যুগ শোভিত...
হেলে মেটেলি ধোঁড়া গেঁড়ি-গুগলি শামুক অর্শজ্বালায় চাঁদসির চাঁদে
ওদের হায়া নেই, বেঁফাস বলায় পাঁচফাইন নেই
ওদের মুখে জোরকদম কুচকাওয়াজ— হাই ধোনি! তু লা-জবাব


ভুল বাজনার সরগম-আ-গম
কথায় ভুল, সুরে ভুল স্বর, কানে ভুল মদের ফেনা
সঙ্গিনীর ওড়নাবুকে স্পষ্টতার শাদা ঢেউ
বন্ধনী উথলে ঝড়োয়া পিন-পয়েন্টেড দুটো শু
ওখানে মুখ, মুখঘষা, চুমায় চুম্মা
একটু পরেই মনে হতে পারে ভুলগন্ধ

আসমানকে আসমান বলা ভাল, দিলশানও বলা যায়
ভুলের ক্যালাস ছাতা তবু ছন্নছাড়া
সুতরাং বলে কোনও আঁখের রস নেই
পান ফুরোলে লম্বাঘাড়ে ভুল কুড়োলের ঘা
মদের গ্লাসে সিপ্‌ মারে আবগারি ঠোঁট, আহা আখরোট


ঢেউ গুনে গুনে দেউলিয়া, বিন্দাস বালুমানুষ অর্ধেক পোঁতা
সাগর হেসে লুটোকুটি, সারাংশ ফেনা জমে রাশি-রাশি রাগ
সময় অসময় জোয়ারের তহবন খুলে যায়
টুসকি চাঁদ হেসে তরঙ্গে চিলিক
ভাঙে জল, জল ভাঙে কার শরীর, শুধুই বালুঢিবি?
বালুমানুষের কান শোনে গান গুনগুন ঘুনঘুন ঝুনঝুনাৎ
নাকে আসে কণা বাতাস সারি-সারি গন্ধমান্দাস
শরীরের পাহাড় প্রবণতায় ভ্রামকমানুষ দাঁড়িয়ে যায়
চোখ ফোটেনি, আধভাঙা নাক, ফেনা ভাঙে কর্ণিয়া
জিভ ভেতরেই ফেটে চৌচির, রসহীন বালুরসিক
ঢেউ আর ঢেউ বলাৎকারে চুরচুর ভেঙে ফসিল প্রায়
বালুমানুষের শব চিহ্নহীন, ভ্রমণ পিপাসা হেঁটে যায়


ভয় হয়, আংটি বনাম অঙ্গুলিহেলনের টিনচারে
এই যে সাবান, দেখা যাচ্ছে বরফ চাঁই-এর কাছে জেনে নিচ্ছে
গলে যাবার শর্তগুলো
খিক্‌-খিক্‌ হাসি এল-আই-সি লাইনে দাঁড়িয়ে ফ্রিজ
রাজনীতির নাতি ছাতা ফুটিয়ে আ-কৈশোর গিটারিস্ট
ভয় হয়, গোখরো ফিস-ফিস করে ফোঁস-ফোঁস করলে
তলপেটে ব্যথা হয়, জল ফুরিয়ে আসে শরীরে,
জলহীনতায় ক্র্যাম্প করে পা, জলের ব্যথা খুঁড়ে ধ্বনি কবিতায়
আজ ২০ মে ২০০৮, আজ কার্যত গৃহবন্দী—

*********************









*
মাধুকরীর কড়ি
পাঁচ
কবি উমাপদ কর
কবির "নৈর্ঋতে বিষুবে" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

অসুখের লিরিক ঘুমের মধ্যে এসে মেশে
     ঘুম আশাবরি খেলতে-খেলতে
          পুরো জ্যোৎস্না শরৎকাল
     স্বপ্নের গেরস্তপনায় কেবলই নীল

ফাঁকা ঘরের দস্যিপনায় দেয়ালে ছো্প-ছোপ ভয়
     আসবাবগুলো আদৌ কখনও কি ছিল
          ফুলদানি ঘুমোলে
     চিরিকআতরের গোসলে ভুরভুরে সন্ধেবেলা

