কবি সোমনাথ রায় এর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
কাঁকড়া কল্যাণ
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
আমার খাবার হবে বলে আজ একটা কাঁকড়া ঘরে উঠে এলো।
হাঁড়ি চাঁপা দিয়ে আমি ওকে বন্দী করে রেখেছি অনেকক্ষণ
হাঁড়িটা কিছুটা ফাঁক করে দেখি ইষ্টনাম জপছে হাঁটু মুড়ে।
কিছুক্ষণ শিকার ও শিকারীর খ্যালাটুকু খেলে নিতে নিতে
আমার স্নানের বেলা এসে যায়, তাড়া দেয় আমার শিকারি—
আমাকে নির্দেশ দেয়, আমি ভেঙে ফেলি তার আলিঙ্গন বাহু।
এমন সুযোগ বেশি আসে না, থানায় পুলিশের বেয়াদপি মনে পড়ে
মানবাধিকার চাপে এখন অবশ্য তারা সমাজবিরোধীদের কফি দিয়ে বসায় টেবিলে।
নিতান্ত জঙ্গলে থাকি, কাকে মারি কাকে খাই, কারোর দ্যাখার কথা নয়।
কাঁকড়ার কল্যাণে আমি দুপুরে দু-মুঠো ভাত বেশি খেয়ে ফেলি—
ডাক্তার বলেন নাকি এর ফলে ক্যানসার হবে না আর আমার কখনো
কিন্তু অপরাধবোধ বেড়ে গেলে হৃদযন্ত্র থেমে যেতে পারে।
****************************
হাঁড়ি চাঁপা দিয়ে আমি ওকে বন্দী করে রেখেছি অনেকক্ষণ
হাঁড়িটা কিছুটা ফাঁক করে দেখি ইষ্টনাম জপছে হাঁটু মুড়ে।
কিছুক্ষণ শিকার ও শিকারীর খ্যালাটুকু খেলে নিতে নিতে
আমার স্নানের বেলা এসে যায়, তাড়া দেয় আমার শিকারি—
আমাকে নির্দেশ দেয়, আমি ভেঙে ফেলি তার আলিঙ্গন বাহু।
এমন সুযোগ বেশি আসে না, থানায় পুলিশের বেয়াদপি মনে পড়ে
মানবাধিকার চাপে এখন অবশ্য তারা সমাজবিরোধীদের কফি দিয়ে বসায় টেবিলে।
নিতান্ত জঙ্গলে থাকি, কাকে মারি কাকে খাই, কারোর দ্যাখার কথা নয়।
কাঁকড়ার কল্যাণে আমি দুপুরে দু-মুঠো ভাত বেশি খেয়ে ফেলি—
ডাক্তার বলেন নাকি এর ফলে ক্যানসার হবে না আর আমার কখনো
কিন্তু অপরাধবোধ বেড়ে গেলে হৃদযন্ত্র থেমে যেতে পারে।
****************************
দায়ভার
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
হারামি মনস্তত্ত্বের অসুখে ভুগেছি
কোথাও বিশ্বাস নেই; না শিল্পে না তত্ত্বে
আত্মহননের সুখে শুধু বেঁচে আছি
আগুন বহন করে শবদেহে হেঁটে যাচ্ছি একা
শ্মশান পায়ের নীচে গড়াগড়ি খাচ্ছে
কোলাকুলি করে করে পাঁজরের হাড় সরে গ্যাছে
হৃদপিণ্ড অপচয়ে কবন্ধ হয়েছি ঘরে ঘরে
বাষ্পবিন্দুস্পর্শ টের পাইনি কারোর
অস্তিত্ববাদের ছেঁড়া কৌপীন পরনে
খুললেই উলঙ্গ হবো
জরুরী মুহূর্তে সেটা
মান্দাসে চাপিয়ে জলে ভাসিয়ে দিয়েছি
নদী তার দায়ভার বহন করুক
স্রোতে বাধা পেলে হাত বাড়ানোর কথা ভাবা যাবে।
****************************
কোথাও বিশ্বাস নেই; না শিল্পে না তত্ত্বে
আত্মহননের সুখে শুধু বেঁচে আছি
আগুন বহন করে শবদেহে হেঁটে যাচ্ছি একা
শ্মশান পায়ের নীচে গড়াগড়ি খাচ্ছে
কোলাকুলি করে করে পাঁজরের হাড় সরে গ্যাছে
হৃদপিণ্ড অপচয়ে কবন্ধ হয়েছি ঘরে ঘরে
বাষ্পবিন্দুস্পর্শ টের পাইনি কারোর
অস্তিত্ববাদের ছেঁড়া কৌপীন পরনে
খুললেই উলঙ্গ হবো
জরুরী মুহূর্তে সেটা
মান্দাসে চাপিয়ে জলে ভাসিয়ে দিয়েছি
নদী তার দায়ভার বহন করুক
স্রোতে বাধা পেলে হাত বাড়ানোর কথা ভাবা যাবে।
****************************
ফর্সাকাচ
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
আর কিছুটা এগিয়ে গেলে অন্ধকার শেষ
হাত বাড়িয়ে নাও
সর্বভুক রক্তপাপ সমস্তটা আমি নামিয়ে দেবো
খালি পাঁজর হাতে দাঁড়িয়ে আছি ভরিয়ে দেবো
আর কিছুটা এগিয়ে গেলে অন্ধকার শেষ
তখন আমি নতুন আর এক গল্প হবো
মেঘ যামিনী গাছের ফাঁকে রাত পাখিরা বড্ড একা; তারা
এগিয়ে এলো, উড়িয়ে দিলো পালকগুলো উড়িয়ে দিলো মন
