কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
*
কালচক্র
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
যোগীন্দ্রনাথ সরকার সংকলিত বন্দেমাতরম্ (১৯০৫) কাব্য সংকলন থেকে নেওয়া।


.                বারেক এখনও কি রে দেখিবি না চাহিয়া,---
উন্নত গগন-পরে, ব্রহ্মাণ্ড উজ্জ্বল ক’রে
.                উঠেছে নক্ষত্র কত নবজ্যোতি ধরিয়া।
মানবে দেখায়ে পথ, চ’লেছে তড়িবৎ
.                প্রভাতিয়া ভবিষ্যৎ ভূমণ্ডল ভাতিয়া।
হেরে সে নক্ষত্র-ভাতি, দেখ রে মানব-জাতি
ছুটেছে তা’দের সনে আনন্দ উত্সাহ-মনে
.                নিজ নিজ উন্নতির জয়পত্র বাঁধিয়া।
চ’লেছে চাহিয়া দেখ, বোদ্ধা যোদ্ধা এক এক
.                কাল-পরাজয় করি দেবমূর্ত্তি ধরিয়া।
জলধি, পৃথিবী, মেরু, প্রতাপে হয়েছে ভীরু,
.                অবাধে পড়িছে পাশ পদতলে পড়িয়া।
চ’লেছে বুধ-মণ্ডলী নরে নরে কুতূহলী,
চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ-তারা ছিঁড়িয়া আনিছে তারা
.                শূন্য হ’তে ধরাতলে জ্ঞান-ডোরে বাঁধিয়া।
আকাশ-পাতাল-গত পঞ্চভূত আদি যত
.                প্রকৃতি ভয়েতে দ্রুত দেখাইছে খুলিয়া।
দেবতা অসুরগণ ক্রমে হয় অদর্শন,
.                ঈশ্বরেরই সিংহাসন উঠিতেছে কাঁপিয়া।
সরস্বতী কুতূহলা, সাহিত্য-দর্শন-কলা
.                স্বহস্তে সহস্রমালা দিতেছে তুলিয়া।
কমলা অজস্র ধারে ভাঙ্গিয়া নিজ ভাণ্ডারে,
.                ধনরাশি স্তূপাকারে দিতেছেন ঢালিয়া।
কবিকুল কোলাহলে মুখে জয়ধ্বনি বলে
উন্নতি-তরঙ্গ সঙ্গে ছুটিছে অশেষ রঙ্গে,
.                স্বজাতি-সাহস-কীর্ত্তী উচ্চৈঃস্বরে গাহিয়া।
অই দেখ অগ্রে তার পরিয়া মহিমা-হার
.                চলেছে ফরাসী-জাতি ধরা স্তব্ধ করিয়া।
অস্হির বাসনানলে--- স্থাপিতে অবনীতলে,
.                সমাজ-শৃঙ্খলামালা নব সূত্রে গাঁথিয়া।
চ’লেছে রে দেখ চেয়ে শত বাহু প্রসারিয়ে
.                অর্দ্ধ সসাগরা ধরা অলঙ্কারে ভূষিয়া,
আমেরিকা-বাসীগণ, নদ, গিরি, প্রস্রবণ,
.                জলনিধি উপকূল লৌহজালে বাঁধিয়া।
অই শোন্ ঘোর নাদে পূরাতে মনে সাধে,
.                পুরুষিয়া মল্লবেশে উঠিতেছে গর্জ্জিয়া।
বিনতা-নন্দন-সম ধ’রে নিজ পরাক্রম
.                দেখ্ রে আসিছে রুশ বসুমতী গ্রাসিয়া।
ইতালি উতলা হ’য়ে স্ব কিরীট শিরে ল’য়ে
.                আবার জাগিছে দেখ্ হুহুঙ্কার ছাড়িয়া।
বিস্তারিয়া তেজরাশি দেখ্ রে বৃটনবাসী
আচ্ছন্ন ক’রেছে ধরা, মরু দ্বীপ সসাগরা,
.                যত দূর প্রভাকর-কর আছে ব্যাপিয়া।
প্রকাশি অসীম বল শাসিছে জলধিতল,
.                শিরে কোহিনুর বাঁধা মদগর্ব্বে মাতিয়া।
তবুও বারেক কি রে দেখিবি না চাহিয়া---
হতভাগ্য হিন্দু জাতি!--- শোভে কি নক্ষত্র ভাতি,
.                উন্নত গগন পরে ধরাতল ভাতিয়া।
ছিল সাধ বড় মনে ভারত(ও) ওদেরি সনে
.                চলিবে উজলি মহী করে কর বাঁধিয়া ;
আবার উজ্জ্বল হ’বে নব প্রজ্জ্বলিত ভবে
.                ভারত উন্নতি-স্রোতে চলিবে রে ভাসিয়া।
জন্মিবে পুরুষগণ বীর যোদ্ধা অগণন,
.                রাখিবে ভারত-নাম ক্ষিতি-পৃষ্ঠে আঁকিয়া।
সে আশা হইল দূর, নীরব ভারতপুর ;
.                একজন(ও) কাঁদে না রে পূর্ব্বকথা ভাবিয়া।
এ ক্ষিতিমণ্ডল-মাঝ আর্য্য কি রে নাহি আজ্
শুনায় সে রব কেহ উচ্চৈঃস্বরে ডাকিয়া।
.                সে সাধ ঘুচেছে হায়!
আয় মা জননী আয়, লয়ে তোর মৃতকায়,
.                মিটাই মনের সাধ মনে মনে কাঁদিয়া!

.               ***************                 
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রেলগাড়ী
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
কবির “কবিতাবলি” (১৮৭০) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।।


অই শুন টিকিটের ঘরে কিবা গোল!---
মানুষের গাঁদি যেন --- ঠেকাঠেকি কোল!
টকস্ টকস্ নাদে
বাবুর টিকির ছাঁদে,
হাঁপায়ে হাঁপায় ছোটে,
সাড়ী, ধূতী, হ্যাট, কোটে
ঠেকা ঠেকি --- ছুটে যায়
কেহ কারে না সুধায়,
গ্যালো গ্যালো মুখে বোল,
আয়, নে রে, খোল্, তোল্
হের চলে কাণাকাণি
কিবা লাট্, রাজা, রাণী!
এই ফুকারিল বাঁশী,
ঠং - ঠং শেষ কাঁসী,
গাড়িতে পড়িল চাবি --- আর নাহি গোল,
দুলিল সবুজ-রাঙা পতাকর দোল্।

চলিল পুষ্পকরথ ফু’কারে ফু’কারে,
এখন নিঃশ্বাস ছাড়ি দেখ হে দু’ধারে---
হরিত বরণ মাঠ,
ধান্য, নীল, ইক্ষু, পাট,
আকাশ ঢেকে যেথা
দিগন্তে বিস্তৃত সেথা!
দেখ হে দুধারে চেয়ে
পশ্চাতে চলিছে ধেয়ে
সারি সারি নারিকেল,
আর, বট, আম, বেল,
জাঙাল, পগাক, বাঁধ,
বেড়, বাড়ী, নানা ছাদ,
সৌদামিনী-বাঁধা হার
ছুটেছে চামার তার,
উড়িয়া চলেছে রথ
বেগেতে কাঁপিছে পথ---
পক্ষী মৃগ দূরে পড়ি মানিতেছে লাজ---
ধরাতে পুষ্পকরথ এনেছে ইংরাজ!

