কবি নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্নের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্নের পরিচিতির পাতায় . . .
দশাপরিবর্ত্তন
কবি নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্ন
কবির ১৩০২ বঙ্গাব্দে (১৮৯৬) সালে প্রকাশিত, ইংরেজী পদ্য গ্রন্থ অবলম্বনে রচিত “নীতিকণা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশিত ১৬.৫.২০২৬।

ছিন্নশাখ বৃক্ষে পুনঃ অন্য শাখা হয়,
পত্র-হীন বৃক্ষে পুনঃ পত্র সুশোভয়।
সুদুঃখিত মানবের তাপিত হৃদয়,
সময়ে যন্ত্রণা হ’তে বিনির্ন্মুক্ত হয়।
শীতকালে কমলিনী বিনষ্ট হইয়া,
বরষায় দেখা দেয় সুচারু হাসিয়া।
কালবশে অবস্থার পরিবর্ত্ত হয়,
এ সংসারে সম দশা কারই না রয়।
সৌভাগ্য কখন নহে স্থির এক স্থানে,
ভ্রমিতেছে নিরন্তর এখানে সেখানে।
জোয়ার ভাটার মত আসে চ’লে যায়,
একস্থলে চিরকাল কে দেখিতে পায়।
যতই আনন্দ কেন হউক তোমার,
অবশ্য সময়ে নাশ হইবে তাহার।
যতই অবস্থা মন্দ হউক এখন,
অবশ্য উঠিবে তব সৌভাগ্য-তপন।
চিরকাল একভাবে থাকে না হেমন্ত,
চিরকাল একভাবে থাকে না বসন্ত।
চিরকাল একভাবে থাকে না রজনী,
নিত্য একভাবে নাহি থাকে দিনমণি।
ক্ষণেক প্রবল থাকি প্রচণ্ড পবন,
পুনর্ব্বার শান্ত-ভাব করয়ে ধারণ।
দুরদৃষ্ট-বশে যাহা এখন হারাই,
অদৃষ্ট প্রসন্ন হ’লে পুনঃ তাহা পাই।
উঠিয়া পড়িতে হয় পড়িয়া উঠিতে,
ইহা যেন থাকে সদা সকলের চিতে।

****************************









*
কৃষক ও পণ্ডিতের কথোপকথন
কবি নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্ন
কবির ১৩০২ বঙ্গাব্দে (১৮৯৬) সালে প্রকাশিত, ইংরেজী পদ্য গ্রন্থ অবলম্বনে রচিত “নীতিকণা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশিত ১৬.৫.২০২৬।

