সিতাংশু ভাল নেই কবি অজিত বাইরী মিলনসাগের এই কবিতার প্রকাশ - ১৫.০৮.২০১৯।
সিতাংশু ভাল নেই। প্রতিধ্বনিত হল চতুর্দ্দিক --- সিতাংশু ভাল নেই সিতাংশু ভাল নেই, সিতাংশু ভাল নেই। গাছগাছালি বলল, সিতাংশু ভাল নেই। পাখপাখালি বলল, সিতাংশু ভাল নেই। খাল, বিল, মজা দিঘি বলল, সিতাংশু ভাল নেই। এমন-কি সিতাংশুর বাড়ির দিকে চলে যাওয়া সরু মেঠোপথ বলল, সিতাংশু ভাল নেই।
শান্ত নির্জন বাড়ি। এ-বাড়িতে থাকেন এক ঈশ্বরপ্রতিম কবি, তাঁকে ঘিরে তাঁর অতীত, তাঁর দুঃখিত জীবন-যাপন আর সৃষ্টির আনন্দ।
কবির উঠোনে এখন বিকেলের রোদ আর গাছের দীর্ঘ ছায়া ; সেই ছায়া ক্রমে দীর্ঘতর হচ্ছে দিনাবসানে। জোনাকি-জ্বলা রাত আবার বয়ে আনবে নিস্তব্ধতা ; স্মৃতিরা ভিড় করবে, জীর্ণ পাতার মতে ধু-ধু স্মৃতি।
যে বাড়িটাকে পিছনে রেখে যাচ্ছি, সেই বাড়ি মনে পড়িয়ে দিচ্ছে বারবার ভাল নেই, ভাল নেই, কবি ভাল নেই।
শত্রু শিবির থেকে কবি অজিত বাইরী মিলনসাগের এই কবিতার প্রকাশ - ১৫.০৮.২০১৯।
শত্রু শিবির থেকে এনেছি ছিন্ন মস্তক ; আর কি চাও উপঢৌকন? যা যা করেছ নির্দেশ, করেছি পালন অক্ষরে অক্ষরে ; জ্বালিয়ে দিয়েছি ঘরদোর সধবাদের করেছি বিধবা, বিধবাদের পাঠিয়েছি নরকবাসে, যা কিছু বাকি ছিল লুন্ঠন, দু’হাতে করেছি লুটপাট ; ভিটেছাড়াদের দিয়েছি বন্ধ করে ঘরে ফেরার দরজা। আর কি হুকুম আছে বল, পুষিয়ে দেব কড়ায়-গণ্ডায়, আমাকে শুধু আড়াল দিও আমাকে দিও লুট, ধর্ষণ, খুনের স্বাধিকার ; তারপর দ্যাখো, দিনকে করে দিতে পারি কি না রাত।
হাজার চুরাশির মা কবি অজিত বাইরী মিলনসাগের এই কবিতার প্রকাশ - ১৫.০৮.২০১৯।
শুনিনি কি কলধ্বনি স্রোতস্বিনীর ? তুমিই শুনিয়েছ মাদল আর পাহাড়িয়া গান পায়ে পায়ে চিনিয়েছ আদিবাসী গাঁ— শুনিয়েছ ভুখা মানুষের আর রুখু মাটির গল্প ; তুমিই হাজার চুরাশির মা।
যে ছেলেরা হারিয়ে গেছে বনে যে বোনেদের খোঁজ মেলেনি, তাদের কথা আপোষহীন কলমে লিখেছ সাদা পাতায়। ঝোড়ো-দিনগুলির সাক্ষী তোমার অজর অক্ষর ; প্রতিটি শব্দের উত্তাপ লেগে আছে মানুষের মাড়-ভাতের লড়াই, রক্তে, ঘামে। টাঙ্গি হাতে ভুখা মানুষের মিছিলে তুমিই হাজার চুরাশির মা।
মৃত্যু লিখে রাখে নাম কবি অজিত বাইরী মিলনসাগরে এই কবিতার প্রকাশ - ১৪.১১.২০২০।
মানুষের আলিঙ্গনকে এত ভয় পাইনি কখনও। মানুষের কাছে যেতেও ভয়; যদি স্পর্শ লাগে, যদি দেহে বাসা বাঁধে ব্যাধির বীজাণু,প্রিয়জনকেও কাছে টেনে নিতে সংশয়ী মন; তফাৎ রেখে কথা বলি; শুনি দূর থেকে; অথচ সারাজীবন কাঙ্ক্ষিত ছিল মানুষের উষ্ণ আলিঙ্গন, প্রিয়তমার নিবিড় বন্ধনে সাগরের ঢেউ হতে চেয়েছিল মন। এখন আতঙ্কের শিবিরে বন্দি সবাই; ধনী, নির্ধন,খ্যাত,অখ্যাত কারুরই রেহাই নেই। হাত বাড়িয়েও হাত সরিয়ে নিই; যদি হাতের তালুতে মৃত্যু লিখে রাখে নাম!