চলুক্ চলুক্ রথ --- যে যার ভাবনা
ভাবো বসে নিরুদ্বেগে ছুটায়ে কল্পনা ;
স্বভাবের প্রিয় যারা
হের গিরি বারিধারা,
নিবিড় ভূধর গায়
গের খেলা কুয়াসায়,
নিশিথে নক্ষত্র পাতি
হের চন্দ্রমার ভাতি,
দেখ হে অনন্ত দৃশ্য ছড়ান মাথায়---
দেখ দিগন্তের কোলে কি দৃশ্য খেলায়।

হের হের তীর্থ মনে চলেছে যাহারা
পথের দু’ধারে তীর্থ --- শীঘ্র নামো তারা,
গেলো চলে --- গেলো রথ,
অই বৈদ্যনাথ পথ,
গুছাতে সবে না দেরি,
কাজ নাই সঙ্গি হেরি,
দেখিতে দেখিতে যাবে
সীতাকুণ্ড আগে পাবে,
কিছু দূর আগে তার
বাকিপুর গয়া দ্বার,
দণ্ড কত যাক্ যান
পাবে কাশীতার্থ স্থান,
প্রয়াগ অযোধ্যা ছাড়ি পাবে অগ্রবন---
মথুরা তাহার পরে হের বৃনিদাবন!

মানব জনম, হায়, সার্থক হে আজ---
সাবাস্ বাষ্পীয় রথ --- সাবাস্ ইংরাজ!
আরো দূরে যাবে যারা
শীঘ্র রথে উঠ তারা
হরিদ্বার, গঙ্গাঝরি,
পুষ্কর, দ্বারকাপুরী,
নর্ম্মদা, কাবেরী নদ,
কৃষ্ণা গোদাবরী পদ,
ঈলোরা বৌদ্ধ-গহ্বর,
সেতুবন্ধ-রামেশ্বর,
ভ্রমিবে নক্ষত্র-গতি,
পর্ব্বত শৃঙ্গেতে পথি
হেরিবে বিমানে চড়ি --- ত্রেতায় যেমন
সীতারামে ইন্দ্ররথে সিন্ধু-দরশন!

এসো হে কে যাবে, চল ভারত-ভ্রমণে
দুয়ারে পুষ্পক রথ ছাড়িছে নিস্বনে!---
আর কেন বঙ্গবাসী
পায়ে বেঁধে রাখ ফাঁসী,---
বাঙ্গালীর যে দুর্নাম
ঘুচায়ে, সাধ হে কাম,
আর যেন স্ত্রৈণ ব’লে
বাঙ্গালীরে নাহি বলে,
এবে পরিষ্কার পথ,
যাও যথা মনোরথ,
বোম্বাই কিম্বা কলিঙ্গ
সিলং দুর্জয়লিঙ্গ,
সিমলা পাহাড় পাট,
কাশ্মীর, মারহাট্টা ঘাট,
যেখানে করে, গমন,
সাধিতে পার হে পণ
পুষ্পক বিমানে চ’ড়ে সেইখানে যাও---
বাঙ্গালীর লজ্জাকর দুর্নাম ঘুচাও!

ভারত-ভ্রমণে চলো শীঘ্র কর সাজ্
দুয়ারে পুষ্পকরথ বেঁধেছে ইংরাজ!
ধন্য রে বিমান ধন্য!
ধন্য রে ইংরাজ ধন্য!---
কলে জিনিয়াছে কাল,
অঙ্গারে জ্বালায়ে জ্বাল,
বহ্নিরে বেঁধেছ রথে,
পবনের মনোরথে
তুচ্ছ করি, কর খেলা
কি নিশি মধ্যাহ্ন বেলা,
বেঁধেছ ভারত অঙ্গ
লৌহ জালে, করি রঙ্গ,
অসুর অসাধ্য কাজ সাধিতেছ জগতে!---
জড়ে প্রাণ দিতে পার দেবের দর্পেতে,
পার না কি বাঁচাইতে নির্জ্জীব ভারতে?

.               ***************                 
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিশ্ববিদ্যালয়ে
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৮৮৩ সালে প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট কাদম্বিনী বসু (পরে সম্পূর্ণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রথম
মহিলা ডাক্তার কাদম্বিনী গাঙ্গুলী) এবং চন্দ্রমুখী গাঙ্গুলীর বি.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া
উপলক্ষে কবিএই কবিতা রচনা করেন। ১৮৮৩ সালে কালীপ্রসন্ন শর্ম্মা সংকলিত ও
সম্পাদিত “হেমচন্দ্র গ্রন্থাবলী” (১৮৬৪) অন্তর্গত “বিবিধ কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


.               ( ১ )
কে বলেরে বাঙ্গালীর জীবন অসার
সৌরভে আমোদ দেখ্ আজ্ কিবা তার !
বঙ্গালীর হৃদয়ের যতনের ধন,
তার মাঝে দেখ ভাই দুইটী রতন
রজনী করিতে ভোর উজলি গগন
আশার আকাশে উঠি জ্বলিছে কেমন !—
ধন্য বঙ্গনারী ধন্য সাবাসি তুহারে |
ভাসিল আনন্দ ভেলা কালের জুয়ারে !

.                ( ২ )
কি ফুল ফুটিল আজি বঙ্গের মরুতে
ফোটে কিরে হেন ফুল কোন সে তরুতে ?
কোন্ নদী কোন হ্রদ পাহাড় উপরে
ফুটন্ত কুসুম হেন আনন্দ বিতরে ?
রে যামিনি ! তারা হারা, কিবা আভরণ
আছে বল্ তোর বুকে দেখিতে এমন ?
এত দিনে বুঝিলাম সে নহে স্বপন,
ভারত-বিপিনে বীজ হয়েছে বপন ||--
ধন্য বঙ্গনারী ধন্য সাবাসি তুহারে !
ভাসিল আনন্দ ভেলা কালের জুয়ারে !

.                ( ৩ )
এত দিনে জাগিল রে জীবনে বিশ্বাস,
ঘুচিল হৃদয় হ’তে কালের হতাশ ||
বাঙালীর কামিনীর হৃদয়-কমলে
পাশ্চাত্য সাহিত্য-রূপ দিনমণি জ্বলে ||
সমপাঠে সহযোগী কুরঙ্গ-নয়নী,
ছুটেছে যুবক সঙ্গে যুবতী রমণী ||
পরেছে উপাধি হার – সুনীল বসন
সেজেছে অঙ্গেতে কিবা চারু-দরশন |--
ধন্য বঙ্গনারী ধন্য সাবাসি তুহারে |
ভাসিল আনন্দ ভেলা কালের জুয়ারে !

.                ( ৪ )
কবে দেখিব রে বল্ এ বিপিন মাঝে,
আর ( ও ) হেন কুরঙ্গিণী এ মোহন সাজে !
সে দিন হবে কি ফিরে এ দেশে আবার
নারী হবে পুরুষের জীবন আধার !
গৃহরূপ কমলের কমলা আকারে,
ছড়াইবে সুখ রাশি চাহিয়া সবারে
হবে কি সে দিন, ফিরে যাবে এ বাঙালী
অলকা পাইবে হাতে অভাগা কাঙালী |--
কি আশা জাগালি হৃদে, কে আর নিবারে ?
ধন্য বঙ্গনারী ধন্য সাবাসি তুহারে !

.                ( ৫ )
হরিণ-নয়না শুন কাদম্বিনী বালা,
শুনো ওগো চন্দ্রমুখী কৌমুদীর মালা,
তোমাদের অগ্রপাঠী আমি এক জন,
অই বেশ, ও উপাধি করেছি ধারণ |
যে ধিক্কারে লিখিয়াছি “বাঙালীর মেয়ে”,
তারি মত সুখ আজ তোমা দোহে পেয়ে ||
বেঁচে থাক, সুখে থাক, চির সুখে আর !
কে বলেরে বাঙালীর জীবন অসার |--
কি আশা জাগালি হৃদে কে আর নিবারে ?
ভাসিল আনন্দ ভেলা কালের জুয়ারে ||
ধন্য বঙ্গনারী ধন্য সাবাসি তুহারে |

.               ***************                 
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রীপণ উত্সব --- ভারতের নিদ্রাভঙ্গ
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
কালীপ্রসন্ন শর্ম্মা সংকলিত ও সম্পাদিত হেমচন্দ্র গ্রন্থাবলী ( ১৮৬৪ ) অন্তর্গত “বিবিধ
কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা |

ভাঙ্গিল কি তবে---                 এতদিন পরে—
.        ভাঙ্গিল কি ঘুম ভারতমাতা ?
জরাজীর্ণ শীর্ণ                         শরীরে তোমার
.        ফিরে কি জীবন দিল বিধাতা ?
উঠ --- উঠ মাতঃ                ডাকিছে তোমায়
.        তোমার সন্তান যে যেথা আজ,
কিবা বৃদ্ধ শিশু                           কিবা গুরুজন
.        কি দরিদ্র আর কিবা অধিরাজ ||
ডাকিছে তোমায়                    মহারাষ্ট্রবাসী—
.        ডাকিছে পারসী – পাঞ্জাবী—শিখ,
ডাকিছে তোমায়                      বীরপুত্রগণ—
.        রাজোয়ারাময় যত নির্ভীক ||
তোমার নন্দন                               মহম্মদীগণ,--
.        বাহুবলে যার ধরণী টলে,
ডাকিছে তোমায়                     সবে একস্বর
.        জাগো মা ভারত---জাগো মা ব’লে ||
একা বঙ্গ নয়                           হিমালয় হ’তে
.        কুমারীর প্রান্ত যেখানে শেষ,
আজি এক প্রাণ                            হিন্দু মুসলমান—
.        জাগাতে তোমায় জেগেছে দেশ ||
“আর ঘুমাইওনা”                      ব’লে কতদিন
.        কেঁদেছি ---কেঁদেছি কত সে আর,
আজি জন্মভূমি                              জীবন সার্থক—
.        তোমার কন্ঠে এ মিলন হার ||
কতবার মাতঃ                               উদাসীর মত
.        দেখেছি তোমায় ভুবনময়
স্থাবর জঙ্গম                             কত দিকে কত
.        অরণ্য যেমন ছড়ায়ে রয় ||
দেখেছি তোমার                    গিরি উপত্যকা,--
.        শস্যক্ষেত্র ভূমি, নগর, দেশ,
ছায়ামাত্র তায়                              প্রাণিবৃন্দ যত
.        কালের কালীতে কালিম বেশ ||
জীবনের বিন্দু                           না হেরি কোথাই,
.        সব শূন্যময় – সকলি খালি,
চারিদিকে যত                              নরাস্থি কঙ্কাল,
.        চারিদিকে ধূ ধূ করিছে বালি |
উঠ গো জননি                            দেখো চক্ষু মেলি
.        সেই অস্থিগুলি নড়িছে ধীরে,
মৃদুল হিল্লোলে                          দেখো কি নিশ্বাস
.        সে শব-পঞ্জরে বহিছে ফিরে ||
একমাত্র শ্বাস                              মিলিত ভারত
.        নাসিকারন্ধ্রেতে ছাড়িল যেই,
কি মহা উত্সব                             বহিল উচ্ছ্বাসে ---
.        ভারতে যাহার তুলনা নেই ||
“ আর ঘুমাইও না”                     ডাকি মা আবার
.        ভাবী আশাফল ভাবিয়া দেখো,
“রীপণ-উত্সব”                             সোণার অক্ষরে
.        হৃদয়ের মাঝে লিখিয়া রেখো |
শূন্যতল হতে                              নেমেছে পবন
.        বহিছে তোমার ভুবনময়,
নব-পল্লবিত                           করিতে তোমারে
.        ফুটাতে জীবন মঞ্জরীচয় ||

এ ধীর হিল্লোলে,                   যে বায়ু উঠিছে
.        কার সাধ্য আর নিবা’রে তারে,
অগ্রসর গতি                        কেবা রোধে তার—
.        কেবা আর তারে বাঁধিতে পারে ?
নব শিখাময়                            নব প্রভারাশি
.        ভারত ভস্মেতে মিশেছে ফের,
যে অস্থি কোলেতে                    কাঁদিলে ভারত
.        সজীব হ’বে সে শিখাতে এর |
জীবন দায়িনী                              এ দহন শিখা
.        ভারত অম্বরে ধরেছে ধীরে,
নারায়ণ মুখে                             হয়েছে উদ্ভব—
.        ভারতের বুকে থাকিবে স্থিরে ||
জ্বলিবে আরো এ                    যাবে কত কাল,
.        জ্ঞানের আলোক---বিদ্যুত্ছটা
দমে না দমনে,                              দমিলে দ্বিগুণ
.        ধরে খরতর তেজের ঘটা ||
ভূলো না ভারত                      “রীপণ-উত্সব”
.        ছিঁড়ো না যে ডোরে মিলেছ আজ,
এক বাণী ধর                               ভারত-সন্তান
.        যেখানে যে থাকো---পরো যে সাজ
মনে করো সবে                          নিভৃতে—উত্সবে
.        “রীপণ-বিদায়” নহে এ খালি,
সম আশা ভয়                              ভারত-অন্তরে
.        এ মিলন তার প্রকাশ্য ডালি ||
নহে আকস্মিক                                 দৈব সুঘটনা—
.        বহুদিন হ’তে অঙ্কুর এর
জড়ায়ে জড়ায়ে                       ভারত-অন্তরে
.        শিকড়ে শিকড়ে বেঁধেছে ফের ||
আজি প্রষ্ফুতি                            হ’য়ে দিছে দেখা
.        তরুমূল যেন পল্লবময়,
ধরণীর গর্ভে                           ধীরে ধীরে বেড়ে
.        ফুলে ফুলে শেষে সাজিয়া রয় ||
ভারতের আশা                               ভারত-প্রত্যাশা—
.        জীবন উন্নতি ইহারই সার,

সুবারি-সেচক                           সে সব তলায়
.        রীপণ কেবলি লক্ষ্য রে তার ||
হবো অগ্রসর                           সেই আশাপথে
.        তিলেক তাহাতে নাহি সংশয়,
দিয়াছে দেখায়ে                     যে পথ উহারা
.        হ’বে পরিসর ধ্রুব নিশ্চয় ||
দিয়াছে যখন                         দেখায়ে সে আলো
.        দিয়াছে যখন দেখায়ে পথ,
আজি আর কালি                   তাহাতে পশিব
.        সাধনে পূরাবো স্ব-মনোরথ ||
আজি আর কালি                  পাবো রে সকলি—
.        আর এ ভারত নিদ্রিত নয়,
সম তৃষ্ণাতুর                             সব পুত্র তার
.        এক ( ই ) পথপানে চাহিয়া রয় ||
এক ( ই ) পথ পানে                    চাহে মহারাষ্ট্র
.        চাহে সে পারসী--- পঞ্জাবী--- শিখ,
চাহে ভারতের                               বীরপুত্রগণ—
.        রাজোয়ারাময় যত নির্ভীক ||

ভারতনন্দন                               মহম্মদীগণ---
.        তাহারাও আজি --- জাগো মা-বলে ;
সেই পথপানে                              একদৃষ্টে চাহে
.        সাধনা সাধিতে সে পথে চলে |
উঠ উঠ মাতঃ                         ডাকিছে তোমায়
.        তোমার সন্তান যে যেথা আজ,
কিবা বৃদ্ধ শিশু                            কিবা যুবাদল
.        কি দরিদ্র আর কিবা অধিরাজ ||
একা বঙ্গ নয়---                           হিমালয় হ’তে
.        কুমারীর প্রান্ত যেখানে শেষ,
আজি এক প্রাণ                           হিন্দু মুসলমান
.        জাগাতে তোমারে জেগেছে দেশ ||
উঠ উঠ মাতঃ                         ছাড়ো নিদ্রা ঘোর
.        পূরিয়া নিশ্বাস ফেল গো মাতঃ,
দেখি কি না হয়                               অরুণ উদয়--
.        তরুণ ছটাতে প্রভাত প্রাতঃ ||

.                    ***************                 
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিদ্যাসাগর
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
কালীপ্রসন্ন শর্ম্মা সংকলিত ও সম্পাদিত “হেমচন্দ্র গ্রন্থাবলী” (১৮৬৪ ) অন্তর্গত
বিবিধ কবিতা কাব্যগ্রন্থের কবিতা |


.              ( ১ )
ফুরাল বঙ্গের লীলা মাহাত্ম্য সকলি,---
হরিল বিদ্যাসাগরে কাল মহাবলী
হারালে মা বঙ্গভূমি, পুত্ররত্নে আজ,
বিশীর্ণ, বিমর্ষ দুঃখে বঙ্গের সমাজ !
কি মহা পরাণ ল’য়ে জন্মেছিল ধীর,
কিবা বিদ্যা--- বুদ্ধি প্রভা – করুণা গভীর !
বিদ্যার সাগর খ্যাতি, --আরো মনোহর
বিশাল উদার চিত্ত দয়ার সাগর !—
.     তেমন সন্তান, মাগো, কে আর তোমার ?

.                (২ )
কাঁদিছে, হের গো, তাঁরে করিয়া স্মরণ,
দরিদ্র কাঙ্গাল দুঃখী কত শত জন :--
“কেবা অন্ন দিবে আর—কে ঘুচাবে দুখ,
দরিদ্র দুঃখীরে হেরে কে চাহিবে মুখ !
কত রাজা রাণী আছে এ রাজ্য ভিতর—
কাঙ্গালে করিবে আর কেবা সে আদর !”
মানব দেহেতে সেই দয়া মূর্ত্তিমান,
সার্থক তাঁহারই জন্ম যশঃ কীর্ত্তিমান,--
.    প্রাতে নিত্য স্মরণীয় যাঁর গুণগান !

.                 ( ৩ )
আপনার বেশ ভূষা সামান্য আকার,
দেখিলে পরের দুঃখ নেত্রে জলভার !
সমাজ-পীড়িত দুঃখ করিতে মোচন
জীবন উত্সর্গ নিজ করিল যে জন,
সমাজ পীড়িত জনে করিতে উদ্ধার
আপনি সহিলা নিন্দা কত তিরস্কার ;
ঋণে বদ্ধ অবশেষে --- তবু দৃঢ় পণ,
সংকল্প সাধন কিম্বা শরীর পতন !---
অ হেন পুরুষ-সিংহ জন্মে মা, ক’জন ?

.                ( ৪ )
অদ্বিতীয় বাঙ্গালা-ভাষার শিক্ষাগুরু—
বর্ণমালা হতে বঙ্গ-সাহিত্যের তরু
স্বহস্ত অর্জ্জিত যাঁর,---যাঁর প্রতিভায়
উজ্জ্বল বাঙ্গালা আজ প্রখর প্রভায় !
বালক বৃদ্ধের মুখে নাম ঘরে ঘরে,
জীবন্ত সুচির কীর্ত্তি রবে যাঁর পরে !
উপাধি উল্লেখে যাঁর নাম পরিচয় ;
ধন্য, বঙ্গমাতা, গর্ভে ধর এ তনয় !---
কর-চিহ্ন কার এত কাল-বক্ষময় ?

.                ( ৫ )
স্বাধীন স্বতন্ত্র চিত্ত কাহার তেমন ?
দর্প, নির্ভীকতা, বীর্য্য ---যে কিছু লক্ষণ
তেজীয়ান্ পুরুষের---সবই ছিল তাঁর |
তৃণজ্ঞান পদ-মান অবজ্ঞা যেথায়,
শ্বেতাঙ্গ প্রসাদ ( ও ) গর্ব্বে ঠেলিত হেলায় !
হেন পুত্র, হায় মাতঃ, হারালে কোথায় ?—
হারালে কোথায় পুত্র হেন পুণ্যতম,
আত্ম যাঁর সত্য আর সাধুতা আশ্রম,--
হৃদয় যাঁহার দয়া--- সাগরের সম |
            
.                ( ৬ )
প্রচণ্ড উত্তাপ-দগ্ধ ভারত গগন,
সকলি অসাড় স্তব্ধ নিঃস্পন্দ যেমন
দুর্জ্জয় কলির দর্পে,--- ধন উপার্জ্জন |
আর পদ-অন্বেষণ, শুধুই এখন
কার্য্য ভূ-ভারত মাঝে ! ---তবুও যে আজ
তাহার ভিতর দীপ্ত করিছে সমাজ
মহাপ্রাণ ---দুই এক,---বিদ্যুৎ যেমন
চকিতে চমকি দিক্ করায় দর্শন ;---
.   হে বিধাতঃ, সে কি, ওহে, ভাবী সুলক্ষণ ?


.                ( ৭ )
এ হেন অদিনে জন্মি অতি দুঃখীকুলে,
আপনার কীর্ত্তিধ্বজা নিজ হস্তে তুলে,
পবিত্র করিয়া তায় জগৎ-পূজায়,
স্থাপিলে শিখর পরে সমাজ-চূড়ায়,
অসামান্য দ্বিজবর ! --- তব দেবদেহ
মরণেও বঙ্গবাসী ভুলিবে না কেহ |
অমর তোমার সেই খর্ব্ব দেহ-ঠাঠ,
সেই দয়াপূর্ণনেত্র ---বিশাল ললাট
বঙ্গের হৃদয়ে নিত্য করুণার পট |
.   দরিদ্র সন্তান হ’য়ে জিনিলে সম্রাট |

.                    ***************                 
.                                                                             
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভারতে কালের ভেরী                   
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১২৮০ বঙ্গাব্দ ( ১৮৭৪ ) এর দুর্ভিক্ষ উপলক্ষে লেখা |
কালীপ্রসন্ন শর্ম্মা সংকলিত ও সম্পাদিত “হেমচন্দ্র গ্রন্থাবলী” ( ১৮৬৪ ) অন্তর্গত “কবিতাবলী”
কাব্যেগ্রন্থের কবিতা |


.                ( ১ )
ভারতে কালের ভেরী বাজিল আবার |----
অই শুন ঘোর ভীম নাদ তার !
ছুটিছে তুমুল রঙ্গে         আকুল অধীর বঙ্গে ;
.   উঠিছে পূরিয়া দিক্ প্রাণী-হাহাকার !—
.   বাজিল অকাল ভেরী---বাজিল আবার |

             
.                ( ২ )
চলেছে প্রাণীর কুল হের চারিধার ;
চলে যেন পঙ্গপাল করিয়া আধার—
স্থবির বালক নারী         হা অন্ন, হা অন্ন বারি
.    বলিতে বলিতে ধায়, চক্ষে নীরধার ;
.    ধরাতলে চলে ধীরে কালীর আকার !

.                ( ৩ )
দেখ রে চলেছে আহা শিশু কত জন,
শীর্ণদেহ চাহি আছে জননী বদন ;
আকুল জননী তার        মুখ চাহি বারবার
.   অনিবার বারিধারা করে বরিষণ—
.    ভ্রমে যেন উন্মাদিনী অন্নের কারণ !

            ( ৪ )
হের দেখ পথিধারে বসিয়া ওখানে
পতির চরণে লুটি আকুল পরাণে,
বলিছে কামিনী কেহ,   “কই নাথ অন্ন দেহ
.   কালি আর চাহিব না রাখ আজ প্রাণে”---
.   বলিয়া ত্যজিল প্রাণ চাহি পতিপানে |

.                  ( ৫ )
ছুটেছে যুবতী কন্যা ফেলিয়া পিতায় ;
মা বলি ডাকিছে বৃদ্ধ সকলি বৃথায় ১
কেবা কন্যা, কেবা পিতা, কে জননী, কেবা মিতা,---
.   অন্নদাতা, পিতা মাতা, আজি বাঙ্গালায়---
.   হের হেন কত জন আজি এ দশায় |

.                  ( ৬ )
হের কত জন আহা উদর-জ্বালায়
জননী ফেলিয়া শিশু ছুটিয়া পলায়—
তুলিয়া যুগল পাণি শিশু ডাকে ‘মা’  ‘মা’  বাণী,
.   ক্ষুধায় জননী তার ফিরিয়া না চায়---
.   একাকী  পড়িয়া শিশু পরাণে শুকায় !

.                ( ৭ )
চলেছে প্রাণীর কুল এরূপে আকুল,
নৃত্য করে অনশন, মুক্ত করি চুল—
নৃত্য করে ভেরী নাদে, কঙ্কাল তুলিয়া কাঁধে,
.   খপূর ধরিয়া করে করিছে ভ্রমণ—
.   দেখ বঙ্গবাসি, দেখ মূর্ত্তি কি ভীষণ !

.                ( ৮ )
ছুটিছে নয়নে বহ্নি স্ফুলিঙ্গ সমান ;
ফিরিছে উন্মত্ত ভাব উল্কার প্রমাণ ;
দন্ত ঘরষণে শব্দ           ভারতভুবন স্তব্ধ,
.  করাল বিকট গ্রাস মুখের ব্যাদান—
.  আকাশে উঠিছে সঙ্গে কালের নিশান !

             ( ৯ )
কতই উত্সবপূর্ণ গৃহস্থ আলয়,
নন্দিনী নন্দন রূপ, সুখপুষ্পময়,
আজি পূর্ণ কলরবে             অচিরে নীরব হবে,
.   শকুনি বায়স কিম্বা পেচক আশ্রয় –
.   ধরিবে শ্মশান বেশ মৃত অস্থিময় |

.                ( ১০ )
কত সে জনতাপূর্ণ পণ্যবীথি হায়,
এ রাক্ষস অনাচারে হবে মরু প্রায় –
ভীষণ গহন সাজ,         ধরিবে পুরীর মাঝ
.  পূরিবে বনের গুল্ম পাদপ লতায় |
.   ভ্রমিবে শার্দ্দূল শিবা আনন্দে সেথায় |

    
.                ( ১১ )
আজি হাসিভরা মুখে প্রফুল্ল যে সব,
আজি সুখপূর্ণ বুক আশার পল্লব,
কালি আর নাহি রবে        শবদেহ হবে সবে,
.   শৃগাল কুক্কুরে করিবে উত্সব—
কর্ণমূলে গৃধ্র বসি শুনাইবে রব !

.                ( ১২ )
কেমনে হে বঙ্গবাসি, নিদ্রা যাও সুখে ?
ভাবিয়া এ ভাব, চিত্ত ভরে না কি দুখে ?
নিজ সুত পরিবার       না জানিছে অনাহার,
.    ভাবিয়ে, না চাহ কি হে অভুক্তের মুখে—
স্বজাতি-শোকের শেল বিন্ধে না কি বুকে ?

            ( ১৩ )
প্রিয়ে বলি গৃহে আসি ধর যবে কর,
হয় না উদয় কি রে হৃদয়-ভিতর---
কত সতী অনাথিনী        পথে পথে কাঙ্গালিনী
.   ভ্রমিবে হতাশ হয়ে ত্যজি শূন্য ঘর—
.   নাহি লজ্জা কুলমান, ক্ষুধায় কাতর !