নগর হইতে দূরে চাসী এক জন,
স্বচ্ছন্দে করিত বাস হ’য়ে হৃষ্টমন।
বার্দ্ধক্যে তাহার কেশ হ’য়েছে ধবল,
দেহের বলিত মাংস করে থল থল।
চিন্তিত সে নহে কভু ধনের আশায়,
হ’য়েছে পরম জ্ঞানী বহুদৰ্শিতায়।
গ্রীষ্মকালে রৌদ্রে কিম্বা শীতকালে শীতে,
কাতর না হয় কভু মেষ চরাইতে।
মনের আনন্দে শ্রম করে অনুক্ষণ,
হিংসা দ্বেষ দুরাকাঙ্ক্ষা জানে না কেমন।
করিতে পরের মন্দ করে না বাসনা,
দেশে তার হ’ল জ্ঞান-যশের ঘোষণা।
  জানিতে সে কৃষকের জ্ঞানের কারণ,
আসিয়া পণ্ডিত এক দিল দরশন।
পরস্পর শিষ্টাচার শেষ হ’লে পরে,
বলিল পণ্ডিত তারে অতি মৃদুস্বরে।
“অনুগ্রহ প্রকাশিয়ে বল মহাশয়,
কিরূপে হইল তব জ্ঞানের উদয়।
জেগেছ কি রজনীতে বিদ্যার লাগিয়া,
লভেছ কি জ্ঞানধন বিদেশ ভ্রমিয়া?
জ্ঞানার্থে কি করে’ছিলে কর্ণাটে গমন,
উজ্জয়িনী গিয়া কি হে লভিলে এ ধন?
তোমার মানস-পটে মনু মহাকবি,
অঙ্কিত করিয়া গে’ছে জ্ঞানের কি ছবি”?
  বিনয়ে কৃষক বলে “শুন মহাশয়,
আমার বিদ্যার সহ নাহি পরিচয়।
মানবের রীতি নীতি শিখিবার তরে,
কভু আমি ভ্রমি নাই দেশ দেশান্তরে।
নরের চরিত বল বুঝিব কেমনে,
বুঝিতে অক্ষম তাহা বুদ্ধিমান জনে।
আপনিই আপনারে না পারি বুঝিতে,
যতন করিব কেন অপরে জানিতে?
মানবের রীতি নীতি করি দরশন,
সাধ্য কি করিতে পারি জ্ঞান উপার্জ্জন?
আমার যে কিছু জ্ঞান পাই’ছ দেখিতে,
পাইয়াছি আমি তাহা প্রকৃতি হইতে।
কুৎসিত প্রবৃত্তি যদি হয় কভু মনে,
মানসের শান্তি দূর হয় সেই ক্ষণে।
তাহাতে মানসে হয় কতই অসুখ,
তাই তারে স্থান দিতে হ’য়েছি বিমুখ।
মধুমক্ষি পরিশ্রম করে নিরন্তর,
তাহা দেখি শ্রম শিক্ষা করে’ছি সুন্দর।
দেখিয়া সঞ্চয়পটু পিপীলিকাগণে,
সঞ্চয় করিতে শিক্ষা করে’ছি যতনে।
কুকুরের কৃতজ্ঞতা দেখিয়াছি যবে,
কৃতজ্ঞ হইতে আমি শিখিয়াছি তবে।
কুকুর বিশ্বাসী অতি করি দরশন,
বিশ্বাসী হইতে আমি হই সযতন।
পক্ষপুটে শাবকেরে করি আচ্ছাদন,
কুক্কুট যতনে শীতে করয়ে পালন।
তাহা দেখি শিখিয়াছি পালিতে সন্তান,
অন্য পাখি হ’তে হ’ল অন্যবিধ জ্ঞান।
প্রকৃতি হইতে আরো কত জ্ঞান পাই,
উপহাস ঘৃণা নিন্দা কভু করি নাই।
যখন কাহারো সনে করি আলাপন,
বাহির না হয় কভু গর্ব্বিত বচন।
অন্যের গর্ব্বিত বাক্য না পারি সহিতে,
তাই তাহা ত্যজিয়াছি যতন সহিতে।
অবিরল কতগুলা যেবা কথা কয়,
দেখি যে অনেক তার অনর্থক হয়।
অনেক কহিতে গেলে পাছে মিছা হয়,
হইয়াছি মিতভাষী তাই মহাশয়।
হরিলে আমার ধন ব্যথা মনে পাই,
তাই অপরের ধন চুরি করি নাই।
চারি দিকে প্রকৃতিরে করি দরশন,
এইরূপ কত জ্ঞান করে’ছি অর্জ্জন।
সামান্য কীটেও যদি করি দরশন,
তা’তেও কোন না কোন করি জ্ঞানার্জ্জন।”
  কৃষকের কথা শুনি, পণ্ডিত বলিল,
কৃষক, তোমার বাক্যে জ্ঞান উপজিল।
তুমিই প্রকৃত গুণী ধন্য তব জ্ঞান,
পণ্ডিত নাহিক দেখি তোমার সমান।

****************************









*
মৌমাছি
কবি নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্ন
কবির ১৩০২ বঙ্গাব্দে (১৮৯৬) সালে প্রকাশিত, ইংরেজী পদ্য গ্রন্থ অবলম্বনে রচিত “নীতিকণা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশিত ১৬.৫.২০২৬।

মধুমক্ষিকার কাছে,  শিল্পকর কেবা আছে,
পরাভব মানে নরগণ।
ছাদ হতে সুরু করে,  সুকৌশলে তার পরে,
শূন্যে ঘর করে সুগঠন।

শ্রমে দক্ষ অতিশয়,  কখন কাতর নয়,
মধু আশে ঘু’রে অবিরত।
প্রকৃতি যতন ক’রে,  পুষ্প পাত্রে মধু ভ’রে,
রাখে তাহা লভে ইচ্ছা মত।

মানবেরা সেই মত,  হ’লে পরিশ্রমে রত,
কার্য্যদক্ষ সরল হৃদয়।
অবশ্য সুফল পায়,  মধুমক্ষিকার প্রায়,
ইষ্টলাভ করে সুনিশ্চয়।

