একা নও কবি অজিত বাইরী মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১৪.১১.২০২০।
আজ বড় অন্ধকার, সবাই মিলে জ্বালাতে হবে আলো; এসো, হাতে হাতে ধরি প্রদীপ। গভীর আতঙ্কের ভেতর আলো জ্বালাই গভীর হতাশার ভেতর আলো জ্বালাই গভীর অনিশ্চয়তার ভেতর আলো জ্বালাই।
যার হাতে প্রদীপ নেই, তার হাতে একটি প্রদীপ দাও। সে-ও আলোর মিছিলে সামিল হোক। তারও চোখে ফুটে উঠুক আগামীর স্বপ্ন তারও চোখে জ্বলুক আশার আলো।
একটি আলোর পাশে এসে দাঁড়াক আর একটি আলো, তারপাশে আর একটি তারপাশে আরও একটি। ভরসার স্ফুলিঙ্গ ফুটুক মুখে মুখে দৃঢ় হোক দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি।
একা নও, একা নও, একা নও তুমি প্রত্যেকে প্রতেকের সহযোদ্ধা প্রত্যেকে প্রত্যেকের আশা-ভরসা প্রত্যেকে প্রত্যেকের নির্ভরতা। আলো সত্য, আর সব মিথ্যা, এসো আমরা সত্যের হাত ধরি, প্রদীপ ধরি একে অন্যের মুখে, আলোর সেতু বেয়ে হেঁটে যাই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে।
সব নদী সাগরে যায় না কবি অজিত বাইরী মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১৪.১১.২০২০।
শুকনো নদীর পাড়ে বসে কী ভাবছে লোকটি কী ভাবছে অন্যমনস্কভাবে? অদূরে শূন্যে ঝুলছে সেতু; নদীতে জল না থাকলে সেতুকে মানায় না। দু' একটা নৌকো উপুড় হয়ে আছে চরের উপর যদি কোনদিন ভরে ওঠে নদী চিৎ হয়ে ভাসবে জলে।
অন্যমনস্কভাবে কী ভাবছে লোকটি? পৃথিবীর কত নদী শুকিয়ে যাচ্ছে! শুকনো নদীর দিকে তাকালে দুঃখ হয়; শূন্যে ডানা মেলা চিল সে দুঃখকে করে তোলে গাঢ়তর।
মরা নদীগুলো মানচিত্র থেকে হারিয়েই যাবে; কোনদিন প্রবাহ ছিল, জানতেই পালবে না কেউ। মানুষের প্রয়োজনে নদীগর্ভে শুরু হবে চাষবাস হয়তো পত্তন হবে নতুন বসত। হাঁড়িতে ফুটবে ভাত, শিশুরা খেলবে উঠোনে।
নদীর পাড়ে বসে কী ভাবছে লোকটি? কী ভাবছে অন্যমনস্কভাবে? সব নদী সাগরে যায় না, কিছু কিছু নদী দিক ভুল করে।
বলো, ভারতবর্ষ বলো কবি অজিত বাইরী মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১৪.১১.২০২০।
শোন ভারতবর্ষ, তাদের কথা শোন-- যারা রেললাইনে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। শোন ভারতবর্ষ, তাদের কথা শোন-- যাদের ক্ষুধার পোড়া রুটি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলো রেললাইনের আশপাশে। বাড়ি ছাড়া সেইসব পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা শোন, যারা বহুদূরের পথ পাড়ি দিয়ে ফিরতে চেয়েছিল স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, পরিবার-পরিজনের কাছে। যারা ফেরার কোন যান না-পেয়ে হাঁটতে শুরু করেছিল মাইলের-পর-মাইল। কেউ চল্লিশ, কেউ পঞ্চাশ মাইল। হেঁটে এসেছিল, তারপর ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল রেললাইনের উপর। বোঝেনি এ-পথে দৌড়ে আসবে মৃত্যুদূত আর ফলের খোসার মতো পিষে দিয়ে যাবে। চর্তুদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাবে দেহাংশ-- রক্ত, রক্তের ছোপ এখানে ওখানে যতটুকু রক্ত অবশিষ্ট ছিল শুকনো শরীরে। শোন ভারতবর্ষ, শোন তাদের কথা যারা স্বগৃহে ফেরার প্রার্থনাটুকু জানিয়েছিল শুধু, তাদের ওইটুকু আর্জি মঞ্জুর করোনি; অথচ তারা তোমারই সন্তান, তারা দরিদ্র, তারা নিঃস্ব পেটের তাগিদে দূর পরবাসী। বলো তুমি ভারতবর্ষ, তাদেরও কী আত্মজের মুখ দেখার অধিকার ছিল না? তাদেরও কী ম-র কাছে ফেরার ছিল না দায়? এত নিষ্ঠুর তুমি, এত নিষ্করুণ!-- বলো, ভারতবর্ষ বলো।
কুড়ানি কবি অজিত বাইরী মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১৪.১১.২০২০।
আজ মহাষ্টমী, আজও কুড়ানি বেরিয়েছে কাগজ কুড়াতে। পিঠে ঝোলা, জঞ্জালের স্তূপ ঘেঁটে এখান থেকে ওখান থেকে টুকরো কগজ তুলে ভরছে ঝোলায়।
সংসারের এমনই হাঁ- মুখ, আর পোড়া-পেটের এমনই চাহিদা, আজকের দিনেও না- বেরুলেই নয়। কাগজ কুড়িয়ে আর কাগজ বেচে ক'পয়সা জোটে? তবু সেই যৎসামান্য উপার্জনটুকু থেকেও বঞ্চিত হতে নারাজ।
চাদ্দিকে কত রঙের বাহার, প্যাণ্ডেলের আর প্রতিমার সাজসজ্জা। কত মানুষের কতরকম পোশাকের চাকচিক্য, জৌলুস। তার পরণে আধময়লা ছেঁড়া শাড়ি--- এর ওর থেকে চেয়েচিন্তে কোনমতে জোড়াতালি দিয়ে পেঁচিয়ে পরেছে কোমরে।
অভাব এদের চিরসঙ্গী; আলোর জোয়ারে শহর ভেসে গেলেও এদের মুখের মলিনতা ঘোচে না; স্বয়ং ঈশ্বর চোখে-মুখে এঁকে দিয়েছেন চিরবিষাদ।
প্রকৃতির নিয়মে শিউলি ফোটে পদ্ম ফোটে দিঘির বুকে কাশবনে চামর দোলায় হাওয়া--- এদের কোন আনন্দ নেই, উচ্ছ্বাস নেই; এরা শুধু দুঃখী কাগজ-কুড়ানি।
মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকের বাদ্যি বাতাসে ধূপ ধুনোর গন্ধ--- কিছুতেই মন লাগে না। দিনের শেষে ক' পয়সা জুটবে সেই ভাবনাতেই কাতর।
এত আলোর জৌলুস চাদ্দিকে--- চোখে পড়ে না। এত ঢাকের বাদ্যি এখানে ওখানে--- কানে বাজে না। কুড়ানি জানে, পুজো তাদের জন্য নয়। নতুন পোশাক না, ভরপেট খাবার না--- বছরের সব ক'টা দিন একইরকম কষ্টের আর দুঃখের। সমাজের কাছে, সভ্য মানুষের কাছে এদের একটাই পরিচয়, এরা শুধু কাগজ- কুড়ানি।