কবি অজিত বাইরীর কবিতা
*
মানুষের কাছে যাও
কবি অজিত  বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১৫.০৯.২০১৯

মানুষের কাছে যাও, যত দূরত্ব বাড়াবে
নিঃসঙ্গতা গ্রাস করবে
শীতঘুমে কৃশ ময়ালের ক্ষুধার মতো।

মানুষের কাছে যাও, দূরত্ব বাড়তে বাড়তে একসময় ঘাড়ের উপর
নেমে আসবে দুর্বহ সময়ের ভার।

সম্পর্কের বাঁধন-ছেঁড়া যে জীবন
সে তো ঢেউয়ের উপর
দিশাহারা টলোমলো নৌকো।

নঙ্গর করো পাড়ের উপর
বাঁধন যেন দৃঢ় হয়;
নইলে ভাসিয়ে নেবে ঝোড়ো-রাতের নিঃশ্বাস।

তুমি তার পাশে গিয়ে বসো;
একটুকু স্পর্শের উত্তাপে
জ্বলে উঠবে আঁধার মনের আলো।

মানুষের কাছে যাও, মানুষকে চেনো।
মানুষের কাছে যাও, নিজেকে চেনো।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আলোর প্রার্থনা
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১৪.১১.২০২০।

আলো ছাড়া আর কোন প্রার্থনা নেই
আলো চাই, আলো চাই, আলো।
ভোরের পাত্র থেকে উছলে পড়া আলো
সন্ধ্যার প্রদীপ থেকে উছলে পড়া আলো
রাতের নক্ষত্র থেকে উছলে পড়া আলো
যত কালো মেখেছি দু চোখে,
যত অবসাদ, ক্লান্তি, ভ্রান্তি অতীতের;
মুছে ফেলব শিশির- স্নাত ঘাসের মতো।
আলো ছাড়া আর কোন প্রার্থনা নেই
আলো ছাড়া আর কোন তৃষ্ণা নেই
পানের নিমিত্ত পেতেছি করতল;
আলো দাও, আলো দাও, আলো।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দাঁড়ের পাখি
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১৪.১১.২০২০।

দাঁড়ের পাখি,
তুমি কি উড়তে চাও?
ডানায় ভর করে পার হতে চাও
আকাশের- পর- আকাশ?

তুমি কি জানো না,
আকাশেও হানা দেয় ঝড়- বাদল?
বজ্র-বিদ্যুতে ছিঁড়ে ফেলে
আকাশের বুক?

তুমি স্বপ্ন দেখেছো সুদূর
নীল আকাশের।
স্বপ্ন দেখেছো অনন্ত মুক্তির।
নেই শিকলের বেড়ি,
নেই সারি সারি গরাদের শিক।

দাঁড়ের পাখি,
দ্যাখো, কী নিশ্চিন্ত জীবন তোমার!
না আছে দানা-পানির অভাব
না আচ্ছাদনের।
সুখের সমস্ত উপকরণ
সাজানো থরে থরে।

তবু মন বসে না দাঁড়ে?
আকাশ কি দেবে নির্ভরতা?
আকাশ কি দেবে নিশ্চয়তা
জীবন- যাপনের?

সকালের উজ্জ্বল আকাশ
বদলে যায় বিকেলের ঝঞ্ঝায়।
নিবিড় নক্ষত্রের রাত
মুছে মায় মেঘের কালো পোঁচে।
এত অনিশ্চয়তার মধ্যে
ঝাঁপ দিতে চাও?

আমি ভেবেছি, যা যা চাও
সব দেব, অলঙ্কারে
ভরে দেব গা, ভ্রমণের
আনন্দ দেব, সংসার-ভরা
স্বাচ্ছন্দ্য দেব।

শুধু আমার কাছে আকাশ চেয়ো না।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সমিধ ও আয়ুধ
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১৪.১১.২০২০।

সংকট থেকে যখন বেরিয়ে আসব
তখন আমরা নতুন মানুষ।
আমাদের চোখে দিগন্ত-ছোঁয়া-আকাশ
আর প্রান্তর-ভরা সবুজ।

ভোরের পাখিরা ফেরে যেমন আকাশে;
আমরাও ফিরব চেনা গঞ্জ, বন্দর, শহরে।
গৃহবন্দি এখন, স্বেচ্ছা-নির্বাসনে অন্তরিন।
কিন্তু একদিন খুলে যাবে আলোর দরজা--
গাছের মতো খসিয়ে দেব
আতঙ্ক আর উদ্বেগের বাকল।

আমরা নতুন করে স্বপ্ন বুনবো চোখে;
ভরসার বীজ বুনোব বুকে;
সব ক্ষতি পূরণ করে নেব উদ্যমে, শ্রমে।

সংকট থাকে না চিরকাল;
মানুষও নয় নিয়তির দাস,
তার  আছে ত্রাণের সমিধ ও আয়ুধ।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
একা নও
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১৪.১১.২০২০।

