কবি জর্জ মীর্জাফর গোস্বামীর গান ও কবিতা
*
শিবার কথা
কবি জর্জ মীরজাফর গোস্বামী
[ সংবাদে প্রকাশ, অনাথ আশ্রমের এক অনাথ সাত বছরের শিবা
অনাহারে মারা গেছে । ]


কার সে খোকন হারিয়ে গেল
অন্ধকারের দেশে
কেউ দেয়নি সোহাগ তাকে
একটু ভালোবেসে ।
কোথায় বা তার বাপের স্নেহ
কোথায় বা তার মা !
তাইতো সমাজ বিধান দিল
নির্বাসনে যা !
ভাত জোটেনি নুন জোটেনি,
সাত বছরের ছেলে,
হয়তো খাঁটি মানুষ হ’ত
একটু সুযোগ পেলে !
কুসুম কুঁড়ি পড়ল ভুঁয়ে
ফুটল না হায় ফুল,
কেন এমন নিঠুর নিয়ম
এমন কেন ভুল ?
আরও কত অনাথ শিবা
নীরব অভিমান,
তোমরা পারো, শোনাও তাদের
মরণ জয়ের গান !

.             ***************  
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শিশু দিবস
কবি জর্জ মীরজাফর গোস্বামী


আমাদের নিয়ে গান
আর কতো বাণী রে
আজকে শিশুর দিন
এইটুকু জানিরে ।
চায়ের দোকানে কাজ,
গরীবের ছেলে তো !
লেখা পড়া ? দূর ছাই !
সে সুযোগ পেলে তো ?
সক্কাল বেলাতেই
আখা দিই ধরিয়ে
দুপুরের ভাত পেতে
বেলা যায় গড়িয়ে ।
গ্লাস কাপ প্লেট মাজি
জল আনি চারবার,
কত টাকা পাই জানো ?
মালিকের কারবার !
গালাগাল কান মোলা
মালিকের মেজাজে
কেবল ধরবে খুঁৎ
যাই আমি যে কাজে ।
খদ্দের নানা লোক
কেউ ভালো, মন্দ
নিজের ভাগ্য নিয়ে
মনে লাগে ধন্দ !
কেউ বলে ‘হতভাগা !
চায়ে চিনি দিস নি !
কালকের পয়সাটা
নগদেই নিসনি ?’
কেউ বা আগুন চায়
সিগারেট ধরাবে
আমি তো চাকর বটে
সব কাজ করাবে !
দিন থেকে রাত কাটে
ছুটি পাই দেরীতে
দোকানের ‘বয়’ আমি
শাসনের বেড়ীতে !
আমার বন্ধু শুধু
লোম ওঠা কালুটা
এঁটো পাতা চেটে খায়
আর পচা আলুটা ।
তোমাদের ইস্কুলে
বই আর খেলা রে
আমাকে সইতে হয়
কতো অবহেলা রে !
আজকে ‘শিশুর দিন’
ব্যাপারটা বুঝি না !
কী হবে ওসব ভেবে,
উত্তর খুঁজি না !
তোমরাই বড় হবে
পড়াশোনা শিখবে,
দোকানের ছোঁড়াটার
কথা কিছু লিখবে ?

.             ***************  
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রঙীন বিশ্ব ছেড়ে
কবি জর্জ মীরজাফর গোস্বামী


কমপ্ল্যান, ক্যাডবেরী, রস্ নার দৃশ্য
রঙীন টিভির পটে রঙীন সে বিশ্ব ;
ধনীর দুলাল ছেলে নেই কোনোও অভাবে
সব কিছু চাই তার আল্লাদী স্বভাবে ।
ফিটফাট শার্টপ্যান্ট চৌখশ মূর্তি,
ফটাফট ইংরেজী কি দারুণ ফূর্তি !
রঙীন বিশ্ব ছেড়ে সত্যটা ভাববে ?
জীবন দেয় না ধরা রঙীন সে কাব্যে !
হাড়গিলে কালো ছোঁড়া তোমারই তো ভাই রে ;
সারা দিন খেটে মরে ভাত রুটি চাইরে ।
তোমারই বন্ধু খাটে কল-কারখানাতে
কপালে ঘামের ফোঁটা কতো কিছু বানাতে !
কেউ বা বাদাম ব্যাচে রেলগাড়ি, বাসেতে,
কটা টাকা পায় খোকা সপ্তাহ মাসেতে ?
আরও আছে কতোশত কতো তার কষ্ট
অন্নের হাহাকারে জীবনটা নষ্ট !
এ হিসেব ঠিক নয় সব্বাই মানবে,
রঙীন দৃশ্য ছেড়ে বিশ্বটা জানবে ।
তোমরাই বড় হবে, ইতিহাস গড়বে,
সব্বার হাসি চাই, সব্বাই লড়বে !

.             ***************  
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
চলো পড়াই-- !
কবি জর্জ মীরজাফর গোস্বামী


“এ্যাই ছোঁড়া ওঠ্ তোকে সাক্ষর বানাবো
বই খাতা পেন্সিল ফীরিতেই আনাবো ।”
“আমি দাদা খেটে খাই, পেটে নেই পান্তা—
কী হবে কেতাব প’ড়ে ? হ’য়ে সব জান্তা ?”
“বুঝিস নে ? পরীক্ষা, পাশটা তো করব !
নম্বর পেতে হবে, ক্যাঁক করে ধরব
আন্টিরা বলেছিল, ‘সাক্ষর বানাবে,
তবে সে না স্কুলটার প্রেসটিজে মানাবে ;
তাই বলি বসে যাও অ-আ-ক-খ শিখবে,
নিজেদের নাম তুমি নিজে নিজে লিখবে ।
তারপর খাবি খাও, কে বা তোকে দেখবে,
পরীক্ষা-নম্বরে একশো-তে ঠেকবে !”
“দরকার নেই দাদা অ-আ-ক-খ শিক্ষা
এতদিন শুনেছি তো চালডাল ভিক্ষা ;
আজ দেখি ভিক্ষাটা পেন্সিল কাগজে
অ-আ-ক-খ হাতুড়ীটা সরাসরি মগজে !
পেট ভ’রে ভাত দাও, বেলা যায় গড়িয়ে ;
‘চুপ কর ছোটলোক ! দেব ধ’রে চড়িয়ে !
ঠিক-ই বলে আন্টিরা,-- বেশি লাই দেবো না,
সত্যি শিখবি তোরা ? এই কথা ভেবো না ।

.             ***************  
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ছোটলোকের ছড়া
কবি জর্জ মীরজাফর গোস্বামী


‘কমপ্লান বয়’ নয়, হাভাতের বাচ্চা
আমাদের দেশ ‘সারে জাঁহাসে ভী আচ্ছা’ !
কেউ মরে ফুটপাতে, কেউ খাটে বেগারে,--
বিদেশীরা ছবি তোলে,---- এ দেশের ‘beggar’- এ ।
কেউ বা অন্ধ হয় “পুষ্টির অভাবে !”
কেউ বা ছ্যাঁচোড় হয় “গুষ্টির স্বভাবে !”
হাড় গিলে বাচ্চারা থিকথিক করছে,
কোথা থেকে আসে এরা ?
“রোজ-ই কতো মরছে !”
“বই পড়া ? দূর ছাই !
ডাল ভাত-ই জোটে না,---
হাভাতের হাতে ভাই বই খাতা ওঠেনা !”
“তবে কেন বই লেখা, তবে কেন কাব্য ?
ছোটলোক হয়ে আজ ছোট কথা ভাবব !”

.             ***************  
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
অথ স্বাধীনতা কথা
কবি জর্জ মীরজাফর গোস্বামী
[ আকাশবাণী প্রদত্ত সংবাদে প্রকাশ মহামান্য উপরাষ্ট্রপতি শ্রীযুক্ত হিদায়েতুল্লা সাহেব
বলেছেন মাউন্ট ব্যাটেনের হস্তক্ষেপের ফলেই ভারতের স্বাধীনতা দশ দিন এগিয়ে আসে ।
দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে মাউন্ট ব্যাটেনের যোগ্য নেতৃত্বের কথাও তিনি জনগণকে
স্মরণ করিয়ে দেন । ]