করিলে আলস্য ত্যাগ,  ক’রে যত্ন অনুরাগ,
পরাধীন হ’তে হয় কা’রে?
কিন্তু যে অলস হয়,  পরিশ্রমে রত নয়,
চিরদুঃখী হয় সে সংসারে।

****************************









*
ক্ষুদ্র তরঙ্গিণী
কবি নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্ন
কবির ১৩০২ বঙ্গাব্দে (১৮৯৬) সালে প্রকাশিত, ইংরেজী পদ্য গ্রন্থ অবলম্বনে রচিত “নীতিকণা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশিত ১৬.৫.২০২৬।

অয়ি ক্ষুদ্র তরঙ্গিণি! তোমার সহিত,
বাল্যকালে খেলিতাম হ’য়ে আনন্দিত।
এই কুঞ্জবন-স্থিত ঝরণা হইতে,
কল কল শব্দে তুমি সতত বহিতে।
এই কুঞ্জে পাখিগণ করিত যে গান,
তাহাতে মোহিত হ’ত বালকের প্রাণ।
তাই আমি ঘন ঘন হেথা আসিতাম,
হরিত নিকুঞ্জ-বন সুখে হেরিতাম।
দক্ষিণ হইতে মন্দ মন্দ সমীরণ,
কুসুম-সৌরভ সদা করিত বহন।
কৃষকের বসন্তের গীত শুনিতাম,
নানাবিধ বরণের ফুল তুলিতাম।
নাচিতাম গাইতাম তোমারি মতন,
অতুল আনন্দ-রসে গ’লে যে’ত মন।
  ক্রমে ক্রমে দিন গেলে বয়স বাড়িলে,
সুখ্যাতি-লাভের তরে বাসনা হইলে,
প্রতিদিন তব তীরে আসি বসিতাম,
ছোট ছোট নানাবিধ পদ্য লিখিতাম।
সে সময় সংসারের পদার্থ নিকর,
দেখা’ত আমার নেত্রে কতই সুন্দর!
কত আশা মনো-মধ্যে হইত উদয়,
সে সব বলিতে এবে জনমে বিস্ময়।
কাল-পরিবর্ত্তে তব পরিবর্ত্ত নাই,
তীরস্থিত বটগাছ রহিয়াছে তাই।
বাল্যকালে ভয়ে ভয়ে এসেছি যখন,
পার্শ্বস্থিত বনস্থল করে’ছি ভ্রমণ।
উল্লাসে নাচিয়া তুমি বহিতে যেমন,
তার কিছু পরিবর্ত্ত না হেরি এখন।
এখনো নাচা’য়ে শুভ্র তরঙ্গ নিকর,
বালুকা রাশির সনে খেলিছ সুন্দর।
তখন যে ধ্বনি শুনি জুড়া’ত শ্রবণ,
অবিকল শুনিতেছি তাহাই এখন।
এখনো তেমনি তব সলিল নির্ম্মল,
তপন-কিরণ-যোগে করে ঝল মল।
তেমনি তোমার তীরে ঘন তরু-রাজি,
অবিকৃত রহিয়াছে দেখিতেছি আজি।
বনকুসুমের গন্ধে হইয়া আকুল,
উড়িতেছে মধুলোভে মধুকর-কুল।
এখনো পূর্ব্বের মত বিহঙ্গমগণ,
সুস্বরে করিয়া গান মুগ্ধ করে মন।
  কালবশে পরিবর্ত্ত নাহিক তোমার,
কিন্তু কত পরিবর্ত্ত হ’য়েছে আমার।
এবে হৃষ্ট-চিত নই পূর্ব্বের মতন,
অপূর্ব্ব গম্ভীর ভাব করে’ছি ধারণ।
বাল্যকালে এ সংসার ছিল দীপ্তিময়,
হইয়াছে অন্ধকারপূর্ণ এ সময়।
কেবল দেখিতে পাই প্রকৃতির শোভা,
সর্ব্ব স্থানে সর্ব্ব কালে অতি মনোলোভা।
কালের গতিতে তা’র পরিবর্ত্ত নাই,
পূর্ব্ব কালে যাহা ছিল, রহিয়াছে তাই।
বিগত হইলে পর আরো কিছুদিন,
শরীর মলিন মম হ’বে শক্তিহীন।
বাঁচি যদি পুনর্ব্বার এখানে আসিব,
মনোহর শোভা পুনঃ নয়নে হেরিব।
অবশেষে কাটাইয়া ভব-মায়া-জাল,
হয় ত তোমার তীরে র’ব চিরকাল।
কত মাস কত দিন, কতই বৎসর,
কতই শতাব্দ ক্রমে যাইবে সত্বর।
আমার মতন আরো কত শত জন,
আসিয়া তোমার শোভা করিবে দর্শন।
কালবশে তাহারাও ধূলিসাত হবে,
তুমি কিন্তু এইরূপ অবিকৃত র’বে।
এমনি উল্লাসে তুমি চিরকাল র’বে,
উপহাস করি সদা নশ্বর মানবে।