.                    ( ১৪ )
ক্রোড়ে ধরি হের যবে কন্যা পুত্রগণ,
ভাবিয়া জগৎ মাঝে অমূল্য রতন—
কভু কি পড়ে না মনে      সেই সব শিশুগণে
.    অন্য বিনে মরে যারা করিয়া রোদন ?
.    তাহার ও অইরূপ নয়ন-রঞ্জন

.                  ( ১৫ )
হে বঙ্গ কুল কামিনী আর্য্যা যতজন,
জান যারা পতি পুত্র পিতা সে কেমন –
ভাব দেখি একবার        বদন সে সবাকার
.   ঘরে যারা প্রাতঃসন্ধ্যা করে দরশন
.   নিরন্ন বিষণ্ণ পতি, জনক, নন্দন !

.                ( ১৬ )
একদিন অনশনে দিন যদি যায়,
জান না কি বঙ্গবাসী কি যাতনা তায় !
আজি সেই অনশনে         দারুণ হতাশ মনে
.   লক্ষ নরনারী শিশু করে হায়, হায়—
.   তবুও চেতনা কি হে নাহি হয় তায় !

.                    ( ১৭ )
ভাব, অহে বঙ্গবাসী,  ভাব একবার
কি কাল রাক্ষস আসি ঘেরিয়াছে দ্বার—
নাশিতে সে দুরাচার            বৃটনের হুহুঙ্কার
.   বৃটিশ কেশরীনাদ শুন একবার---
.    ঘুমাইও না বঙ্গবাসী, ঘুমাইও না আর ;
.    ভারতে কালের ভেরী বাজিল আবার ;

.                    ***************                 
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
বাঙ্গালীর মেয়ে
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
কালীপ্রসন্ন শর্ম্মা সংকলিত ও সম্পাদিত “হেমচন্দ্র গ্রন্থাবলী” (১৮৬৪) অন্তর্গত “বিবিধ কবিতা” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। এই কবিতাটির উত্তরে
কবি মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায় "বাঙ্গালীর বাবু" কবিতাটি রচনা করেন।
সেই কবিতাটি এই কবিতার নীচেই দেওয়া রয়েছে।

কে যায় কে যায় অই উঁকি ঝুঁকি চেয়ে?
হাতে বালা, পায়ে মল, কাঁকালেতে গোট,
তাম্বুলে তামাকু রস---রাঙা রাঙা ঠোঁট,
@@লে টিপের ফোঁটা, খোঁপা বাধা চুল,
@@তে রসনা ভরা---গালে ভরা গুল,
@@@হারি কিবা সাটী দুকূলে বাহার,
@@পেড়ে শান্তিপুরে কল্মে চুড়িদার,
অহঙ্কারে ফেটে পড়ে, চলে যেন ধেয়ে---
হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে
হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে---
মুখের সাপটে দড়, বিপদে অজ্ঞান,
কোঁদলে ঝড়ের আগে, কথায় তুফান,
বেহদ্দ সুখের সাধ---পা ছড়ায়ে বসা,
আঁচলের খুঁট্টি তুলে অমঙ্গলা ঘষা!

নমস্কার তাঁর পায়ে---পাড়ায় বেড়ানী
পেট্টিভরা কুঁজড়ো কথা, পরনিন্দা গ্লানি।
কথায় আকাশে তোলে, হাতে দেয় চাঁদ,
যার খায়, যার পরে, তারি নিন্দাবাদ,
রসনা কলের গাড়ি চলে রাত্রি দিন,
ঘাড়েতে পড়েন যার---বিপদ সঙ্গীন,
খেয়ে যান, নিয়ে যান, আর যান চেয়ে---
হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে!

হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে---
ধারাপাতে মূর্ত্তিমান, চারুপাঠ পড়া,
পেটের ভিতরে গজে দাসুরায়ী ছড়া!
চিত্রকাজে চিত্রগুপ্ত---পীঁড়িতে আল্পনা!
হদ্দ বাহাদুরি---“@রি”, বিচিত্র কারখানা!
অঙ্কশাস্ত্রে---বররুচি, গ্যালিলো নিউটান,
গণ্ডা কড়ি গুন্তে হ’লে জানের বাড়ি যান ;
পাত্তাড়ে পড়োর মত অক্ষরের ছাঁদ,
কলাপাতে না এগুতে গ্রন্থ লেখা সাধ!
ক্ষীরপুলি, পায়েস, পীঠা, মিষ্টান্নের সীমা
বলিহারি বঙ্গনারী তোমার মহিমা!
জলো দুধে পুষ্টদেহ তেলে জলে নেয়ে---
হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে!

হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে---
সমুখে দুধের কড়া---কাটীতে ঘোটন,
খোলা চুলে চুলো জ্বেলে ধোঁয়াতে ক্রন্দন!
তপ্ত ভাতে ভরা হাঁড়ী বেড়ী ধরে তোলা,
মদ্গুর মৎস্যের ঝোলে ধনে বাঁটা গোলা,
খাড়া বাড়ী শাক্ পাতাড়ে বিলক্ষণ টান,
কালিয়ে কাবাব্ রেঁধে দেমাকে অজ্ঞান!
শাঁখেতে পাড়িতে ফুঁক চূড়ান্ত নিপুণ,
হুলুধ্বনি কোলাহলে চতুর্ম্মুখ খুন!
রান্নাঘরে হাওয়া খাওয়া, গাড়ি মুদে যাওয়া
দেশশুদ্ধ লোকের মাঝে গঙ্গাঘটে নাওয়া!
বাসর-ঘরে ঝুমুর কবি চখের মাথা খেয়ে,
প্রভাত হ’লে পিস্ শাশুড়ী ঘোমটা মুখে চেয়ে,

সাবাস্ সাবাস্ তোরে বাঙালীর মেয়ে!
ব্রতকথা, উপকথা, সেঁজুতি পালন,
কালীঘাটে যেতে পেলে স্বর্গে আরোহণ!
মেয়ে ছেলের বিয়ে পর্ব্বে গাজনের গোল,
যাত্রা সঙ্গে নিদ্রা ত্যাগ---ছেলে ভরা কোল,
ভূত পেরেতে দিনে ভয় অন্ধকারে কাঠ,
শক্ত রোগে রোজা ডাকা, স্বস্ত্যয়ন পাঠ,
তীর্থস্থানে পা পড়িলে আহ্লাদে পুঁতুল,
হাট বাজারে লজ্জা হীনা, ঘরে কুঁড়িফুল!
গুঁড়িকাষ্ঠ, নুড়িশিলা, ভক্তিপথে নেয়ে---
হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে!

হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে---
রসের মরাল যেন জলটুকু ছেড়ে।
দুধটুকু টেনে নেন আগে গিয়া তেড়ে,
চিনের পুতুলে সাধ, রাক্স টেনে পেটা!
“ব়্যাফেল” বাঁধা ছবিগুলি ঘরে দোরে সাঁটা!
খেলায় দিগ্গজ কেঁয়ে, চোরের সদ্দার,
লুকোচুরি যমের বাড়ি---স্পষ্ট করে ঠার!
আয়েস খালি খোঁপা বাঁধা, নয় বিননো ঝারা,
হদ্দ হলো কচি ছেলে টেনে এনে মারা!
কার্পেটে কারচুপি কাজ কারু নব্য চাল,
ঘরকন্নায় জলাঞ্জলি ভাত রাঁধতে ডাল!
নিজে ঘাটে, অন্যে দোষে, মুখসাপটে দড়,
হুজ্জুতে হারিলে কেঁদে পাড়া করে জড় ;
বাঙালী মেয়ের গুণ কে ফুরাবে গেয়ে---
হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে!

হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে---
মৃদু মৃদু হাসিটুকু অধরে রঞ্জন,
সাবাস্ সাবাস্ নাক চোখের গড়ন ;
কালো চুল কিবা ঘটা, চোখে কাল তারা,
দেখে নাই যারা কভু দেখে যাক্ তারা!
ভাসা ভাসা খাসা চোখ তুলি দিয়ে আঁকা,
তা উপরি কিবা সরু ভূরুযুগ আঁকা!
থমকে থমকে থির গতি কি সুন্দর,
হাসি হাসি মুখখানি কিবা মনোহর!
আহা আহা লজ্জা যেন গায়ে ফুটে আছে---
কোথা লজ্জাবতী তুই এ লতার কাছে ?
চক্ষু যদি থাকে কারো তবে দেখ চেয়ে---
হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে!

.      *************************

@@@@@ - আমাদের কাছে যেসব গ্রন্থ রয়েছে তাতে এই অক্ষরগুলি অপাঠ্য।


.                                                                                             
সূচীতে . . .     


বাঙ্গালির বাবু
কবি মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায়
আমরা এই কবিতাটি পেয়েছি ১৩২৭ বঙ্গাব্দে (১৯২০ খৃষ্টাব্দে) প্রকাশিত, মন্মথনাথ ঘোষ সম্পাদিত
“হেমচন্দ্র” ২য় খণ্ড, পঞ্চম পরিচ্ছেদ, “কবিতাবলী” দ্বিতীয় ভাগ থেকে। এই কবিতাটি কবি হেমচন্দ্র
বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা “বাঙ্গালীর মেয়ে” কবিতার পালটা জবাব!

১৩২৭ বঙ্গাব্দে (১৯২০ খৃষ্টাব্দে) প্রকাশিত, মন্মথনাথ ঘোষ সম্পাদিত “হেমচন্দ্র” ২য় খণ্ড, পঞ্চম পরিচ্ছেদ,
“কবিতাবলী” দ্বিতীয় ভাগ থেকে নেওয়া, ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদক সঞ্জীচন্দ্রের সম্পাদকীয়ের
অংশবিশেষ :---
“সকলেই জানেন, বাঙ্গালায় সাহিত্যসংগ্রামক্ষেত্রে, বাবু হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অদ্বিতীয় মহারথী। তাঁহার
প্রতি শরসন্ধানে সাহস করে বাঙ্গালার পুরুষ লেখকদিগের মধ্যে এমন শূর বীর কেহ নাই। তাঁহার প্রণীত
‘বাঙ্গালীর মেয়ে’ নামক কবিতার জ্বালায়, অনেক ‘বাঙ্গালীর মেয়ে’ আজিও কাতর। আজি সেই আঘাতের
প্রতিশোধের জন্য এই কাব্যবীরাঙ্গনা বদ্ধপরিকর---ধৃতাস্ত্র। হেমচন্দ্রের ঐ (বাঙ্গালীর মেয়ে) কবিতার উত্তরে
মোক্ষদায়িনী বাঙ্গালির বাবু শিরোনামে একটি কবিতা লিখিয়াছেন। কবিতাটি বড় রঙদার---লেখিকার
লিপিশক্তিপরিচায়িকা---আদ্যোপান্ত পাঠের যোগ্য। আমকা এ কবিতাটী কিছু বাদ দিয়া প্রায় সমস্ত উদ্ধৃত
করিলাম --- গ্রন্থকর্ত্রী আমাদের এ অপরাধ মার্জ্জনা করিবেন :---”

বাঙ্গালির বাবু----

কে নায় কে খায় অই, করে দড়বড়ি,
বাঙ্গালীর বাবু! হায় বড় তাড়াতাড়ি ;
সাহেব করিবে রাগ, বেলা হলে যেতে,
তাই এত তাড়াতাড়ি নাইতে খাইতে।
চারকান পেন্টালুনে পোষাকের ঘটা,
শিরে শোভে শোলা পাক্ড়ী, শাল দিয়ে আঁটা ;
চেঙারির মত দৃশ্য কিবা চমত্কার!
দিতে কিছু দেরী হলে করেন চীত্কার ;
সে সময় ছেলে যদি বাবা বলে ডাকে
মারিতে উদ্যত হয়ে খিঁচয়ে যান তাকে।
তাড়াতাড়ি করে অন্য সব কর্ম্ম হয়,
তামাক টানিতে থাকে যথেষ্ট সময়,
টানিতে টানিতে ধূম, দয়া হলে মনে
শিশুরে সান্ত্বনা করা উচ্ছিষ্ট পানে।
গাড়ি ভাড়া পাঁচ পয়সা, চলতে হন কাবু,
হায় হায় অই যায় বাঙ্গালীর বাবু।

হায় হায় অই যায় বাঙ্গালীর বাবু!
দশটা হতে চারটাবধি দাস্যবৃত্তি করা
সারাদিন বইতে হয় দাসত্ব পশরা।
উকীল, ডেপুটী কেহ, কেহ বা মাস্টার,
সবজজ, কেরাণী কেহ, ওভারসিয়ার,
বড় কর্ম্ম বড় মান, অহঙ্কার কত
ধরারে দেখেন বাবু সরাখানা মত।
সারাদিন খেটে খেটে রক্ত উঠে মুখে
পেগের বড়াই হয় ঘরে এসে সুখে।
বড় কর্ম্ম করি ভেবে, দেমাকে অজ্ঞান,
এদিকে সাহেব দেখে, হৃদি কম্পমান,
সাহেব দেখে মান্য করা, ইংরাজি বুলি,
হদ্দ হলো নিজ ভাষে দেন তারে গালি ;
শিখিয়া ইংরাজি ভাষা বড় অহঙ্কার,
তাড়াতাড়ি যান দিতে ইংরাজি লেকচার,
কহিতে ইংরাজি বুলি খান হাবু ডুবু,
শুনে যা, ইংরেজি কয়, বাঙ্গালীর বাবু।