মাউন্টব্যাটেন ডিম পেড়েছেন
নামটি তাহার আজাদী
সেই কথাটাই গেছিস ভুলে ?
দেখনা কেমন সাজা দি !
গান্ধী হলেন ধম্মোবাবা,
আসল বাবা বিলাতে
মাউন্ট ব্যাটেন হঠাৎ এলেন
স্বাধীনতা বিলাতে !
এটলি বাবা দুষ্টু ভারী
করেন খালি বাহানা---
নেহেরুদা বলেন শুধু
আরও দেরী ? আহা না !
‘ধৈর্য ধরো’ ব’লে লেডি
নয়ন দুটি খেলালেন,
নেহেরুদা দীওয়ানা তার
দুই পাটি দাঁত কেলালেন ।
মাউন্টব্যাটেন মধুর হেসে
প্রসব করেন দশদিনে
জিন্না মিঞা বেজায় খুশী
আধখানা ডিম নেন চিনে ।
ধন্য হলাম ভারতবাসী
আধখানা ডিম ভাগ পেয়ে—
জয় জয় জয় মাউন্টব্যাটেন,
‘এই শালারা ! ওঠ্ গেয়ে !!’

.             ***************  
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আলো সংকট
কবি জর্জ মীরজাফর গোস্বামী


জ্যোতি দাদা, জ্যোতি দাদা
করছ তুমি কী ?
‘এই দেখো না চতুর্দিকে
আঁধার করেছি !’
কেমন ক’রে ক’রলে আঁধার
বলবে নাকি দাদা ?
‘আঁধার দিল সিধু ব্যাটা
ইন্দিরাজীর গাধা !’
সিধু দাদা, সিধু দাদা
বলবে নাকি তুমি ?
কেমন ক’রে করলে আঁধার
ভঙ্গ বঙ্গ ভূমি ?
‘এই কথা তো সবাই জানে
ভুলিনি তার নাম,
আঁধার করার খেল্ টা হ’ল
অজু মুখোর কাম !’
অজু দাদা, অজু দাদা
এই কথা কি ঠিক,
আঁধার দিয়ে ঢাকলে তুমি
দেশের দিক্ বিদিক ?
‘আমি তো ভাই মন্ত্রী ছিলাম
কেবল কটা মাস,
আঁধার হবার আসল কারণ,
প্রফুল্লটার বাঁশ !’
প্রফুল্ল দা, প্রফুল্ল দা
এটা তোমার বাঁশ,---
তুমি-ই তালে ক’রিয়েছিলে
অমন সব্বোনাশ ?
‘যখন আমি মন্ত্রী হ’লাম
চেয়ারেতে ব’সে
আঁধার দিলেন পূর্বসুরী
যাবার আগে হেসে !’
বিধান দাদা, বিধান দাদা
নব্যবঙ্গ নেতা,
আঁধার করার কারসাজীতে
তুমি-ই নাকি হোতা ?
আমি হোতা ? আজব ব্যাপার !
হাসালে ! দূর ! দূর !
আঁধা দিলেন সবার বাবা
ব্রিটিশ বাবাদূর !

.             ***************  
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বঙ্গ বুদ্ধিজীবী কথা (২)
কবি জর্জ মীরজাফর গোস্বামী


বামপন্থী বুদ্ধিজীবী
মিনিস্টারের কাছের লোক,
অধ্যাপনা, ‘পেপার’ লেখা
সন্ধ্যাবেলায় দু’-চার ঢোঁক।

প্রিয়া তাহার হিয়া দোলে
বামপন্থী নেত্রী তাই
মহিলাদের কমিশনে
ব্যস্তভারি সময় নাই।

নন্দীগ্রামে মানুষ মরে
চক্ষু বুজে নিদ্রা যাই,
পুত্র গেল মার্কিনেতে
ইঞ্জিনিয়ার পাত্রী চাই!

.             ***************  
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পুজোর ছড়া (৩)
কবি জর্জ মীরজাফর গোস্বামী


বন্যায় ভেসে গেল লাখো লাখো ছেলে মেয়ে
তবু তুমি নেবে পুজো ? দেখ না এ সব চেয়ে ?
অসুর দমন করো, যদি হয় সত্যি
কী ক’রে ঘোরায় ছড়ি যতো সব দত্যি ?
আসল কথাটা বুঝি, নেই তোর শক্তি!
মাটির ঢ্যালাকে তবে কেন মিছে ভক্তি!

.             ***************  
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*