কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা
*
সহোদরা
কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

না, সে নয় | অন্য কেউ এসেছিল | ঘুমো তুই ঘুমো |
এখনো রয়েছে রাত্রি, রোদ্দুরে চুমো
লাগেনি শিশিরে | ওরে বোকা,
আকাশে ফোটেনি আলো, দরজায় এখনো তার টোকা
পড়েনি | টগর-বেলা-গন্ধরাজ-জুঁই
সবাই ঘুমিয়ে আছে, তুই
জাগিসনে আর | তোর বরণডালার মালাগাছি
দে আমাকে, আমি জেগে আছি |
না রে মেয়ে, নারে বোকা মেয়ে,
আমি ঘুমোবো না | আমি নির্জন পথের দিকে চেয়ে
এমন জেগেছি কত রাত,
এমন অনেক ব্যথা-আকাঙ্ক্ষার দাঁত
ছিঁড়েছে আমাকে | তুই ঘুমো দেখি, শান্ত হ'য়ে ঘুমো |
শিশিরে লাগেনি তার চুমো,
বাতাসে ওঠেনি তার গান |
                ওরে বোকা,
এখনও রয়েছে রাত্রি, দরজায় পড়েনি তার টোকা |


.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
হঠাত্ শূণ্যের দিকে
কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

ক্রমে স্পষ্ট হয় সব | কে সিংহ, কুকুর, হাতি, সার্কাসের ঘোড়া ;
কে টিয়া, চন্দনা, কংবা হাঙর কুমির ;
বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে এসে কলকাতার ভীড়
ঠেলে কে সাঁতার কাটে ; কে ধর্মতলায়
পাঞ্জাবির হাতা নেড়ে উড়ে যেতে চায়
হঠাত্ আকাশে | যেন একে একে সবগুলি অভ্যাসের ফোড়া
ফেটে গেলে ঠিক
বিকেলে তিন পা হেঁটে চিনে নেওয়া যায়
কে ব্যাঘ্র, বিড়াল, হাঁস, ঝুঁটি-কাকাতুয়া ;
এবং কে শাশ্বত নাবিক |

ক্রমে স্পষ্ট হয় সব | সব কিছু জানা গেল, এমন ধারণা
নিয়ে ঘরে ফিরে গিয়ে ঘুমোনো সহজ হয়, আর
ঘুমের একটু আগে মনে হয়, দারুণ বাহার
খুলেছে রাস্তায়-ঘাটে | সবগুলি ফোড়া
ফাটিয়ে গণ্ডার, বাঘ, সার্কাসের ঘোড়া
ছুটে যায় | মনে হয় ভিড়ের ভিতরে কেউ "হুশ্"
ব'লে উঠেছিল ; তাই ডানা ঝপটিয়ে
নিখিল শূণ্যের দিকে উড়ে চ'লে গেল
কয়েকটি সুন্দর মানুষ |


.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
এশিয়া
কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

এখন অস্ফুট আলো | ফিকে ফিকে ছাড়া অন্ধকারে
অরণ্য সমুদ্র হ্রদ, রাত্রির শিশির-শিক্ত মাঠ
অস্থির আগ্রহে কাঁপে, আসে দিন, কঠিন কপাট
ভেঙে পড়ে | দুর্বিনীত দুরন্ত আদেশ শুনে কারো
দীর্ঘরাত্রি মরে যায়, ধসে পড়ে শীর্ণ রাজ্যপাট ;
নির্ভয়ে জনতা হাঁটে আলোর বলিষ্ঠ অভিসারে |
হে এশিয়া, রাত্রিশেষ, "ভস্ম অপমান শয্যা" ছাড়,
উজ্জীবিত হও রূঢ় অসংকোচ রৌদ্রের প্রহারে |

শহরে বন্দরে গঞ্জে, গ্রামাঞ্চলে, ক্ষেতে ও খামারে
জাগে প্রাণ, দ্বীপে দ্বীপে মুঠিবদ্ধ অহ্বান পাঠায় ;
অগণ্য মানবশিশু সেই ক্ষিপ্র অনিবার্য ডাক
দুর্জয় আশ্বাসে শোনে, দৃঢ় পায়ে হাঁটে | তারপরে
ভারতে, সিংহলে, ব্রহ্মে, ইন্দোচীনে, ইন্দোনেশিয়ায়
বীত-নিদ্র জনস্রোত বিদ্যুত্-উল্লাসে নেয় বাঁক |

