কবি অজিত বাইরীর কবিতা
*
মানুষ বড় একা
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৩.১.২০২১।

মানুষ বড় একা, মানুষ বড় নিঃসঙ্গ ;
তুমি তাকে সঙ্গ দিও কাছে ডেকে।
যে তোমার বন্ধু হতে পারতো ;
যে আছে দূরে, ডেকে বসাও পাশে।

মানুষ বড় দুঃখী, মানুষ বড় অভিমানী ;
তুমি কিঞ্চিৎ ভাগ নিও দুঃখের।
অভিমানকে কোরো না অবহেলা,
ঝরা পাতারও থাকে অভিমান---
তুমি অভিমানের মূল্যটুকু দিও।

মানুষ বড় বেশি কাঙাল ভালোবাসার ;
প্রশ্রয় পেলে গলে যাবে মোমের মতো।
মানুষ যা চায়, তা হৃদয়ের উষ্ণতা ;
তুমি স্বেচ্ছায় বাড়িয়ে দিও হৃদয়।

তারপর দ্যাখো, আকাশ কত নীল ;
তারপর দ্যাখো, বাতাস কত নির্ভার।
মানুষ বড় এক, মানুষ বড় নিঃসঙ্গ ;
মানুষ বড় দুঃখী, মানুষ বড় অভিমানী।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নদীপারে সন্ধ্যা
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৩.১.২০২১।

মাথার উপর ঝুঁকে আছে মেঘ
নদী উচ্ছল পূবালী  হাওয়ায়,
ঘাটে বাঁধা নৌকো টলোমলো।

কেউ কি ভেসেছিল চোখের জলে
এমন-ই মেঘবরণ দিনে?
ক্ষণে ক্ষণে ঝিলিক দেয় তারই মুখ
ভাঙা মেঘের ফাঁকে?

নদীপারে দোলে শরবন---
পাতাগুলি না না করে কাঁপে।
ও সোনাবউ, নাও ভাসাইয়া যাও কোন্ দ্যাশে---
দরদ ঝরে ভাটিয়ালী সুরে।

ছলাৎ  ছলাৎ  পাটাতনে ভাঙে ঢেউ
দাঁড় থেকে রুপোলি তরল ঝরে।
'ঘন মেঘে ছাইল আকাশ---'
গলা ছেড়ে গাইছে একলা পাগল
বুকে এসে তার ছন্দ দোলে।

আমি কী জানি, কে যায় কত দূরে!

জলের পিছনে ধায় জল;
আঁধার ডেকে আনে কাজল মেঘে।
বিন্দু বিন্দু আলোর সংকেতে
অক্ষরের মতো জ্বলে ওঠে গ্রাম।

.             ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
চল, দেখে আসবে
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৩.১.২০২১।

চল, দেখে আসবে
চিত্রিত দেয়াল,
এলামাটিতে নিকোনো উঠোন,
চতুর্সীমায় বেতসের বেড়া।
উঠোনের খুঁটিতে টান করে বাঁধা লালপেড়ে শাড়ি।
বাতাসে ঘেঁটুফুলের গন্ধ,
কিশোরীর কণ্ঠে ভাদুগান।

চল, দেখে আসবে
শহর ছেড়ে দু'পা দূরে
কেষ্টঠাকুরের মাথার উপরে ফুটেছে বেহায়া কদম।
বর্ষায় ভিজে এক্শা
লাজ নিবারণে অক্ষম রাধিকার আটহাতি শাড়ি।

চল, দেখে আসবে….

হয়তো খনাসুরে কোন বুড়ি
শুধোবে, ' কুন্ দেশের মরদ গো তুমরা?
কেন এয়েছ, কি দেখবে এখেনে?
সব কুল খেয়ে পোড়ামাটির দেশে
মিথ্যে-মিথ্যে বেঁচে আছি।'

.             ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
জিয়লমাছ
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৩.১.২০২১।

বঁটির গা বেয়ে নামছে রক্তধারা ;
একটি একটি ফোঁটা টপটপ পড়ছে মাটিতে
আর মুহূর্তে দানা বাঁধছে ধুলোয়।

ছিল পাড়াগাঁর এঁদো ডোবায়---
খুব  নিশ্চিন্ত নিরিবিলির জীবন।
কে কার প্রয়োজনে তার জীবনটাকেই
বাজি ধরল ;
হাত বদল হতে হতে একদিন ঠাঁই হল
ছোট্ট ডকচির মধ্যে,
স্বচ্ছজলে নজরবন্দি জীবন।

চোখ থেকে উবে গেল দূর পাড়াগাঁর
অখ্যাত ডোবার স্বপ্ন---
শ্যাওলা-শীতল জল,
গাছগাছালির ছায়া
আর শালুক পাতায় শিশিরের শব্দ।

সে জানতোই না, একদিন তাকেও
উৎসর্গ করতে হবে জীবন ;
বঁটির গা বেয়ে নামবে রক্তধারা।

সে জানতোই না, তার ভবিষ্যৎ বংশধরেরাও
জানবে না, কি তাদের ঋণ?
কেনই-বা ঋণশোধ আঁচলা আঁচলা রক্তে!

.             ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এ নদী আমারও চেনা
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৩.১.২০২১।

এ নদী আমারও চেনা, আঁকাবাঁকা ---
বাঁকে বাঁকে ভাঙন।
কত গ্রাম, জনপদ, বসতি গিলেছে রাক্ষসী;
ভাসিয়েছে ক্ষেত, বাগান,বাগিচা।

এ নদীর পাড় ধরে যেতে যেতে দেখেছিলাম
পালকি বাহক বেহারাদের,
ভেতরে বরবেশী পিতৃদেব।
এ নদীর পাড় ধরেই বয়ে নিয়ে গিয়েছি
চিতার কাঠ,
দাউদাউ জ্বলে উঠতে দেখেছি মা-র শব।

এ নদী আমারও চেনা, কারও কপাল ভেঙেছে
কারও বা গড়েছে; চর জেগেছে
ওপারে, দখল পেয়েছে নতুন মানুষ;
এপারে সর্বস্ব খোয়ানোর হাহাকার।

এ নদী আমারও চেনা, কখনও উৎসবের
বাজনা বাজিয়ে পার হয় নৌকো;
কখনও স্রোতের টানে ভেসে যায় শব।

.             ****************                                
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর