লাভা কবি চিরশ্রী দেবনাথ মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১২.৭.২০২০।
যে মেয়েটির সঙ্গে আমার বেশ ভাব, নামটাও ঠিক জানি না তার। পান খায় খুব। ব্রাউন রঙের লিপস্টিক লাগায়, একটু ধেবড়ে থাকে। চুল সামান্য একটু কোঁকড়ানো, ঘড়ি পরে, গোল্ডেন চেন। খসখসে আঙুল, রঙ লাগানো নখ, দ্রুত ফলস লাগায় আমার শাড়ির।
নাম দিয়েছি তার দ্রাঘিমা, বিয়ে করেনি বা হয়নি। চালাক। বুদ্ধি খুব । তাকে আমি পছন্দ করি না । কিন্তু ভাব আছে, কথাও বলি না, কিন্তু ভাব আছে। কারণ, ওর ভেতর জমে আছে স্বর্ণাভ লাভা , আগ্নেয়গিরিটিও চেনা আমার, একই লাভায় হাত দিই, সুপ্ত, কি ভীষণ ভয়ঙ্কর এই নীরবতা ! মেয়েটিকে আমি পছন্দ করি না। যদিও তার সঙ্গে খুব আধাআধি আমার। আগ্নেয়গিরি দিয়েই আমাদের পরিচয় আর সর্বশান্ত হওয়া।
মেয়েরা যেভাবে কবিতা লিখে কবি চিরশ্রী দেবনাথ মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১২.৭.২০২০।
মেয়েরা একটু অন্যরকমভাবে কবিতা লেখে এ আমার অনুমান যখন তারা মশলার গুঁড়ো নেয় খুব ধীরলয়ে তারা ঢুকে পরে হলুদ মরিচের ক্ষেতে সন্ধ্যা হওয়া দেখে নরম পায়ে ফিরে আসে এই ফিরে আসাটাই তাদের কবিতা, স্নান করতে করতে মুঠোতে ফেনা নিয়ে তারা চলে যায় সমুদ্রে ভাসাভাসি আর ঝিনুকদানা কলের জলেই উপচে পড়ে তখন দেহ জুড়ে যে কাটাকাটি হয় সেটাকেই তারা পরবর্তীতে কবিতা বলে চালিয়ে দেয় ঘর গোছাতে গোছাতে তারা অরণ্যে চলে যায় শাল সেগুন ইত্যাদি পর্ণমোচী বৃক্ষকে সাবধান করে দিয়ে আসে দাবানল থেকে হরিণীকে সখী করে উপহার চায় মৃগনাভি লকেট রাতের বেলা এইসব অরণ্য পদছাপ কুড়িয়ে লিখে ফেলে সমূহ উষ্ণ অক্ষর এজন্য অনেক সময় মেয়েদের কবিতা ঠিক কবিতার মতো হয় না অন্যমনস্ক ভাঁজ থেকে বালির মতো ঝরে যায় শুধু আবেগ ঠিকঠাক কবিতা খুঁজতে হয়তো ততক্ষণে সে আবার আগুন জ্বালাতে বসেছে ফিনকি দিয়ে ছুটছে রুটি পোড়া গন্ধ, নাহ্ এবারও কবিতা হলো না কলমকে শান দিতে গিয়ে দু এক দাগ কম হিমোগ্লোবিনে আস্তে আস্তে সে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে, ঘরের আনাচ কানাচে রোগা রোগা মেধা ধুলোর মতো জমে উঠছে ...
