ইচ্ছে কবি চিরশ্রী দেবনাথ মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১২.৭.২০২০।
আমাদের একটি ঘর থাক দুজনের চারটে দেয়াল, চারটে মহাসাগর দিনরাত ঢেউ, নীল বেলাভূমি বিছানায় কিছু না, টুকটাক কথা দুজনের ব্যক্তিগত দিনশেষে হতে পারে একশটাকার হিসেব বা শাহরুখ খানের বুড়ো হয়ে যাওয়া একটি টি ভি অকারণ, বাজে সিরিয়েল, বদলে দিয়ে খুব গাল দিলাম, ঘুরে ফিরে চ্যানেল বদলে চলে এলাম সেখানেই ততক্ষণে চার দেয়ালের সমুদ্রে জোয়ার এসেছে, চাঁদ উঁকি দিচ্ছে প্রবলভাবে
নৌকোটৌকা গুলোকে সামাল দিয়ে তুমি ফিরে এলে টিভির খবরে আমার পা তখন তোমার পায়ে জড়িয়ে আছে ঝগড়া করবে বলে
আসলে তখন আমরা মিথ্যে মিথ্যে প্ল্যান করছিলাম কোথাও বেড়াতে যাওয়ার বনজঙ্গল, মহুয়া গাছ, গির অরণ্য, কেশরবান সিংহ
তারপরই হাসি,
তুমি বললে এই ভালো
আমি বললাম কি?
তুমি বললে এই তো চারদেয়াল।
আমি বললাম কোথায় সেই চার দেয়াল? "একটি ব্যক্তিগত দিনের শেষে যেখানে দুজন পাশাপাশি "
না শেষ নয় এখানে ...
খুব অভিমান নিয়ে বলতে ইচ্ছে করে এই অসীম নির্জনতায় আমি আর বাঁচতে পারছি না ...
কাঠের গোলাপ কবি চিরশ্রী দেবনাথ মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১২.৭.২০২০।
লক্ষ্মী ছড়ার ব্রিজ থেকে কাল রাতে কেউ ঝাঁপ দিয়েছিল, নীচে পড়েনি, দুজন পরী কাছেই ছিল, একা অভিসারে যুবকের দুপাশে জুড়ে দিলো ডানা, নাম বদলে গেলো তার মেঘের নিয়মে। এখন সে সূর্যকেতু গন্ধর্ব যে দু একজন মদখোর এই দৃশ্য দেখেছিল তাদের কথা কেউ বিশ্বাস করেনি পালকের মতো শরীর নিয়ে সূর্যকেতু উড়ে বেড়ায় চাকরির আর দরকার নেই তার আকাশ থেকে নক্ষত্রের জল পান করে, পরীদের হাত থেকে ফুলের পাপড়ি খায় কিন্তু কারো গলার স্বর শুনতে পায় না , নেশাগ্রস্তদের একান্ত সুর, অথচ যুবকটি ছিল সঙ্গীতপ্রিয় । কোন চাহিদা নেই এখন, শুধু একদিন শুনতে চায় শেষবারের মতো... মরু বেহাগ...ওস্তাদ রশিদ খান।
তারপর উড়বে না, ডানা ভেঙে দেবে , মরবে, যাতে দেহ ভেসে ওঠে আষাঢ়ের জলে
মর্গে তার মৃতদেহ সনাক্ত করতে আসবে বন্ধুর ছেড়ে দেওয়া প্রেমিকা , মেয়েটি প্রিয় ছিল তাঁর, তিন পূর্ণ চাঁদ আগে।
ওরা উদ্বাস্তু নয় কবি চিরশ্রী দেবনাথ মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১২.৭.২০২০।
এখন কিছু কাগজ আসে নিজের নামে একটি ঠিকানা রয়েছে যেন কোথাও আম্রপল্লবের স্বস্তিকাচিহ্নরচিত আমার মার একটি বাড়ি ছিল, নিজেদের ঘাম রক্তে ঘেরা। সেখানে বাবার নামে অজস্র চিঠি আসতো, বই পত্র ইত্যাদি।
মার নামে তেমন কিছু চিঠি আসেনি কোনদিন, কিন্তু বাড়িটি প্রবলভাবে মাকে ঘিরেই হয়ে উঠেছিল। এই যে, আজকাল কিছু পত্রিকা, বই ডাকযোগাযোগ ! এটাই বোধহয় সামান্য অতিক্রম করা মাকে, বাড়ি, অস্তিত্ব কিছুই নেই যার, খামের ওপর এইসব অদেখা জায়গাগুলোর নাম পড়ে পড়ে শুধু মনে হয় অক্ষরগুলো নৌকার মত, মৃদুমন্দ বাতাসে তাদের বিবাহ দিয়েছি দূরদেশে পরিচয় আর ঠিকানা নিয়ে মায়ের হৃদয়ে ফিরে এসেছে সুখী মুখ দেখাতে।
যতদিন উৎসব কবি চিরশ্রী দেবনাথ মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১২.৭.২০২০।
তাদের বিচ্ছেদ হয়েছে এতোদিন উজান বেয়েছে সময়, আকাশ, বায়ুপ্রবাহ যে কয়েকবছর তারা বিবাহিত ছিল ছিল শুধু উদযাপন, শেষ রাতেও উৎসবের আলো বড়ো বেশী দুঃখহীন এই বিচ্ছেদ হেসে হেসে হাত নেড়ে নেড়ে তারা চলে যাচ্ছে সূর্যের দিকে একসাথে একা হওয়ার আগে তাদের চুল, নখ, পশম পরস্পরকে দেখে নিচ্ছে কোথাও কি লেগে আছে দুঃখ মলমের দাগ অথবা হতাশ সুগন্ধির ক্লান্তি এসব মুছে দিতে হবে তারা বলতে চায়, যৌথবেলার সবটুকু তারা ছিল একসাথে, পাখির গুহায়, একটি হৃদয়ে