আজ বড় অন্ধকার, সবাই মিলে
জ্বালাতে হবে আলো;
এসো, হাতে হাতে ধরি প্রদীপ।
গভীর আতঙ্কের ভেতর আলো জ্বালাই
গভীর হতাশার ভেতর আলো জ্বালাই
গভীর অনিশ্চয়তার ভেতর আলো জ্বালাই।

যার হাতে প্রদীপ নেই, তার হাতে
একটি প্রদীপ দাও।
সে-ও আলোর মিছিলে সামিল হোক।
তারও চোখে ফুটে উঠুক আগামীর স্বপ্ন
তারও চোখে জ্বলুক আশার আলো।

একটি আলোর পাশে এসে দাঁড়াক
আর একটি আলো, তারপাশে আর একটি
তারপাশে আরও একটি।
ভরসার স্ফুলিঙ্গ ফুটুক মুখে মুখে
দৃঢ় হোক দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি।

একা নও, একা নও, একা নও তুমি
প্রত্যেকে প্রতেকের সহযোদ্ধা
প্রত্যেকে প্রত্যেকের আশা-ভরসা
প্রত্যেকে প্রত্যেকের নির্ভরতা।
আলো সত্য, আর সব মিথ্যা, এসো
আমরা সত্যের হাত ধরি, প্রদীপ ধরি
একে অন্যের মুখে, আলোর
সেতু বেয়ে হেঁটে যাই কাঙ্ক্ষিত  লক্ষ্যে।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সব নদী সাগরে যায় না
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১৪.১১.২০২০।

শুকনো নদীর পাড়ে বসে কী ভাবছে লোকটি
কী ভাবছে অন্যমনস্কভাবে?
অদূরে শূন্যে ঝুলছে সেতু;
নদীতে জল না থাকলে সেতুকে মানায় না।
দু' একটা নৌকো উপুড় হয়ে আছে চরের উপর
যদি কোনদিন ভরে ওঠে নদী
চিৎ হয়ে ভাসবে জলে।

অন্যমনস্কভাবে কী ভাবছে লোকটি?
পৃথিবীর কত নদী শুকিয়ে যাচ্ছে!
শুকনো নদীর দিকে তাকালে দুঃখ হয়;
শূন্যে ডানা মেলা চিল
সে দুঃখকে করে তোলে গাঢ়তর।

মরা নদীগুলো মানচিত্র থেকে হারিয়েই যাবে;
কোনদিন প্রবাহ ছিল, জানতেই পালবে না কেউ।
মানুষের প্রয়োজনে নদীগর্ভে শুরু হবে চাষবাস
হয়তো পত্তন হবে নতুন বসত।
হাঁড়িতে ফুটবে ভাত, শিশুরা খেলবে উঠোনে।

নদীর পাড়ে বসে কী ভাবছে লোকটি?
কী ভাবছে অন্যমনস্কভাবে? সব নদী
সাগরে যায় না, কিছু কিছু নদী দিক ভুল করে।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বলো, ভারতবর্ষ বলো
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১৪.১১.২০২০।

শোন ভারতবর্ষ, তাদের কথা শোন--
যারা রেললাইনে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।
শোন ভারতবর্ষ, তাদের কথা শোন--
যাদের ক্ষুধার পোড়া রুটি
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলো রেললাইনের আশপাশে।
বাড়ি ছাড়া সেইসব পরিযায়ী শ্রমিকদের
কথা শোন, যারা বহুদূরের পথ
পাড়ি দিয়ে ফিরতে চেয়েছিল
স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, পরিবার-পরিজনের কাছে।
যারা ফেরার কোন যান না-পেয়ে
হাঁটতে শুরু করেছিল মাইলের-পর-মাইল।
কেউ চল্লিশ, কেউ পঞ্চাশ মাইল।
হেঁটে এসেছিল,  তারপর ক্লান্ত হয়ে
ঘুমিয়ে পড়েছিল রেললাইনের উপর।
বোঝেনি এ-পথে দৌড়ে আসবে মৃত্যুদূত
আর ফলের খোসার মতো পিষে দিয়ে যাবে।
চর্তুদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাবে দেহাংশ--
রক্ত, রক্তের ছোপ এখানে ওখানে
যতটুকু রক্ত অবশিষ্ট ছিল শুকনো শরীরে।
শোন ভারতবর্ষ, শোন তাদের কথা
যারা স্বগৃহে ফেরার প্রার্থনাটুকু
জানিয়েছিল শুধু, তাদের ওইটুকু আর্জি
মঞ্জুর করোনি; অথচ তারা তোমারই
সন্তান, তারা দরিদ্র, তারা নিঃস্ব
পেটের তাগিদে দূর পরবাসী।
বলো তুমি ভারতবর্ষ, তাদেরও কী আত্মজের
মুখ দেখার অধিকার ছিল না? তাদেরও
কী ম-র কাছে ফেরার ছিল না দায়?
এত নিষ্ঠুর তুমি, এত নিষ্করুণ!--
বলো, ভারতবর্ষ বলো।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কুড়ানি
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১৪.১১.২০২০।