মা কবি চিরশ্রী দেবনাথ মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১২.৭.২০২০।
মা মরে গেলে মেয়েরা খুব একা হয়ে যায় গরম ভাতে মেয়েটি কি ভালোবাসত সেটা মনে রাখার শেষ মানুষটি তখন নক্ষত্রের পাশে তারপর থেকে মেয়েরা একা একা ভাত খায় অনেক খাবারের সামনেও তারা একাই থাকে বাকি জীবন
রেইনকোট কবি চিরশ্রী দেবনাথ মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১২.৭.২০২০।
আসলে তো কেউ ফিরিয়ে দেয়নি প্রতিটি মাঝপথ ওনাকে দ্বিধায় ফেলেছে
অন্যরা বলেছিল তিনি নাকি বামপন্থায় বিশ্বাসী
মৃত্যুর কিছুদিন আগে বুঝেছিলেন তিনিও আদর্শহীন আসলে, রক্তে মেশাতে পারেননি কিছুই উপর থেকে ঘাম চেটে কিছু মিছিল করেছেন স্লোগানের কথা পরিবারেও ঢুকতে দেননি তিনি আসলে চামচা হয়েছিলেন, কমিউনিজম এতটা সহজ নয়
তাই ব্যাপক দলবদলেও আজ তার আর নিন্দে করতে ইচ্ছে হয় না কারণ প্রতিদিন মিছিল মিটিং সেরে ঘামে ভেজা জামা বাইরে রেখে তিনিও ঘরে ঢুকতেন
পৌষ সংক্রান্তি কবি চিরশ্রী দেবনাথ মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১২.৭.২০২০।
ট্রেনে যেতে যেতে মানুষের উঠোন দেখি অস্থির এক নিমগাছ ফেলেছে ছায়া ছায়াটুকু কুড়িয়ে নিয়ে ঘরে তুলে রাখছে অবিবাহিতা মেয়েটি তেতো লেগে আছে তার মুখে ও দেহে মনে তার হিংসে খুব, মিথ্যেও বলতে পারে বেশ
শুধু ভালোবাসা পেলেই সে বদলে যাবে পৌষের হিম তুলে নিয়ে আসবে মাঠ থেকে জানলা খুলে পিঠে বানাতে বসবে, ধিকি ধিকি রোদ ঢুকছে তখন আগুনের বেশে,^ তার পাশে বসে খেয়ে নিচ্ছে নরম আঙুল
গ্রীষ্মকাল কবি চিরশ্রী দেবনাথ মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১২.৭.২০২০।
ভীষণ গভীর রাতে মধ্যবিত্ত শহরের খোলা ছাদগুলোতে জমা হয় শহরের সব বিশ্রী মেয়ের প্রেম
তারা রঙ মাখে, চুল বাঁধে, চুলে দেয় গুলঞ্চ ফুল সেইসব প্রেমেরা গুছিয়ে বসে ফিসফিস করে
শহর জেগে গেলেই আবার তারা ঢুকে যায় ঘুপচি মেয়ের গহ্বরে প্রতিরাতে এভাবে তারা বুড়ো হয় তারপর এক গরীব দুপুরে মেয়েরা তাদের প্রেম বেঁচে দেয় সমাপ্তি সঙ্গীত গায় একটি মেয়ে বাকি মেয়েরা দেখে দিনে দিনে শেষ হয়ে আসছে গুলঞ্চ ফুলের ঝোঁপ.....
বোধন কবি চিরশ্রী দেবনাথ মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১২.৭.২০২০।
কবি মারা গেছেন। তিনি বেঁচে উঠছেন। লোহা গলে গলে মিশে যাচ্ছে আগুনের সঙ্গে একমুঠো শিশির এখনো তার হাতের মুঠোয়, ...বাস্প হচ্ছে না, প্রিয় মানুষের ছায়া নিয়ে টলটল করছে ছেড়ে যাওয়া পৃথিবীর মুখ একদিন সে ভালোবেসেছিল একদিন সে অপমান সয়েছিল একদিন সে চুপ হয়ে গিয়েছিল
তারপরও যেতে পারেনি, সরাতে পারেনি নিঃশ্বাস কবি চলে যেতে যেতে না লেখা শ্রেষ্ঠ কবিতাটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে দিচ্ছেন তাকে শীতের বনে তারা ছড়িয়ে পড়ছে ট্রাম লাইনের মতো, আর বিকল হৃদযন্ত্র শেষবার চুমু খাবার লোভে আটকে রাখছে ঘন বাতাস।