পুনর্বার কবি চিরশ্রী দেবনাথ মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১২.৭.২০২০।
যত সব দুঃখদুয়ারী মেয়েরা আমি তাদের মধ্যে নেই কত হাজার সংগ্রামে যাদের কেটেছে পা আমি তাদের মধ্যে নেই পুরুষ হাত রাখেনি হাতে বলে যাদের অভিমান আমি তাদের মধ্যে নেই ভালোবাসা নিংড়ে যারা পুড়ে গেছে কোনো এক সকালে আমি তাদের মধ্যে নেই
সব শর্ত নিজের কাছে বাজি রেখে একে একে হেরে গেছি সবখানে কেউ দেখে ফেলার আগে উন্মুক্ত হৃদয় ভরে গেছে পরাজয়ের সুখে দোপাট্টা উড়িয়ে পেতেছি হাত আবারো নিখাদ হে খোদা... হে ঈশ্বর ইনতেজার ফরমাও, আতশ জ্বালাও, আসমান... এই খোলা আসমান আমার, ভুলে গেছি বাকি সব অগ্নিভ প্রতিবাদ
মিছিলে হেঁটে যারা কেড়ে নিয়েছে অধিকার, আমি তাদের ক্লান্ত পা ঘরে ফিরে হেঁটে গেছি আধখানা রাত বিছানায় যেতে যেতে মেখেছি ক্রিম বলিরেখার নীচে আঙুল চালিয়ে কেড়ে নিতে চেয়েছি দুপুরের রোদ তারপর বলেছি এই দুরন্ত ভ্রমণে, আবারো মেয়ে হতে চাই তোমাদের তৃষ্ণার্ত মুখে এঁকে দিতে অরণ্য, মেয়ে হয়ে বার বার ডুবে যেতে চাই।
পরিযায়ী, ২০২০ কবি চিরশ্রী দেবনাথ মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১২.৭.২০২০।
লোক গুলো হেঁটে যাচ্ছিল তাদের বাড়ি ঘরে সন্ধ্যা নামছিল তাদের দুটুকরো জমিতে নষ্ট ফসল তাদের হাতে পোঁটলা পুঁটলি রুটি কাঁধে বাচ্চাকাচ্চা আর শরীর জুড়ে ক্লান্তি
মন্দির মসজিদ গুরুদুয়ারা পেরিয়ে যাচ্ছিল তারা রেললাইনের ধার ধরে চারপাশে মাঠ আর পথ আর রোদ চারপাশে অন্ধকার আর ময়লা চাঁদ তারা যাচ্ছিল, শুধু যাচ্ছিল দিনরাত নাগরিক শহরে তারা পথ হারায়নি, তাদের কালো কালো মাথা পথে পথে রেখে গেছে রক্তের দাগ পথে পথে রেখে গেছে ক্ষুধার ছোঁয়াচ পথে পথে ছড়িয়ে গেছে সংক্রমিত ভোটচিহ্ন
কিছুদিন পর কিছু হারগোর কুয়োতে কিছু ক্লান্তিতে ঢলে গেছে বন্ধুর কোলে পায়ের নখ ও চামড়া খুলে গেছে ফটো উঠেছে মুখবই এ, দেখেছে কি তারা কত লাইন লেখা হয়েছে, উড়ে গেছে ঝড়ে বেঘোরে মরেছে আমার সকল আবেগ
কার দোষ বলো, বিদেশী ভাইরাস? কার দোষ বলো, সরকার অথবা মালিকপক্ষ?
শুধু হেঁটে হেঁটে গেছে যারা সারা ভারতে তারা নতুন জাতি নাম তার পরিযায়ী মহারাষ্ট্রের নোনা হাওয়া থেকে রাজস্থানের মরুবালি, গঙ্গার পলি মেখে মেখে তারা প্রমাণ করে গেছে এই ভারতের তারা কেউ নয়, কেউ নয় আমাদের ভাত, আসবাব, তেল, নুন সব কিছুতে আজ রক্ত লেগে আছে আমরা সাবানজলে ধুয়ে যাচ্ছি আমাদের পাপ, আমাদের সংসদে চিরস্থায়ী হলো পরিযায়ীর লাশ।
বসন্তদিন দিয়েছে মাস্ক কবি চিরশ্রী দেবনাথ মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১২.৭.২০২০।
মেয়েটিকে দিয়েছো N 95 মাক্স, কিছু শ্রান্ত কথাবার্তা, সে তাই নিয়ে লকডাউনের রাজপথে একটুখানি উড়তে গেলো নিষেধ না মেনে, হয়তো তার শ্বাসযন্ত্রে সন্দেহ ছিল না, ফুসফুসটিও খুব টগবগে
এদিকে কিছুই ভালো লাগছে না তোমার সপ্রতিভ মান্দার ফুল নিয়ে বসে আছো তাকে দেখছো দূর থেকে, নিঃশব্দের বাগানে বসে
স্পর্শ খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর নয় শুধু চোখে চোখে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে পৃথিবী ডুবে থাকুক অনন্ত বিরহে