কবি অজিত বাইরীর কবিতা
*
করতলে ফুটুক
অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৭.২০১৭


ভেতরে ভেতরে ছট্ ফটাচ্ছি
ডানা-ঝাড়া পাখির মতো ;
যতক্ষণ না উগ্ রে দিতে পারছি
ফোঁটা কতক রক্ত |

রক্ত তো কবিতারই  অপর নাম –
রক্ত দিয়ে ফোটানো গোলাপ |
আমি সেই গোলাপ ধারণ করেছি
বুকের ভেতরে ;  নিবের ডগে
তুলে আনতে চাই অক্ষরে |

ভেতরে ভেতরে ছট্ ফটাচ্ছি ;
তুলে দিতে চাই ফোঁটা কতক রক্ত |
তুমি হাত পাতো  ; করতলে
তোমার ফুটুক বিশুদ্ধ গোলাপ |

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ডাক
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.১১.২০১৮

দিগন্ত আমায় ডাকে,  আমি যাই
অনন্ত আমায় ডাকে,  আমি যাই
যাবার আগে জেনে যাই,  পাখি-ওড়া আকাশ
নেমে এসেছে আমার দুয়ারে।
যাবার আগে জেনে যাই,  পশ্চিমে
মেঘে মেঘে লেগেছে সোনা রঙ।
যাবার আগে দেখে যাই
মানুষের মুখে একচিলতে হাসি।

যাবার আগে যদি উসকে দিতে
না-পারি স্মৃতির সলতে, যদি বৃষ্টি
ঝরাতে না-পারি মানুষের বুকে ; তবে কেন
এ পৃথিবীতে এ জন্মে আসা !

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পরি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.১১.২০১৮

আজ গুরুপূর্ণিমায় চমত্কার গোল
চাঁদ উঠেছে ছাদের কার্নিশে।
যে মেয়েটি ধর্ষিতা হয়ে খুন হয়েছিল—
পরি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রালোকে।

আমি তার মুখের লাবণ্য পড়ি ;
স্বেদ বিন্দুগুলি মুছে গেছে শুভ্র কিরণে।
সন্ত্রাস দিয়ে যারা সাজিয়েছিল বাসর ;
মুখ তাদের ঝলসে গেছে চিতার আগুনে।
যে মেয়েটি ধর্ষিতা হয়ে খুন হয়েছিল –
পরি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রালোকে।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কুসুমপুর
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.১১.২০১৮

মনের ভিতর বাজতে থাকে কুসুমপুর কুসুমপুর।
কুসুমপুর কোথায়,  এই পৃথিবীর কোন কিনারে
আমার কোন ধারণা নেই।

কিন্তু কুসুমপুর শব্দটা মনে পড়লেই
বুকের ভিতর ঝমঝম বাজতে থাকে রেল ব্রিজ
দিগন্তের কাছাকাছি উড়তে থাকে অলীক পাখিরা
আর আমি স্বপ্নের ভিতর পার হয়ে যাই
একের-পর-এক গতজন্মের চেনা শহর।

কুসুমপুর কী আমার আরেক ভালবাসার দেশ ?
কুসুমপুর কী কবিতার মতো নিবিড় এক গ্রাম ?
কখন যে বের হয়েছি কুসুমপুরের উদ্দেশ্যে
রাত ভোর করে আবার তো সন্ধ্যা গড়াল।

কুসুমপুর, কুসুমপুর, আশ্চর্য এক নামের জাদু
তৃষ্ণাকাতর মৃগের মতো আমাকে শুধু
ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায় ; কোথায়, কত কত দূর—
কুসুমপুর !

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভুল ছন্দে
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.১১.২০১৮


ভুল ছন্দে লেখা কবিতার মতো কেন তুমি আসো,
.                                 কেন ফিরে যাও ?
আমার অবসাদ-বিষাদ আমায় জড়িয়ে রাখে
.                                  শ্রাবণ-মেঘের মতো।
নিজের ভিতরে শুনি বৃষ্টি ঝরার শব্দ।

কোথাও সরোদ বাজে, তারে তারে বেহাগের সুরে
বিকেলের আকাশে ছিঁড়ে যায় বলাকার মালা ;
আমার দু’হাত ভিজে যায় শোকার্ত শিউলির গন্ধে।

আমি কি কখনও শিলাতটে লিখিনি নাম ?
আমি কি কখনও আকাশে বোলাইনি তুলি ?
ফিরে ফিরে আঁকিনি একই মুখচ্ছবি ?

ভুল ছন্দে কেন বারবার এসে, বারবার ফিরে যাও ?

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মায়া আছে বলেই
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.১১.২০১৮


মায়া আছে বলেই তো জড়িয়ে আছি,
মায়া আছে বলেই ঘর-দুয়ার ;
মায়া আছে বলেই স্মৃতির সলতে পাকানো।

মায়া আছে বলেই জড়িয়ে আছি শাখায় মূলে ;
প্রতিসন্ধ্যায় প্রতীক্ষারত দুটি চোখের কাছে
বন্দি হয়ে আছি।
বুকের উপর চুমু রাখা সন্তানের কাছে
ঋণী হয়ে আছি।

মায়া আছে বলেই দক্ষিণে খুলি দরজা—
দু-চার ঝাড় লাগাই টগর, জুঁই, রজনীগন্ধা।
সংসারের স্বাদ বদলাতে চেপে বসি
দূর-পাল্লার ট্রেনে।

মায়া আছে বলেই বেঁধে বেঁধে আছি;
মায়া আছে বলেই দিগন্তকে রেখেছি বুকে।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
জীবন বয়ে যায়
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.১১.২০১৮


জলঙ্গীর তীরে জ্বলে উঠল চিতা ;
সেই প্রথম দু-চোখে দেখা শবদাহ।
দৃশ্যপট ঝাপসা হয়ে আসে ;
আকাশে চারিয়ে যায় ধোঁয়া।

দাহ শেষে বাড়ি ফিরে মনে হল—
চাদ্দিক থেকে শূন্যতা
গ্রাস করতে চাইছে চেতন-সত্তা।

একটা মানুষ ছিল, এখন নেই।

জীবন ও মৃত্যু
কে যে কাকে আড়াল করে দাঁড়ায় !

জলঙ্গী একইরকম বয়ে যায়—
মর্মর জাগে দুই পাড়ের গাছে ;
খেয়ানৌকো করে পারাপার।

দেখা আর হবে না ধুলোর পৃথিবীতে;
জীবন তবু বয়ে যায়, জীবন বয়ে যাবে।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
স্থান-সংকুলান
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.১১.২০১৮


স্থান-সংকুলান নিয়ে এখন থেকে
.                        অতো ভেবো না ;
পাঁচ-সাত বছর পরে যখন বাড়তি
ঘরের প্রয়োজন হবে, ততদিনে
একখানি ঘর নিশ্চিত খালি হয়ে যাবে।

সে-ঘরখানি থেকে সরিয়ে দিও
.                     স্মৃতির ভার,
শুকনো ফুলের মালা জড়ানো ছবিটাও
নামিয়ে রেখো, ব্যবহৃত জিনিষপত্র
ঠেলে সরিয়ে দিও সিঁড়ির নিচে।

এখন থেকে স্থান-সংকুলান নিয়ে
.                        অতো ভেবো না ;
নিশ্চিত জেনো, পাঁচ-সাত বছরে
খালি হয়ে যাবে একখানি ঘর।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কুড়োতে কুড়োতে চলেছি
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.১১.২০১৮

কুড়োতে কুড়োতে চলেছি অস্তরাগ;
মাঠের ওপারে পাখিদের ওড়াউড়ি।
কুড়োতে কুড়োতে চলেছি সন্ধ্যেয়
ফুটে ওঠা নক্ষত্র, ঝাউবনের মাথার উপর
তৃতীয়ার সরু ফালি চাঁদ।
কুড়োতে কুড়োতে চলেছি নদীর জলে
ঝিকমিক তারা, গুলঞ্চঝোপে জোনাকি।

কুড়োনোর শেষ নেই আমার।
কুড়োতে কুড়োতে চলেছি প্রেম, অনুরাগ
কুড়োতে কুড়োতে চলেছি গোধূলি-রঙে
আঁকা আকাশ;  স্বর্গ থেকে
খসে পড়া হিরন্ময় পাখির পালক।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নদীর কাছে, নক্ষত্রের কাছে
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.১১.২০১৮


ভোরের আলো ডেকে বলেছিলঃ
.                চল, চল, নদীর কাছে চল।              
কুয়াশার ভেতর থেকে মোচার খোলের মতো
ধীরে উন্মোচিত হচ্ছিল নৌকোর গলুই,
স্পষ্ট হচ্ছিল ওপার,
পাখিরা পারাপার করছিল দুই দেশের সীমা।
তোমারও কী সাধ ছিল পাখি হবার ?
ছুঁয়ে দেখার দুই পারের পানি ?

সন্ধ্যার নিবিড় আঁধার বলেছিল ;
.                চল, চল, নক্ষত্রের কাছে চল।
কত কালের কত স্মৃতি নিয়ে
জেগে আছে অপলক মাথার উপর।
ওই তো দরিয়াপুরের ঘাট,
হাটখোলার কাছারিবাড়ি, মুন্সিপাড়ার
নাটমন্দির, মোক্তারসাহেবের দরগা।
উঠোনের ভারায় ঝুলছে নীলম্বরি;
মাথার উপর উন্মুক্ত আকাশ।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর