না, সে নয় | অন্য কেউ এসেছিল | ঘুমো তুই ঘুমো | এখনো রয়েছে রাত্রি, রোদ্দুরে চুমো লাগেনি শিশিরে | ওরে বোকা, আকাশে ফোটেনি আলো, দরজায় এখনো তার টোকা পড়েনি | টগর-বেলা-গন্ধরাজ-জুঁই সবাই ঘুমিয়ে আছে, তুই জাগিসনে আর | তোর বরণডালার মালাগাছি দে আমাকে, আমি জেগে আছি | না রে মেয়ে, নারে বোকা মেয়ে, আমি ঘুমোবো না | আমি নির্জন পথের দিকে চেয়ে এমন জেগেছি কত রাত, এমন অনেক ব্যথা-আকাঙ্ক্ষার দাঁত ছিঁড়েছে আমাকে | তুই ঘুমো দেখি, শান্ত হ'য়ে ঘুমো | শিশিরে লাগেনি তার চুমো, বাতাসে ওঠেনি তার গান | ওরে বোকা, এখনও রয়েছে রাত্রি, দরজায় পড়েনি তার টোকা |
ক্রমে স্পষ্ট হয় সব | কে সিংহ, কুকুর, হাতি, সার্কাসের ঘোড়া ; কে টিয়া, চন্দনা, কংবা হাঙর কুমির ; বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে এসে কলকাতার ভীড় ঠেলে কে সাঁতার কাটে ; কে ধর্মতলায় পাঞ্জাবির হাতা নেড়ে উড়ে যেতে চায় হঠাত্ আকাশে | যেন একে একে সবগুলি অভ্যাসের ফোড়া ফেটে গেলে ঠিক বিকেলে তিন পা হেঁটে চিনে নেওয়া যায় কে ব্যাঘ্র, বিড়াল, হাঁস, ঝুঁটি-কাকাতুয়া ; এবং কে শাশ্বত নাবিক |
ক্রমে স্পষ্ট হয় সব | সব কিছু জানা গেল, এমন ধারণা নিয়ে ঘরে ফিরে গিয়ে ঘুমোনো সহজ হয়, আর ঘুমের একটু আগে মনে হয়, দারুণ বাহার খুলেছে রাস্তায়-ঘাটে | সবগুলি ফোড়া ফাটিয়ে গণ্ডার, বাঘ, সার্কাসের ঘোড়া ছুটে যায় | মনে হয় ভিড়ের ভিতরে কেউ "হুশ্" ব'লে উঠেছিল ; তাই ডানা ঝপটিয়ে নিখিল শূণ্যের দিকে উড়ে চ'লে গেল কয়েকটি সুন্দর মানুষ |
"বাতাসি ! বাতাসি !"---লোকটা ভয়ংকর চেঁচাতে চেঁচাতে গুমটির পিছন দিকে ছুটে গেল | ধাবিত ট্রেনের থেকে এই দৃশ্য চকিতে দেখলুম | কে বাতাসি ? জোয়ান লোকটা অত ভয়ংকরভাবে তাকে ডাকে কেন ? কেন হাওয়ার ভিতরে বাবরি-চুল উড়িয়ে পাগলের মতো "বাতাসি ! বাতাসি !" ব'লে ছুটে যায় ?
টুকরো টুকরো কথাগুলি ইদানিং যেন বড় বেশি--- গোঁয়ার মাছির মতো জ্বালাচ্ছে | কে যেন কাকে বাসের ভিতরে বলেছিল, "ভাবতে হবে না, এবারে দুদ্দাড় করে হেমাঙ্গ ভীষণভাবে উঠে যাবে, দেখে নিস" | কে হেমাঙ্গ ? কে জানে, এখন সত্যিই দুদ্দাড় ক'রে কোথাও উঠে যাচ্ছে কিনা | কিংবা সেই ছেলেটা, যে ট্রাম-স্টপে দাঁড়িয়ে পাশের মেয়েটিকে অদ্ভুত কঠিন স্বরে বলেছিল, "চুপ করো, না হলে আমি সেই রকম শাস্তি দেব আবার---" কে জানে "সেইরকম" মানে কি রকম | আমি ভেবে যাচ্ছি, ক্রমাগত ভেবে যাচ্ছি, তবু--- গল্পের সবটা যেন নাগালে পাচ্ছি না | গল্পের সবটা আমি পাব না নাগালে | শুধু শুনে যাব | শুধু এখানে ওখানে, জনারণ্যে, বাতাসের ভিতরে, হাটেমাঠে, অথবা ফুটপাথে, কিংবা ট্রেনের জানলায় টুকরো টুকরো কথা শুনবো, শুধু শুনে যাব | আর হঠাত্ কখনো কোনো ভুতুড়ে দুপুরে কানে বাজাবে "বাতাসি ! বাতাসি !"
উলঙ্গ রাজা কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী ৩ জানুয়ারী ১৯৭০, দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত
সবাই দেখছে যে, রাজা উলঙ্গ, তবুও সবাই হাততালি দিচ্ছে | সবাই চেঁচিয়ে বলছে : সাবাশ, সাবাশ ! কারও মনে সংস্কার, কারও ভয় ; কেউ-বা নিজের বুদ্ধি অন্য মানুষের কাছে বন্ধক দিয়েছে ; কেউ-বা পরান্নভোজী, কেউ কৃপাপ্রার্থী, উমেদার, প্রবঞ্চক ; কেউ ভাবছে, রাজবস্ত্র সত্যিই অতীব সূক্ষ্ম, চোখে পড়ছে না যদিও, তবু আছে, অন্তত থাকাটা কিছু অসম্ভব নয় |
গল্পটা সবাই জানে | কিন্তু সেই গল্পের ভিতরে শুধুই প্রশস্তিবাক্য-উচ্চারক কিছু আপাদমস্তক ভিতু, ফন্দিবাজ অথবা নির্বোধ স্তাবক ছিল না | একটি শিশুও ছিল | সত্যবাদী, সরল, সাহসী একটি শিশু |
নেমেছে গল্পের রাজা বাস্তবের প্রকাশ্য রাস্তায় | আবার হাততালি উঠছে মুহুর্মুহু ; জমে উঠছে স্তাবকবৃন্দের ভিড় | কিন্তু সেই শিশুটিকে আমি ভিড়ের ভিতরে আজ কোথাও দেখছি না |
শিশুটি কোথায় গেল ? কেউ কি কোথাও তাকে কোনো পাহাড়ের গোপন গুহায় লুকিয়ে রেখেছে ? নাকি সে পাথর-ঘাস-মাটি নিয়ে খেলতে খেলতে ঘুমিয়ে পড়েছে কোনো দূর নির্জন নদীর ধারে কিংবা কোনো প্রান্তরের গাছের ছায়ায় ? যাও, তাকে যেমন করেই হোক খুঁজে আনো | সে এসে একবার এই উলঙ্গ রাজার সামনে নির্ভয়ে দাঁড়াক | সে এসে একবার এই হাততালির ঊর্দ্ধে গলা তুলে জিজ্ঞাসা করুক : রাজা তোর কাপড় কোথায় ?
ভয় কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী ২৪ নভেম্বর ১৯৫১, দেশ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত। পরে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ এ অন্তর্ভুক্ত।
যদি এ চোখের জ্যোতি নিবে যায় তবে কি হবে, কী হবে ! দূরপথে ঘুরে ঘুরে ঢের নদীবন খুঁজে যাকে এই রাতে নিয়ে এলে মন এখনো দেখিনি তাকে দেখিনি, এখন যদি এ চোখের জ্যোতি নিবে যায় তবে কি হবে, কী হবে !