আজ মহাষ্টমী, আজও কুড়ানি
বেরিয়েছে কাগজ কুড়াতে।
পিঠে ঝোলা, জঞ্জালের স্তূপ ঘেঁটে
এখান থেকে ওখান থেকে
টুকরো কগজ তুলে ভরছে ঝোলায়।

সংসারের এমনই হাঁ- মুখ,
আর পোড়া-পেটের এমনই চাহিদা,
আজকের দিনেও না- বেরুলেই নয়।
কাগজ কুড়িয়ে আর কাগজ বেচে
ক'পয়সা জোটে? তবু
সেই যৎসামান্য উপার্জনটুকু থেকেও
বঞ্চিত হতে  নারাজ।

চাদ্দিকে কত রঙের বাহার,
প্যাণ্ডেলের আর প্রতিমার সাজসজ্জা।
কত মানুষের কতরকম পোশাকের
চাকচিক্য, জৌলুস।
তার পরণে আধময়লা ছেঁড়া শাড়ি---
এর ওর থেকে চেয়েচিন্তে
কোনমতে জোড়াতালি দিয়ে
পেঁচিয়ে পরেছে কোমরে।

অভাব এদের চিরসঙ্গী;
আলোর জোয়ারে শহর ভেসে গেলেও
এদের মুখের মলিনতা ঘোচে না;
স্বয়ং ঈশ্বর চোখে-মুখে এঁকে দিয়েছেন
চিরবিষাদ।

প্রকৃতির নিয়মে শিউলি ফোটে
পদ্ম ফোটে দিঘির বুকে
কাশবনে চামর দোলায় হাওয়া---
এদের কোন আনন্দ নেই, উচ্ছ্বাস নেই;
এরা শুধু দুঃখী কাগজ-কুড়ানি।

মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকের বাদ্যি
বাতাসে ধূপ ধুনোর গন্ধ---
কিছুতেই মন লাগে না।
দিনের শেষে ক' পয়সা জুটবে
সেই ভাবনাতেই কাতর।

এত আলোর জৌলুস চাদ্দিকে---
চোখে পড়ে না।
এত ঢাকের বাদ্যি এখানে ওখানে---
কানে বাজে না।
কুড়ানি জানে, পুজো তাদের জন্য নয়।
নতুন পোশাক না, ভরপেট খাবার না---
বছরের সব ক'টা দিন একইরকম
কষ্টের আর দুঃখের।
সমাজের কাছে, সভ্য মানুষের কাছে
এদের একটাই পরিচয়,
এরা শুধু কাগজ- কুড়ানি।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অক্ষরে পুড়ে
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১৪.১১.২০২০।

কবে যেন লগি ঠেলে ঠেলে
এগিয়ে দিয়েছিলাম নৌকো জোয়ারের মুখে;
চরের পাখিরা ঘাড় ঘুরিয়ে
দেখেছিল আমাকে ভীষণ কৌতুকে।

আকাশ ছিল ঝাঁঝাঁ রোদে পোড়া---
নীলাকাশ মুখ দেখছিল আয়না জলে;
আমার ছিল না কোন তাড়া---
খুব আমোদে মেতেছিল তারা, ঘড়া

ভরতে এসেছিল যারা নদীঘাটে;
আমি তো এক নওল কিশোর,
চোরা-চোখে তাকাই তাদের পানে;
সূর্য তখন ঢলেছে পশ্চিম মাঠে।

কোনদিন কলম ধরবো ভাবিনি,
ভেবেছিলাম, লগি ঠেলে পার করবো জীবন।
নক্ষত্রের ভিড় ঠেলে যাব বহুদূর---
মাথার চুলে জোনাকি, ফিরবো যখন।

লগি ঠেলে বেরিয়েছিলাম যেদিন,
সেদিন কী জানতাম, নিয়তি বেঁধেছে
আমাকে অক্ষরে, অক্ষরেই পুড়ে পুড়ে
শোধ দিতে হবে জীবনের ঋণ!

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রমিত অক্ষর
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১৪.১১.২০২০।

আমি দেখেছি আতঙ্কগ্রস্ত একটি মুখ;
ভয়ে শুকিয়ে গিয়েছে মুখের লাবণ্য।
ওষ্ঠে ধরেছিলে যে পার্থিব হাসি---
তা-ও মুছে গেছে ম্লান রোদের মতো।

তোমাকে আমি জননী বলে জানি;
একশ তিরিশ কোটির মা; সংশয়ের
ঘন মেঘ জড়ো হয়েছে শিয়রে তোমার;
কী জানি, কীসের ছায়া দ্রুত দীর্ঘ হয়!

তুমি তো ততটাই, যতটা গর্ভধারিণী;
তুমি কী ছেঁড়া আঁচলে বেঁধেছ জোনাকি?
ভাঙা ঘটে ভরেছ জল? সিঁদুর-কৌটোর
ভেতর রেখেছ ভরে ভালবাসার ভ্রমর?

শোক সে-তো এক প্রবহমান নদী;
নিত্য ভেসে চলেছে কত শত শব।
আমি লিখি, জীবন ও মৃত্যুকে লিখি;
উনুনের হাঁড়িতে ফুটছে প্রমিত অক্ষর।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর