পাঠ করো নিভৃতে কবি চিরশ্রী দেবনাথ মিলনসাগরে প্রকাশকাল ১২.৭.২০২০।
এক
এটা হলো একটি বেলাভূমি সমুদ্র শান্ত, কোন ঝড় আসবে না তেমন কোন আবহাওয়া সংবাদ নেই আমাদের মাথার রোদের ছাতা উড়ে গেছে দীর্ঘ ঝাউগাছ ছায়া হয়ে নেমে আসছে দূরে যে দু চারটি মানুষ দেখা যাচ্ছে তারা আমাদের সম্পর্কে কৌতুহলী নয় তাই আমরা নিশ্চিন্তে হাত রাখলাম, পায়ের পাতা ছড়িয়ে দিলাম সমুদ্র চিল এসব দেখতে দেখতে অভ্যস্ত বলে, আমরা আরো একা হয়ে গেলাম তারপর সূর্যাস্ত দেখলাম, যুগান্তর ঘটে যাচ্ছে অথচ কত নির্বিকার ভাবে আমরা ভালোবেসে যাচ্ছি ক্রমাগত
দুই
আমাদের একটি ঘর থাক দুজনের চারটে দেয়াল, চারটে মহাসাগর দিনরাত ঢেউ, নীল বেলাভূমি বিছানায় কিছু না, টুকটাক কথা দুজনের ব্যক্তিগত দিনশেষে হতে পারে একশ টাকার হিসেব বা শাহরুখ খানের বুড়ো হয়ে যাওয়া একটি টি ভি অকারণ, বাজে সিরিয়েল, বদলে দিয়ে খুব গাল দিলাম, ঘুরে ফিরে চ্যানেল বদলে চলে এলাম সেখানেই ততক্ষণে চার দেয়ালের সমুদ্রে জোয়ার এসেছে, চাঁদ উঁকি দিচ্ছে প্রবলভাবে
নৌকোটৌকা গুলোকে সামাল দিয়ে তুমি ফিরে এলে টিভির খবরে আমার পা তখন তোমার পায়ে জড়িয়ে আছে ঝগড়া করবে বলে
আসলে তখন আমরা মিথ্যে মিথ্যে প্ল্যান করছিলাম কোথাও বেড়াতে যাওয়ার বনজঙ্গল, মহুয়া গাছ, গির অরণ্য, কেশরবান সিংহ
তারপরই হাসি,
তুমি বললে এই ভালো
আমি বললাম কি?
তুমি বললে এই তো চারদেয়াল।
আমি বললাম কোথায় সেই চার দেয়াল?
"একটি ব্যক্তিগত দিনের শেষে যেখানে দুজন পাশাপাশি "
না শেষ নয় এখানে ...
খুব আলতো করে বলতে ইচ্ছে করে এই অসীম নির্জনতায় আমি আর বাঁচতে পারছি না ...
তিন
তোমার অভিমান আমার অসম্মতি
তোমার অসম্মতি আমার অভিমান
পৃথিবীর হৃদয়ে এর চাইতে বেশি বেদনানির্ভর চলাচল আর নেই
আমাদের যৌথ বাহুতে যুদ্ধের ষড়যন্ত্রকে হারিয়ে, এভাবে কখনো কখনো সাদা ফুলের মতো জেগে ওঠে কিছু কিছু ক্ষয়িত সন্ধ্যা
চার
মানুষ যখন কথা থাকে না তখন জিজ্ঞেস করে বৃষ্টির সংবাদ আর কথা জমে গেলে তারা ভিজতে থাকে আমাদের কথা জমে আছে ঝরটর, শিলাবৃষ্টি, উপচানো জলাশয় হয়তো এখন আমরা অভিযোগ করবো ইত্যাদি তারচাইতে আগে চলো আদর করে নিই তারপর যা হবার হোক
পাঁচ
কয়েকটি সময় এমনি খালি চলে যায় জ্বর ছেড়ে গেলে যেমন কবিতা চলে যায় নিরন্তর অসুখও তো তেমন ভালো কিছু নয় ভেষজ গাছ আনমনে দিয়েছে বল্কল ও নিরাময় পরিধেয় বস্ত্র হয়েছে, হৃদয়ের সমৃদ্ধি আনাচ কানাচ থেকে পড়ে গিয়েছে রক্তবিন্দু দল এখন ক্লান্ত হয়ে বসে থাকি কিছুদিন তোমার পাশে সময় দিতে হবে না, এমন কি কথাবার্তাও আরো দুখানা পর পর বৃষ্টির মাস, এমনই তো হয় নির্জন দুর্যোগ শেষ হলে আবার মুখরতা কিছুকাল
ছয়
যেসমস্ত জায়গা গুলো বেড়াবো বলে ঠিক করেছিলাম, ঝিলম নদীর ধার বরাবর একটু খানি হাঁটা তখন কি খুব হাওয়া দেবে, ঠান্ডা আমাদের আবার ঠাণ্ডা লাগার দোষ
পাঞ্জাবের হলুদ সর্ষে ক্ষেতে ঝলসে দেবো চোখ আমাদের আবার খুব রোদ সহ্য হয় না, মাথা ব্যথার দোষ, তবুও না হয় চা খেতাম, ঝকঝকে স্টীলে চলকে যেতো ঠোঁট
" রাজার বাড়ি " নামে একটি গ্রাম আছে সব গরীব লোক থাকে সেখানে, নীলচে রঙের গীর্জা সুরকি দেওয়া রাস্তা গেছে অনেক দূর , সূর্য যেন নিশানা ছোট্ট বেঞ্চ, সেখানে বসব বলেই আসা
আমাদের আবার হতাশ হওয়ার খুব ঝোঁক আগে থেকেই শতভাগ অনুমান মিলে যাওয়ার ক্ষোভ
তবুও
বুকিং শেষ কবেই, আমরাই প্রথম সব সিজনে কোনদিন কয়লা খাদান দেখবো, এও ভেবেছি কবে আমাদের আবার ভুলে যাওয়ার দোষ নরম অন্ধকারে আঁকা আমাদের সবুজ নোটবুক
সাত
হঠাৎ করে খুব ক্লান্ত লাগছে মনে হয় একজন আমার সঙ্গে থাকতে থাকতে আরো ক্লান্ত হয়েছে
তাকে ভালোবেসে এসব বলতে বলতে আসল রহস্যময় দ্বীপ ছেড়ে এসেছি
সামনে নিতান্তই নদীবারান্দা, নৌকাবাটি এখানে আমার সকল অহংকার শেষ করেছি, এমনকি গন্তব্যও যা কিছু আড়ম্বরহীন, তাই দিচ্ছি, স্বঅভিমানে
আট
তুমি যাকে ভালবাসলে আর তাকে দিতে চাইলে তোমার " না পাওয়া " অবাক হয়ে দেখলে তার কাছে আছে শুধু "হাহাকার " বাধ্য হয়ে তুমিও কুড়িয়ে নিলে সেই " হাহাকার " তারপর খাদের পাশে দাঁড়িয়ে দুজনে কি ভয় ! কি ভয় ! যদি ফিরে আসে আরো বিকট শূন্যতা, ভীতু পাখির মতো নামানো চোখ শুধু বলে যাচ্ছে , "নিঃশর্ত, নিঃশর্ত "!
নয়
আবার অপেক্ষা করছি প্রেমের আস্তে আস্তে কেমন করে সে হয়ে যায় অপ্রেম অপেক্ষা করছি তারও। মজা সেখানেই, ক্লান্তি সেখানেই, পাশে রাখা এক কিবোর্ড, চলাচল ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে শুধু। ক্যালেন্ডার থেকে নীচে পরে যাচ্ছে কিছু সরকারি ছুটির দিন, এইসকল ছুটির দিনে, আমরা কখনো সখনো আধখানা গান শুনেছি তারপর কেউ এসেছে, গল্প করেছে দেশের বেকার সমস্যা নিয়ে, আমি শুনতে শুনতে ভাবতে থাকি এখনো কি কোথাও আছে সেই ডাকবাক্স, যেখানে নিভৃতে শুয়ে আছে কিছু বিশেষ ঘোষণা, ব্যথা আর ব্যর্থতার ...
