| কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা |
| কুলীন মহিলা বিলাপ কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় “কবিতাবলি” (১৮৭০) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। “এই না, ইংলণ্ডেশ্বরি, রাজত্ব তোমার? তবে যেন ক্রীতদাস হয় গো উদ্ধার তোমার পরশ মাত্র --- সরস অন্তরে ছিঁড়িয়া শৃঙ্খলমালা স্বাধীনতা ধরে? তবে যেন রাজ্যেস্বরি রাজ্যেতে তোমার সকলে সমান স্নেহ উত্সাহ সবার? নাহি যেন ভিন্নভাব কন্যাসুত প্রতি? নাহি যেন তোমার রাজ্যে নারীর দুর্গতি? শুনেছি না বৃটনের শ্বেতাঙ্গী মহিলা পুরুষের সহতরী সঙ্গে করে লীলা? সন্তান ধরেছ গর্ভে তুমি মা আপনি, সন্তানের কত মায়া জান ত জননী। তবে কেন আমাদের দুর্গতি এমন, এখনো মা ঘুচিল না অশ্রুবিসর্জ্জন!” আয় আয় সহতরী, ধরি গে বৃটনেশ্বরী, করি গো তাঁহার কাছে দুঃখের রোদন ; এ জগতে আমাদের কে আছে আপন? বিমুখ বান্ধব ধাতা, বিমুখ জনক ভ্রাতা, বিমুখ নিষ্ঠুর তিনি পতি নাম যাঁর--- রাজেশ্বরী বিনে ভবে কোথা যাব আর? আয় আয় সহচরী, ধরি গে বৃটনেশ্বরী, করি গে তাঁহার কাছে দুঃখের রোদন ; এ জগতে আমাদের কে আছে আপন? “সাতশতবর্ষ, মাতঃ, পৃথিবী ভিতরে এই রূপে অহরহঃ অশ্রধারা ঝরে মাতা মাতামহী চক্ষে জন্ম জন্মকাল, আমাদেরো সেই দুর্দশা হায় রে কপাল! কত রাজ্য হলো গেলো, কত ইন্দ্রপাত, নক্ষত্র খসিল কত, ভূধর নিপাত, হিন্দু বৌদ্ধ মুসলমান ম্লেচ্ছ অধিকার, শাস্ত্র ধর্ম্ম মতামত কতই প্রকার উঠিল ভারত ভূমে, হইল পতন, আমাদের দুঃখ আর হলো না মোচন! |
| ভারত বিলাপ কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় “কবিতাবলি” (১৮৭০) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। ভানু অন্ত গেল, গোধূলি আইল ;--- রবি-কর-জাল আকাশে উঠিল মেঘ হ’তে মেঘে খেলিতে লাগিল, গগন শোভিল কিরণজালে ;--- কোথা বা সুন্দর ঘন কলেবর সিন্দুরে লেপিয়া রাখে থরেথর, কোথা ঝিকি ঝিকি হীরার ঝালর যেন বা ঝুলায় গগন ভালে। সোণার বরণ মাখিয়া কোথায় জলধর জলে --- নয়ন জুড়ায়, আবার কোথায় তুলা রাশি প্রায় শোভে রাশি রাশি মেঘের মালা। হেনকালে একা গিয়া গঙ্গাতীরে হেরি মনোহর সে তট উপরে রাজধানী এক, নব শোভা ধরে, রয়েছে কিরণে হয়ে উজলা। দ্বিতালা ত্রিতালা চৌতালা ভবন, সুন্দর সুন্দর বিচিত্র গঠন, রাজবর্ত্ম পাশে আছে সুশোভন--- গোধূলি রাগেতে রঞ্জিত কায়। অদূরে দুর্জ্জয় দুর্গ গড়খাই, প্রকাণ্ড মূরতি, জাগিছে সদাই, বিপক্ষ পশিবে হেন স্থান নাই--- চরণ প্রক্ষালি জাহ্নবী ধায়। গড়ের সমীপে আনন্দ উদ্যান, |
. *************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |


| ভারত কামিনী কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় “কবিতাবলি” (১৮৭০) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অরে কুলাঙ্গার হিন্দু দুরাচার--- এই কি তোদের দয়া, সদাচার? হয়ে আর্য্যবংশ --- অবনীর সার রমণী বধিছ পিশাচ হয়ে! এখনও ফিরিয়া দেখনা চাহিয়া জগতের গতি ভ্রমেতে ডুবিয়া--- চরণে দলিয়া মাতা, সুতা, জায়া, এখনো রয়েছ উন্মত্ত হয়ে? বাঁধিয়া রেখেছ বামা রাশি রাশি অনাথা করিয়া গলে দিয়া ফাঁসি, কাড়িয়া লয়েছ কবরী, কঙ্কণ, হার, বাজু, বালা, দেহের ভূষণ--- অনন্ত দুখিনী বিধবা নারী। দেখ রে নিষ্ঠুর, হাতে লয়ে মালা কুলীন সধবা অনূঢ়া অবলা আছে পথ চেয়ে পতির উদ্দেশে, অসংখ্য রমণী পাগলিনী বেশে--- কেহ বা করিছে বরমাল্য দান মুমূর্ষুর গলে হয়ে ম্রিয়মাণ নয়নে মুছিয়া গলিত বারি! চারিদিকে হেথা ভারত জুড়িয়া, সরসীকমল যেন রে ছিঁড়িয়া--- কামিনীমণ্ডলী রেখেছ তুলিয়া--- কোমল হৃদয় করেছ হতাশ, না দেখিতে দেও অবনী আকাশ--- করে কারাবাস জগতে রয়ে। অরে কুলাঙ্গার হিন্দু দুরাচার--- এই কি তোদের দয়া, সদাচার? হয়ে আর্য্যবংশ --- অবনীর সার রমণী বধিছ পিশাচ হয়ে! এখনও ফিরিয়া দেখনা চাহিয়া জগতের গতি ভ্রমেতে ডুবিয়া--- চরণে দলিয়া মাতা, সুতা, জায়া, ছড়ায়ে কলঙ্ক পৃথিবী মাঝে! --- দেখ না কি চেয়ে জগত উজ্জ্বল এই সে ভারত, হিমানী অচল, এই সে গোমূখী, যমুনার জল, সিন্ধু, গোদাবরী, সরযূ সাজে? জান না কি সেই অযোধ্যা, কোশল, এই খানে ছিল, কলিঙ্গ পঞ্চাল, মগধ, কনৌজ, ---সুপবিত্র ধাম সেই উজ্জয়নী, নিলে যার নাম ঘুচে মনস্তাপ কলুষ হরে? এই রঙ্গভূমে করেছিল লীলা আত্রেয়ী, জানকী, দ্রৌপদী, সুশীলা, খনা, লীলাবতী প্রাচীন মহিলা--- সাবিত্রী ভারত পবিত্র করে। এই আর্যভূমে বাঁধিয়া কুন্তল ধরিয়া কৃপাণ কামিনী সকল, প্রফুল্ল স্বাধীন পবিত্র অন্তরে নিঃশঙ্ক হৃদয়ে ছুটিত সমরে--- খুলে কেশপাশ দিত পরাইয়া ধনিদণ্ডে ছিলা আনন্দে ভাসিয়া--- সমর-উল্লাসে অধৈর্য্য হয়ে--- কোথা সে এখন অসিভল্লধার মহারাষ্ট্র বামা, রাজোয়ারা নারী? অরাতি বিক্রমে পরাজিত হলে চিতানলে যারা তনু দিত ঢেলে পতি, পিতা, সুত, সংহতি লয়ে। বীরমাতা যারা বীরাঙ্গনা ছিল, মহিমা কিরণে জগত ভাতিল--- কোথা এবে তারা --- কোথা সে কিরণ? আনন্দ কানন ছিল যে ভূবন নিবিড় অটবী হয়েছে এবে! আর কি বাজে সে বীণা সপ্তস্বরা বিজয় নিনাদে বসুন্ধরা ভরা? আর কি আছে সে মনের উল্লাস, জ্ঞানের মর্য্যাদা, সাহসবিভাস সে সব রমণী কোথা রে এবে? সে দিন গিয়াছে --- পশুর অধম হয়েছে ভারতে নারীর জনম ; নৃশংস আচার, নীচ দুরাচার ভারত ভিতরে যত কুলাঙ্গার পিশাচের হেয় হয়েছে সবে। তবে কেন আজও আছে ঐ গিরি নাম হিমালয়, শৃঙ্গ উচ্চে ধরি? তবে কেন আজও করিছে হুঙ্কার ভারত বেষ্টিয়া জলধি দুর্ব্বার? কেন তবে আজও ভারত ভিতরে হিন্দুবংশাবলী শুনে সমাদরে ব্যাস বাল্মীকি, বারিধারা ঝরে সীতা, দময়ন্তী, সাবিত্রী রবে? --- গভীর নিনাদে করিয়ে ঝঙ্কার, বাজ্ রে বীণা বাজ্ একবার, ভারতবাসীরে শুনায়ে সবে। দেখ্ চেয়ে দেখ্ হোথা একবার--- প্রফুল্ল কোমল কুসুম আকার য়ূনানী১ মহিলা হয় পারাপার অকূল জলধি অকুতোভয়ে। ধায় অশ্বপৃষ্ঠে অশঙ্কিত চিতে কানন, কন্দর, উন্নত গিরিতে--- অপ্সরা আকৃতি পুরুষ সেবিতা সাহিত্য, বিজ্ঞান, সঙ্গীতে ভূষিতা--- স্বাধীন প্রভাতে পবিত্র হয়ে। আর কি ভারতে ওরূপে আবার হবে রে অঙ্গনা-মহিমা প্রচার?--- পেয়ে নিজ মান, পরে নিজ বেশ জ্ঞান, দম্ভ তেজে পূরে নিজ দেশ,--- বীর বংশাবলী প্রসূতি হবে? এহেন প্রকাণ্ড মহীখণ্ড মাঝে নাহি কিরে কোন বীরাত্মা বিরাজে--- এখনি উঠিয়া করে খণ্ড খণ্ড সমাজের জাল করাল প্রচণ্ড--- স্বজাতি উজ্জ্বল করিয়া ভবে? চৈতন্য গৌতম নাহি কিরে আর, ভারত সৌভাগ্য করিতে উদ্ধার?--- ঋষি বিশ্বামিত্র, রাঘব, পাণ্ডব, কেন জন্মেছিল মহাত্মা সে সব--- ভারত যদি না উন্নত হবে? ধিক্ হিন্দুজাতি হয়ে আর্য্যবংশ, নরকণ্ঠহার নারী কর ধ্বংস! ভুলে সদাচার, দয়া, সদাশয়, কর আর্য্যভূমি পূতিগন্ধময়, ছড়ায়ে কলঙ্ক পৃথিবী মাঝে! --- দেখ না কি চেয়ে জগত উজ্জ্বল এই সে ভারত, হিমানী অচল, এই সে গোমুখী, যমুনার জল, সিন্ধু, গোদাবরী, সরযূ সাজে? জান না কি সেই অযোধ্যা, কোশল, এই খানে ছিল, কলিঙ্গ পঞ্চাল? মগধ, কনৌজ, ---সুপবিত্র ধাম সেই উজ্জয়নী, নিলে যার নাম ঘুচে মনস্তাপ কলুষ হরে? এই রঙ্গভূমে করেছিল লীলা আত্রেয়ী, জানকী, দ্রৌপদী, সুশীলা, খনা, লীলাবতী প্রাচীন মহিলা--- সাবিত্রী ভারত পবিত্র করে?--- অরে কুলাঙ্গার হিন্দু দুরাচার--- এই কি তোদের দয়া, সদাচার? হয়ে আর্য্যবংশ --- অবনীর সার রমণী বধিছ পিশাচ হয়ে? এখনও ফিরিয়া দেখনা চাহিয়া জগতের গতি ভ্রমেতে ডুবিয়া--- চরণে দলিয়া মাতা, সুতা, জায়া, এখনো রয়েছ উন্মত্ত হয়ে? . *************** ১ - ইউরোপীয়। . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
. *************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