****************************









*
সুখ
কবি নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্ন
কবির ১৩০২ বঙ্গাব্দে (১৮৯৬) সালে প্রকাশিত, ইংরেজী পদ্য গ্রন্থ অবলম্বনে রচিত “নীতিকণা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশিত ১৬.৫.২০২৬।

তোমারে লভিতে করে সকলে প্রয়াস,
বল না বল না সুখ, কোথা তব বাস?
আড়ম্বরে থাকে যথা পৃথিবীর পতি,
সেই হর্ম্ম্য মধ্যে কি হে তোমার বসতি,
হীনবেশে দীনগণ থাকে যেই স্থানে,
তোমারে দেখিতে কি হে পা’ব সেইখানে?
পর্ণের কুটীর করি তাপস নিচয়,
বিজনে বসিয়া যথা তপে মগ্ন রয়।
সেই স্থানে হয় কি হে তোমার গমন,
কোন স্থানে গেলে পা’ব তব দরশন।
লভিতে তোমায় সবে করে আকিঞ্চন,
তোমায় দেখিতে কিন্তু পায় কোন্‌ জন।
এই আছ, এই নাই, থাকিয়া থাকিয়া,
বিদ্যুতের মত তুমি বেড়াও ছুটিয়া।
একবার এক দিকে ফিরা’লে নয়ন,
তোমার উজ্জ্বল জ্যোতি করি দরশন।
পলক ফেলিয়া যেই নয়ন ফিরাই,
সে জ্যোতি পুনশ্চ তথা দেখিতে না পাই।
সংসারে অনেক পথ পাই ত দেখিতে,
ছুটোছুটি করি সদা তোমায় ধরিতে।
এক পথে ছুটে যাই না পে’য়ে তোমায়,
অন্য পথে ছুটোছুটি করি মাত্র হায়!
এইরূপ কত পথ ভ্রমি অনিবার,
ক্লান্ত হই তবু দেখা না পাই তোমার।
শেষে স্থির করিয়াছি ছাড়িয়া নিশ্বাস,
এই মর্ত্তলোকে তুমি কর না হে বাস।

****************************









*
সন্তোষ
কবি নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্ন
কবির ১৩০২ বঙ্গাব্দে (১৮৯৬) সালে প্রকাশিত, ইংরেজী পদ্য গ্রন্থ অবলম্বনে রচিত “নীতিকণা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশিত ১৬.৫.২০২৬।

কৃষক, পদ বা প্রভুত্ব আশায়,
ফিরো না ভুলো না সংসার মায়ায়।
লতার নিকুঞ্জ হরিত বরণে,
শোভিত ক’রেছে তোমার প্রাঙ্গণে।
তোমার রোপিত বৃক্ষ অগণন,
প্রকৃতির শোভা করে সম্পাদন।
শস্য-ক্ষেত্র তব শোভন যেমন,
উজ্জ্বল প্রাসাদ কভু কি তেমন?
এ সব ছাড়িয়া আর কিবা চাই?
আমি যাহা বলি, কর দেখি তাই!
যেন দুশ্চিন্তায় সময় না হর,
আপন কুটীরে সুখ-ভোগ কর।
কৃষি পাশুপাল্য ছেড়ো নাকো ভাই!
পদ বা প্রভুত্বে শান্তি পাবে নাই।
  তোমার দশায় তুমি সুখী অতি,
তোমার সমান নহে লক্ষপতি।
পদ প্রভুত্বাদি দেখিতেছ যাহা,
তিলেকের সুখ নাহি দেয় তাহা।
নগরের দৃশ্য চিত্ত-আকর্ষক,
ভিতরে জেনো তা কেবল চটক!
তথা আছে সুখ, ভাবিও না মিছে,
কলহ কুচিন্তা পীড়া বিরাজিছে।
সে সুখের আশা ক’রে কাজ নাই,
আমি যাহা বলি, কর দেখি তাই।
যেন দুশ্চিন্তায় সময় না হর,
আপন কুটীরে সুখভোগ কর।
কৃষি পাশুপাল্য ছেড়ো নাকো ভাই,
পদ বা প্রভুত্বে শান্তি পাবে নাই।