কোথাও কি শঙ্খের দানা-দানা ধ্বনি পড়ে আছে
     নাচের মুদ্রায় বুঝি লেগে আছে পায়রার বকবকম
          অচেতনও উঠে বসে
     ওদের নাচের আসরে আজ সবার নিমন্ত্রণ

রাতের একবাটি জ্যোৎস্নাই এখন সকালের সা-রে-গা-মা-পা

*********************









*
সিঁড়ি
কবি উমাপদ কর
কবির "নামিয়ে রাখা চোখ" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

চশমাটা খুলে নামাতেই চোখদুটিও সঙ্গে নেমে আসে
          কোথায় যে রাখি তাদের!

কক্ষচ্যুত হবে নাকি গ্রহটা? নাকি এতোকাল চ্যুত হয়েই ছিল
     এখন চোখদুটো নামাতেই কক্ষে গিয়ে বসবে
          যেন উড়তেথাকা টিয়াপাখিটির দাঁড়ে এসে বসা।

দোলনার সামনে অবিকল পাখিরা ডানার জল ঝরাচ্ছে ঠোঁটে করে
     হাঁড়িচাচা ডেকে উঠলে বোঝা যায় আজ বন্ধুরা আসবে
          যারা হাত মুঠো করে ওড়াতে শিখিয়েছিল।

চোখদুটো নামিয়ে রাখি সিঁড়িতে, ওরা শুধু ওঠা আর নামা দেখে
     দেখে তোমার শেষবারের মতো নেমে যাওয়া
          এখন শুধু আমিই দাঁড়িয়ে রইলাম…

*********************









*
শিরোনামহীন
কবি উমাপদ কর
কবির "আনারকলির তানপুরা" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।


শুয়ে পড়েছিলে
   ছবিটি রাখিনি…

ফিরিয়েও দিয়েছিলে
   ছবিটি কেন যে রাখি!


অতিভুজে ফিরি।
   বৃত্তের রওনা
      আজও ভুলিনি…

ভূমিতে দাঁড়াই,
   লম্বে হেলান

ফিরতে পারি না
   বৃত্ত আমাকে পরিধি করে
      অসহ ঘূর্ণন…

*********************









*
পুতুল
দুই
কবি উমাপদ কর
কবির "শিরোনামহীন পুতুল" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

গ্রাফপেপারের মুখোমুখি বসিয়ে দেওয়া হলো
     এক স্প্রিং-দম-এ চলা পুতুলকে
          কার্যত সে ড্রাম বাজায়

প্রতিটি শব্দকণায় ভরে যাচ্ছিল গ্রাফের একেকটি বর্গ
     বাজনা শেষ হলে
          দেখা গেল একটা বেহালা
     কিন্তু দম শেষ হয়ে যাওয়ায় ছড়টি
          আঁকা হয়নি…

*********************









*
আলোশিশু অন্ধকারশিশু
কবি উমাপদ কর
কবির "শিরোনামহীন পুতুল" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

আলোর মধ্যে ছায়া মিশিয়ে এই দার্জিলিং ডুয়ার্স
   চা রঙের একটা দিন
      কতদিন আগে বলেছিলে উপহার দেবে
তুমি নও, দেবে তোমার উজাড় করা প্রকৃতি
   কিন্তু এসব নিয়ে আমি কী করব!
 যদি শিশুটি কাঁদতেই থাকে আর ঘ্যান-ঘ্যান বৃষ্টি
      বারবার চায় তার মুখ চেপে ধরতে
এই আলোওয়ালা দিনটির অন্ধকার হয়েআসা কি কোনো সূচক
   যা মাপতে কোনো মিটার তৈরি হয়নি আজও
      এই ছায়া মেশানো আলো নিয়েই বা আমি কি করব!
 চায়ের স্বাদ মেটাবো কিসে, যদি দার্জিলিঙের শিশুটি
   ডুয়ার্সের শিশুটির সঙ্গে একসাথে না খেলে?
যদি এ ওকে মুখ ভেঙায় আর সে খিলখিল হেসে না ওঠে!

