কবি ধীরাজ - জন্মগ্রহণ করেন পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার ভদ্রেশ্বরের তেলেনিপাড়ায়। তিনি একজন প্রসিদ্ধ সঙ্গীত রচয়িতা ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বর্ধমানের মহারাজা মহাতবচাঁদ রায়বাহাদুরের কর্মজীবনকালে। অর্থাৎ উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে।
বর্ধমানের মহারাজা মহাতবচাঁদ তাঁকে “ধীরাজ” উপাধি দ্বারা সম্মানিত করেন। তখন থেকে তিনি “ধীরাজ” নামেই পরিচিতি লাভ করেন। এখানে দুটির মধ্যে একটিতে “ধীরাজ” ভণিতাও রয়েছে। তাঁর পিতৃদত্ত নামের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় নি।
আমরা তাঁর দুটি গান পেয়েছি, ১৩০৩ সালে (১৮৯৭) প্রকাশিত, নবকান্ত চট্টোপাধ্যায় কর্ত্তৃক সংগৃহীত “সঙ্গীত মুক্তাবলী, প্রথম ভাগ” সংকলনে। সেই গ্রন্থের পরিশিষ্টে সেই কবিদের সংক্ষিপ্ত জীবনীও দেওয়া রয়েছে। আমরা কবি ধীরাজের সঙ্গীতের সম্বন্ধে সেখান থেকেই যা জানতে পেরেছি তা হলো যে তাঁর সঙ্গীত ছিল “বড়ই চমৎকার ও আমোদপ্রদ” এবং সংকলনটির প্রকাশকালে, ১৮৯৭ সালে, তাঁর গান বিশেষ আর পাওয়া যাচ্ছিল না।
“সঙ্গীত মুক্তাবলী” তে যে দুটি গান আমরা পেয়েছি, তা তখনকার সাম্প্রতিক দুটি ঘটনার উপর লেখা। একটি নীল চাষের প্রতি ইংরেজদের ন্যায়বিচার বা বিচার ব্যবস্থার ঘাটতির উপর লেখা এবং অন্যটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনা নিয়ে লেখা।
নীল চাষ নিয়ে লেখা গানটিতে জেমস লং সাহেবের ১০০০ টাকা জরিমানা এবং তা সিংহ বাহাদুর অর্থাৎ কালীপ্রসন্ন সিংহ মিটিয়ে দিয়েছিলেন তার উল্লেখ রয়েছে।
অন্য গানটিতে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর সঙ্গে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা টি ঘটেছিল ১৮৬৬ সাল নাগাদ। Banglalive.com ওয়েবসাইটে, নীলার্ণব চক্রবর্তীর, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখের “সাগরে আঘাত” লেখাটিতে সেই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। বিদ্যাসাগর গিয়েছিলেন বিজয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের তৈরি উত্তরপাড়া বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে। কিছুটা পিছনে আর একটি ঘোড়ার গাড়িতে ছিলেন স্কুল ইন্সপেক্টর উড্রো, শিক্ষাবিভাগের ডিরেক্টর অ্যাটকিনসন সাহেব এবং মিস্ মেরি কার্পেন্টার, যিনি ভারতে, নারীশিক্ষা প্রসারে অসীম আগ্রহ নিয়ে কাজ করতে এসেছিলেন। তাঁর পিতা রেভারেন্ড কার্পেন্টার ছিলেন রাজা রামমোহন রায়ের বন্ধু এবং ইংল্যাণ্ডে, রাজার শেষ সময়ে, মেরিও তাঁর সেবা যত্ন করেছিলেন। ঘটনাটিতে বিদ্যাসাগরের গাড়িটি উলটে যায় এবং তিনি রাস্তায় পড়ে গিয়ে কিছুক্ষণ অজ্ঞান হয়ে ছিলেন। মিস্ মেরি কার্পেন্টার পিছনের গাড়ি থেকে দৌড়ে গিয়ে শুশ্রুসা করে বিদ্যাসাগরের জ্ঞান ফেরান।
বিদ্যাসাগর সেই যাত্রায় বেঁচে গেলেও সেই দুর্ঘটনার পরে তিনি আরও ২৫ বছর বেঁচেছিলেন। কিন্তু তাঁকে সারাজীবন এই দুর্ঘটনার জন্য কষ্ট পেতে হয়েছিলো। ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার , বিদ্যাসাগরকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টার কোনো ত্রুটিই রাখেন নি। চিকিৎসকদের মত ছিল যে দুর্ঘটনার ফলে তাঁর যকৃত উল্টে গিয়েছে। জ্বর আর পেটখারাপ তাঁর লেগেই থাকত। খেতে পারতেন না প্রায় কিছুই। দুধ খেতে পারতেন না। তাঁকে বাকি জীবন খুব সাবধানে অল্প আহার খেয়ে জীবন কাটাতে হয়।
“সঙ্গীত মুক্তাবলী” তে দেওয়া কবি ধীরাজের সংক্ষিপ্ত জীবনীতে দেওয়া রয়েছে যে তিনি উদ্ধন্ধনে প্রাণত্যাগ করেন। অর্থাৎ কোন কারণবশতঃ ফাঁসী দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
মিলনসাগরে কবি ধীরাজ এর কবিতার পাতা তৈরী করে আমরা আনন্দিত।
বাঙালীদের বহু বদনাম আছে। তাঁরা অলস, তাঁরা আড্ডাবাজ, ফাঁকিবাজ, আরও অনেক কিছু। কিন্তু বাঙালীর যে ভাল গুণগুলি আছে, তার মধ্যে একটা হলো কবিতা লেখা! প্রায় সব বাঙালীই জীবনে দু-এক লাইন কবিতা লেখেন বা লিখেছেন। মিলনসাগরে আমাদের চেষ্টা সেই কবিতার মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক বাঙালীদের মিলনসাগরের কবিদের সভায় ধরা। মিলনসাগরের বাংলা কবিতার কালানুক্রমিক সূচী আসলে বাঙালীর ইতিহাস হয়ে উঠছে, কবিদের জীবনীর মধ্য দিয়ে।
কবি ধীরাজ এর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।
আমাদের ই-মেল : srimilansengupta@yahoo.co.in
হোয়াটসঅ্যাপ : +৯১ ৯৮৩০৬৮১০১৭
এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ১৮.১০.২০২৫
উৎস ---
- নবকান্ত চট্টোপাধ্যায় কর্ত্তৃক সংগৃহীত “সঙ্গীত মুক্তাবলী, প্রথম ভাগ”।
- নীলার্ণব চক্রবর্তী, “সাগরে আঘাত”, Banglalive.com
- রঞ্জন চক্রবর্ত্তী, বাংলা ভাষায় শিক্ষার সূচনাপর্ব এবং বিদ্যাসাগর (২য় ভাগ), কুলায়ফেরা