মেঘ উড়ছে
পাপের গাড়ি বোঝাই করে কোথায় যেন বৃষ্টি হলো খুব
তারপরেই, পাহাড় থেকে ঝরনা ভাঙা মন্ত্র উঠে এলো
তার পেছনে নৌকানদী
এগিয়ে দিলো চিতা আমার পুড়িয়ে দিলো পাপ
এটুকখানি এগিয়ে এসে অন্ধকার শেষ
এখন আমি নতুন আর এক গল্প হবো ফর্সাকাচে।
****************************
হাত বাড়িয়ে নাও
সর্বভুক রক্তপাপ সমস্তটা আমি নামিয়ে দেবো
খালি পাঁজর হাতে দাঁড়িয়ে আছি ভরিয়ে দেবো
আর কিছুটা এগিয়ে গেলে অন্ধকার শেষ
তখন আমি নতুন আর এক গল্প হবো
মেঘ যামিনী গাছের ফাঁকে রাত পাখিরা বড্ড একা; তারা
এগিয়ে এলো, উড়িয়ে দিলো পালকগুলো উড়িয়ে দিলো মন
মেঘ উড়ছে
পাপের গাড়ি বোঝাই করে কোথায় যেন বৃষ্টি হলো খুব
তারপরেই, পাহাড় থেকে ঝরনা ভাঙা মন্ত্র উঠে এলো
তার পেছনে নৌকানদী
এগিয়ে দিলো চিতা আমার পুড়িয়ে দিলো পাপ
এটুকখানি এগিয়ে এসে অন্ধকার শেষ
এখন আমি নতুন আর এক গল্প হবো ফর্সাকাচে।
****************************
হলুদ জবানবন্দী
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
আপনারা আজ ক্ষমা করুন আমাকে
ফুলের ঝাঁঝালো ঘ্রাণে ভীষণ অসুস্থ
কেউ নেই ঘরে, কোনো মধুচোর নেই
অস্থির ধৃষ্টতা নিয়ে বিকৃত অসুখ
বহন করেছি একা; কবিতা বিমুখ
হয়েছে, কল্পিত সমুদ্রে লবন বমনের পর
হিম শরীরকে হামাগুড়ি দিয়ে টেনেছি কলমে
নিজের জবানবন্দী নিজেই চেয়েছি
মেঘমুখ আকাশের নীচে ঠোঁটে থুতু নিয়ে পাঠক দাঁড়িয়ে
বিচারাগারের দেওয়ালে পিঠ রেখে পৃথিবীর
বিখ্যাত কবিগুরুরা—আমিই দর্পণ
মুখ শুঁকে দেখে যান ধর্মাবতাররা, জিবে মদগন্ধ নেই
আগুনে গলিত রক্তলৌহক্ষত বুকের গভীরে
কোন সত্য বাক্য উচ্চারণে কাব্যে নিমগ্ন রয়েছি
হয় হত্যা করো, এখনই শহীদ হই, নয় কথা শোনো বন্ধু
নারীসঙ্গে টের পাই নিয়তির গান—
নিঃসঙ্গের অত্যাচারে যে মানুষ বিকৃত হয়েছে
সঙ্গসুখে তার কোনো অসুখ থাকে না।
****************************
ফুলের ঝাঁঝালো ঘ্রাণে ভীষণ অসুস্থ
কেউ নেই ঘরে, কোনো মধুচোর নেই
অস্থির ধৃষ্টতা নিয়ে বিকৃত অসুখ
বহন করেছি একা; কবিতা বিমুখ
হয়েছে, কল্পিত সমুদ্রে লবন বমনের পর
হিম শরীরকে হামাগুড়ি দিয়ে টেনেছি কলমে
নিজের জবানবন্দী নিজেই চেয়েছি
মেঘমুখ আকাশের নীচে ঠোঁটে থুতু নিয়ে পাঠক দাঁড়িয়ে
বিচারাগারের দেওয়ালে পিঠ রেখে পৃথিবীর
বিখ্যাত কবিগুরুরা—আমিই দর্পণ
মুখ শুঁকে দেখে যান ধর্মাবতাররা, জিবে মদগন্ধ নেই
আগুনে গলিত রক্তলৌহক্ষত বুকের গভীরে
কোন সত্য বাক্য উচ্চারণে কাব্যে নিমগ্ন রয়েছি
হয় হত্যা করো, এখনই শহীদ হই, নয় কথা শোনো বন্ধু
নারীসঙ্গে টের পাই নিয়তির গান—
নিঃসঙ্গের অত্যাচারে যে মানুষ বিকৃত হয়েছে
সঙ্গসুখে তার কোনো অসুখ থাকে না।
****************************
রঙের উৎসব
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
আমার মাথায় তুমি হাত দিলে
পৃথিবীর তারারা আমার মুখ দ্যাখে
না দিলে অন্ধকারের মধ্যে ডুবে থাকে
আমার অস্তিত্ব। বলো উদার হবে কি?
তোমার প্রশ্র্য় পেলে আমি অনায়াসে
যাবতীয় আবর্জনা মুহূর্তে পুড়িয়ে
শুরু করে দিতে পারি রঙের উৎসব
না পেলে বিবর্ণ হব, তুমি সাক্ষী থেকো।
তোমার ছায়ার সঙ্গে ছায়া মেখে হেঁটেছি যেদিন
বুঝেছি আকাশ আর মাটি পৃথিবীর
কতখানি কাছাকাছি অক্ষর যাপনে।
মানচিত্র ভেঙে দাও আমার জীবনে
পৃথিবীর নাগরিক হতে চাই আমি
তুমি মুক্তি দিলে আমি পাখি হতে পারি।
****************************
পৃথিবীর তারারা আমার মুখ দ্যাখে
না দিলে অন্ধকারের মধ্যে ডুবে থাকে
আমার অস্তিত্ব। বলো উদার হবে কি?