*********************









*
অগঠিত জিঞ্জির
কবি উমাপদ কর
কবির "অগঠিত জিঞ্জির" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।


হারিয়ে ফেলতে-ফেলতে এই অচিন ঠেক, এক বৃত্তে খরা ও প্লাবন
   এক ডিমকুসুমে পাখির খুদকুঁড়ো ও আঠামাখা শলা
      বন্ধক রাখা নোয়া আর রংদার পোশাকে সুদখোর
   এতদূর বলতে-বলতে বাড়ির ছায়া যতটা গিয়েছিল বিকেলে,
      এলাম তো! এখন ছায়ার মাথা পর্যন্ত যাওয়া যেতে পারে


যদি হারিয়েই যায়, তোমার নাম ধরে ডাকবে ধরা যেতে পারে
   ফেরার রাস্তা জুড়ে কাকপালক, হঠাৎই দু-একটা শাদা কবুতর
      যেতে-যেতে মাতৃসদনের পথ যদি
   এক ডজন নবজাতকের নাম ধরে ডাকতে থাকে
      নাড়িকাটা অনুভব তুমি ফিরে পেতে পারো, ধ্বনিস্পর্শে

*********************









*
কামরা
কবি উমাপদ কর
কবির "দূরের অদূরে" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

নেই, তবু আছে মনে হয় দু-কামরার ফ্ল্যাটটা

ভাসমান দুটো বয়া— বরাভয় ভেতরে, তবু নেই মনে হয়
   তবে ভেসে আছি কোন যাদুবলে!

ঘরে আছি, ঘোরেও, দু-কামরাকে অশেষ মনে হয়
   একটু ফাঁকাকে মনে হয় কোনওদিন ফুরোবে না

নিজের আলোয়ানে নিজেকে বন্ধক রেখে
   সুদ দিয়ে যাচ্ছি আসলের তোয়াক্কা না করে

শুধুই তাজ্জব বনে যাওয়া নিয়ে দেয়ালের টিকটিকি
   নেই আর আছের মধ্যে গাঢ় আলোয় কীট-ছায়ার তালাশ

এক জীবনের অসমাপ্ত মধুচাকে ঢিল-ছোঁড়া-হাতও অবসর চাইতে পারে
   যা রয়েছে থাকলো আমার যাওয়া অনিবার্য করে

*********************









*
দূরের অদূরে
কবি উমাপদ কর
কবির "দূরের অদূরে" কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৩১.০৮.২০২৫।

দূর আর অপেক্ষায় থাকে না, কাছে চলে আসে
    যতটা এলে পালে-লাগা মুহূর্তের বাতাস
  ভাসিয়ে নেয় প্রতিস্রোতে, বুঝতে পারে না ঠিক কোথায় এল

হাতের মুঠোয় ধরা পাতার পোশাক সেলাই খুলছে
    অজগর স্বপ্নে নীল হয়ে থাকা মৈথুন ঘুম ভাঙাচ্ছে
  জাগরণ জানে প্রতিমা বিসর্জন হলেও অপরাজিতা বাঁধা হয়নি

নিজেকে ধারালো করে দেখেছি সব কাটে, কাটে না স্পৃহা-শরবত নেশা
    ঘুরেফিরে শরবত খায় আর ওত পেতে থাকে
  আরও কত পিচ্ছিল করে পাওয়া যায়, কাঙালস্য কাঙাল

জটাজুটের মাথায় যশের মাথাল প্রার্থনায়
    নখের কোনায় রাখি কামনাপ্রেমের মৌরি চিবোনো
  বুঝি বাগানে ভুলভাল নানারঙের ফুল, আমারই নয়ন

দূর বোঝেনি কোথায় এল, কতটা কাছে!
    আমি হাতড়ে মরি কোথায় এলাম, কতটা অদূরেই বা দূর!

*********************