সে-ও চলে যেতে পারে, যদি যায় তবে কি হবে , কী হবে ! এই যে চোখের আলো, ব্যাথাবেদনার আগুনে রেখেছি তাকে জ্বেলে আমি, তার দেখা পাওয়া যাবে, তাই | সে যদি আবার চলে যায়, চোখভরা আলো নিয়ে তবে কি হবে, কী হবে !
কখনো হারাই প্রাণ, কখনো প্রাণের থেকেও যে প্রিয়তম, তাকে | সারাদিন কথা মনে ছিল কোনো মায়াবী গানের, সুর খুঁজে পেয়ে তার বিষাদমলিন কথাগুলি যদি ফের ভুলে যাই তবে কি হবে, কী হবে !
হাতে ভীরু দীপ কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী ১৫ অক্টোবর ১৯৫৫ , দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত
হাতে ভীরু দীপ, পথে উন্মাদ হাওয়া, ভ্রুকুটিকুটিল সহস্র ভয় মনে | কেন ভয় ? কেন এমন সঙ্গোপনে পথে নেমে তোর বারে-বারে ফিরে চাওয়া ? এ কী ভয় তোর সকল সত্তা কাঁপায় ?
আমি যে এসেছি, সে যেন জানতে না পায় | দূরে হেলঙের পাহাড়, পাহাড়তলি ছাড়িয়ে পিপলকোঠির চড়াই, আর তারপর সাঁকো | বাঁয়ে গেলে গঙ্গার ধারে সেই গ্রাম, আমৌঠি রঙ্কোলি |
সেইখানে যাব | সামনের শীতে যদি পাওয়া যায় জমি ঢালু সিয়াসাঙে, তাই চলেছি | এ ছাড়া --- জানেন গঙ্গামাঈ---- কোনো আশা নেই | বরফের তাড়া খেয়ে নির্জন পাকদণ্ডির পথ বেয়ে নীচে মেনে যাই | কী ভয়ে আমাকে কাঁপায়--- জানে মানাগাঁও, জানে পাহাড়িয়া নদী |
যাবেন না কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী শারদীয় দেশ ১৯৮৯,
কখন যে একদল মানুষ আমাকে ঘিরে ফেলেছে, তা আমি বুঝতে পারিনি | হাত ধরে যিনি আমাকে আজ এই হাটের মধ্যে এনে ছেড়ে দিয়েছিলেন, চোখের পলক ফেলতে– না ফেলতেই তিনি জাদুকরের পায়রার মতো ভ্যানিশ | বুঝতে পারছিলুম যে, আমারও এখন সরে পড়া দরকার | কিন্তু মানুষের বলয়ের বাইরে যেই আমি আমার পা বাড়িয়েছি অমনি কেউ একজন বলে উঠল, ‘যাবেন না !’
যাবেন না, যাবেন না, যাবেন না ! হাটের ধারেই বিশাল বটগাছ | জোলো হায়ায় গা ভাসিয়ে সে তার পাতার ঝাঁঝর বাজাচ্ছে তো বাজিয়ই যাচ্ছে | দুপুরবেলায় খুব বৃষ্টি হয়েছিল, বিকেলে তাই লোকজনের চেহারা একটু অন্যরকম | ছেঁড়া- ছেঁড়া মেঘগুলোও তাদের ভোল ইতিমধ্যে আমূল পালটে ফেলেছে | বোঝা যাচ্ছে, আজ আর বৃষ্টি হবে না |
যেন ছবিটাকে সম্পূর্ণ করে তুলবার জন্যেই খানিক আগে আকাশ থেকে সেই আলোর ধারা নেমে এসেছে, যে-আলোয় শুধু বিয়ের কনে নয়, যে-কোনো মানুষকেই ভারী সুন্দর দেখায় | আর তার মধ্যে চতুর্দিকে ধ্বনিত হচ্ছে সেই মন্ত্র, যে-মন্ত্র একমাত্র মানুষই উচ্চারণ করতে পারে | যাবেন না, যাবেন না, যাবেন না !