তোমার প্রশ্র্য় পেলে আমি অনায়াসে
যাবতীয় আবর্জনা মুহূর্তে পুড়িয়ে
শুরু করে দিতে পারি রঙের উৎসব
না পেলে বিবর্ণ হব, তুমি সাক্ষী থেকো।
তোমার ছায়ার সঙ্গে ছায়া মেখে হেঁটেছি যেদিন
বুঝেছি আকাশ আর মাটি পৃথিবীর
কতখানি কাছাকাছি অক্ষর যাপনে।
মানচিত্র ভেঙে দাও আমার জীবনে
পৃথিবীর নাগরিক হতে চাই আমি
তুমি মুক্তি দিলে আমি পাখি হতে পারি।
****************************
কবির নিয়তি জানা সম্ভব হবে না
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
আজ ভোরবেলা ঘুম থেকে তুলে মুকুন্দ গায়েন
যে কবিতা শোনালেন তা আমাকে সুন্দরবনের
নদীতে ভাসিয়ে দিলো, দূরত্ব কী করে এত কমে
ভাবতে ভাবতে জোয়ার ফুরিয়ে ভাটা এসে কানে বিঁধছে
ভাষা তার জলজসভ্যতা থেকে ভূতুরে শহর
ফাঁক করে দ্যাখাচ্ছে কবির কোনো বাসভূমি নেই
যে কোনো গাছের নীচে বসে ছায়া ভোগ করা যায়
দেখতে হবে, পাখিদের ঘুম নষ্ট না হলেই হলো
সাঁতার কাটাও যেতে পারে যে কোনো নদীতে
বুঝতে হবে, স্রোত পক্ষে না বিপক্ষে তীব্র ভাসমান
ডুব সাঁতারেও যেতে পারো বা মরতেও পারো ডুবে
কবির নিয়তি জানা কোনোদিন সম্ভব হবে না।
****************************
যে কবিতা শোনালেন তা আমাকে সুন্দরবনের
নদীতে ভাসিয়ে দিলো, দূরত্ব কী করে এত কমে
ভাবতে ভাবতে জোয়ার ফুরিয়ে ভাটা এসে কানে বিঁধছে
ভাষা তার জলজসভ্যতা থেকে ভূতুরে শহর
ফাঁক করে দ্যাখাচ্ছে কবির কোনো বাসভূমি নেই
যে কোনো গাছের নীচে বসে ছায়া ভোগ করা যায়
দেখতে হবে, পাখিদের ঘুম নষ্ট না হলেই হলো
সাঁতার কাটাও যেতে পারে যে কোনো নদীতে
বুঝতে হবে, স্রোত পক্ষে না বিপক্ষে তীব্র ভাসমান
ডুব সাঁতারেও যেতে পারো বা মরতেও পারো ডুবে
কবির নিয়তি জানা কোনোদিন সম্ভব হবে না।
****************************
মা ও শেষ পরম্পরা
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
শীতের রোদ্দুরে বসে মা বড়ি দিচ্ছেন
শুদ্ধবস্ত্রে।
ভোর থেকে ডাল বেটেছেন
হিং কুমড়ো মিশিয়ে
মায়ের আকাশে ফুটে ওঠে সাদা নরম নক্ষত্র।
ঝোলের ভাজার দু-রকম
নজর এড়াতে টিয়া পাখির ঠোঁটের মতো লাল কাঁচালঙ্কা
গুঁজে দিয়েছেন
ঠাকুমা দিদিমা ঠিক এভাবেই সাজাতেন তাঁদের আকাশ।
তাঁদের আনন্দ পরিশ্রম পৌঁছে যেতো
দূরদূরান্তের
আত্মীয়ের ভাতের থালায়।
****************************
শুদ্ধবস্ত্রে।
ভোর থেকে ডাল বেটেছেন
হিং কুমড়ো মিশিয়ে
মায়ের আকাশে ফুটে ওঠে সাদা নরম নক্ষত্র।
ঝোলের ভাজার দু-রকম
নজর এড়াতে টিয়া পাখির ঠোঁটের মতো লাল কাঁচালঙ্কা
গুঁজে দিয়েছেন
ঠাকুমা দিদিমা ঠিক এভাবেই সাজাতেন তাঁদের আকাশ।
তাঁদের আনন্দ পরিশ্রম পৌঁছে যেতো
দূরদূরান্তের
আত্মীয়ের ভাতের থালায়।
****************************
রঙের তামাশা
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
মৃত্যু নিয়ে এখনও তামাশা করছ রাস্তায় দাঁড়িয়ে
রং খেলছ যে যেমন মৌতাতে রয়েছ
নীল লাল হলুদ বেগুনি কারও হাত সাদা নয়।
মাটি শুঁকে শুঁকে মেঘ ওড়াউড়ি করে
বৃষ্টি যে কখন কোন্ নদীকে বাহন করে সমুদ্রে পৌঁছবে
বালিকা সেসব জানে না, সে শুধু জানে
বৃষ্টি হলে পুকুরে সাঁতার দেবে এপাড় ওপাড়
স্কুলে গিয়ে ডিম না পাক, খিচুড়ি পাবে।
সে জানত না কালো মেঘ ঘিরে ধরবে তাকে
কাঠের আগুন জ্বেলে খিচুড়ি বানাবে
বনমানুষেরদল, তারা গিলে ফেলবে তাদের থাবায়
তারপর চারদিক আলো করে শুরু হবে
রঙের তামাশা, ঠিক আর একটা বনভোজনের
খেলা শুরু না-হওয়া পর্যন্ত।
****************************
রং খেলছ যে যেমন মৌতাতে রয়েছ
নীল লাল হলুদ বেগুনি কারও হাত সাদা নয়।
মাটি শুঁকে শুঁকে মেঘ ওড়াউড়ি করে
বৃষ্টি যে কখন কোন্ নদীকে বাহন করে সমুদ্রে পৌঁছবে
বালিকা সেসব জানে না, সে শুধু জানে
বৃষ্টি হলে পুকুরে সাঁতার দেবে এপাড় ওপাড়
স্কুলে গিয়ে ডিম না পাক, খিচুড়ি পাবে।
সে জানত না কালো মেঘ ঘিরে ধরবে তাকে
কাঠের আগুন জ্বেলে খিচুড়ি বানাবে
বনমানুষেরদল, তারা গিলে ফেলবে তাদের থাবায়
তারপর চারদিক আলো করে শুরু হবে
রঙের তামাশা, ঠিক আর একটা বনভোজনের
খেলা শুরু না-হওয়া পর্যন্ত।
****************************
যে বাঁশি হারিয়ে গ্যাছে
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
গঙ্গা থেকে মোহনা পেরিয়ে আমি সাগরে ঢুকেছি
মাথার ওপরে পাক খাচ্ছে শঙ্খচিল
বাতাস তোমার ওড়না উড়িয়ে এনেছে
আমার গলায়—আমি ঘুরে দেখে ফেলেছি তোমার ছোট্ট তিল
ভীষণ অবহেলায় কষ্টে থাকা চিবুকের পাশে।
চিকন চুলের কোনো বাধা নেই, সে যখন তখন ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকে—
সমুদ্রের বুকে যত ঢেউ, আমার বুকেও তত
তোমার বুকে কি স্তব্ধ আকাশ! গোপন অহংকারে
তুমি তাকালে না, চেয়ে থাকলে দূরে দৃষ্টি-অগোচরে
কেউ ডাকল তোমাকে পেছন থেকে, নাম জানা হয়ে গ্যালো, রাধা।
হাসলে না, রাগলে না, ওড়না গুটিয়ে কেবিনে ফিরে যেতে
পলক বুলিয়ে গেলে, ঢেউ ভাঙা সাদা
বুদ্বুদ লুটিয়ে পড়ল দোলনাতলে সাগরশয্যায়
ম্লান হয়ে গ্যালো রোদ আসন্ন সন্ধ্যায়।
জ্যোৎস্না রাতে ডেকের ওপরে বাঁধা হ্যামোকে শুয়েছি
জাহাজবাড়িটা দুলে দুলে ভেসে চলেছে দক্ষিণে
রেলিং-এ হেলান দিয়ে ছায়ামূর্তিটি কে
ঝলসানো চন্দ্ররেখায় তাকিয়ে রয়েছে একা হিমেল আশ্বিনে?
রাধা, বলে তাকে ডেকে ফেলেছি সহসা
বিচলিত মুখ ঘুরে তাকিয়েছে, স্থির
দৃষ্টিপাতে দু-খানি জলপ্রপাত; আমি তার উৎসের সন্ধানে
উঠেছি হ্যামোক থেকে, যেখানে চৌচির
হয়েছে ফাটল তার কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছি
শান্ত পদক্ষেপে, যে বাঁশি ভেঙেছে, তার তীব্র সুর
এখনো পেচিয়ে আছে রাধাকে, গমকে
উথলে ওঠে তার রেশ, স্মৃতির অঙ্কুর
গলে গলে ঝরে পড়ে লবণ অতীত—
সমুদ্রও কি তাই এত লবণাক্ত ধরিত্রীর ব্যথা সমৃদ্ধ পতিত!
ক্রমে আমাদের গাঢ় হয়েছে বন্ধুত্ব
বিদ্যুৎ চমকে বৃষ্টি নেমেছে সাগরে
ধুয়ে যাচ্ছে ক্লান্ত লবণের দাগ, ভিজে যাচ্ছে চাঁদ
রাধার আবদারে
সকালবেলায় বাঙ্ক থেকে বেরিয়েছি
রাধার কেবিনে দরজা বন্ধ
সারাটা দুপুর দ্যাখা গ্যালো না
তবে কি বিগত রাত মিথ্যা ছিল? অথবা ছিলাম আমি অন্ধ?
বিকেলে সাহস ভরে দরজা ঠেলে ঢুকেছি কেবিনে
শুয়ে আছে রাধা, তার শিয়রে বাবা-মা
কাল রাত থেকে জ্বর
বৃষ্টিতে ভেজার ফলে আমাদের দু-জনের ভিজেছিল জামা।
আমাকে বসাল তার বিছানায় ডেকে
আমি তো আড়ষ্ট, তবু বসলাম দূরত্ব বজায় রেখে।
শহীদ-স্বরাজ দ্বীপে নেমে যেতে হবে আমাদের
একই ট্যুরিস্ট গ্রুপ, কেটে যাবে ক’দিন পোর্টব্লেয়ারে, আরও অন্য দ্বীপে।
তবু কলকাতার ঠিকানাটা রেখে দিতে হয়—
বন্দরে পা রেখে বাবা আর মা’র সঙ্গে রাধা উঠে গ্যালো জিপে।
যাবার সময় টা টা করেছিল হাসিমাখা ফর্সা হাত নেড়ে
আমিও নেড়েছিলাম কালাপানিমাখা
সেই হাত, যে হাত পারেনি ধরে রাখতে কোনো বাঁশি
সুরের আকাশে উড়ানের পথে বারংবার ভেঙে গ্যাছে পাখা।
সেলুলার জেলে পৌঁছে যখন অত্যাচারিত শহীদের কথা মনে পড়ে
তাঁদের স্মৃতিতে জ্বলা প্রদীপের আলোর পেছনে
দেখি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই মুখ!
বিকেলের আলো কমে এসেছে জিমখানার মাঠে ততক্ষণে
পায়ে পায়ে হেঁটে এসে বসেছি এবারডিনে, সমুদ্রকিনারে
দূরে হাসি-মশকরা চলছে রাধাদের পরিবারে।
লিটল আন্দামানের জঙ্গলে জলপ্রপাত দ্যাখার সময়
দলছুট রাধা এসে দাঁড়িয়েছিল পাশে
জোঁক যেন, আমার শরীর থেকে রক্ত চুষে নিতে
চায় সে—
বনানীর ছায়াঘন অন্ধকারে যখন বিচ্ছিন্ন করি তাকে
দেখি তার সর্বাঙ্গ রক্তিম, পাকা আপেলের মতো
প্রপাতের ধারাস্রোতে চোখমুখ ধুয়ে উঠে গ্যালো
আমার শরীরে, ঠোঁটে পড়ে রইল অবসাদ, ক্ষত।
নিকোবরীদের দেশে তাদের পোশাক পরে বেরিয়েছে রাধা
পিগমিলিয়ন পয়েন্টের চড়াই-উৎরাই পথে
ছাপা স্কার্ট শায়া আর বুক-চেরা ব্রা-হীন গেঞ্জিতে
বেশ মানিয়েছে পরিব্রাজক লেদারব্যাক কচ্ছপের নিশীথ-সৈকতে।
দূরে দ্যাখা যায় ইন্দোনেশিয়ার আলো
ওয়াচ টাওয়ারে উঠে মনে হয় রাধা বুঝি আমার হারানো বাঁশি আবার বাজালো।
উত্তর আন্দামানের পথে রাধা আমাকে বলেছে
চলো কোনো ফাঁকা দ্বীপে লুকোই দু-জনে
গাছের ওপরে বেঁধে নেবো রাত্রিনিবাসের চালা
জারোয়া, শম্পেন, ওঙ্গিদের মতো বেড়াবো পোশাকহীন বনে বনে
সমুদ্রের জলে হোড়ি চড়া শিখে নেবো
গর্ত কেটে জমাবো বৃষ্টির জল, যা হবে পানীয়
ইঁদুরের দৌড় থেকে ফিরে যাবো আদিম মানবে
কৃত্রিম আরোহণের এতখানি পথ থেকে এবার অবরোহণ করি চলো প্রিয়!
রাধার কথায় ভীত বুক কেঁপে উঠেছে আমার
এখন সম্মুখে রোগভোগের সময়
বিছানা পাল্টালে ঘুম নষ্ট হয়ে যায়
এ বয়সে এতটা সাহস, এত ঝুঁকি ঠিক নয়।
আমাকে বলেছে রাধা, ভীতু, কাপুরুষও
আমিও বলেছি তাকে, তুমি উন্মাদিনী কম নও!
হ্যাভলকে রাধাকে দেখে মনে হতো সমুদ্রসুন্দরী
সে দূরের ঢেউ মেখে উঠে আসত বালুকাবেলায়
সাঁতারের উপযোগী কসটিউম পরে
রঙিন মাছের মতো আমি তাকে দেখেছি জ্যোৎস্নায়
সমুদ্রের গর্ভজাত প্রবালারণ্যের
খণ্ড কোরালের ভিজে মায়া বন্দী করেছি তাঁবুতে
নির্জন গভীর রাতে গানে কবিতায় আলিঙ্গনে
আমাদের পেয়েছিল পেত্নিতে ও ভূতে।
পাশের তাঁবুতে ঘুমে কাতর তখন
রাধার বাবা-মা, তারা কিছুই জানেনি
ঢেউলগ্ন সৈকত-তাঁবুতে স্বর্গযাপনের কথা—
ভিজে পায়ে ভোরবেলা ফিরেছি প্রাতঃভ্রমণ সেরে, কোনো সন্দেহ করেনি।
মহুয়াগাছের কাছে আমরাও পেয়েছিলাম তমালের ছায়া
কিছুক্ষণ আলাদিন ভেবেছি নিজেকে আর রাধাকে আলেয়া।
প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রস্তুত জাহাজ
হ্যাডো জেটি লোকারণ্য, শুধু রাধা নেই।
তারা ফিরবে না এই এম. ভি. হর্ষবর্ধনে
তাদের টিকিট কাটা বিমানে, পৌঁছবে আজকেই
তিনদিন তিনরাত সমুদ্রবাতাস মেখে কাটাবো একাকী
যেভাবে আগেও কাটিয়েছি বহুবার
সুরের বিচ্ছিন্ন স্মৃতি নিয়ে
পাঁজরে চাপিয়ে রেখে লবণের ভার।
নীলাভ সমুদ্রঘেরা পাহাড় অরণ্য পড়ে থাকে
বিদায় জানিয়ে তাকে ঢুকেছি বাতানুকূল গর্ভকক্ষে
কোথাও উষ্ণতা নেই, শুধু শীতলতা
দারুণ অসহনীয় হয়ে ওঠে এই কৃষ্ণপক্ষে।
বিরহে আমার মতো রাধা কি আকুল হবে আজ
যখন মেঘের বুক চিরে ভেসে যাবে তাদের উড়োজাহাজ!