দশ
কোনদিন আপনাকে হারিয়ে ফেলব আমি একটি ভুলভাল সংলাপের খেসারত হয়তো দেবো আপনি চলে যাবেন অভিমান করে
আমি কোনো কোনো কবিতা পাঠের আসরে যাবো মেয়ে তখন অনেক বড় হয়ে গেছে পুরীর সমুদ্রধার থেকে পুরাতন মায়ের জন্য কিনে এনেছে শঙ্খমালা, সেটাই পরেছি আমি কবিতা পড়ছি, চশমার বাড়তি পাওয়ারের নীচ থেকে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে কবিতার রঙ আমি অনেকদিন আগে আপনার সেই চলে যাওয়াকে বলছি ... কবিতায় যুদ্ধ নেই, বিপ্লব নেই, অসহায় মানুষের কথা নেই শুধু চলে যাওয়ার অস্ফুট কিছু কথা আছে ...
এগারো
একটি আশ্চর্য অনুভব হলো আজ ভেবেছিলাম আমরা পুরনো হয়ে গেছি
আমাদের সন্ধ্যাকাল আর অন্যান্য সময় নতুন কিছু নয় আর
কিন্তু যেই না এক বিকেলে আমরা খুব কাজে বেরোলাম দুজনে মোষের গায়ের রঙের মতো কিছু মেঘ তখন আকাশে আশ্চর্য কি ভালোই না লাগছিল হাঁটতে অথচ কথা হচ্ছিল করোনা ভাইরাস, জিনিসপত্রের দাম ইত্যাদি নিয়ে তবুও অনেক ভালো লাগছিল ...রাতের চেয়েও যেন কিছু বেশি
বারো
হঠাৎ করে বিকেল নেমে এলো যেন বহুদিন এরকম বিকেল আসেনি তোমার কাছে তুমি কি করবে ভেবে পাচ্ছো না তাকে নিয়ে একটি পাহাড়ী পথ গোপনে রেখেছো আজো বিভাজিকায় সেখান দিয়ে সোজা হেঁটে গেলেই বন না হয় একাই পথিক হলে, আরোহন শেষে খুলে রাখলে নির্মল স্বেদ...
তেরো
সমস্ত নিরাপদ লাইন থেকে নির্বাসিত মেঠোপথে আছে তোমার অস্থিরতা আলো আবছায়া হয়ে হেঁটে যাওয়া সংসারে থেকে অসংসারী মন, উদোম হাওয়া মাছের মতো পিচ্ছিল সব বসন্তকাল
হে নতুন কবিতা লিখতে আসা মেয়ে মিলিয়ে নিও আমার সঙ্গে তোমার অবিকল ধারাপাত
চৌদ্দ
ম্যাপ খুলে বসেছি দুজনে, একসঙ্গে আঙুলে আঙুল লাগিয়ে খুঁজছি আজ , যেখানে হবে মধুযামিনী জন্মান্তরে, চোখ বন্ধ করে, আঙুল হাঁটতে থাকে,
কোথাও থামতে দিই না আমি ভয়ে, যদি হয় আগ্নেয়প্রপাত, সাগরখাদ, শ্বেতমরু, অথবা শ্বাপদ অরণ্য!
একসময়, তুমি বলে উঠো স্টপ ইট্ !
চোখ খুলে ফেলি দুজনেই ভাঙামুহুর্তে,
দেখি এক ঝড়না ঘর!
স্নান শেষের গন্ধে ভরে আছে চার দেয়াল,
সব সময় পুড়ে গেছে ঋতুতে ঋতুতে শীতের মাঠে মাঠে,
তারা কোন জন্মান্তর রেখে যায়নি। . ************************** . সূচীতে . . .