****************************









*
সমুদ্র
কবি নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্ন
কবির ১৩০২ বঙ্গাব্দে (১৮৯৬) সালে প্রকাশিত, ইংরেজী পদ্য গ্রন্থ অবলম্বনে রচিত “নীতিকণা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশিত ১৬.৫.২০২৬।

গাঢ় নীল রত্নাকর এখন কেমন,
গভীর প্রশান্তভাব ক’রেছে ধারণ!
প্রাতঃকালে তপনের রক্তিম কিরণে,
ঝলমল করিতেছে সুন্দর বরণে।
বিশদ জলদ-মালা ইহার উপর,
ধরিয়াছে চন্দ্রাতপ অতি মনোহর।
নিঃশব্দে চলে’ছে ক্ষুদ্র তরঙ্গ-নিকর,
পবন করি’ছে খেলা তাহার উপর।
  আবার রজনী-যোগে যবে চরাচরে,
সকল নিস্তব্ধ হয় আরামের তরে।
নির্ম্মল আকাশ হ’তে যবে নিশাকর,
ছড়ায় জগৎ-মাঝে সুবিমল কর।
সাগরের শান্ত বক্ষে তারা অগণন,
প্রতিবিম্ব-পাতে হয় শোভিত তখন।
উকি ঝুকি মারে গিয়া সাগর অন্তরে,
বসনে চুমকি প্রায় ঝিকি মিকি করে।
  কিন্তু যবে সমীরণ হ’য়ে বেগবান,
সাগর-সলিল-রাশি করে কম্পমান।
সুনীল জলদজাল উঠি চারি ধারে,
গগনেরে আচ্ছাদন করে অন্ধকারে।
তখন গর্ব্বিত ভাব ধরিয়া সাগর,
রোষিত সিংহের মত কাঁপায় কেশর।
সমুদ্র উভয় কূল হইতে তখন,
বজ্রপাত-শব্দ সম করয়ে গর্জ্জন।
অচল সদৃশ দেহ করিয়া ধারণ,
উত্তাল তরঙ্গচয় করয়ে গমন।
কত যে অর্ণবযানে প্রচণ্ড পবন,
বিশাল সাগর-গর্ভে করে নিমগন।
মাঝে মাঝে নাবিকেরা আর্ত্তনাদ করে,
অৰ্দ্ধ-বিনির্গত-শ্বাসে ডুবি’ছে সাগরে।
তখন সে উগ্রভাব করি দরশন,
ভীত নাহি হয় কোন মানবের মন?
  দেখিতে দেখিতে পুনঃ শান্ত ভাব ধরে,
মনোহর বীচি-মালা তর তর করে।
ধীরে ধীরে সেই ক্ষণে বহে সমীরণ,
কোথায় সে উগ্রভাব করিল গমন।
সাগর ভীষণ ভাব করিয়া বর্জন,
সুন্দর প্রশান্ত মূর্ত্তি করিল ধারণ।
হেন ভীষণতা আর শান্তি চমৎকার,
যাঁহার আজ্ঞায় হয়, তাঁ’রে নমস্কার।

****************************









*
কৃপণ
কবি নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্ন
কবির ১৩০২ বঙ্গাব্দে (১৮৯৬) সালে প্রকাশিত, ইংরেজী পদ্য গ্রন্থ অবলম্বনে রচিত “নীতিকণা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশিত ১৬.৫.২০২৬।