পুরনো শহরে গিয়ে খুঁজেছি রাধাকে
ঠিকানা হারিয়ে ফেলে তোলপাড় করেছি বাসরাস্তা ট্রামরাস্তা অলিগলি
কোথাও মেলেনি, কোনদিন তাকে দেখিনি রাস্তায়।
নিজের সমিধ থেকে গড়ে তুলি ভস্মের অঞ্জলি—
যদিও রাধার কাছে পৌঁছবে না জানি
তবুও অশান্ত দৃষ্টিপাত পড়ে থাকে অপেক্ষায়।
ক্ষণে ক্ষণে সাগর ডিঙিয়ে যায় ব্যূহচ্যুত মন
তাকে ভুলে থাকতে মদ্যপান বেড়ে যায়
অথচ ভোলা যায় না, ভাঙা বাঁশি বাজে ভাঙা সুরে।
এক দৃশ্য এক মুখ এক ভাষা এক নৃত্য এক গন্ধ ক্লান্ত করে এই পুরুষত্ব
নিভৃতে ছোবল মারে বিষাক্ত বিদ্রুপ
নীলাম্বর খুঁজি নীল রাধার অস্তিত্ব
আকাশে-বাতাসে নীল সাগরের জলে
শ্মশানে কবরে কিংবা নিঃস্ব নীলাচলে।
সমুদ্র প্রলয় নৃত্যে মেতে উঠল পর্বতসৈকতে
আদিম উপকূলের নিরীহ অঞ্চলে
ভেসে গ্যাছে অসহায় স্বামী ও স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা
পুত্রকন্যা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন দলে দলে।
ভেঙেছে বন্দর কাঠ-কংক্রিটের আবাসন সমূহ স্থাপত্য
সমুদ্রগর্ভের ভয়াবহ ভূকম্পনে উপকূল থেকে দূরে
সমতলে উথালপাথাল পুকুরের জল উঠেছে রাস্তায়।
পৃথিবী চিৎকার করে উঠেছে কোরাসে, আর্ত সুরে—
সমস্ত শবের মধ্যে দেখেছি আমার মুখ আমি
দেখেছি রাধার মুখ মরণ বরণ করে নিতে
ভ্রমণের, মিলনের মাত্র পক্ষকাল পরে সুনামিতাণ্ডবে
বসন্তের পূর্বে শীতে।
এইখানে শেষ করি বিস্ময়ের বেদনায় স্তব্ধ রাধাপর্ব
যে বাঁশি হারিয়ে গ্যাছে তার সুর আর কত খুঁজবো।
****************************
মাথার ওপরে পাক খাচ্ছে শঙ্খচিল
বাতাস তোমার ওড়না উড়িয়ে এনেছে
আমার গলায়—আমি ঘুরে দেখে ফেলেছি তোমার ছোট্ট তিল
ভীষণ অবহেলায় কষ্টে থাকা চিবুকের পাশে।
চিকন চুলের কোনো বাধা নেই, সে যখন তখন ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকে—
সমুদ্রের বুকে যত ঢেউ, আমার বুকেও তত
তোমার বুকে কি স্তব্ধ আকাশ! গোপন অহংকারে
তুমি তাকালে না, চেয়ে থাকলে দূরে দৃষ্টি-অগোচরে
কেউ ডাকল তোমাকে পেছন থেকে, নাম জানা হয়ে গ্যালো, রাধা।
হাসলে না, রাগলে না, ওড়না গুটিয়ে কেবিনে ফিরে যেতে
পলক বুলিয়ে গেলে, ঢেউ ভাঙা সাদা
বুদ্বুদ লুটিয়ে পড়ল দোলনাতলে সাগরশয্যায়
ম্লান হয়ে গ্যালো রোদ আসন্ন সন্ধ্যায়।
জ্যোৎস্না রাতে ডেকের ওপরে বাঁধা হ্যামোকে শুয়েছি
জাহাজবাড়িটা দুলে দুলে ভেসে চলেছে দক্ষিণে
রেলিং-এ হেলান দিয়ে ছায়ামূর্তিটি কে
ঝলসানো চন্দ্ররেখায় তাকিয়ে রয়েছে একা হিমেল আশ্বিনে?
রাধা, বলে তাকে ডেকে ফেলেছি সহসা
বিচলিত মুখ ঘুরে তাকিয়েছে, স্থির
দৃষ্টিপাতে দু-খানি জলপ্রপাত; আমি তার উৎসের সন্ধানে
উঠেছি হ্যামোক থেকে, যেখানে চৌচির
হয়েছে ফাটল তার কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছি
শান্ত পদক্ষেপে, যে বাঁশি ভেঙেছে, তার তীব্র সুর
এখনো পেচিয়ে আছে রাধাকে, গমকে
উথলে ওঠে তার রেশ, স্মৃতির অঙ্কুর
গলে গলে ঝরে পড়ে লবণ অতীত—
সমুদ্রও কি তাই এত লবণাক্ত ধরিত্রীর ব্যথা সমৃদ্ধ পতিত!
ক্রমে আমাদের গাঢ় হয়েছে বন্ধুত্ব
বিদ্যুৎ চমকে বৃষ্টি নেমেছে সাগরে
ধুয়ে যাচ্ছে ক্লান্ত লবণের দাগ, ভিজে যাচ্ছে চাঁদ
রাধার আবদারে
সকালবেলায় বাঙ্ক থেকে বেরিয়েছি
রাধার কেবিনে দরজা বন্ধ
সারাটা দুপুর দ্যাখা গ্যালো না
তবে কি বিগত রাত মিথ্যা ছিল? অথবা ছিলাম আমি অন্ধ?