.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
বাতাসি
কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

"বাতাসি ! বাতাসি !"---লোকটা ভয়ংকর চেঁচাতে চেঁচাতে
গুমটির পিছন দিকে ছুটে গেল |
ধাবিত ট্রেনের থেকে এই দৃশ্য চকিতে দেখলুম |
কে বাতাসি ? জোয়ান লোকটা অত ভয়ংকরভাবে
তাকে ডাকে কেন ? কেন
হাওয়ার ভিতরে বাবরি-চুল উড়িয়ে
পাগলের মতো
"বাতাসি ! বাতাসি !" ব'লে ছুটে যায় ?

টুকরো টুকরো কথাগুলি ইদানিং যেন বড় বেশি---
গোঁয়ার মাছির মতো
জ্বালাচ্ছে | কে যেন কাকে বাসের ভিতরে
বলেছিল, "ভাবতে হবে না,
এবারে দুদ্দাড় করে হেমাঙ্গ ভীষণভাবে উঠে যাবে, দেখে নিস" |
কে হেমাঙ্গ ? কে জানে, এখন
সত্যিই দুদ্দাড় ক'রে কোথাও উঠে যাচ্ছে কিনা |
কিংবা সেই ছেলেটা, যে ট্রাম-স্টপে দাঁড়িয়ে পাশের
মেয়েটিকে অদ্ভুত কঠিন স্বরে বলেছিল,
"চুপ করো, না হলে আমি
সেই রকম শাস্তি দেব আবার---" কে জানে
"সেইরকম" মানে কি রকম | আমি ভেবে যাচ্ছি,
ক্রমাগত ভেবে যাচ্ছি, তবু---
গল্পের সবটা যেন নাগালে পাচ্ছি না |
গল্পের সবটা আমি পাব না নাগালে |
শুধু শুনে যাব | শুধু এখানে ওখানে,
জনারণ্যে, বাতাসের ভিতরে, হাটেমাঠে,
অথবা ফুটপাথে, কিংবা ট্রেনের জানলায়
টুকরো টুকরো কথা শুনবো, শুধু শুনে যাব | আর
হঠাত্ কখনো কোনো ভুতুড়ে দুপুরে
কানে বাজাবে "বাতাসি ! বাতাসি !"

.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
দিঘির ভিতরে ছায়া
কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

দিঘির ভিতরে ছায়া ধীরে বড় হয়, ধীরে-ধীরে
নিজেকে গুটিয়ে আনে ফের |
মাঝে মাঝে হাওয়া দেয় | জালের শরীরে
দোলা লাগে | ত্রিকালে দণ্ডায়মান বৃদ্ধ অশথের
শাখা-প্রশাখায়
ছড়ায় অস্ফুট কানাকানি |
তীব্র নীল আকাশে নিঃসঙ্গ চিল উড়ে চলে যায় |
জলের উপরে ভাসে অশথের শান্ত ছায়াখানি |
#
আজও ছায়াখানি সেই জলের উপর শুয়ে আছে |
মাঝে-মাঝে হাওয়া দেয়, মাঝে মাঝে ছায়া
কেঁপে ওঠে | কাছে
ঘরবাড়ি নেই, জনমনিষ্যির মমতা-মায়ার
চিহ্ন নেই | চতুর্দিকে মাঠ, শুধু মাঠ |
মাঠের ভিতরে দিঘি, দিঘির ভিতরে ছায়া পড়ে |
হাহা করে আকাশের জানালা-কপাট |
মাঠ পাড়ি দিয়ে হাওয়া ছুটে যায় গ্রামে ও শহরে |

.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
উলঙ্গ রাজা
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
৩ জানুয়ারী ১৯৭০, দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত

সবাই দেখছে যে, রাজা উলঙ্গ, তবুও
সবাই হাততালি দিচ্ছে |
সবাই চেঁচিয়ে বলছে : সাবাশ, সাবাশ !
কারও মনে সংস্কার, কারও ভয় ;
কেউ-বা নিজের বুদ্ধি অন্য মানুষের কাছে বন্ধক দিয়েছে ;
কেউ-বা পরান্নভোজী, কেউ
কৃপাপ্রার্থী, উমেদার, প্রবঞ্চক ;
কেউ ভাবছে, রাজবস্ত্র সত্যিই অতীব সূক্ষ্ম, চোখে
পড়ছে না যদিও, তবু আছে,
অন্তত থাকাটা কিছু অসম্ভব নয় |