লভিতে অমূল্য ধন খনির ভিতরে,
ঘোর অন্ধকারে যা’রা পরিশ্রম করে।
তা’দের অদৃষ্ট বটে মন্দ অতিশয়,
কিন্তু কৃপণের চেয়ে কখনো ত নয়।
কৃপণ আপন ধন রক্ষিবার তরে,
তাহাদের শতগুণ পরিশ্রম করে।
হৰ্ষ-বিকসিত-নেত্রে মুদ্রাগুলি গণে,
শিহরে যদ্যপি কেহ যায় সেই ক্ষণে।
টাকার উপরে টাকা ঢালে রাশি রাশি,
চিন্তাযুক্ত কপোলেতে দেখা যায় হাসি।
শয্যা পাতি প্রাণসম সিন্দুকের পাশে,
শয়ন করিতে যায় আরামের আশে।
সহসা স্বপন দেখি জাগরিত হয়,
মনে করে বুঝি চোরে চুরি ক‘রে লয়।
তাড়াতাড়ি উঠে’ দেখে দ্বার রুদ্ধ আছে,
ত্বরা করি ছুটে’ যায় সিন্দুকের কাছে।
দেখিল সিন্দুক তা’র আছে নিরাপদ,
ঘুমা’তে না পারে তবু চিন্তিয়া বিপদ।
জনক-জননী-হীন বালক যখন,
দাঁড়াইয়া তা’র কাছে করয়ে রোদন।
সে সময় কৃপণের পাষাণ হৃদয়,
তাহার নয়ন-জলে আর্দ্র নাহি হয়।
বিধবা রমণী যদি হাহাকার করে,
দেখিয়া না হয় দয়া তাহার অন্তরে।
নিরাশ্রয় দীন যদি মরে অনাহারে,
তথাপি সে এক কড়া দিবে না তাহারে
প্রাণসম অর্থরাশি রাখিয়া যতনে,
নিরন্তর বদ্ধ থাকে আপন ভবনে।
যখন শমন আসি বিস্তারি বদন,
গ্রাস করে কৃপণেরে হায় রে! তখন,
তা’র শোকে নেত্রজল বিসর্জ্জন করে,
কা’রেও না দেখি হেন সংসার ভিতরে।
তখন সে ধনরাশি থাকে বা কোথায়,
এক কপর্দকো তা’র সঙ্গে নাহি যায়।
যা’র তরে কষ্ট ক’রে কাল কাটাইল,
তাহাও সময়ক্রমে অন্যের হইল।

****************************









*
অহঙ্কার
কবি নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্ন
কবির ১৩০২ বঙ্গাব্দে (১৮৯৬) সালে প্রকাশিত, ইংরেজী পদ্য গ্রন্থ অবলম্বনে রচিত “নীতিকণা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশিত ১৬.৫.২০২৬।

উচ্চ বংশে জন্ম ব’লে কেন গর্ব্ব কর?
ধন আছে ব’লে কেন অহঙ্কারে মর?
বংশ, পদ, মান, ধন, সকলি অসার,
মিছে সেই সকলের কর অহঙ্কার।
ধরিয়া ভীষণ মূর্ত্তি শমন যখন,
প্রসারিবে দুই কর সংহার কারণ।
ধন, মান, পদ আদি থাকিবে কোথায়?
তাহারা কি বাঁচাইতে পরিবে তোমায়?
তা’দের তরেই হও মহা যত্নবান,
জান না কি সে সকল ছায়ার সমান?
শমনের আলিঙ্গন বড়ই ভীষণ,
তা হ’তে নিস্তার কি হে পায় কোন জন?
তপনের তাপে যা’রা পরিশ্রম করে,
লালায়িত সদা যা’রা উদরের তরে।
তা’দিগে যে মূর্ত্তি ধ’রে সংহারে শমন,
সেই মূর্ত্তি ধ’রে হরে অন্যেরো জীবন।
এ জগতে তা’র কাছে সমান সবাই,
ছোট বড় ব’লে কা’রো বিভিন্নতা নাই।
সসাগরা ধরা জয় করি বাহুবলে,
যশের পতাকা যেই তুলে ভূমণ্ডলে।
বীরত্বে উপমা যা’র নাহিক ধরায়,
মণির মুকুট শোভে যাহার মাথায়।
যা’র পদ শত শত নৃপতি পূজিত,
তাহাকেও হ’তে হয় কাল-কবলিত।
পরাক্রমে পৃথিবী যে করিয়াছে জয়,
মৃত্যুর নিকটে সেও পরাজিত হয়।
নয়ন মুদিলে ভবে কেবা বল কা’র?
তবে আর মিছে কেন কর অহঙ্কার?
প্রভুত্ব, বীরত্ব কিম্বা পদ, মান, ধন,
সে সকল সঙ্গে ল’য়ে যায় কোন জন?
সতত ধর্ম্মের পথে করিয়া গমন,
যাহারা সুকৃত ধন করে উপার্জ্জন।
চিরস্থায়ী তাহাদের হয় সেই ধন,
ধ্বংস নাহি হয় তা’র হ’লেও নিধন।

****************************