বিকেলে সাহস ভরে দরজা ঠেলে ঢুকেছি কেবিনে
শুয়ে আছে রাধা, তার শিয়রে বাবা-মা
কাল রাত থেকে জ্বর
বৃষ্টিতে ভেজার ফলে আমাদের দু-জনের ভিজেছিল জামা।
আমাকে বসাল তার বিছানায় ডেকে
আমি তো আড়ষ্ট, তবু বসলাম দূরত্ব বজায় রেখে।
শহীদ-স্বরাজ দ্বীপে নেমে যেতে হবে আমাদের
একই ট্যুরিস্ট গ্রুপ, কেটে যাবে ক’দিন পোর্টব্লেয়ারে, আরও অন্য দ্বীপে।
তবু কলকাতার ঠিকানাটা রেখে দিতে হয়—
বন্দরে পা রেখে বাবা আর মা’র সঙ্গে রাধা উঠে গ্যালো জিপে।
যাবার সময় টা টা করেছিল হাসিমাখা ফর্সা হাত নেড়ে
আমিও নেড়েছিলাম কালাপানিমাখা
সেই হাত, যে হাত পারেনি ধরে রাখতে কোনো বাঁশি
সুরের আকাশে উড়ানের পথে বারংবার ভেঙে গ্যাছে পাখা।
সেলুলার জেলে পৌঁছে যখন অত্যাচারিত শহীদের কথা মনে পড়ে
তাঁদের স্মৃতিতে জ্বলা প্রদীপের আলোর পেছনে
দেখি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই মুখ!
বিকেলের আলো কমে এসেছে জিমখানার মাঠে ততক্ষণে
পায়ে পায়ে হেঁটে এসে বসেছি এবারডিনে, সমুদ্রকিনারে
দূরে হাসি-মশকরা চলছে রাধাদের পরিবারে।
লিটল আন্দামানের জঙ্গলে জলপ্রপাত দ্যাখার সময়
দলছুট রাধা এসে দাঁড়িয়েছিল পাশে
জোঁক যেন, আমার শরীর থেকে রক্ত চুষে নিতে
চায় সে—
বনানীর ছায়াঘন অন্ধকারে যখন বিচ্ছিন্ন করি তাকে
দেখি তার সর্বাঙ্গ রক্তিম, পাকা আপেলের মতো
প্রপাতের ধারাস্রোতে চোখমুখ ধুয়ে উঠে গ্যালো
আমার শরীরে, ঠোঁটে পড়ে রইল অবসাদ, ক্ষত।
নিকোবরীদের দেশে তাদের পোশাক পরে বেরিয়েছে রাধা
পিগমিলিয়ন পয়েন্টের চড়াই-উৎরাই পথে
ছাপা স্কার্ট শায়া আর বুক-চেরা ব্রা-হীন গেঞ্জিতে
বেশ মানিয়েছে পরিব্রাজক লেদারব্যাক কচ্ছপের নিশীথ-সৈকতে।
দূরে দ্যাখা যায় ইন্দোনেশিয়ার আলো
ওয়াচ টাওয়ারে উঠে মনে হয় রাধা বুঝি আমার হারানো বাঁশি আবার বাজালো।
উত্তর আন্দামানের পথে রাধা আমাকে বলেছে
চলো কোনো ফাঁকা দ্বীপে লুকোই দু-জনে
গাছের ওপরে বেঁধে নেবো রাত্রিনিবাসের চালা
জারোয়া, শম্পেন, ওঙ্গিদের মতো বেড়াবো পোশাকহীন বনে বনে
সমুদ্রের জলে হোড়ি চড়া শিখে নেবো
গর্ত কেটে জমাবো বৃষ্টির জল, যা হবে পানীয়
ইঁদুরের দৌড় থেকে ফিরে যাবো আদিম মানবে
কৃত্রিম আরোহণের এতখানি পথ থেকে এবার অবরোহণ করি চলো প্রিয়!
রাধার কথায় ভীত বুক কেঁপে উঠেছে আমার
এখন সম্মুখে রোগভোগের সময়
বিছানা পাল্টালে ঘুম নষ্ট হয়ে যায়
এ বয়সে এতটা সাহস, এত ঝুঁকি ঠিক নয়।
আমাকে বলেছে রাধা, ভীতু, কাপুরুষও
আমিও বলেছি তাকে, তুমি উন্মাদিনী কম নও!
হ্যাভলকে রাধাকে দেখে মনে হতো সমুদ্রসুন্দরী
সে দূরের ঢেউ মেখে উঠে আসত বালুকাবেলায়
সাঁতারের উপযোগী কসটিউম পরে
রঙিন মাছের মতো আমি তাকে দেখেছি জ্যোৎস্নায়
সমুদ্রের গর্ভজাত প্রবালারণ্যের
খণ্ড কোরালের ভিজে মায়া বন্দী করেছি তাঁবুতে
নির্জন গভীর রাতে গানে কবিতায় আলিঙ্গনে
আমাদের পেয়েছিল পেত্নিতে ও ভূতে।
পাশের তাঁবুতে ঘুমে কাতর তখন
রাধার বাবা-মা, তারা কিছুই জানেনি
ঢেউলগ্ন সৈকত-তাঁবুতে স্বর্গযাপনের কথা—
ভিজে পায়ে ভোরবেলা ফিরেছি প্রাতঃভ্রমণ সেরে, কোনো সন্দেহ করেনি।
মহুয়াগাছের কাছে আমরাও পেয়েছিলাম তমালের ছায়া
কিছুক্ষণ আলাদিন ভেবেছি নিজেকে আর রাধাকে আলেয়া।
প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রস্তুত জাহাজ
হ্যাডো জেটি লোকারণ্য, শুধু রাধা নেই।
তারা ফিরবে না এই এম. ভি. হর্ষবর্ধনে
তাদের টিকিট কাটা বিমানে, পৌঁছবে আজকেই
তিনদিন তিনরাত সমুদ্রবাতাস মেখে কাটাবো একাকী
যেভাবে আগেও কাটিয়েছি বহুবার
সুরের বিচ্ছিন্ন স্মৃতি নিয়ে
পাঁজরে চাপিয়ে রেখে লবণের ভার।
নীলাভ সমুদ্রঘেরা পাহাড় অরণ্য পড়ে থাকে
বিদায় জানিয়ে তাকে ঢুকেছি বাতানুকূল গর্ভকক্ষে
কোথাও উষ্ণতা নেই, শুধু শীতলতা
দারুণ অসহনীয় হয়ে ওঠে এই কৃষ্ণপক্ষে।
বিরহে আমার মতো রাধা কি আকুল হবে আজ
যখন মেঘের বুক চিরে ভেসে যাবে তাদের উড়োজাহাজ!
পুরনো শহরে গিয়ে খুঁজেছি রাধাকে
ঠিকানা হারিয়ে ফেলে তোলপাড় করেছি বাসরাস্তা ট্রামরাস্তা অলিগলি
কোথাও মেলেনি, কোনদিন তাকে দেখিনি রাস্তায়।
নিজের সমিধ থেকে গড়ে তুলি ভস্মের অঞ্জলি—
যদিও রাধার কাছে পৌঁছবে না জানি
তবুও অশান্ত দৃষ্টিপাত পড়ে থাকে অপেক্ষায়।
ক্ষণে ক্ষণে সাগর ডিঙিয়ে যায় ব্যূহচ্যুত মন
তাকে ভুলে থাকতে মদ্যপান বেড়ে যায়
অথচ ভোলা যায় না, ভাঙা বাঁশি বাজে ভাঙা সুরে।
এক দৃশ্য এক মুখ এক ভাষা এক নৃত্য এক গন্ধ ক্লান্ত করে এই পুরুষত্ব
নিভৃতে ছোবল মারে বিষাক্ত বিদ্রুপ
নীলাম্বর খুঁজি নীল রাধার অস্তিত্ব
আকাশে-বাতাসে নীল সাগরের জলে
শ্মশানে কবরে কিংবা নিঃস্ব নীলাচলে।
সমুদ্র প্রলয় নৃত্যে মেতে উঠল পর্বতসৈকতে
আদিম উপকূলের নিরীহ অঞ্চলে
ভেসে গ্যাছে অসহায় স্বামী ও স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা
পুত্রকন্যা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন দলে দলে।
ভেঙেছে বন্দর কাঠ-কংক্রিটের আবাসন সমূহ স্থাপত্য
সমুদ্রগর্ভের ভয়াবহ ভূকম্পনে উপকূল থেকে দূরে
সমতলে উথালপাথাল পুকুরের জল উঠেছে রাস্তায়।
পৃথিবী চিৎকার করে উঠেছে কোরাসে, আর্ত সুরে—
সমস্ত শবের মধ্যে দেখেছি আমার মুখ আমি
দেখেছি রাধার মুখ মরণ বরণ করে নিতে
ভ্রমণের, মিলনের মাত্র পক্ষকাল পরে সুনামিতাণ্ডবে
বসন্তের পূর্বে শীতে।
এইখানে শেষ করি বিস্ময়ের বেদনায় স্তব্ধ রাধাপর্ব
যে বাঁশি হারিয়ে গ্যাছে তার সুর আর কত খুঁজবো।
****************************
ভ্রমরজন্ম
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
কবি সোমনাথ রায়
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৫.২০২৬।
তুমি স্বপ্নে ছিলে বলে কাল আমি দুঃস্বপ্ন দেখিনি
নদীতে সাঁতার কাটতে কাটতে আমি ডিঙিয়ে গিয়েছি
শ্মশানের চিতাকাঠ, ঢেউগুলো হল্কা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
যখন অনেক দূরে স্পর্শহীন বয়ে যায় জল
দহন জ্বালার মুখে দ্বার খুলে রাখে দাহপথ
কিছুটা এগিয়ে ফিরে এসে বৃষ্টি খুঁজেছি আকাশে।
আমার ঝলসানো মুখ দেখে আঁতকে উঠেছে দর্পণ
আমি তবু বদ্ধ জলাশয় দেখে কাতর হয়েছি।
শঙ্খ নয়, দীর্ঘশ্বাস ছুঁড়ে ছুঁড়ে ভেঙেছি বরফ
তুমি ধারাপথে এসে কোলে তুলে নিয়েছ আমাকে
স্নিগ্ধ প্রলেপের স্পর্শে আমি যত জুড়িয়েছি জ্বালা
ততই বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়েছে তোমার অশ্রুভূমি।
দুঃস্বপ্নের দাহ থেকে আমাকে ভাসানে রাখো তুমি
তোমার প্রতিটি বাঁকে আমার ভ্রমরজন্ম হোক।
****************************
নদীতে সাঁতার কাটতে কাটতে আমি ডিঙিয়ে গিয়েছি
শ্মশানের চিতাকাঠ, ঢেউগুলো হল্কা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
যখন অনেক দূরে স্পর্শহীন বয়ে যায় জল
দহন জ্বালার মুখে দ্বার খুলে রাখে দাহপথ
কিছুটা এগিয়ে ফিরে এসে বৃষ্টি খুঁজেছি আকাশে।
আমার ঝলসানো মুখ দেখে আঁতকে উঠেছে দর্পণ
আমি তবু বদ্ধ জলাশয় দেখে কাতর হয়েছি।
শঙ্খ নয়, দীর্ঘশ্বাস ছুঁড়ে ছুঁড়ে ভেঙেছি বরফ
তুমি ধারাপথে এসে কোলে তুলে নিয়েছ আমাকে
স্নিগ্ধ প্রলেপের স্পর্শে আমি যত জুড়িয়েছি জ্বালা
ততই বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়েছে তোমার অশ্রুভূমি।
দুঃস্বপ্নের দাহ থেকে আমাকে ভাসানে রাখো তুমি
তোমার প্রতিটি বাঁকে আমার ভ্রমরজন্ম হোক।
****************************