গল্পটা সবাই জানে |
কিন্তু সেই গল্পের ভিতরে
শুধুই প্রশস্তিবাক্য-উচ্চারক কিছু
আপাদমস্তক ভিতু, ফন্দিবাজ অথবা নির্বোধ
স্তাবক ছিল না |
একটি শিশুও ছিল |
সত্যবাদী, সরল, সাহসী একটি শিশু |

নেমেছে গল্পের রাজা বাস্তবের প্রকাশ্য রাস্তায় |
আবার হাততালি উঠছে মুহুর্মুহু ;
জমে উঠছে
স্তাবকবৃন্দের ভিড় |
কিন্তু সেই শিশুটিকে আমি
ভিড়ের ভিতরে আজ কোথাও দেখছি না |

শিশুটি কোথায় গেল ? কেউ কি কোথাও তাকে কোনো
পাহাড়ের গোপন গুহায়
লুকিয়ে রেখেছে ?
নাকি সে পাথর-ঘাস-মাটি নিয়ে খেলতে খেলতে
ঘুমিয়ে পড়েছে
কোনো দূর
নির্জন নদীর ধারে কিংবা কোনো প্রান্তরের গাছের ছায়ায় ?
যাও, তাকে যেমন করেই হোক
খুঁজে আনো |
সে এসে একবার এই উলঙ্গ রাজার সামনে
নির্ভয়ে দাঁড়াক |
সে এসে একবার এই হাততালির ঊর্দ্ধে গলা তুলে
জিজ্ঞাসা করুক :
রাজা তোর কাপড় কোথায় ?

.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
ভয়
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
২৪ নভেম্বর ১৯৫১, দেশ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত। পরে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ
‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ এ অন্তর্ভুক্ত।

যদি এ চোখের জ্যোতি নিবে যায় তবে
কি হবে, কী হবে !
দূরপথে ঘুরে ঘুরে ঢের নদীবন
খুঁজে যাকে এই রাতে নিয়ে এলে মন
এখনো দেখিনি তাকে দেখিনি, এখন
যদি এ চোখের জ্যোতি নিবে যায় তবে
কি হবে, কী হবে !

সে-ও চলে যেতে পারে, যদি যায় তবে
কি হবে , কী হবে !
এই যে চোখের আলো, ব্যাথাবেদনার
আগুনে রেখেছি তাকে জ্বেলে আমি, তার
দেখা পাওয়া যাবে, তাই | সে যদি আবার
চলে যায়, চোখভরা আলো নিয়ে তবে
কি হবে, কী হবে !

কখনো হারাই প্রাণ, কখনো প্রাণের
থেকেও যে প্রিয়তম, তাকে | সারাদিন
কথা মনে ছিল কোনো মায়াবী গানের,
সুর খুঁজে পেয়ে তার বিষাদমলিন
কথাগুলি যদি ফের ভুলে যাই তবে
কি হবে, কী হবে !

.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
হাতে ভীরু দীপ
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
১৫ অক্টোবর ১৯৫৫ , দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত

হাতে ভীরু দীপ, পথে উন্মাদ হাওয়া,
ভ্রুকুটিকুটিল সহস্র ভয় মনে |
কেন ভয় ? কেন এমন সঙ্গোপনে
পথে নেমে তোর বারে-বারে ফিরে চাওয়া ?
এ কী ভয় তোর সকল সত্তা কাঁপায়  ?

আমি যে এসেছি, সে যেন জানতে না পায় |
দূরে হেলঙের পাহাড়, পাহাড়তলি
ছাড়িয়ে পিপলকোঠির চড়াই, আর
তারপর সাঁকো | বাঁয়ে গেলে গঙ্গার
ধারে সেই গ্রাম, আমৌঠি রঙ্কোলি |

সেইখানে যাব | সামনের শীতে যদি
পাওয়া যায় জমি ঢালু সিয়াসাঙে, তাই
চলেছি | এ ছাড়া --- জানেন গঙ্গামাঈ----
কোনো আশা নেই | বরফের তাড়া খেয়ে
নির্জন পাকদণ্ডির পথ বেয়ে
নীচে মেনে যাই | কী ভয়ে আমাকে কাঁপায়---
জানে মানাগাঁও, জানে পাহাড়িয়া নদী |