হায় হায় অই যায় বাঙ্গালীর বাবু!
খোলা হয় ধরাচুড়া গোলামির ভার,
ঘরে এলে খোলা গায়ে চটিতে বাহার ;
পরিধান থান ফাড়া চাকর কোঁচানে,
সিলিপার কারু পায়ে চটি ঠন্ ঠনে।
আয়েস তামাক পানে, তাকিয়া হেলন,
হুঁকা নল মুখে দিলে স্বর্গে আরোহণ।
বৈঠকখানা গুলজার, হাসির ধমকে ;
পাপোশেতে থুতু ফেলা, পিকদানি সম্মুখে।
নাহি কোন ধর্ম্মচর্চ্চা, শুয়ে গীত গান
মধ্যে মধ্যে হুঙ্কারেন ‘পান তামাক আন।’
সম্মুখের সেজের আলো, ভ্যারাণ্ডার তেলে
মর্দ্দানি ফলান হয় মূর্খ এলে।
ইয়ার এলে খেলা হয়, দাবা কিম্বা গ্রাবু,
হায় হায় অই বোসেয় বাঙ্গালির বাবু।

*        *        *        *        *

হায় হায় অই যায় বাঙ্গালীর বাবু!
ছড়ি হাতে, সুজ পায়ে, মুখেতে চুরোট,
কাহারো সাহেবি চাল পরা হ্যাট কোট,

*        *        *        *        *

ফরশা হতে বড় সাধ সাবাং মাখা কোসে,
উঠে যায় ছাল চামড়া, তোয়ালেতে ঘোসে।
সোজা সিঁতে কাটা চুল, আলবার্ট ফ্যাশান,
সেণ্ট মেখে গন্ধ গোকুল, হন মূর্ত্তিমান।

*        *        *        *        *

নাটক দেখিতে সাধ সখে ভরা প্রাণ,
মুচকে মুচকে হাসিটুকু, গালে ভরা পান ;
একসেণ্ট এনকোরে যেন ছাড়ে বৃষ নাদ,
ধুম টেনে দম রাখা দোকানি প্রসাদ।
ঋণে মাথা ডুবে আছে, সখে মত্ত তবু
হায় হায় অই যায় বাঙ্গালীর বাবু।

যিনি নাহি মদ খান তাঁর অহঙ্কার
বুঝি বা যে করিলাম ভারত উদ্ধার,
নাম লিখায়ে ব্রাহ্ম হন, ধর্ম্মগজে পেটে,
দোরানি পশারি তাক বক্তৃতার চোটে।
স্বাধীন করিতে নারী হন ব্রহ্মজ্ঞানী,
আনেন বাহির করি কুলের কামিনী ;
মদ্যপায়ী মদ খেয়ে খুলে দেয় মন
ভারত উদ্ধার হেতু হয় আস্ফালন।
কথা কন খই, মুড়কী, ইংরাজী, বাঙালী
মন খুলে ইংরেজেরে দেন গালাগালি।
লীলাখেলা বাবুদের যত রাত্রিকালে
মুখ বুজে ভদ্র হন সকাল হইলে।

.      *************************

.                                                                                                   
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হতাশের আক্ষেপ
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
কবির “কবিতাবলি” (১৮৭১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

( ১ )
আবার গগনে কেন সুধাংশু উদয় রে!
কাঁদাইতে অভারারে, কেন হেন বারে বারে,
গগন মাঝারে শশী আসি দেখা দেয় রে।
তারে যে পাবার নয়, তবু কেন মনে হয়,
জ্বলিল যে শোকানল, কেমনে নিবাই রে।
আবার গগনে কেন সুধাংশু উদয় রে!

( ২ )
অই শশী অইখানে, এই স্থানে দুই জনে,
কত আশা মনে মনে কত দিন করেছি!
কত বার প্রমদার মুখচন্দ্র হেরেছি!
পরে সে হইল কার, এখনি কি দশা তার,
আমারি কি দশা এবে কি আশ্বাসে রয়েছি!

( ৩ )
কৌমার যখন তার, বলিত সে বারম্বার,
সে আমার আমি তার অন্য কারো হবো না।
অরে দুষ্ট দেশাচার, কি করিলি অবলার,
কার ধন কারে দিলি, আমার সে হলো না!

( ৪ )
লোক-সজ্জা মান ভয়ে, মা বাপ নিদয় হয়ে,
আমার হৃদয়-নিধি অন্য কারে সঁপিল,
অভাগার যত আশা জন্ম-শোধ ঘুচিল।

( ৫ )
হারাইনু প্রমদায়, তৃষিত চাতক প্রায়,
ধাইতে অমৃত আশে বুকে বজ্র বাজিল ; ---
সুধাপান অভিলাষ অভিলাষি থাকিল।
চিন্তা হলো প্রাণাধার, প্রাণতুল্য প্রতিমার
প্রতিবিম্ব চিত্তপটে চিরাঙ্কিত রহিল,
হায়, কি বিচ্ছেদ-বাণ হৃদয়েতে বিঁধিল!

( ৬ )
হায় সরমের কথা, আমার স্নেহের লতা,
পতিভাবে অন্য জনে প্রাণনাথ বলিল ;
মরমের ব্যথা মোর মরমেই রহিল।

( ৭ )
তদবধি ধরাসনে, এই স্থানে শূন্যমনে
থাকি পড়ে, ভাবি সেই হৃদয়ের ভাবনা ;
কি যে ভাবি দিবানিশি তাও কিছু জানি না।
সেই ধ্যান সেই জ্ঞান, সেই মান অপমান---
অরে বিধি, তারে কি রে জন্মান্তরে পাব না ?

( ৮ )
এ যন্ত্রণা ছিল ভালো, কেন পুনঃ দেখা হলো,
দেখে বুক বিদারিল, কেন তারে দেখিলাম।
ভাবিতাম আমি দুখে, প্রয়সী থাকিত সুখে,
সে ভ্রম ঘুচিল, হায়, কেন চখো দেখিলাম!

( ৯ )
এই রূপে চন্দ্রোদয়, গগন তারকাময়,
নীরব মলিনমুখী অই তরুতলে রে ;
এক দৃষ্টে মুখপানে, চেয়ে দেখে চন্দ্রাননে,
অবিরল বারিধারা নয়নেতে ঝরে রে ;
কেন সে দিনের কথা পুনঃ মনে পড়ে রে ?

( ১০ )
সে দেখে আমার পানে, আমি দেখি তার পানে,
চিতহারা দুই জনে বাক্য নাহি সরে রে ;
কতক্ষণে অকস্মাৎ, “বিধবা হয়েছি নাথ”
বলে প্রিয়তমা ভূমে লুটাইয়ে পড়ে রে।

( ১১ )
বদন চুম্বন করে, রাখিলাম ক্রোড়ে ধরে,
শুনিলাম মৃদু স্বরে ধীরে ধীরে বলে রে---
“ছিলাম তোমারি আমি, তুমিই আমার স্বামী,
ফিরে জন্মে, প্রাণনাথ পাই যেন তোমারে।”---
কেন শশী পুনরায় গগনে উঠিল রে!

.      *************************

.                                                                                                   
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*