বর্ষাবরণ কবি অজিত বাইরী মিলনসাগের এই কবিতার প্রকাশ - ১৫.০৮.২০১৯।
দুটি মেঘ এসে পাশাপাশি কথা বলছে কার্নিশের ধারে। তাদের কন্ঠস্বর খুব মৃদু আর ভেজা-ভেজা। কী কথা বলছে তারা তারা-জ্বলা আকাশের নিচে ? বাতাস অল্প অল্প দোলাচ্ছে আঁচল ; দুই সখীর যেন দেখা হল কতকাল পর ! বিবাহের পরে গ্রামের দুই যুবতীর দেখা হলে কথা যেমন ফুরোয় না ; তেমনই অনর্গল কথার ভারে ঝুঁকে আছে দুটি মেঘ। আজ তাদের বড় আনন্দের দিন ; আজ তারা ঝরবে বৃষ্টির কুঁড়ি ছড়িয়ে ছড়িয়ে। ময়ূর তুমি পেখম মেলো, অনাবৃষ্টির দিনগুলির পর আজ আমাদের বর্ষাবরণ।
যেতে যেতে কবি অজিত বাইরী মিলনসাগের এই কবিতার প্রকাশ - ১৫.০৮.২০১৯।
যেতে যেতেই পার হব মজা দিঘি যেতে যেতেই হাটতলা, বুড়োশিবের থান বাউলবাবার আখড়া, গাজিসাহেবের মাজার যেতে যেতেই মাথার উপর ঢলে যাবে সূর্য— ছায়া দীর্ঘ হবে পায়ে পায়ে।
সন্ধ্যা নামবে দূর গ্রামের সীমান্তে ; জ্বলে উঠবে একটি দুটি কুপির আলো ; শুনতে পাব শাঁখ আর আজানের ধ্বনি।
যেতে যেতেই পায়ের নিচে সাঁকো আর পৃখিবীর কিনারে ঢালু আকাশ। যেতে যেতেই হাতে রাখব হাত ; তুমি জড়িয়ে ধরে বলবে, আরে, অমিতাভ ! জড়িয়ে ধরে আমি বলব, কেমন আছ ওসমান?
সমিধের আগুন কবি অজিত বাইরী মিলনসাগের এই কবিতার প্রকাশ - ১৫.০৮.২০১৯।
তুমি বিশ্বাস অর্জন কর, তোমার পাশে এসে দাঁড়াবে অনেক মানুষ। তুমি বিশ্বাস অর্জন কর ; তোমার উপর ভরসা রাখবে অনেক অনেক মানুষ। মানুষ তারই উপর ভরসা রাখে, যে অন্ধকারে আলো জ্বালে, পথ দেখায় বন্ধুর মতো বাড়িয়ে দেয হাত।
তুমি বিশ্বাস অর্জন কর ; যাতে তোমার সঙ্গেই ভাগ করে নেয় সুখ-দুঃখ। তোমার সঙ্গেই ভাগ করে নেয় প্রিয়জন বিয়োগের শোক।
তুমি বিশ্বাস অর্জন কর আশ্রয়দাতা বৃক্ষের মতো ; তুমি বিশ্বাস অর্জন কর পথিকের পায়ের নিচে দূরগামী পথের মতো।