আমি যে এসেছি, সে যেন জানতে না পায় |

.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
যাবেন না
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
শারদীয় দেশ ১৯৮৯,

কখন যে একদল মানুষ আমাকে ঘিরে ফেলেছে,
তা আমি বুঝতে পারিনি |
হাত ধরে যিনি আমাকে আজ এই হাটের মধ্যে এনে
ছেড়ে দিয়েছিলেন,
চোখের পলক ফেলতে– না ফেলতেই তিনি
জাদুকরের পায়রার মতো
ভ্যানিশ |
বুঝতে পারছিলুম যে, আমারও এখন    
সরে পড়া দরকার  |  কিন্তু
মানুষের বলয়ের বাইরে যেই আমি আমার
পা বাড়িয়েছি অমনি
কেউ একজন বলে উঠল, ‘যাবেন না !’

যাবেন না, যাবেন না, যাবেন না !
হাটের ধারেই
বিশাল বটগাছ | জোলো হায়ায়
গা ভাসিয়ে সে তার
পাতার ঝাঁঝর বাজাচ্ছে তো বাজিয়ই যাচ্ছে |
দুপুরবেলায় খুব বৃষ্টি হয়েছিল,
বিকেলে তাই লোকজনের চেহারা একটু
অন্যরকম |
ছেঁড়া- ছেঁড়া মেঘগুলোও তাদের ভোল ইতিমধ্যে
আমূল পালটে ফেলেছে |
বোঝা যাচ্ছে, আজ আর বৃষ্টি হবে না |

যেন ছবিটাকে সম্পূর্ণ করে তুলবার জন্যেই
খানিক আগে
আকাশ থেকে সেই আলোর ধারা নেমে এসেছে,
যে-আলোয় শুধু
বিয়ের কনে নয়, যে-কোনো মানুষকেই ভারী
সুন্দর দেখায় | আর তার মধ্যে
চতুর্দিকে ধ্বনিত হচ্ছে সেই মন্ত্র,
যে-মন্ত্র একমাত্র মানুষই উচ্চারণ করতে পারে |
যাবেন না, যাবেন না, যাবেন না !

.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
এবার মৃত্যুকে মারো
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
১৫ জুন ১৯৯১, দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত

ওইখানে ছড়িয়ে ছিল ছত্রখান হয়ে
চশমার কাচের গুঁড়ো, রক্তমাখা ধুতি শাড়ি, ছেঁড়া
চাদর পাঞ্জাবি, ছড়ি ঘড়ি ও চপ্পল |
ওইখানে ছড়িয়ে ছিল ছিন্নভিন্ন মৃত মানুষেরা |

টুকরো-টুকরো সংবাদ এখনও আনে বয়ে
যে-মঞ্চ সাজানো ছিল, যে-কথা বলবার ছিল, তার স্মৃতি |
এখনও বাতাস
ওইখানে রেখেছে ধরে সহস্রজনের দীর্ঘশ্বাস |

তোমরা যাও | ধুধু
শূন্য ওই মাঠে গিয়ে আবার দাঁড়াও | কিন্তু শুধু
নির্বিকার দাঁড়িয়ে থেকো না |
হাতে হাত রাখো, চক্ষু দু’হাতে ঢেকো না |

কাজ বাকি পড়ে আছে, তাই
এখন সবাই
ভোলো দুঃখ, ভোলো শোক,
যে মালা ছিঁড়েছে, তাকে আবার নূতন করে গাঁথা হোক |

যে-সভা হয়নি শুরু, তাকে ফের শুরু করা চাই,
তাকে খুব শান্ত হাতে তুলে ধরা চাই
সমাপ্তি সুন্দর উত্সবে |
আবার সাজাও মঞ্চ তা হলে, টাঙাও সামিয়ানা |

কথাটা এইজন্য বলছি আরও---
যা জীবন, তাকে তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে |
কী করে বাঁচাবে, যদি অতর্কিতে মৃত্যু দেয় হানা ?
যা মৃত্যু, তা হলে তাকে মারো |

তা হলে নূতন করে জীবনের জয়ধ্বনি দাও,
যা মারে মৃত্যুকে, সেই উদ্বোধনী সংগীত শোনাও |

.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর